ভাঙাচোড়া দিনকাল ২
জাপানে আসার পর বুঝলাম ভদ্রতা এবং বিনয় পীড়াদায়ক হয়ে উঠতে পারে। বিনয়পীড়িত বাঙালী হিসেবে অসস্তিবোধ করি সময় সময়। আমার সুপারভাইজার অতিশয় বিনয়ী কিন্তু কাজপাগল। তার বিভিন্ন আইডিয়া নিয়ে সময়ে-অসময়ে উপস্থিত হয়ে ভিন্ন জাতির মাতৃভাষায় বুঝানোর চেষ্টা করে, আমিও ভিন্ন একটা ভাষায় সে আইডিয়া বোঝার চেষ্টা করি, সময়ে-অসময়ে নিজের দুর্বল ইংরেজীতে শব্দ সরবরাহের চেষ্টা করি।
সন্ধ্যায় পরবর্তী সপ্তাহের কাজের তালিকা নিয়ে ফিরে এসে, খোশমেজাজে সিনেমা দেখে সকাল বেলা ইলেক্ট্রনিক চিঠি পেলে প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগতো, এখন সয়ে গেছে। রাত ২টায় পাঠানো চিঠিতে নতুন কাজের ফরমায়েশ দেখলে হতাশ লাগে না এখন।
অবশ্য এইসব উপস্থাপনের ভঙ্গিটা চমৎকার- তোমার যদি তেমন সমস্যা না হয় তাহলে এভাবে করে দেখো, আমি এটা দেখলাম অন্য একজনের কাজে- চেষ্টা করে দেখা যাক। অবশ্য তোমার অন্য কাজও আছে, তারপরও দেখো এটা করে ফেলা যায় কি না। যেকোনো সাহায্য লাগলে বলবে, আমরা আছি।
অনুরোধে ঢেঁকি- জাহাজ গিলে ফেলার অভ্যাস থাকায় আমার অবস্থা কিছুটা করুণ। গ্রামের বোকা মেয়ের মতো কাউকেই না বলতে পারি না- এবং না বলার অনভ্যাসে নতুন নতুন কাজ শিখতে হচ্ছে।
৩ মাস আগেও যা ভাবি নি, এখন সেসব কাজ অনায়াসে করে ফেলতে পারছি- যদিও আমার অগোছালো স্বভাবের জন্যে কিছুটা ঝঞ্ঝাট পোহাতে হচ্ছে। যে কাজ শুরু করেছিলাম, প্রথমে মনে হয়েছিলো একটা প্রশিক্ষিত বাঁদরও সে কাজ করতে পারবে, তেমন বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ এখানে নেই। তবে সময়ের সাথে সাথে একেবারে রুটিন কাজটাতেও নতুন নতুন ঝামেলা তৈরী হচ্ছে। প্রায়োগিক ধারণা এবং যে ধারণাকে ভিত্তি করে নতুন কোনো যন্ত্র নির্মাণ এবং সেটার কর্মদক্ষতা বাড়ানোর কাজটা প্রশিক্ষিত বাঁদর করতে পারবে না। ছোটো ছোটো কিছু ঝামেলা থাকলেও কাজটাতে ঠিক মন বসানো যাচ্ছে না।
আমি অন্য একটা কাজে মন দিতে চাচ্ছি- কিন্তু কাজটা থেকে সুপারভাইজার কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছে আমাকে। প্রতিবার আলোচনায় ঘুরে ফিরে সে কথা চলে আসে- সুপারভাইজার নিরস মুখে বলে অবসরে ওটা করবে- তোমার মনোযোগ এই কাজে দাও।
ছেলে-মেয়ে এসেছে অনেক দিন পর, তাদের নিয়ে কয়েকটা দিন উচ্ছ্বাসে সুযোগ নেই, যদিও ছুটির ঘোষণা দেখেছি, নিজের বাস্তবতায় ছুটির অস্তিত্ব দেখতে পারছি না। আজকে দুপুরে ভাবছিলাম অন্তত ১ সপ্তাহ কোনো কিছু না ভেবে কাটিয়ে দিবো, বিকেল বেলা সুপারভাইজার এসে বললো তোমার কাজটা করার জন্যে লাগবে এটা। সার্কিটটা মেরামত করতে হবে, তারপর একটা প্লাটফর্ম ডিজাইন করতে হবে, তারপর সার্কিটসহ যন্ত্রটা প্লাটফর্মে লাগাতে হবে। তুমি ডিজাইনটা করে ফেলো আর সার্কিট কাজ করে কি না দেখো।
যন্ত্রভীতি আমাদের জাতীয় সমস্যা। সার্কিট মেরামতের কাজটা জিঞ্জিরা আর ধোলাই খালের লেড মেকানিকদের হাতে সমর্পন করে আমরা প্রকৌশলী তৈরী করি- আর নিজের হাঁতে রেডিও-টিভি কিংবা যেকোনো যন্ত্র মেরামত করাটা আমাদের মধ্যবিত্ত অহং এর জন্যে পীড়াদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সার্কিট লাগানোতে সহযোগিতা করার জন্যে আলাদা 'মামা' আছে। তারা যন্ত্রটা ভালো না বুঝলেও কোথায় টোকা দিলে কাজ হবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় সেটা ভালো বুঝে। সুতরাং আমার অনভিজ্ঞতার জাতীয় অপমান থেকে নিজেকে বাঁচাতে বুক ফুলিয়ে বললাম সমস্যা নাই, করে ফেলবো এ আর এমন কি।
আমার সামনে এক মিশরীয় বসে, পোস্ট ডক। তার পরিবার আসার আগে আমরা একদিন বাজারে গিয়েছি, আসার পথে বললো বৌয়ের জন্যে বিছানা বানাতে হবে, কাঠের বিছানা। আমি বললাম সমস্যা নাই, বানিয়ে ফেলবো।
দোকান থেকে খাটের মাপে কাঠ কিনতে হবে। কি ধরণের কি পরিমাণ কাঠ কিনবো?
ব্যাপার না এইটা, একটা খাটই তো বানাতে হবে।
তুমি এর আগে এইসব করছো?
আরে এইসব করার সময় কই আমার, আমি কি কাঠমিস্ত্রী? কিন্তু একটা কাঠমিস্ত্রী হাতুড়ি পেরেক ঠুকে যদি বিছানা বানায় ফেলতে পারে, আমাদের না পারার কোনো কারণ নাই। তুমি ফিজিক্স থেকে পাশ করলে সব করতে পারবে।





আরে এইসব করার সময় কই আমার, আমি কি কাঠমিস্ত্রী? কিন্তু একটা কাঠমিস্ত্রী হাতুড়ি পেরেক ঠুকে যদি বিছানা বানায় ফেলতে পারে, আমাদের না পারার কোনো কারণ নাই। তুমি ফিজিক্স থেকে পাশ করলে সব করতে পারবে।
তুখোড় লাইন হইছে!
পুরাই সিরাম.. :v
তুমি ফিজিক্স থেকে পাশ করলে সব করতে পারবে।
মন্তব্য করুন