ভাঙাচোড়া দিনকাল
গত শুক্রবার যখন সুর্য মেঘের আড়ালে ঢাকলো সেদিন শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিলো ১৬ ডিগ্রী, বাংলাদেশের শীতে এমন রোদ্দুরদিনে গায়ে হালকা চাদর জড়িয়ে তরিয়ে তরিয়ে সুর্যালোক উপভোগ করা যায়, অবশ্য এখানে এখন তেমন সুযোগ নেই। দরিদ্র দেশ থেকে আসা শিক্ষাশ্রমিক আমরা, শ্রমের বিনিময়ে সনদ অর্জন করি, কেউ দেশের নানাবিধ অস্থিরতায় আড় অন্য অধিকাংশ সবাই কিছুটা স্বচ্ছলতা এবং ভালো কাজের পরিবেশের জন্যে বেশ লম্বা একটা জীবন শিক্ষাশ্রমে কাটিয়ে দেন।
গবেষণার আলাদা আনন্দ আছে, যৌক্তিক কল্পনার সাথে কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে কোনো একটা পরিকল্পনা তৈরী করা এবং যন্ত্রপাতি হাতিয়ে সে পরিকল্পনা মূর্ত হতে দেখে যেমন তৃপ্তি পাওয়া যায়, প্রায় নিয়মিত ব্যর্থ প্রচেষ্টাগুলোর কষ্ট আর দুর্ভোগ ভুলিয়ে দেয় সেটুকু।
নভেম্বরের শেষ সুর্যালোকিত দিনে বিকেল বেলা ল্যাব রিপোর্ট দিয়ে যখন সূর্যকে মেঘের আড়ালে লুকাতে দেখেছিলাম আশা ছিলো সপ্তাহান্তের বর্ষণ শেষে আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ সত্য করে বৃষ্টি নামলো, তারপর শুধু বৃষ্টির দিন। গত ৭ দিনে ২৭ মিনিটও সুর্যের চেহারা দেখা যায় নি, ঝিরঝির বৃষ্টি আর প্রচন্ড বর্ষণের ভেতরেই তাপমাত্রা ১০ এর নীচে নেমে গেলো।
আবহাওয়ার পূর্বাভাষ বলেছিলো সম্পূর্ণ সপ্তাহই বৃষ্টিকবলিত হবে, আর সপ্তাহের শেষে তুষারপাতের সম্ভাবনা আছে। বৃষ্টির দ্বিতীয় দিনে আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে বরফদানা পরা শুরু হলো, ছোটো ছোটো শ্বেতমুক্তার মতো বরফের টুকরো ঝড়ছে আকাশ থেকে, দমকা হাওয়ার সাথে এলোপাথারি বরফবর্ষণের পর রাস্তা সাদা হয়ে আছে বরফে, অনেক উপর থেকে দেখে মনে হয় কেউ যত্ন করে শোলা সাজিয়ে রেখেছে, সিনেমার শ্যূটিং হবে।
বৃষ্টি- বরফবৃষ্টির সাথে গতকাল থেকে শুরু হলো তুষারপাত, গতকাল সারাটা বিকেল আর সন্ধ্যা তুষার পরলো। প্রফেসর বেশ উৎফুল্ল, ডেকে বললো দেখছো এখন তুষার পরছে- কেবল তুষার পরা শুরু হলো, তুমি বরফে হাঁটার জুতা কিনো নি এখনও?
আসার পর থেকে শুনছি এখানে খুব বরফ পরে মাঝে মাঝে আধা মিটার উঁচু বরফে ঢেকে থাকবে চারপাশ- তুমি শীতের প্রস্তুতি নাও। খুব বেশী পাত্তা দেই নি এইসব কথা। দীর্ঘদিন পর জুতা পরছি, তুষার আর বৃষ্টি কত খারাপ হতে পারে? একদিন ২০০০ কদম হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেখলাম হাঁটতে হাঁটতে মোজা ভিজে গেছে। ভেজা মোজা পায়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা যাদের নেই, তারা ঠিক বুঝবে না শরীরের একটা অংশে ভেজে এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে থাকলে কি ধরণের অসস্তি আর বিরক্তি তৈরী হতে পারে।
অধুমপায়ীদের পরোক্ষ ধুমপানের হাত থেকে বাঁচাতে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিগারেটখোরদের আলাদা জায়গা আছে- ধুমপায়ীদের অবশিষ্ট সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার এই প্রবনতা আমার অসহ্য লাগলেও কিছু করার নেই। ল্যাব থেকে বের হয়ে কফি নিয়ে স্মোকার্স কর্নারে যেতে প্রায় আধা কিলোমিটার হাঁটতে হয়- ধুমপানের ক্ষতির সাথে হাঁটার স্বাস্থ্যকর উপাদান যুক্ত হওয়ায় সম্ভবত তেমন শাররীক ক্ষতি হয় না। তুষারপাতের ভেতরে জ্যাকেটের কলার উঁচিয়ে একটা সিগারেট টেনে আসলাম, ভেতরে ঢুকে দেখি জ্যাকেটের কলারে আর পকেটের আশাপাশে তুষার জমে আছে।
