প্রতিবন্ধীত্ব
ধীরে ধীরে আমরা আধুনিক হয়ে উঠছি সম্ভবত, আমাদের ভাবনা বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে। বাংলাদেশে একটা সময় পর্যন্ত পরিবারের মানসিক ও শাররীক প্রতিবন্ধী শিশুটা সামাজিক দায় হিসেবে স্থানীয় মসজিদের জিম্মায় চলে যেতো। মসজিদের দাতাদের অনুগ্রহে, দীর্ঘ শাররীক শাস্তির পর কোরান হেফজ করে, অনুগ্রহ এবং করুণা কামনার নানাবিধ কৌশল শিখে সমাজে তার অবস্থান তৈরী হতো। অনেক ক্ষেত্রেই মসজিদের আশেপাশের খাস জমিতে একটা ঘর উঠিয়ে সে বসবাস করতো। মানসিক কিংবা শাররীক প্রতিবন্ধীদের সমাজের উপর চাপিয়ে দিয়ে পরিবারের বোঝা হালকা করার প্রবনতাটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। পরিস্থিতিও অনেকটা বদলে গেছে। অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে তাল মেলানোর চাপ থেকে হোক কিংবা বিভিন্ন এনজিও এবং সমাজকর্মীদের অব্যহত লেখালেখি এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের ফলেই হোক শাররীক প্রতিবন্ধী মানুষদের এক ধরনের আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো ততটা উন্নত হয় নি, এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পাঠদানের এবং আত্মীকরণের সুযোগ আছে, শ্রবণপ্রতিবন্ধী কিংবা বাকপ্রতিবন্ধীরা এখনও অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত-অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে শিক্ষাগ্রহন করতে পারেন না। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতিটুকু আসলে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নয়, সারা দেশেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা গ্রহনের ন্যুনতম সুযোগ থাকলেও বাক প্রতিবন্ধী এবং শ্রবন প্রতিবন্ধীরা মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না তেমন ভাবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যক্তিগত-সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বেশ কিছু প্রতিবন্ধী স্কুল চালু করা হয়েছে তবে সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য এবং প্রশিক্ষকদের ব্যাপারে সবাই উদাসীন। স্থানীয় পর্যায়ে কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তদারকি করা হয় না।
মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর পরিবারের সদস্যদের জন্যে এখনও তেমন কোনো সুযোগ সুবিধাই তৈরী হয় নি। পূর্বপুরুষের পাপের ফল ভোগ করছে প্রতিবন্ধি মানুষেরা এমন একটা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ধারণা আমাদের প্রতিবন্ধী শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারে বিলুপ্ত করে ফেলতে পেরেছে এমনটা দাবী করা ঠিক হবে না। আমাদের সমবয়সী মানুষেরা এখনও এমনটা অবচেতনে বিশ্বাস করে। সেটার ফলাফল পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিবন্ধিদের মাঝেমাঝেই ভোগ করতে হয় কারণ এই মানুষদের একাংশই এখনও এইসব প্রতিবন্ধী কল্যান সংস্থাগুলোর তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত। শাররীক এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এদের অনেকেই তাদের অধিকারবঞ্চিত হলেও প্রতিবাদ করতে পারে না, সুতরাং তারা নিপীড়িত এবং নির্যাতিত হচ্ছে নিয়মিতই।
প্রতিবন্ধীত্ব শুধুমাত্র জন্মগত ত্রুটি নয় অনেকসময় বিভিন্ন শাররীক অসুস্থতায় মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় হলে যেসব প্রতিবন্ধীত্ব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিক কল্যানে নিয়োজিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মতোই স্বাস্থ্যসেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিবন্ধী। জন্মকালীন ত্রুটি, জেনেটিক ত্রুটি এবং উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তৈরী হওয়া প্রতিবন্ধীত্বের সাথে মানুষের নানাবিধ লোভ-লালসা-ক্ষোভ এবং প্রতিশোধ বাসনা অনেক ধরণের শাররীক প্রতিবন্ধী তৈরী করছে।
ভিক্ষার লোভে শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ফেলছে মানুষ, প্রতিশোধবাসনায় কারো চোখ উপড়ে ফেলছে, কাউকে পঙ্গু করে ফেলছে মানুষ, এদের একাংশ অনিবার্যভাবেই সামাজিক দায় হিসেবে শহরে চলে আসছে, সামাজিক অনুগ্রহে জীবনযাপন ছাড়া এদের সামনে বেঁচে থাকার অন্য কোনো বিকল্প নেই। শহরের রাস্তায় এদের আনাগোনা দেখে স্পষ্ট বুঝা যায় আমাদের সমাজটাও এক ধরণের মানসিক প্রতিবন্ধী সমাজে পরিণত হচ্ছে। এখানে মানবিকতা, মূল্যবোধ নামক ধারণাগুলো এখন পঙ্গু। রাজনৈতিক প্রতিশোধবাসনায় এখানে শিক্ষার্থী সহপাঠীকে পঙ্গু করছে, পিটিয়ে হত্যা করছে, সন্ত্রাসী বাহিনী নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্যে প্রতিদন্ডীকে পঙ্গু করছে এবং অপরাপর প্রতিদন্ডীদেরও হুমকি দিচ্ছে।
পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও মসজিদের দরজা কিংবা মাদ্রাসায় প্রতিবন্ধীদের ফেলে আসার পরিমাণ কমে নি। দেশের দৃষ্টি, শ্রবন এবং বাকপ্রতিবন্ধীদের বড় একটা অংশ এখনও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। এখনও ধর্মের আবেদন এবং অবদান কমে নি এখানে। আল্লাহর কালাম পড়লে আর আল্লাহর কালাম শুনলে এই ধরণের প্রতিবন্ধীত্ব দূর হয়ে যায় এমন অলীক ধারণা থেকে সমাজ মুক্ত হয় নি। অলৌকিকের প্রত্যাশায় থাকা মানুষ এখনও প্রত্যাশা করে কোথাও যীশু হেঁটে আসছে যার হাতের স্পর্শ্বে, যার যাদুর ছোঁয়ায় সমাজ থেকেপ্রতিবন্ধীত্বের অভিশাপ দূর হয়ে যাবে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষও প্রত্যাশায় থাকে- পারস্পরিক চুলাচুলিতে লিপ্ত প্রধান দুই দলীয় প্রধান এবং তাদের অনুগত অন্ধ স্তাবক এবং চাটুকারদের কবল থেকে রাজনীতি মুক্ত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে মানবিক, সুবিবেচক মানুষেরা- যারা যাদুর স্পর্শ্বে সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবন্ধীত্ব দূর করবে। এই অলীক প্রত্যাশা পুরণের কোনো সম্ভাবনা তৈরী করতে এখনও পর্যন্ত ব্যর্থ আমরা।





কথা এইটাই
মন্তব্য করুন