স্বাধীনতা যুদ্ধ
স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে অনেকটা নির্মোহভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ সময়কালীন ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা সম্ভব। অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এবং প্রায় বিরল কিছু তাত্ত্বিক বিশ্লেষন প্রচেষ্টায় সীমিত আমাদের মুক্তিযুদ্ধচর্চা।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন সংক্ষিপ্ততার কারণে প্রতিরোধ যুদ্ধের ধরণ ও কার্যকারিতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ হয়তো সম্ভব নয় কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের অনুসারী মানুষদের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে স্বাধীকার আন্দোলনের পর্যায় পেড়িয়ে রাতারাতি একটি জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হলো , সেই রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো কিভাবে স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো সেটার বিশ্লেষণ সম্ভব ছিলো
স্বাধীনতার বিবৃত চেতনা( মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা) এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা- উপলব্ধি এবংরাজনৈতিক অর্জনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাত্ত্বিক পর্যালোচনা সম্ভব ছিলো, সে উদ্যোগ গ্রহন এবং সেই লক্ষ্যে গবেষণা সম্প্রসারণের আকাঙ্খা আমাদের ইতিহাসবিদদের ভেতরে এখনও অনুপস্থিত । রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, ব্যক্তিগত হতাশা এবং অন্যান্য নানাবিধ কারণে আমাদের ইতিহাস চর্চার একটা বড় অংশ একেবারেই অনুৎপাদনশীল স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কে ধ্বংস হয়ে গেলো। জনগোষ্ঠীর সামগ্রীক অবদানকে অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধানতম অনুঘটক হিসেবে প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় অর্জন এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বিস্তারের কুকুর লড়াইয়ে গিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের বদৌলতে আমরা জানি পূর্ব বাংলায় প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আস্থা হারানো বিচ্ছিন্ন কিছু গোষ্ঠী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখছিলো। আওয়ামী লীগের অনুসারী ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত এক দল তরুণ সে লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা শহরে গোপন কমিটিও তৈরী করেছিলো। সমসাময়িক সময়ে পূর্ব বাংলা কম্যুনিস্ট পার্টির বিভিন্ন গ্রুপ পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনের ধরণ ও অর্থনৈতিক শোষন উচ্ছেদের প্রক্রিয়া হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহন করছিলো। এক দফা দাবী তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতিও চলছিলো ১৯৭১ এর মার্চে।
ফেডারেল ব্যবস্থার অধীনে ছয় দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা এবং বাঙালীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রথম ধাপে বাংলাদেশের নাগরিকেরা এক তরফা ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশী আসনে বিজয়ী করে। নির্বাচনে একক সংখয়াগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত নাও হতে পারে বাঙালীদের ভেতরে এমন সংশয়ও ছিলো ।
যারা ৭ই মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন ২ সপ্তাহে বাঁশ আর গাছের ভাঙা ডাল নিয়ে লেফট রাইট লেফট রাইট খেলার বাইরে বড় কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায় নি। তাদের ভেতরে স্বাধীনতার আকাঙ্খা ছিলো। ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিশ্বাস যেমনই হোক না কেনো, সুযোগ সন্ধানী মানুষেরা অবশ্য আওয়ামী লীগের ব্যপক জনপ্রিয়তার ঢল দেখে আওয়ামী লীগের চাহিদা মতো আচরণ করেছে। পাকিস্তানী সেনা বাহিনী সামরিক রসদ জমাচ্ছে, অস্ত্র এবং সৈনিকের সংখ্যা বাড়াচ্ছে, সম্ভবত একটা হামলা আসন্ন- এই ধরণের অসংখ্য বার্তা বিভিন্ন ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগ সংগ্রাম কমিটির কাছে পৌঁছে দিয়েছে নিয়মিত। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোপন নথি মারফত স্পষ্ট হয়েছে ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন এমন আশংকা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিশেষ করে ইয়াহিয়া খানের ভাবনায় ছিলো এবং এমন যেকোনো ঘোষণায় তার সামরিক বাহিনী ব্যবহার করবে এমন সবুজ সংকেতও প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে দেওয়া হয়েছিলো।
৭ই মার্চ, এবং পরবর্তীতে ২৩শে মার্চ কিংবা ২৫শে মার্চ রাত ১১টা পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নি। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ যাদের হয়েছে তারাও আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন কি না এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ৭ই মার্চের ঘোষণা থেকে নির্দেশনা গ্রহনের কথা বলেছেন তিনি। এমন কি এক দফা দাবির ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর মোয়াজ্জেম হোসেন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, দাপ্তরিক স্বীকারোক্তি এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে রচিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রের প্রথম ৬ খন্ডে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নির্মাণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী অংশগুলোতে ব্যক্তির অংশগ্রহন এবং ব্যক্তিগত দুর্দশার বিভিন্ন প্রতিবেদন সংকলিত হয়েছে। সেসবের বাইরে মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তিগত গরিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে কেউ কেউ স্মৃতিকথা লিখেছেন, সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত অনুভুতির কাঠামো থেকে সম্মিলিত ইতিহাস নির্মাণের প্রচেষ্টা তেমন তীব্র হয়ে উঠে নি এখানে।
