অন্ধকার বর্তমান
২০০৯ সালে বাংলাদেশের পুলিশ ১২৯০৬টি নারী নির্যাতনের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেছিলো, ২০১০ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২১২।
২০১১ সালে পুলিশী হেফাজতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো ৪টি, ২০১২ সালে আইন শৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের হাতে ধর্ষিত এবং নির্যাতিত হন ১৩ জন নারী।
২০১১ সালে ৭১২টি নারী ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ থানায় লিপিবদ্ধ হয়েছিলো, ২০১২ সালে ৮০৬ জন নারী ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেছে থানায়।
গত এক দশকে বাংলাদেশে নথিভুক্ত নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের সংখ্যা দেড় লক্ষের বেশী। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার নারী নির্যাতনের অভিযোগ থানায় লিপিবদ্ধ হয় কিন্তু থানায় লিপিবদ্ধ না হওয়া নির্যাতন, নিপীড়ন ও নারী ও শিশু হেনেস্তার অভিযোগ পরিমাণ আমাদের কল্পনার বাইরে। "ইভ টিজিং" নামের নিরীহ শব্দের আড়ালে স্কুলের গেটে দাঁড়ানো ফ্লাইং রোমিও আর ধর্ষনাগ্রহী মানুষদের কুৎসিত যৌনকামনার অবিশ্রান্ত বর্ষণ পার হয়ে ঘরে ফিরে গোসল করা শিক্ষার্থীরা কেউই স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেন না। স্ট্রীট রোমিওদের সবাই প্রেমাকূল কিশোর নয়। মৌখিক ধর্ষণ কামনা ব্যক্ত হওয়ার পর যখন শিক্ষার্থীর ওড়নায় টান লাগে, যখন নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষার্থীরা ক্লাশ টিচার আর হেড মিস্ট্রেসকে জানায় তখন স্কুলের গেটে পুলিশ কনস্টেবলের পাহারা বসে।
ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের শিক্ষার্থী পরিমল নামের একজন শিক্ষকের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পর সে ঘটনার ভীষণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো। সেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অন্যান্য আরও সব অঘটনের ভীড়ে হারিয়ে গিয়েছে, নারী ও শিশু নিপীড়ণ বন্ধ হয়ে যায় নি। ৫ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ যুবক আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসে পুনরায় শিশুটিকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। আজও ৮বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এক যুবককে জুতা পেটা করার পর ক্ষুব্ধ যুবক শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে এক নারীকে কুপিয়ে ক্ষত বিক্ষত করেছে ৪ জন যুবক, নিরাপত্তাহীনতায় নারী সেই যুবকদের নাম বলতে ভয় পাচ্ছেন।
৩ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর পালিয়ে গিয়েছে বাসার দারোয়ান, আমরা মহিলাকে অনুরোধ করেছিলাম শিশুটি নিজের উপরে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের প্রতিকার চাইতে পারবে না, আপনি আপনার সন্তানের হয়ে আইনী লড়াই করেন, আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি আপনাদের নাম পরিচয় কিছুই প্রকাশিত হবে না, শিশুটির মা লোকলজ্জা এবং প্রবাসে কর্মরত স্বামীর ভয়ে থানায় কোনো মামলা করেন নি।
এ ধরণের অমানবিক ঘটনাগুলোর মুখোমুখি হই মাঝে মাঝেই। তবে রাজবাড়ীর ৫ম শ্রেণীর মেয়েটির মতো মর্মন্তুদ হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হই নি, বৈকালিক কোচিং ক্লাশের পর প্রশান্ত কুমার নামের শিক্ষক শিশুটিকে ধর্ষণ করে সে দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করেন এবং ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পরবর্তী ১ বছরের বেশী সময় শিশুটিকে ধর্ষণ করেন।
