ইউজার লগইন

বাসা বদল

আমার স্থায়ী কোনো ঠিকানা এখনও নে। ভোটার তালিকায়, জন্মনিবন্ধন সনদে ,সরকারী তালিকায় সবার একটা স্থায়ী ঠিকানা থাকে। শৈশবের স্থায়ী ঠিকানা বদল করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ করে নিয়েছিলাম নিজের মতো, যেহেতু ঢাকায় বসবাস করতেই হবে, ঠিকানাটা ঢাকায় হলেই ভালো। সে স্থায়ী ঠিকানা , ঠিকানা আর রাজ্য বদলের পরেও বদলানো সম্ভব হয় নি, সরকারী নথিতে সে ঠিকানাই লেখা আছে।

সরকারী নথিতে যেমনই থাকুক, আমরা আসলে ভাসমান মানুষ, মধ্যজীবনে কিংবা মধ্য যৌবনে এসে এখনও জানি না ৩ বছর পর আসলে আমি কোথায় থাকবো? অধিকাংশ শিক্ষা শ্রমিকই এই বয়েসে এসে নিজের পথ খুঁজে নেয়, আমার এখনও যে সুযোগ হয় নি। সুতরাং অনির্ধারিত ভবিষ্যত- অনির্ধারিত ঠিকানা। আমাদের জীবনের বাস্তবতা হলো কয়েক বছর পরপরই আমাদের বর্তমান ঠিকানা বদলায়, পুরোনো ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটিয়ে নতুন এলাকার ভোটার তালিকায় নাম উঠাতে হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হয় নতুন সাকিন। পুরোনো বাসায় বলে রাখতে হয় যদি কোনো চিঠি আসে ফেলে না দিয়ে যেনো অনুগ্রহ করে জানায়, নিজ গরজে এসে নিয়ে যাবো।

সম্ভবত বাংলাদেশের ডাকবিভাগে ঠিকানা পরিবর্তনের ফর্ম আছে। আদৌ আছে কি না জানি না, তবে শের শাহের ঘোড়ার ডাক প্রচলনের পর থেকে ইংরেজরাই মূলত পোস্টাল সার্ভিসের কাঠামো তৈরী করেছে এবং তাদের দেশে অনেক দিন আগে থেকেই এমন ঠিকানা পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় আশা করছি বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে এইসব সেবার ফর্মও অর্জন করেছে।

প্রতিবার বাসাবদলের সিদ্ধান্ত একই রকম যন্ত্রনা বয়ে নিয়ে আসে। পোটলা-পুটলি বেধে পিক আপ, ভ্যান, রিকশায় মালামাল উঠিয়ে এলাকা বদলের প্রস্তুতি পর্বটাই বিরক্তিকর। এখানে এসেও ঠিকানা বদল করতে হচ্ছে- আগামীকাল নতুন ঠিকানায় যেতে হবে।

প্রচন্ড উদ্যম নিয়ে ঠিকানা বদল কার্যক্রম শুরু করেছিলাম, তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেলো। নতুন ঠিকানা এখনকার ঠিকানা থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা পথ, ভেবেছিলাম হেঁটে হেঁটে বাসা বদল করে ফেলবো কিন্তু প্রকৃতির তেমন ইচ্ছা ছিলো না। গতকাল থেকে তুষার পরছে, চাইলেই হেঁটে হেঁটে বাসা বদল করা সম্ভব না, গাড়ী লাগবে, আর গাড়ী চালাতে পারি না বলে একজন ড্রাইভারও লাগবে। এই বৈদেশে চাইলে ড্রাইভারও পাওয়া যায় কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক আর নামি-দামী তারকা না হলে এই বৈদেশে ড্রাইভারের খরচ মেটানো সহজ না। আমরা নিম্নবিত্ত মানুষ, এইসব বিলাসিতা আমাদের জন্যে না। আমাদের বিভিন্ন জনের সাথে সময় মিলিয়ে আগুপিছু করে বাসাবদল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

গতকাল রাত থেকে সব কিছু গুছিয়েই রেখেছিলাম, কথা ছিলো যাওয়ার ঠিক আগে আগে ফ্রিজে রাখা জিনিষপত্র বের করে নতুন বাসায় চলে যাবো। স্যুটকেস, থালা বাসনের প্যাকেট ঠিকমতো চোখের সামনে ছিলো, জুতার পোটলাও চোখের সামনে ছিলো, লেপ-কাথা-কম্বলের পোটলাটাও ঠিকমতো গুছিয়ে রেখেছিলাম দুপুরে, সেসব নিয়ে নতুন বাসায় রেখে আসলাম।

কথা ছিলো অবশিষ্ট জিনিষগুলো নিয়ে আজকেই চলে যাবো, ফাঁকা ঘর পরিস্কার করে রেখে দিতে হবে নইলে পুরো মাসের ভাড়া জরিমানা। নতুন বাসায় কম্বল বালিশ সব গেলো, দোকান থেকে তোষক কিনে উঠে যাবো- সে সুযোগ হলো না, এইসব গুছাতে গুছাতে দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

চোখের আড়াল হলে মনে আড়াল কথাটা মিথ্যা না। দেয়ালে সাঁটানো ড্রয়ার খুলে দেখলাম সেখানে গীটার রাখা আছে, ওটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছি, ফ্রিজ খুলে দেখলাম ফ্রিজের জিনিষপত্র নিতে ভুলে গিয়েছি, এক টুকরো সংসার পুরোনো ঠিকানায় দিব্যি রয়ে গেলো। আগামীকাল তুষারের পরিমাণ বাড়বে- এর ভেতরেই কুলির কাজ করতে হবে।

যেহেতু আর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তখন মনে হলো রাতে ঘুমাতে হবে, রাতের ঘুমানোর কথা মনে হতেই মনে পরলো এখানে কম্বল বালিশ নেই, একসেট কম্বল বালিশ জোগাড় করতে হবে। ফ্রিজ খুলে মনে হলো রাতের খাওয়ার জোগাড় করতে হবে, রাইস কুকারে গত রাতের ভাত আছে- কিন্তু প্লেট নেই, হাড়ি-কুড়ি সব নতুন বাসায়, তরকারী রান্না করা যাবে না।
তুষার- বৃষ্টির ভেতরে আবার বাইরে বের হলাম, দোকানে গিয়ে কম্বল কিনলাম, কাগজের প্লেট কিনলাম, যেহেতু রাত হয়েছে তাই তৈরী খাবারের দামে ৫০% কনসেশন, কনসেশনের মাছভাজা কিনে নিয়ে রাতের খাওয়ার খেলাম।
মনে পরলো ঘর মুছতে হবে, ফ্লোরমপ খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে সস্তার ফ্লোরমপ কিনলাম। ফ্লোরমপ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একটা চৌকোনা কাঠামোর সাথে হাতল লাগানো, হাতলটা বড় ছোটো করা যায়, আর সাথে একটা প্যাকেটে বেবী ওয়াইপ রাখা, ছবি দেখে বুঝলাম চৌকো কাঠামোতে বেবীমপ লাগিয়ে ফ্লোর ঘষতে হবে।

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.