ইউজার লগইন

আমাদের ধর্মচর্চা

ধর্মীয় বয়ান শুধু আরবীতে দেওয়া যাবে না কি স্থানীয় ভাষায় ধর্মীয় বয়ান দেওয়া শুদ্ধ- এমন প্রশ্নের উত্তরে ইমাম আবু হানিফা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন স্থানীয় ভাষাতেও ধর্মীয় বয়ান দেওয়া শুদ্ধ। বাস্তববুদ্ধি, কান্ডজ্ঞান দিয়ে ব্যক্তির ধর্মবিষয়ক সংকটের সমাধান খোঁজা ইমাম আবু হানিফার কাছে ভাষা হিসেবে "আরবি"র আলাদা পবিত্রতা ছিলো না। প্রতিটি ভাষায় সমান পবিত্র, সমান গুরুত্বপূর্ণ। আরবি ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে যতদুর বিস্তৃত হয়েছিলো ইসলাম ধর্ম প্রচারক এবং ব্যবসায়ীদের কল্যানে তারচেয়েও বেশী দূরে বিস্তৃত হয়েছিলো।

আরবি শিক্ষিত মোল্লা এবং স্থানীয় অধিবাসীদের ভেতরে মাতৃভাষায় ধর্মচর্চা ও ধর্ম পালনের বিতর্কটা প্রতিনিয়তই চাঙ্গা হতো। কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন ধর্মবেত্তারা সব সময়ই মাতৃভাষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বাঙাল মুল্লুকে বিতর্কটা অন্যান্য দেশের অনেক পরে শুরু হয়েছে। এবং বাঙাল মুল্লুকে ধর্মভাষা বিতর্কটাতে আরবীর তুলনায় বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে উর্দু ভাষা।

উত্তর ভারতের মুসলমানদের মাতৃভাষা উর্দু, ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার শুরুর দিকেই তারা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত হয় এবং ইংরেজদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে। বাঙাল মুল্লুকে কোলকাতাকেন্দ্রীক বাণিজ্যিক বিকাশের অধিকাংশ সুফল ভোগ করেছে বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়, কোলকাতা শহরের আশেপাশে বসবাসরত মুসলমানেরাও সে সুবিধা ভোগ করেছে কম বেশী কিন্তু গঙ্গা যতদুর পারি দিয়ে পদ্মা হয়ে যায় সেই পদ্মা অঞ্চলের অধিবাসীরা এই বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করতে পারে নি।
উত্তর ভারতে মুসলমানেরা এই সুবিধা ভোগ করলেও সেখানকার বর্ণহিন্দুরা ইংরেজ শাসনের সুবিধা থেকে কিছুটা বঞ্চিত হয়েছিলো, ফলে সেখানেও এক ধরণের অনুগ্রহলোভী সাম্প্রদায়িকতা বিকশিত হয়। আরবি-ফার্সী- তুর্কী-হিন্দি -বিহারী-মৈথিলী ভাষার সংকর হিসেবে উদ্ভুত উর্দু ভাষা খুব দ্রুত বিকশিত হয়েছে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে বহুলচর্চিত হওয়ার কারণে খুব দ্রুতই সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে উর্দুতে কোরানের অনুবাদ-তাফসীর-ইত্যাদী গ্রন্থ প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার অনেক পরে বাংলা ভাষায় কোরান অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ইংরেজী উচ্চশিক্ষিত উত্তর প্রদেশের মুসলমান নেতার বাঙাল মুল্লুকের মুসলমানদের নেতা হয়ে ওঠে- ইংরেজ সাহেবদের সান্নিধ্য এক ধরণের এলিটিজম তৈরী করেছিলো এবং নব্য ইংরেজীশিক্ষিত বাঙালীদের অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিলো তারা। এই অংশটাই উর্দু ভাষাকে মাতৃভাষার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছিলো। বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক এবং উচ্চশিক্ষিত বাঙালী সরকারী আমলাদের ভেতরে ভাষার প্রশ্নে এক ধরণের ঠান্ডা লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিলো সিপাহী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে, সে লড়াই গ্রামীণ পূঁথি রচিয়তা এবং আমলাদের ভিন্ন ধাঁচে ধর্ম ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত করে। দিল্লীর মসনদ হারানোর বেদনায় একজন যখন ফতোয়া দিলেন এটা বিধর্মী রাষ্ট্র এখানে জুম্মার নামাজ আদায় করা যাবে না, সে সময়ে অন্য একদল জুম্মার নামাজের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলতে ফতোয়া দিলো পরপর ৪ শুক্রবার যদি কেউ জুম্মার নামাজ আদায় না করে সে কাফের হয়ে যাবে। কয়েক দশক ধরে এই দুই মতাদর্শের ধর্মপ্রচারক এবং ধর্মগুরুরা ঢ্যাড়া পিটিয়ে গ্রামের ময়দানে উন্মুক্ত বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। কখনও জুম্মাবাদীরা বিজয়ী হয়েছে, কখনও জুম্মাবিবাদীরা, কিন্তু এই লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে বাঙাল যে আদতে দুর্বল মুসলমান, নামাজ রোজা আর ধর্মপালনের বদলে গরুর মাংস চিবিয়ে নিজের ধার্মিকতা প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত এই পরিচয়টি সামনে চলে এসেছে। সেই পরিস্থিতির যে খুব পরিবর্তন ঘটেছে সোয়াশো বছর পরে এমনটা বলা যাবে না। এখনও বাঙালের উৎকট ধার্মিকতা ধর্মকে হৃদয়ে ধারণ করার বদলে ধর্মকে পদবীতে বহন করতে বাধ্য করে।