সে ঘটনা জেনে ফেলেন সিরাজুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম প্রশান্ত কুমারের বিরুদ্ধে কিংবা এই অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেন নি। তিনি শিশুটির নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না করে প্রশান্ত কুমারের সাথে নিজেও শিশুটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য এই উদাহরণ যেখানে প্রশান্ত কুমার যখন স্কুল কক্ষে শিশু ধর্শণ করেন তখন সে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেন সিরাজুল ইসলাম এবং সিরাজুল ইসলামের ধর্ষণের দিন শ্রেণীকক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেন প্রশান্ত কুমার। এমন ক্যালেন্ডারের পাতা দাগিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করে ধর্ষণের ঘটনার ভয়াবহতার মুখোমুখি শিশুটি ভালো থাকুক। অভিযুক্ত প্রশান্ত কুমারের বিরুদ্ধে অতীতে আরও দুটো স্কুলে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। একজন চিহ্নিত শিশু ধর্ষণকারীর অতীত ইতিহাস যাচাই না করে তাকে শিশুদের স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও এই অপরাধের দায়ভার বহন করা উচিৎ।
৯ই এপ্রিল প্রথম আলোর ভেতরের পাতায় ছাপা হয়েছিলো সংবাদটি। পঞ্চম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী টানা একবছর কি ধরণের বিভিষীকাময় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। একজন শিশু যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাধারী দুইজন শিক্ষকের যৌনদাসী হিশেবে প্রতিদিন লাঞ্ছিত হচ্ছে, শিশু দিবস- নারীর মর্যাদা আর নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে হাজার হাজার রিপোর্ট করা প্রধান দৈনিকগুলোর সম্পাদকেরা সে বিষয়ে মোটামুটি উদাসীন। তারা বিষয়টিকে নিতান্ত অবহেলায় ভেতরের পাতায় ঠেলে দিয়ে প্রথম পাতা ক্ষমতাবানদের দুর্নীতের সংবাদ প্রকাশ করেন। একজন শিশু আজকের সময়ে এসে এক বছরের বেশী সময় ধরে নিয়মিত ধর্ষিত হচ্ছে এই সংবাদ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুমি লুণ্ঠন আর পুলিশের চুরি চামারির চেয়ে গুরুত্বহীন????
নিউজ এডিটর এবং প্রধান সম্পাদক যখন সংবাদের গুরুত্ব বিবেচনা করে কোনো ঘটনাকে প্রথম পাতায় উপস্থাপন করেন এবং পেশাদারিত্বের সবক শেখান তখন আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি তারা পেশাদার অমানবিক কর্পোরেট দাস । শেষ পর্যন্ত মুনাফাই যাদের কাছে মুখ্য।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এলিটিজম গণবিরোধী। ক্লিনিকের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্লিনিক কতৃপক্ষ নবজাতককে বিক্রী করে দিয়েছে সংবাদটি ২৬শে মার্চ প্রথম আলোর ৮ নং পৃষ্টায় ছাপানো হয়েছিলো, সেদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিশেবে ছিলো তদন্ত কমিটি জামায়াত বাতিলের সুপারিশ করেছে। স্বাধীনতার ৪৩ বর্ষপুর্তির দিনে যখন দেশের কোনো একটি অঞ্চলে একজন ক্লিনিক মালিক প্রসবের খরচ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নবজাতককে বিক্রী করে দেয়- সেদিন প্রথম পাতা এবং শেষ পাতার কোথাও এমন অমানবিক সংবাদের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় "কর্পোরেট", "সব ভালোর সাথে হামাগুড়ি দেওয়া", "সত্য প্রকাশে নির্ভীক" গোঁয়ার দৈনিক পত্রিকাগুলো আসলে হিন্দী সিরিয়ালের মতো ক্ষমতাধরদের ক্ষমতার রশি টানাটানি আর তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চা উপস্থাপনের মুখপত্র হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।
স্থানীয় পর্যায়ে সকল নাগরিককে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনে তারা এইসব নিপীড়ণের কি কি প্রতিকার পেতে পারেন, কিভাবে অভিযোগ লিপিবদ্ধ করবেন, কিভাবে আইনী লড়াই চালাবেন এবং কারা তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিবে এই বিষয়গুলো নিয়ে গ্রামপর্যায়ে আলোচনা হওয়া জরুরী। জনসচেতনতা নির্মানের দায়িত্ব ছিলো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সে দায়িত্ব পালন করছে না। যারা রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যুক্ত তারা বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম, লুণ্ঠন এবং দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তাদের দুর্নীতিগ্রস্ততা প্রশাসনকেও দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে। প্রশাসনও এইসব নিপীড়নের আইনী প্রতিকার দিতে অনাগ্রহী। একজন শিশু যখন আদালতের জামিনে বাইরে আসা একজনের হাতে খুন হয় তখন প্রশাসন এবং বিচারক এই হত্যার দায়ভার স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচারকের উপরেও বর্তায়।
