প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম- বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ৩য় শ্রেণী।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাপাঠ্যক্রম অদ্ভুত রহস্যময় নৈরাজ্যে পরিপূর্ণ। সমাজের মান্য-গন্য-বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানুষেরা পাঠ্যক্রম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, অসংখ্য আলোচনার পর প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তকের নামে কয়েকটি অশ্বডিম্ব প্রসব করেছেন। অবশ্য পাঠ্যপুস্তকের গায়ে লেখা আছে পরীক্ষামূলক সংস্করণ। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ন্যুনতম ৫০ লক্ষ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহন করছে। দুর্বল- পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন আত্মজ্ঞানের চুড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে যে পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে তা শুধুমাত্র কয়েকটি পাইলট প্রজেক্টে ব্যবহার করে, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার মাণ শিক্ষাগবেষকদের দিয়ে যাচাই না করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত সবাইকে নিয়ে নিরীক্ষা করার গুরুত্বপূরণ কর্মকান্ড একেবারে কান্ডজ্ঞানবিবর্জিত আচরণ মনে হয়েছে।
স্কুলের শিক্ষকদের সাপ্তাহিক পাঠ্যসূচি তৈরীর উদ্যোগ হিসেবে আজ তৃতীয় শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পড়ছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশ ও বিশ্বপরচিয় পুস্তকে কি কি তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে এবং এইসব উপস্থাপিত তথ্যের কোনগুলো শিক্ষার্থীর জন্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেটা নির্ধারণ করা এবং বিষহয়বস্তুর গুরুত্ব অনুসারে ৪০ সপ্তাহের খন্ডিত পাঠ্যক্রম সাজানো। পাঠ্যপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ে চোখ বুলিয়ে কিঞ্চিৎ ধাক্কা লাগলো- ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের বিশ্লেষনী ক্ষমতার উপরে কতটুকু আস্থা থাকলে এ ধরণের পাঠ্যপুস্তক রচনা করা সম্ভব।
পাঠ্যপুস্তকের সূচনা বক্তব্যে প্রফেসর মোস্তফা কামালউদ্দিন লিখেছেন " শিশু এক অপার বিষ্ময়। তার সেই বিষ্ময়ের জগত নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই।" সে কারণেই শিশু এবং শিক্ষকদের যুগপৎ বিষ্মিত করতে গিয়ে পাঠ্যপুস্তক বিভাগ এই পাঠ্যপুস্তকের অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ' শিশুদের সার্বিক বিকাশের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে" সামনে রেখেই ২০১১ সালে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুন:মার্জিত হয়েছে, "শিক্ষার্থীর পরিপুর্ণ বিকাশকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা হয়েছে" এবং বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবেশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মৌলিক চাহিদা, শিশুর অধিকার, কর্তব্য, সুনাগরিক হয়ে ওঠার গুণাবলি অর্জন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ ভাবে এবং সংবিধানসম্মত উপায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিষয়বস্তু উপস্থাপনের অধ্যায়ভিত্তিক তালিকার শিরোণাম:
১ আমাদের সমাজ ও পরিবেশ,
২ মিলেমিশে থাকি,
৩ আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব,
৪ সমাজের বিভিন্ন পেশা,
৫ মানুষের গুণ,
৬ পরিবার ও বিদ্যালয়ে উন্নয়নমূলক কাজ,
৭ পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন,
৮ মহাদেশ ও মহাসাগর,
৯ আমাদের বাংলাদেশ,
১০ আমাদের জাতির পিতা,
১১ আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং
১২ বাংলাদেশের জনসংখ্যা।
তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ে শিশু অধিকারের তালিকায় তারা লিখেছেন
শিশু হিশেবে আমাদের বিশেষ কতগুলো অধিকার রয়েছে
জন্ম নিবন্ধনের অধিকার,
একটি নাম পাওয়ার অধিকার,
স্নেহ ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার,
পুষ্টি ও চিকিৎসার অধিকার,
খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকার,
শিক্ষার অধিকার,
ছেলে ও মেয়ে শিশুর সমান অধিকার পাওয়ার অধিকার।
এবং তারা ঘোষণা করেছেন পৃথিবীর সব দেশের শিশুদের এই অধিকারগুলো আছে।
মানুষের গুণ অধ্যায়ে তারা ভালো মানুষের নৈতিক গুণোগুলোর কয়েকটির তালিকা করেছেন এবং অপরাপর নৈতিক গুণাবলী তৈরীর দায়িত্ব দিয়েছেন পাঠপ্রদানরত শিক্ষকের কাঁধে। একই সাথে তারা ভালো কাজের তালিকা করেছেন- সেখানে মিথ্যা কথা না বলা, অপরের উপকার করা কাউকে না ঠকানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধের জামায়াত ই ইসলামী সংস্করণের পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের দাবীতে গণিত বিষয়ের সমস্যার ধরণ পরিবর্তনের তাগিদ দেওয়া হয়েছিলো। গণিতের সমস্যায় সুদের অংক কষতে গেলে মানুষের ঈমাণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে, বেশ কিছু মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তারা কবিতা-গল্পের মতো সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল বিষয়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছিলো। তারপর আমরা বিপুল আয়োজনে ২০১২ শিক্ষানীতি অনুমোদন করলাম এবং সেখানে পাঠ্যপুস্তকে পুনরায় সত্য-মিথ্যা- সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপিত হলো।
গল্প মিথ্যা কিছু ঘটনা বয়ান করে সুতরাং এই ধরণের সৃষ্টিশীলতা মিথ্যাচার অনুমাণে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হয়ে ওঠা কতটুকু সম্ভব?
