ভাঙাচোরা দিনকাল ৩
নিয়মতান্ত্রিক জটিলতায় ঋক কিংবা ঋত কেউই আসে নি আমাদের সাথে, তারা বাংলাদেশে ছিলো। বাংলাদেশের জাপান এম্বেসী জানালো তারা সার্টিফিকেট ওফ এলিজিবিলিটি ছাড়া কোনো ভিসাই দিবে না আর সার্টিফিকেট ওফ এলিজিবিটির আবেদন করতে হবে জাপানে এসে। এলিজিবিটি এপ্লিকেশন করার পর একদিন ছেলে মেয়ের স্কুল খুঁজতে বের হলাম বিকেল বেলা। গুগল ম্যাপে কাছে পিঠে একটা এলিমেন্টারি স্কুলের অস্তিত্ব দেখে সেদিকে হাঁটা দিলাম। মরিনোসাতো এলিমেন্টারি স্কুল দেখে মরিনোসাতো নার্সারী এবং ডে কেয়ার সেন্টার খোঁজার পালা। রাস্তায় মাঝে মাঝে ইংরেজী লেখা কিছু সাইনবোর্ড চোখে পরলেও অধিকাংশ সাইনবোর্ডই জাপানী ভাষায় লেখা। কানজি লেখার ধাঁচটা কম্পিউটার স্ক্রীনে যতটা সহজ মনে হয় খালি চোখে ততটা সহজ লাগে না। চারকোনা বাক্সে রাজ্যের আঁকিবুকি, কাটাকুটির প্রতিটা দাগই গুরুত্বপূর্ণ। এই বাক্সগুলো জোরা দিয়ে দিয়ে একটা বাক্য লেখা, যেটার মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা নেই, শুরুর বাক্স আর শেষের বাক্সের ভেতরে তফাত করতে পারি না। জানজি দেখে ভবনের কর্মকান্ড বোঝা সম্ভব হবে না ধরে নিয়েই ভবনের আকৃতি দেখে ভবনের কার্যক্রম অনুমানের চেষ্টা করতে করতে একটা ভবন দেখে মনে হলো এটাই আসলে নার্সারি আর ডে কেয়ার সেন্টার। উলটো পাশে হাঁটতে থাকা একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম এটা বাচ্চাদের নার্সারি কি না? তারপর বললাম এটা কি হকুয়েন? বেচারা আরও বেশী আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকলো, কিন্টারগার্ডেনের জাপানী প্রতিশব্দ হইকুয়েন, হোকুয়েন অর্থবোধক কোনো জাপানী শব্দ না। তারপর বৃদ্ধ খুঁজে খুঁঁজে বললো এটা ছোটো ছোটো বাচ্চাদের স্কুল।
স্কুলের সামনে সুবেশী নারী-পুরুষের পোস্টার দেখে ভাবলাম এটা সম্ভবত কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রচন্ড প্রতিদন্ডিতাপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং সেন্টার পরিচালনা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ভালো স্কুলে ভর্তি হয়ে ভালো ফলাফল করার চাপ এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে এখন সরকারী টহল পুলিশ মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে রাত ১১টার পর পড়াশোনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। রিপোর্টে দেখলাম জাপানের সবগুলো স্কুলের পাঠ্যক্রম আর শিক্ষার্থীর শিক্ষার মাণ সমান না তাই একটু ভালো মানের স্কুলের ভর্তির জন্যে এখানকার ছেলে মেয়েরাও কোচিং করে। পরে জানলাম ওটা আসলে ভোটের বিজ্ঞাপন। আমরা ছুটির দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় যেসব চিৎকার শুনতাম সেসব আসলে ভোট ভিক্ষার সিডি।
জাপানের এবেনোমিক্সের সফল ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে প্রধানমন্ত্রী অপ্রত্যাশিত অন্তবর্তীকালীন নির্বাচনের আয়োজন করেছে। দেশের লোকজন এটাকে অপ্রয়োজনীয় খরচ ভাবলেও কর্তায় ইচ্ছায় কর্ম তাই এই অর্থনৈতিক মন্দার ভেতরে গুচ্ছের টাকা খরচ করে অপ্রয়োজনীয় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে যেটার মূল কারণ এই মন্দা দুর করতে যেসব অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে সেসবের প্রতি জনসমর্থন যাচাই করা। প্রধানমন্ত্রী ভোটের ফলাফলে আনন্দিত- তার দলই পুনরায় বিজয়ী হয়েছে যদিও জনগণের দুই তৃতীয়াংশই ভোটকেন্দ্রে যায় নি।