আমাদের ধর্মপালনের ভাষা বিষয়ক বিতর্ক যখন শুরু হলো তখন হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির গ্রাসে আমাদের মুসলমানিত্ব হীনবল হয়ে পরেছে এই ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত- ফলে আমাদের শিল্পী-সাহিত্যিকেরা মুসলমানী শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহন করছে। ইংরেজদের অনুকরণে নানান নামের নানান উদ্দেশ্যের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করছে- সেসব সাংস্কৃতিক উদ্যোগ কৃষিজীবী আপাতস্বচ্ছল নব্যশিক্ষিত মুসলমানদের ভেতরে প্রসারিত হচ্ছে। ক্লাবের অনুরাগী-অনুদানদাতাদের সংখ্যা বাড়ছে- বড় লাট ছোটো লাটের দরবারে তাদের নানাবিধ দাবী উত্থাপিত হচ্ছে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া ইংরেজ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরেছে এবং উপমহাদেশের বিপূল জনগোষ্ঠীর কাছে যুদ্ধ পরিচালনার সৈনিক সরবরাহের আবেদন জানাচ্ছে। গান্ধী এসে ইংরেজ সরকারকে আশ্বস্ত করছেন তিনি ইংরেজদের স্বার্থ দেখভাল করবেন- সেক্যুলার জিন্নাহও ইংরেজদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

অন্য দিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে সে বিতর্কে হিন্দুয়ানী বাংলা এবং মুসলমানী বাংলার বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুসলমান সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের অনুরোধ যদি কেউ আর্বি ফার্সী সম্বলিত বাংলায় প্রশ্নোত্তর লেখে শুধুমাত্র ভাষা ব্যবহারের জন্যে তাদের প্রতি অবিচার করা ঠিক হবে না। যেহেতু এরা বাঙালী মুসলিম এবং বাঙালী মুসলিমদের ভেতরে আর্বি-ফার্সীবহুল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা ঐতিহ্য আছে , পঠিত বিষয় তারা যেভাবে অনুধাবন করে এবং তারা যদি তাদের মাতৃভাষায় প্রশ্নোত্তর লেখে সেখানে সংস্কৃতজাত শব্দের বদলে এমন উর্দু-ফার্সী-আরবিজাত শব্দের আধিক্য থাকতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ভাষা বিতর্কে জড়িয়ে লিখছেন বিদেশী ভাষা বিশেষত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত শব্দগুলো বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করবে নিশ্চিত ভাবেই কিন্তু প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা না করে যথেচ্ছা ফার্সী এবং আরবী শব্দের ব্যবহার বাংলাভাষার বিকৃতি করছে। সে বিষয়টাতে সচেতন হতে হবে। এস ওয়াজেদ আলী রবীন্দ্রনাথের মুসলমান বিদ্বেষের কঠোর পালটা জবাব দিচ্ছেন পত্রিকার কলামে।