পত্রিকা কর্পোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পর, পত্রিকার মালিক সম্পাদক এবং সাংবাদিককদের বেতন ভাতা সম্পর্কিত পৃথক পে কমিশন তৈরী হওয়ার পর সাংবাদিকেরাও ধীরে ধীরে সমাজের উপরতলার বাসিন্দা হয়ে উঠেছেন। সেই উপর থেকে নীচের মানুষের দুঃখ দুর্দশার সংবাদ নেহায়েত ছাপাতে হয় বলে তারা ছাপাতে আগ্রহী। গণমুখী কোনো পলিসি বাস্তবায়নের জন্যে প্রচারণা কিংবা জনসচেতনতা তৈরীর আগ্রহ তাদের কম। সামনের পাতা আর ভেতরের পাতার বিজ্ঞাপনের রেট প্রচার সংখ্যায় বাড়িয়ে নিতে পারলে তারা খুশী।
আমাদের বাইরে আমাদের কোনো স্বজন নেই। আমরা ছাড়া আমাদের কোনো বন্ধু নেই। নিজেদের অসস্তি, নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদেরই একতাবদ্ধ হতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ছাত্র প্রতিনিধিদের ১৩ দফা মেনে নিয়েছিলো। সেই আন্দোলনের একজন দুর্বল সমর্থক হিশেবে মিছিলে অংশগ্রহন এবং ১৩ দফা ধর্ষণবিরোধী নীতিমালার খসরা তৈরির সময় নিতান্তই উপস্থিত থাকা একজন হিশেবে যখন হাইকোর্ট ছাত্র প্রতিনিধিদের ১৩ দফাকে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন এবং প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে মেনে চলার সুপারিশ করেছিলো সে আন্দোলনে অংশগ্রহনের গর্ব তৈরী হয়েছিলো নিজের ভেতরে। সেই নীতিমালা মেনে চলার সুপারিশের কয়েক বছর পার হয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অধিকাংশ অফিসে এখনও সে সুপারিশ মেনে চলার পরিস্থিতি তৈরী হয় নি।
আমাদের সচেতন অবহেলায় এই ধরণের নির্মম ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটছে, তার সবগুলো গণমাধ্যমে উঠে আসছে না। যৌননিপীড়নের শৈশব স্মৃতি নিয়ে বিষন্ন, ভীত একদল মানুষ বাংলাদেশের ভবিষ্যত নাগরিক সমাজ হিশেবে গড়ে উঠছে এমন বাস্তবতা প্রতিহত করতে মানববন্ধনে অংশগ্রহন করুন।
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা যথাযথ কতৃপক্ষ এবং প্রশাসনের। তাদের দায়িত্বপালনের অবহেলা প্রায় ৩ কোটি শিক্ষার্থীকে এমন অঘটনের সম্মুক্ষীন করতে পারে। শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে যৌন নিপীড়ণ বিরোধী নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
পাঠ্যপুস্তকে শিশু ও শিক্ষার্থীদের অধিকার সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যৌনস্বাস্থ্য এবং যৌননিপীড়ন সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটি এনজিওদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
যাদের অংশগ্রহনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তাদের একাংশের সাথে গত বছর কথা হয়েছিলো। এখনও দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ দফা সুপারিশ মেনে চলা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূলত বামপন্থী ছাত্রনেতাদের কাছে ১৩ দফা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জেনে সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহনের আগ্রহও ছিলো। তবে এই প্রয়োজনীয় কাজটি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি । কাউকে না কাউকে আগ্রহী হয়ে কাজটা শুরু করতে হবে।
প্রাক্তন বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন এনজিওর দফতরে বসে মানবিক অনুভুতির কাতুকুতি দেওয়া অনুদানের চিঠি লিখছে নিয়মিত কিন্তু এনজিওর অনুদান নির্ভর জনসচেতনতা প্রকল্পের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরী করা সম্ভব না। অমানবিক একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের লড়াইটা সকল মানবতাবাদী মানুষের এবং রাষ্ট্রকে এই কাজে অংশগ্রহন করতে বাধ্য করতে হবে। তরুণরা যদি মানবিক রাষ্ট্র নির্মানের লড়াইয়ে পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে পারে তাহলে মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব।





আসলেই অন্ধকার বর্তমান!
এই অন্ধকার থেকে কখনও কি এই বের হয়ে আলোর মুখ দেখবে এই দেশ, এইটাও একটা প্রশ্ন!
কবে কাটবে এই অন্ধকার
মন্তব্য করুন