আমাদের দেশের সাথে অন্যান্য উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের তফাত ভোট কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যার উপস্থিতিতে। দেয়াল লিপি, সংবাদপত্রে চাররঙে ছাপা ভোটের আহ্বান আর বিজ্ঞাপনে সুবেশী নরনারীর ব্যানার হাতে লাফ-ঝাঁপ দেখে বাঙালী বিশ্বাস করে তাদের সংঘবদ্ধ হয়ে কোনো পরিবর্তনের উদ্যোগে সামিল হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, দল বেধে ব্যালটে সিল মেরে আসলেই আকাঙ্খিত পরিবর্তন চলে আসবে। ব্যালটে সিল মারলেই সব পরিবর্তিত হবে এমন বদ্ধ ধারণা থেকে বাঙালী ভোটে সিল মেরে ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করে। স্বদেশে কিংবা প্রবাসে অন্য কারো গণতন্ত্রের প্রতি, ভোটে সিল লাগানোর প্রতি কোনো মোহ থাক কিংবা না থাক, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে বাঙালী ভোট কেন্দ্রে গিয়ে উৎসবমুখর পরিস্থিতিতে ভোট দিয়ে আসবে। আমাদের জেনেটিক কোড খুঁজলে নির্বাচনে ভোট দিতেই হবে জীন খুঁজে পাওয়া যাবে।
বহুজাতিক কোম্পানী পার্টিসিপেশনের নতুন মাত্রা তৈরী করেছে, দর্শক ভোট, টিভি সেটের সামনে হাজার হাজার মানুষ, সবাই মোবাইলের বোতাম চাপছে- ১০ প্রার্থীর ভেতরে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতেই হবে, ফ্লেক্সী লোডের দোকানে গিয়ে ৩০০ টাকা ভরে নিয়ে এসে এসএমুএস ভোটে উড়িয়ে দেওয়া বাঙালী ভোটে নিজের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করেই খুশী।
আমার ধারণা আইএসসিএস যদি টেলিভিশনে কিংবা অন লাইনে ১০ জনের ছবি দিয়ে বলে দর্শক ভোটের ভিত্তিতে এদের শিরচ্ছেদ করবো আমরা। তাদের বিভিন্ন অপকর্মের ভিডিওচিত্র আপনাদের দেখানো হবে আগামী ৩ দিন, আপনারা সেসব অপকর্মের উপর ভিত্তি করে ভোট দিবেন। সবচেয়ে বেশী ভোট পাওয়া ব্যক্তিকে আমরা কতল করবো ।
তাদের ভোটে একজনকে হত্যা করা হবে বিষয়টা বেমালুম ভুলে গিয়ে বাঙালী এখানেও দলে দলে ভোট দেওয়া শুরু করবে এবং আমি নিশ্চিত নিজের অপছন্দের প্রার্থীকে হত্যা করার জন্যে বাংলাদেশের দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে। এমন কি এই ভোটের ভিত্তিতে কতল উৎসবের কেউ সমালোচনা করলে আইএসআইএসের ইয়্যুটিউব পেজে গিয়ে সেই ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রচারানাও চালাতে পারে এরা। দেয়ালে পোস্টার, ভোট দেওয়ার আহ্বান বাঙালীর জিনে সুপ্ত ভোট দিতেই হবে ভাবনাকে উস্কে দেয়। সুন্দরবন, নোলক, লাক্স ফটো সুন্দরী সবখানেই এমনটা ঘটেছে, আইএসআইএসের শিরচ্ছেদের ভোটের আহ্বানেও এর ব্যতিক্রম হবে না। সে তুলনায় উন্নত বিশ্বের মানুষজন তেমন গণতন্ত্রের উৎসবে বিশ্বাস করে না। নির্বাচনী গোলোযোগ, হৈ-হট্টোগোল উপলব্ধি করার সুযোগ পেলাম না। অপরিচিত ভাষায় চিৎকার, গান সবই একই রকম লাগে।
জাপানের লোকজনের মান-অপমান বোধ সম্ভবত বেশী। এক কিশোরী তার বান্ধবীকে বাসায় ডেকে এনে খুন করেছিলো ৬ মাস আগে, সেই মেয়ের বিচার শুরু হচ্ছে আর লজ্জায় তার বাবা আত্মহত্যা করেছে। এক জাপানী প্রফেসরের পেপারের ডাটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রফেসর আত্মহত্যা করেছেন। অবশ্য বাংলাদেশে পরিবারের আর নিজের মাণ সম্মান বাঁচাতে অন্যকে খুন করে ফেলার উদাহরণ অনেক আছে। ছেলে মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করার পর পাত্র-পাত্রীর মর্যাদার সামাজিক ব্যবধানের লজ্জা এড়াতে চৌধুরী সাহেব কাঠুরের মেয়েকে খুন করলেন জাতীয় বাংলা সিনেমার বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে আসতে পারে নি। যদিও শরীরে পোশাকের পরিমাণ কখনও লজ্জা শরমের পরিমাপ হতে পারে না কিন্তু ভৌগলিক অবস্থান জনিত কারণে অন্তত পোশাকের দৈর্ঘ্য বিষয়ক লজ্জা শরম আমাদের কম। কোম্পানী রেল লাইন তৈরী করে দেওয়ার পর কোম্পানীর রেল লাইন শক্তপোক্ত বেড়ে উঠুক ভাবনা থেকে গ্রামের মানুষ ভোর বেলা বদনা হাতে রেল লাইনের স্লীপারে জৈব সার দিয়ে আসতো। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে এখনও দেশের ৪০% মানুষ খোলা মাঠে প্রাতঃকৃত্যাদি সম্পন্ন করে। আমরা অর্ধেক মানুষকে রেল লাইন অভিমুখী বদনা মিছিল থেকে সরিয়ে আনতে পেরেছি, ব্যালট বাক্সে সিল মেরে এটুকু বৈপ্লবিক পরিবর্তন আমরা আশা করতেই পারি





পড়ছি
বরাবরের মতোই মচমচে লেখা ও তির্যক অব্জারভেশন!
দুইটা শব্দ মাথায় ঘুরতেছে, সামুরাই আর হারিকিরি!
পিচ্চিগুলা কেমন আছে?
লেখাটা হুট করে শেষ হয়ে গেলো
মন্তব্য করুন