প্রতিটি বিতর্ক অন্তত একটি বিষয়কে মেনে নিয়েছে- ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে ধর্ম সংস্কৃতির একটা প্রভাব আছে- ইসলাম ধর্ম যে অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে- সে অঞ্চলের ভাষাবিধিকে ধর্ম পালনের ভাষা হিসেবে গ্রহন করা উচিত কি না এ বিতর্ক তখন বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী বিংশ শতাব্দীর সুচনালগ্নের উপলব্ধি করেছেন ধর্ম উপলব্ধিতে ভাষাগত ব্যবধান প্রচন্ড। মাদ্রাসাশিক্ষিত উর্দুভাষী মৌলভী মাওলানারা তাদের মিশ্রিত ভাষায় যেভাবে সাধারণ মানুষকে ধর্ম শিক্ষা দেন- তাতে সাধারণ মানুষ ধর্মে আকৃষ্ট হচ্ছে না। মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী কিংবা তার সহযোদ্ধারা বাংলায় ধর্ম প্রচারের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলায় ধর্মচর্চা এবং ধর্মীয় বিতর্ক অব্যাহত রাখতে নতুন নতুন পত্রিকা প্রকাশ করছেন। এবং মাদ্রাসাশিক্ষিত আধাউর্দুভাষী মৌলভীরা শতাব্দীর সুচনালগ্নে ধর্মের বয়ান সংক্রান্ত প্রায় মৃত বিতর্কটা পুনরায় উস্কে দিলেন।

১২০০ বছর আগে ইমাম আবু হানিফা যে বিতর্কের মীমাংসা করেছিলেন নিজের কান্ডজ্ঞানে- আমরা সে মীমাংসাকে গ্রহনযোগ্য মেনে নিতে পারি নি। উর্দু ভাষাকে নিজের ধর্ম পরিচয়ের সাথে মিশিয়ে উর্দুকে জাতীয় জীবনে গ্রহনযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছি। আমাদের মেধাবী সাহিত্যিকদের একাংশের মেধা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার বদলে মুসলমান বাংলা ভাষা নির্মাণের প্রচেষ্টায় ধ্বংস হয়ে গেলো। ভাষার রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে একদল মানুষ তাদের ভাষাকে 'লবজ" এ বদলে ফেললো এবং প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিবেচনা না করে রবীন্দ্রনাথের আশংকা অনুযায়ী বাংলা ভাষার ফার্সীকরণ এবং আরবীকরণে মনোযোগী হলো। উর্দু নয় যদি ধর্মীয় প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে আরবী ভাষার গুরুত্ব হবে সবচেয়ে বেশী- মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এই বক্তব্য তেমন গুরুত্ব পায় নি। আমরা এখন "সালাত কায়েম" করার বদলে নামাজ পড়ি, আমরা "সিয়াম" সাধনার বদলে "রোজা" রাখি।

আমাদের উৎকট ধর্মচর্চা ধর্মকে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে মেনে নিতে শেখায় নি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভেতরে যেভাবে ইসলামী ধারণাগুলো প্রবেশ করেছিলো তাতে ইসলামী ধারণাগুলো স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে এক ধরণের লোকজ পরিচয় পেয়েছিলো- সেই লোকজ ইসলাম ধর্মীয় গোঁড়ামির বদলে ধর্মের মূল ভাব অনুধাবন এবং অনুসরণের তাগিদ তৈরী করেছিলো ধর্মের অনুসারীদের ভেতরে। একই ঘটনা ঘটেছে মালোয়শিয়ায়, একই ধরণের স্থানীয় ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই লোকজ ইসলামী সংস্কৃতি এবং আরবী ইসলামী সংস্কৃতির ভেতরে দ্বন্দ্ব এবং বিদ্বেষ তৈরী হয়েছে। আমরা লোকজ ইসলামী সংস্কৃতি তৈরী করতে পারি নি, উর্দুভাষার সংস্কৃতি অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের ইসলামী সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে, আমরা খুব দ্রুতই বাংলা ভাষা ও বাঙালী সংস্কৃতিবিদ্বেষী হয়ে উঠেছি।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


অসাধারণ!

বিষাক্ত মানুষ's picture


অনেকদিন পর একটা ভাল ব্লগ পড়লাম রাসেল ভাই Smile

আপনার লেখাটা পড়তে পড়তে মাথায় একটা আইডিয়া আসলো। ধরেন, নজরুলের 'এত জল ও কাজল চোখে' গানটার যদি ধর্মিয়ভাষাত্বত্তে ফেলা হতো ব্যপারটা কেমন হতো?

এত পানি ও কা'পানি' চোখে ... কি ভয়াবহ !! আর চিন্তাই করা যাচ্ছে না

তানবীরা's picture


ভাল লেগেছে

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.