এসব নৈতিকতার বিষয় নিয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যাবে তবে গুরুতর ভুলের তালিকা করলে মহাদেশ ও মহাসাগর অধ্যায়ে যেতে হবে, সেখানে রচয়িতা লিখেছেন
পৃথিবীর স্থলভাগকে সাতটি বড় ভাগে ভাগ করা হয়েছে, এক একটি ভাগকে বলে মহাদেশ। প্রতিটি মহাদেশকে আবার কয়েকটি দেশে বিভক্ত করা হয়েছে।
মহাদেশ, দেশ ভাগ করার কতৃপক্ষ আসলে কারা? কবে কে এই দায়িত্ব গ্রহন করলো এবং মহাদেশ, দেশ, বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা ইউনিয়নের মানচিত্র আঁকলো। সংবিধান সম্মত ইতিহাসে ২৬শে মার্চের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিভাবে নতুন একটি দেশ তৈরি হলো? যারা মহাদেশকে দেশের হিসাবে ভাগ করে তারা এই নতুন দেশকে কিভাবে তালিকাভুক্ত করলো?
সর্বশেষ অধ্যায় জনসংখ্যা, সেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ভিত্তিক পুস্তক লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা,( ড মাহবুবা নাসরিন, ড আব্দুল মালেক, ড ঈশানী চক্রবর্তী এবং ড সেলিনা আক্তার,) জনসংখ্যায় নারী পুরুষের শতকরা হার উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর গণিত বইয়ে ভগ্নাংশের সামান্য ধারণা দেওয়া হলেও শতকরার হিসেবটা চতুর্থ শ্রেণীর শেষ পর্যায়ের জন্যে তুলে রাখা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে কেনো চতুর্থ শ্রেণীর গাণিতিক ধারণা অনায়াসে ঢুকে গেলো এই প্রশ্নটা পরীক্ষামূলক পাঠ্যপুস্তক অনুমোদনকারী ব্যক্তিদের ভেতরে কেনো তৈরি হলো না?
যদি শুধুমাত্র তৃতীয় শ্রেনীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পুস্তকটি এমন ধরণের অদ্ভুত বিষয়বস্ততে ঠাঁসা হতো তাহলে মেনে নেওয়া যেতো তবে পিএইচডিপ্রাপ্ত অধ্যাপক অধ্যাপিকাগণ তাদের চুড়ান্ত মেধার সাক্ষর রেখেছেন এই সিরিজের পরবর্তী দুটো বইতেও।
কুশিক্ষায় অপশিক্ষিত হওয়ার চেয়ে অশিক্ষিত কান্ডজ্ঞানসম্মত সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের উপকারে আসতে পারে। শিক্ষা সংস্কারের নামে এমন চুড়ান্ত অসভ্যতা মেনে নেওয়া যায় না।





কুশিক্ষায় অপশিক্ষিত হওয়ার চেয়ে অশিক্ষিত কান্ডজ্ঞানসম্মত সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের উপকারে আসতে পারে। শিক্ষা সংস্কারের নামে এমন চুড়ান্ত অসভ্যতা মেনে নেওয়া যায় না।
কি আশ্চর্য!! এসব লেখা নাকি!! বাচ্চারা এসব শিখছে, কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই বাচ্চারা কি শিখছে!!
মন্তব্য করুন