বৃষ্টির এক ধরণের অলস সৈন্দর্য্য আছে, তবে বৃষ্টির চেয়ে বেশী সুন্দর বৃষ্টির পরের রোদের সময়টুকু, হলদে সবুজ আলোয় আলোকিত চারপাশ- সজীব, প্রানোচ্ছল। কিন্তু তুষারপাতের সৈন্দর্য্যের ভেতরে একধরণের পবিত্রতা আছে। বৃষ্টি প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন করে কিন্তু একই সাথে অনেক ধরণের ক্ষতও উন্মুক্ত করে দেয়, তুষার সব সময়ই অমলিন শুভ্রতায় চারপাশ আড়াল করে ফেলে। রাস্তার ক্ষত আর ময়লার দাগ লুকিয়ে ফেলে তার সাদা চাদরে। আকাশের রংটাও বদলে যায়-
বিস্তৃর্ন সমতলে তুষারপাত দেখা হয় নি- পাহাড়ের পটভুমিতেই শুধু তুষার দেখেছি আমি। পাহারে সারি বেধে থাকা পাইন-ওক- বীচ- ফারের সবুচ সূচালো পাতার গায়ে জমে থাকা বরফের ওড়নার নীচে তার কালচে সবুজ পাতা দেখা যায়। দুরের পাহাড়গুলোর সাথে মেঘের তফাত আর বোঝা যায় না। ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠ সম্পূর্ণ সাদা হয়ে আছে, সে মাঠে কেউ হাঁটে নি।
কিছুটা বিরতি দিয়ে দিতে গতকাল সারা রাত আর আজকে সারা দিন তুষার পরেছে। এখন মধ্যরাতেও বাইরে তাকিয়ে দেখছি অবিরাম তুষার পরছে। সারা দিন এই ঝঞ্ঝাটের ভেতরে পায়ে হেঁটে শহর ঘুরতে হয়েছে, ছেলে মেয়েদের স্কুল আর ডে কেয়ার সেন্টার খুঁজতে। যাওয়ার পথটা চেনা ছিলো, সামান্য শীতে ৫ কিলোমিটার হাঁটা তেমন কঠিন কিছু না, কিন্তু রাস্তায় যখন৬ ইঞ্চি বরফ আর বরফশীতল পানি জমে থাকে- সে পথে হাঁটা খুব বেশী আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা না।
প্রথম দফায় ৩০ মিনিট হেঁটে বাধ্য হয়ে একটা হাত মোজা কিনলাম, ঘরে থেকে বের হওয়ার সময় ভুলে ছাতা নিয়ে আসি নি, কি আর হবে পাতলা বরফই তো, গা ঝারা দিলেই ঝরে যাবে, হাঁটতে হাঁটতে উপলব্ধি করলাম গা ঝারা দিলেই বরফ ঝরে যায় না, কিছু বরফ গলে যায়, জ্যাকেটের ভেতর ভিজিয়ে দেয়।
মেয়ের ডে কেয়ার সেন্টারে কথা বলে ছেলের স্কুল দেখতে গেলাম, আরও ১ কিলোমিটার হেঁটে, ফেরার পথে একটা কনভেনিয়েন্ট স্টোরে থেমে বর্ষাতি কিনলাম, আরও কিছুদুর হেঁটে বুঝলাম হাত মোজার ভেতরটা ভেজা, প্রচন্ড ঠান্ডায় আঙ্গুল ব্যাথা করছে- চেনা পথে না গিয়ে একটা শর্ট কাট খুঁজতে গিয়ে পথ হারালাম, তারপর হাঁটতে হাঁটতে শহরের অন্যপ্রান্তে চলে গেলাম।
যে শহরে মানুষ আমাদের ভাষা বুঝে না, সে শহর পথ হারালে খুঁজে পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অবশেষে ৪ ঘন্টা শেষে যখন ঘরে ফিরলাম শীতার্ত- পরিশ্রান্ত- কনভিনিয়েন্ট স্টোর থেকে কেনা স্যান্ডউইচ মুখে দিয়ে বুঝলাম এতটাই ক্লান্ত আর শীতজীর্ণ অবস্থা আমাদের- খাওয়ারের স্বাদ পাচ্ছি না।
সন্ধ্যায় যখন স্ট্রীট লাইট জ্বললো, যখন আবারও তুষার পরা শুরু হলো, ঘরে আরামদায়ক উষ্ণতার ভেতরে থেকে বুঝলাম- তুষারের আলাদা সৈন্দর্য্য আছে। সামনের সম্পূর্ণ সপ্তাহই এমন তুষার আর বৃষ্টির ভবিষ্যতবানী করেছে আবহাওয়াবিদেরা। মানচিত্রে দেখছি যতদুর দেখা যাচ্ছে, জাপান সমুদ্রের উপরটা মেঘে ঢেকে আছে, টানা দুই সপ্তাহের সূর্যবিরহ শেষে আগামী সপ্তাহান্তে একটা সুর্যের দিন দেখা যাবে-





কালকেই পড়লাম। অনেক অনেক শুভকামনা!
বরফ গলে গেলে হাটার পরও অনেক সময় এটা হতে পারে
তুষারপাত নিয়ে বাংলায় এমন চমতকার লেখা আর পড়েছি কীনা জানি না। আমার অসহ্য লাগে। বরফ গললেই প্যাচপ্যাচে কাদা ... বাড়ি বসে থাকলে ঠিকাছে। গাড়ি চালালে ইসপীড দেয়া যায় না, বাসে দেরী ... সবই ঝামেলা লাগে
চমৎকার লেখা, বরাবরের মতই। তুষার কথন অনেক ভালো লাগছে, একটু একটু হিংসা লাগতেছে।
বাসার সবাই ভালো আছে তো?
মন্তব্য করুন