ইউজার লগইন

ভাঙাচোরা দিনকাল ৪

প্রবাসে জীবন মানে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া। কিছু অভ্যস্ততা, কিছু ভালো লাগার সাথে সমঝোতা করে ভিন্ন একটি সংস্কৃতিতে ভালো থাকার প্রয়াস। টং এর দোকানের চা, সস্তা বিস্কুট আর দোকানের শিশু কর্মচারীর কাছে বাড়তি সালামের বিনিময়ে সস্তা দোকানে সেলফসার্ভিস কফি-ডোনাটের দিনগুলো অনেকটা ভিউকার্ডে বসবাসের মতো মনে হয়। আমাদের বেড়ে ওঠার সময় খুব ভিউকার্ডের চল ছিলো। সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, লেক জেনেভা, এল্পাইন, টিউলিপ বাগান, আমীর খান, মাধুরী শ্রীদেবীর ৪ বাই ৬ ছবি। আমাদের অনেকেই ভিউকার্ড জমাতো, বিদেশের অনুকরণে আমাদের মফঃস্বলে অঞ্জু ঘোষ, চম্পা ববিতার ভিউকার্ড বিক্রী হতো সিনেমা হলের সামনের দোকানে। লুকিয়ে সিগারেট টানার সময় দেখতাম নায়িকার স্ফীতস্তনের দিকে তাকিয়ে কেউ বলছে মালটা সেই রকম।

ঘরের ভেতরে যেমনই থাকি, দরজা খুললেই ভিউকার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অনুচ্চ পাহাড়ে বরফ জমে আছে। কাঠি আইসক্রীমের মতো গাছের ডালে জমে আছে তুষার, সামনের ছাদে দেড়-দুই ফুট বরফের স্তুপ , চোখে পরছে কিন্তু স্পর্শ্ব করছে না। কোনো হর্ণ না দিয়ে , বিশ্রীভাবে ওভারটেক না করে, ট্রাফিক আইন মেনে এবং পথচারীকে সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে লোকজন গাড়ী চালাচ্ছে, প্রতিটি লোকালয়ে শিশুদের জন্যে আলাদা খেলার জায়গা, ছোটো হলেও একটা পার্ক, প্রায় পরিচ্ছন্ন রাস্তা- সবই ভিউকার্ডের মতো ঝকঝক তকতকে মনে হয়। এই সাজানো গোছানো শহরের ভেতরে নিজেকে অতিথি মনে হওয়াটুকুই প্রবাসী অনুভূতি। নইলে প্রবাস এখন আর তেমন আলাদা কিছু না। চিনিগুড়া চাল, সোনা মুগ ডাল, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, চট্টগ্রামের লটিকি শুটকি সবই পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক পাওয়া না গেলেও দেশের নির্দিষ্ট কিছু পণ্য চাইলে এক স্পতাহের ভেতরে পাওয়া সম্ভব। ইচ্ছে হওয়া আর ইচ্ছে পুরনের ভেতরে ৭ দিনের ব্যবধান মেনে নিতে পারলে প্রবাস তেমন দুরহ কিছু না।

প্রবাসে ভাষা সংকট প্রচন্ড ডিপ্রেসিং, হতাশা-বিমর্ষতা- অসহায়ত্ব মিলে মিশে ভাবনা অবশ করে দিতে পারে। প্রতিনিয়ত স্বদেশ-স্মরণ, তারে-বেতারে দেশের সাথে সংযুক্ত থাকা আর বর্তমানের ফেসবুকের ওয়ালে দেশী বন্ধুদের উল্লাসের ছবি দেখে আরও হতাশাক্রান্ত হওয়াটুকু এড়ানো যায় কিন্তু এই হতাশাক্রান্ত হওয়ার ভেতরেও সম্ভবত দেশপ্রেম থাকে। আমাদের ভেতরে স্বদেশ প্রীতি উঠে আসলো মশুরের ডালে। রাইসকুকারের আঠালো ভাত আর হলুদ-রসুন-আদা মরিচে কষা মাংসের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা আঁশটে গন্ধের ভেতরে মশুরির ডাল না থাকার বেদনায় মুহ্যমান হয়ে গেলাম।

খাওয়ার শুরুতে কিংবা শেষে একটু ঘন মশুরের ডাল চমৎকার হয়ে উঠতে পারতো কিন্তু না পাওয়াটুকু নিয়ে বিমর্ষ হওয়ার কোনো কারণ ছিলো না। মশুরের ডালের জন্যে ইন্টারনেটে অর্ডার দিতে হবে, সে অর্ডার নেওয়ার জন্যে ঘরে বসে থাকতে হবে, তারপর ডালে ঝোল মেখে কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার সাধ পুর্ণ হবে প্রক্রিয়াটা কোনোভাবেই সম্পন্ন হলো না। কাছেপিঠের বাঙালী পরিবারের দাওয়াতে একটু আধটু ডালের স্বাদ নিয়ে হতাশা ভুলে ছিলাম কিন্তু সেটুকুও যথেষ্ট মনে হলো না লিপির কাছে।

ঋত আর ঋককে আনতে ডিসেম্বরে দেশে যাওয়ার সময় আমাদের ডালহীন আলুনি জীবনের কথা বলার পর আম্মা আর বড় বোন একটা প্যাকেটে রাজ্যের জিনিষ ভরে পাঠিয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে যে বাক্স টেনে আনার দায়িত্বটা পরলো আমার ঘাড়ে। শহরে উথাল পাথাল বৃষ্টি আর বাতাস- ছুটির দিনের বাসের তালিকায় ঘন্টায় একটা মাত্র বাস-

লিপি বাংলাদেশ থেকে ঋক আর ঋতকে নিয়ে আসলো।

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.