অপেক্ষাকৃত বর্ষীয়ান গবেষকেরা সবাই এক ধরণের দ্বিচারিতায় বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করেন তাদের " বিস্ফোরক তথ্য কিংবা অনুসন্ধান" সাময়িক স্থিতিশীলতাকে কিছুটা হলেও বিচলিত করবে। তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস কিংবা তথ্য প্রকাশের অনীহা নিয়ে বক্তব্য দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই।
বরং সাদামাটা কাঠামোতে আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের ধাঁচকে উপস্থাপন করা যায়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে দূরে রাখা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিজস্ব বাহিনী নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাধারণ জনসাধারণদের সাথে নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে জড়িয়ে পরা এবং অপেক্ষাকৃত র্যাডিক্যাল কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মীদের রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মনবাড়িয়া, কুষ্টিয়া কিংবা সিলেটে প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা করেছে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। পাবনা রাজশাহী ঢাকায় প্রতিরোধে আন্দোলন শুরু হয়েছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্মচারীদের সক্রিয় উদ্যোগে। অপেক্ষাকৃত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্বাসের অনুসারী নেতা কর্মীদের সক্রিয় উদ্যোগে। কিছু স্থানীয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়া এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত ব্যক্তিদের মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য মেনে নেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কারোই মুজিবনগর সরকারের সামরিক পরিকল্পনা অনুসারে যুদ্ধ পরিচালানার আগ্রহ ছিলো না।
প্রবাসী সরকারের স্থানিক দুরত্ব, কর্মচারী স্বল্পনা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা সারা দেশের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নির্দিষ্ট কোনো আইনী বাধ্যবাধকতার অধীনে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছিলো। সাম্রিক বাহিনীর সদস্যরা সবাই মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য মেনে যুদ্ধ পরিচালনা করলেও দেশের অভ্যন্তরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন তাদের অনেকেই জুলাইয়ের আগে মুজিবনগর সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আসতে পারে নি।
একদল অস্ত্রধারী মানুষ যারা দেশের বিদ্যমান প্রশাসনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে এবং যাদের স্থানীয় আচরণ নিয়ন্ত্রনের প্রশাসনিক ক্ষমতা মুজিবনগর সরকারের নেই- সেই পরিস্থিতিতেও অনেক বেশী আইনানুগ ছিলেন অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু যুদ্ধের প্রথাগত নিয়ম মেনে তারা প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছেন এমনটা সব সময় সত্য ছিলো না।
ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির স্মৃতি নিয়ে অনেকে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের ভেতরে স্বাধীনতার আকাঙ্খার চেয়ে বড় ছিলো প্রতিশোধ আকাঙ্খা। বিরুপ পরিস্থিতিতে পরাধীন ভূখন্ডে অবৈধ দখলদার বাহিনীর বিভিন্ন ধরণের লাঞ্ছনার স্মৃতি নিয়ে জীবনযাপন করা সাধারণ মানুষ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা এবং প্রতিশোধ বাসনা নিয়ে বসবাস করেছে। প্রায় ৬ মাসের লাঞ্ছিত জীবনযাপনের পর মুক্তিবাহিনী এবং যৌথবাহিনীর স্রোতে তাদের বসতি স্বাধীন হয়েছে।
স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের সহযোগিতাকারী ব্যক্তিদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা এবং পাকিস্তানী টহলবাহিনীকে ঝটিকা আক্রমনে ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকারে বাধ্য করার উদ্দেশ্য সারা দেশেই বিভিন্ন ছোটো ছোটো গ্রুপ আক্রমন চালিয়েছে। সফল এবং ব্যর্থ এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় কখনও একটি জনপদের সকল মানুষই নির্মম গণহত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু যখন যৌথ বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ক্যাম্প গুটিয়ে পশ্চাতসরন করেছে এবং মুক্তিবাহিনী রাজাকার ক্যাম্প দখল করেছে, তখন স্থানীয় মানুষ এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা কেউই জেনেভা কনভেনশন মেনে চলেন নি। স্থানীয় জনগণ ন্যায়বিচার প্রত্যাশী ছিলো না, তারা প্রতিশোধ চেয়েছে এবং প্রশাসনিক নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরে থাকা মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রতিশোধ বাসনা চরিতার্থ করেছে। স্থানীয় জনগনের অনুমোদনে তাদের চাহিদা মেটাতে প্রত্যেকটি রাজাকারকে হত্যা করা হয়েছে।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী কোনো ব্যক্তির পরিবারকে হত্যা করার বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো যখন প্রায় স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হলো, মুজিবনগর সরকার এই ধরণের বিচারবিহীন হত্যাগুলোকে নিয়ন্ত্রনের উদ্যোগ গ্রহন করেছিলো। তাদের প্রভাবে কিংবা স্থানীয় কমান্ডারদের তৎপরতায় নভেম্বর ডিসেম্বরে রাজাকার হত্যার পরিমাণ হ্রাস পায়।
প্রাণ ভয়ে অনেক রাজাকার কমান্ডারই তখন এলাকা ছেড়ে পালায় কিংবা স্থানীয় থানায় গিয়ে আত্মসমর্পন করে। আটককৃত রাজাকারদের বোঝা বয়ে নেওয়ার বদলে তাদের বন্দী করে ভারতে পাঠানো এবং হত্যা করে মাটির তলে পুঁতে রাখার ভেতরে যেটা তাদের কাছে বেশী সহজ মনে হয়েছে সেই প্রক্রিয়া তারা অনুসরণ করেছেন।





মন্তব্য করুন