দিনলিপি
সকাল বেলা সূর্য তাতিয়ে ওঠার আগেই কানের পাশে শিশ্নকাতর এক প্রেমিকের প্রেমের আঁচ হজম করলাম। অফিসগামী মানুষের ভীড়ে বাস আগাচ্ছে এক পা দুই পা করে, কানের পাশে প্রেমের উত্তাপ। কানে জীপার থাকলে ভালো হতো, ঠিকমতও লাগিয়ে দিলেবাইরের কোলাহল, উত্তেজনা এবং নানাবিধ শব্দঝঞ্ঝাট এড়িয়ে নিজের মতো অফিসের জ্যাম ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হতো। অভিযোগে পর্যুদস্ত করে, অনুযোগ অভিমানজর্জর মেকী প্রেমালাপের ফাঁকে যতটুকু স্পষ্ট হলো আমার গন্তব্যের তিনটা স্টপেজ আগে প্রেমিক নামবে। রাস্তায় এলেমেলো ছড়িয়ে থাকা গাড়ী, ট্রাফিকের তুলে রাখা হাত, লাঠি আর বাতিতে সাজানো আমাদের বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাত্রীর মানসিক উত্তেজনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রৌদ্রের তাপ। অল্পতেই বিক্ষুব্ধ, সহিংস হয়ে উঠতে চাওয়া যাত্রীর সাথে কন্ডাক্টরের বচসা। পাশে মৌলানা ধাঁচের একজন বসেছে, সেও ক্রুদ্ধ।
প্রেমিকা এবং প্রেমিকের মোবাইলের চার্জ ফুরোলো, কথার নটে গাছ মুড়োলো অবশ্য প্রেমিক তখনও ক্ষুব্ধ। টাকা নেই তাই তার জীবন চলে না কিন্তু যদি বাসার লোকদের ফাঁকি দিয়ে কোনোমতে প্রেমিকা তার অস্থায়ী নিবাসে আসতে পারে, সিএনজি ভাড়া দিয়ে দিবে সেই। প্রেমিকার নানাবিধ ছলছুঁতো, তারও একজন প্রেমিক আছে। সকাল বেলা এক অদ্ভুত প্রেমের গন্ডোগোলের ভেতরে আটকা পরে আছি। মোবাইলের দীর্ঘ প্রেমালাপ সাঙ্গ হওয়ার পর মনে হলো একবার পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি কে সেই মহান প্রেমিক কিন্তু সেটাও নাগরিক অভদ্রতা। আমাদের নাগরিক জীবনে অনাকাঙ্খিত একান্ত ব্যক্তিগত ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে গেলেও এড়িয়ে যাওয়াটাই নিয়ম। এত ভীড়ে সামান্য আড়াল খুঁজে প্রেমিকা ওষ্ঠচুম্বনের অবসর নেই এখানে তাই তাতানো রাস্তায় সিএনজির ঘোরটোপের আড়ালে উত্তেজক প্রেমের দৃশ্যগুলো চিত্রায়িত হয়।
সৌখিন মানুষেরা কেউ যায় নৌকাভ্রমণে, মাঝনদীতে চইয়ের পর্দা নামে, বেরসিক মাঝি গলুইয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে ভালোবাসার নানাবিধ স্বর শুনে, বিড়ি টানে আর আশেপাশের মাঝিদের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হাসি হাসে। বর্ষার পর নদীতে টান লাগলে কুমারী চর জাগে। নি:সঙ্গ কুমারী চরে কলমীর ঝোঁপ আর চরের বালেতে আটকে পরা পঁচে যাওয়া কচুরীপানার কটুগন্ধ, জনমানুষ নেই, সেখানে ক্ষণিক বাসর সাজিয়ে প্রেমের গল্পগুলো শেষ হয়ে যায়। শহরের আব্রু নেই। মানুষের প্রেম-কাম-যৌনকাতরতা- উদোম উদ্দাম। কাতর মানুষ ফাঁকা মেস আর বন্ধুর খালি বাসা খোঁজে।
শহরতলির ঘিঞ্জি বস্তিতে শরীর তৈরি হওয়ার আগে প্রাক-কৈশোরেই শাররীক সম্পর্কগুলোর ভাষা শিখে যায় মানুষ। সন্ধ্যার ক্রুদ্ধ ঝগড়ায় কিংবা গভীর রাতের সন্তাপে খাটের কাছে গুটিশুটি শুয়ে থাকা তারা জানে কে কার সাথে বৈধ-অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। নারীর উপরে পুরুষের অধিকারবোধ যতটা শাররীক তারচেয়ে বেশী সামাজিক। সেই অধিকারবোধের ভেতরে উৎকণ্ঠা স্নেহ-কামনা-আক্ষেপ থাকে। সব মিলিয়ে সম্পর্কের ভেতরে এক ধরণের উষ্ণ মানবিক অনুভুতি থাকে।
প্রচন্ড শ্রম, শ্রমশোষণে হাড় জিরজিরে মানুষ বিনোদনের আশায় টিভির সামনে বসে, রাতের ভাতের সাথে হিন্দি সিরিয়ালের অসভ্য-অশালীন কুৎসিত সম্পর্কের জটিলতা গিলে । সম্পর্কগুলো হয়তো এ রকমই, নিছক শাররীক, শুধু আমরা কতিপয় মধ্যবিত্ত সম্পর্কে এক ধরণের নিয়মতান্ত্রিক পবিত্রতা আরোপ করতে চাই। যেহেতু শাররীক চাহিদা মেটানোর সামাজিক বৈধ্যতা নেই তাই মরিয়া মানুষ চাহিদা মেটাতে নিজের ভাষাজ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। হয়তো বাসে নিতান্ত অনিচ্ছায় পার্শ্ববর্তী মানুষের কামবাসনা পুরণের কলা কৌশল শুনতে শুনতে অযথাই ক্রুদ্ধ হয়ে ভাবছি
সবচেয়ে বিশ্রী সে পুরুষ অন্ডকোষের চামড়ায় বন্দি যার হৃদয়।





দুর্দান্ত!
হ্যাটস অফ!
সহজ সত্য দিনলিপি
মন্তব্য করুন