ইউজার লগইন

পাঠপ্রতিক্রিয়া " জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা" পারভেজ আলম

কিছু মৌল বিশ্বাস বাদ দিলে ধর্মাচরণ আদতে এক ধরণের সংস্কৃতিযাপন। মৌলবিশ্বাসের রকমফেরে সে সংস্কৃতিচর্চার বৈশিষ্ঠ্য বদলায়। সামাজিক- অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভেতরে থেকেই সে সংস্কৃতিচর্চা করতে হয় বিধায় ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে একই ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় জীবন সংস্কৃতিতে স্থানীয় বৈশিষ্ঠ্য প্রকট হয়ে ওঠে এবং মৌল বিশ্বাস কাঠামোর ভেতরেই ধর্ম নিজেই সংস্কৃত হয়ে ভিন্ন একটি ধর্মীয় সংস্কারে পরিণত হয়। কখনও সামাজিক প্রয়োজনে নতুন ধর্মমতের উদ্ভব হয়, কখনও পুরোনো ধর্মমতের মৌলিক বিশ্বাসজনিত বিতর্কে নতুন একটি ধর্ম সংস্কার তৈরী হয় , মানুষের সংস্কৃতিন্যস্ততা তাকে কোনো না কোনো একটি সংস্কৃতির ভেতরে অভ্যস্ত করে ফেলে এবং সেই অভ্যস্ততাজনিত কারণে তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা রক্ষায় কখনও প্রতিক্রিয়াশীল কখনও সমঝোতাকামী।

একেশ্বরবাদের ভিত্তিতে বিশ্বে অসংখ্য ধর্মমত প্রচলিত হয়েছে, তবে অনুসারী বিবেচনায় ইসলাম এবং খ্রীষ্টান ধর্মমতের অনুসারী সবচেয়ে বেশী। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই দুই ধর্মমতের অনুসারী মানুষ রয়েছে তবে তাদের জীবনযাপনে তীব্র রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে, তারা মোটামুটি স্থানীয় সামাজিক সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিয়েই নিজেদের ধর্মমতের অনুসরণ করছে। আমাদের বাঙালী মুসলমানেরা ইথিওপিয়া কিংবা সোমালিয়ার মুসলমানদের সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার ধরণ দেখে তাদের কাফির মনে করতে পারে, তেমনভাবেই আরবের মুসলমানেরা ভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের মুসলমানদের সাংস্কৃতিক জীবনকে অনেকটাই অণৈসলামিকতার মোড়কে মোড়া, ব্যক্তিগত পর্যালোচনা, সংস্কৃতিক ভিন্নতার ভেতরেই বর্তমানে ইসলামী জঙ্গীবাদ এক ধরণের বৈশ্বিক আশংকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদকে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হাদিস এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সংগ্রাম করা জিহাদ প্রতিটি মুসলমানের জন্যে ফরজ ঘোষণা দেওয়া হাদিসের ভেতরে কোনো মতবাদ গ্রহনযোগ্য এই বিতর্কে এক দল নিজের প্রবৃতি- লোভ-লালসা এবং সীমাহীন কাঙ্খাকে নিয়ন্ত্রনে রেখে সৌহর্দময় জীবনযাপন করে স্বশটাকে পরিতৃপ্ত করাটাকেই নিজের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং সীমিত একদল মানুষ মনে করেছে এই পৃথিবীতে ইসলামের প্রতিশ্রুত সাম্রাজ্য তৈরী করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। যারা সৌহার্যপূর্ণ সামাজিক স্থিতির পথে নিজের ধর্মমতকে প্রকাশ করতে চান- তারা এই ধরণের উগ্রপন্থী মুসলমানদের কর্মকান্ডে আক্রান্ত হন- কখনও বিব্রত হন, কখনও হেনেস্তার শিকার হন, এবং একই সাথে অমুসলিম উন্নত বিশ্বে রাষ্ট্রের সাম্ভাব্য শত্রুর তালিকায় উঠে যান।

সন্দেহ সংশয় এবং উৎকণ্ঠাজনিত ঘৃণায় তারা যখন তাদের সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা হারান, তারাও ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত মৌলবাদীসমর্থক হয়ে যান, অন্ধকারের চক্র অন্ধকারে এসেই সমাপ্ত হয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী জঙ্গীবাদের উত্থান এবং সহনশীল মুসলমান এবং উগ্রবাদী মুসলমানদের ভেতরে আত্মপরিচয় সংকট যেভাবে ঘৃণা উগড়ে দিচ্ছে, পারভেজ আলমের জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা সেই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটা সংযোজন।

জঙ্গীবাদের অগ্নিকুণ্ডে কেনো অবিরাম আত্মঘাতী বোমাবাজের সরবরাহ বাড়ছে- কারা কি কারণে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জড়িয়ে যাচ্ছে, পারভেজের যেমন এর পেছনের আর্থসামাজিক কারণ উদঘাটন এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে জঙ্গীবাদের উত্থানকে ব্যাখ্যা করার রাজনৈতিক প্রয়োজন ছিলো একই সাথে তার নিজস্ব পরমতসহিষ্ণু ঐসলামিক বিশ্বাসের স্থানও যে ইসলামী কেতাবের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অগুরুত্বপূর্ণ স্থানে লিপিবদ্ধ আছে এবং তার জীবন সংস্কৃতিও যে শান্তিপূর্ণ ঐসলামিক জীবন সংস্কৃতি এটা প্রমাণের দায়ও পারভেজের আছে ফলে সকল মুসলমানই ধর্মীয় কেতাবের বানীর কারণে এক ধরণের সাম্ভাব্য জঙ্গীবাদী এই পরিচয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেই ১১টি ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধে সাজানো তার বইটি শুরু হলেও প্রকৃত ইসলামিক সংস্কৃতি প্রশ্নকে চিহ্নিত না করেই বইটি শেষ হয়ে যায়।

লেখক যেটাকে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক চক্রান্ত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল গ্যাস দখলের চক্রান্ত হিসেবে উল্লেখ করে ইসলামের এক রৈখিক চিত্রায়ন হিসেবে চিহ্নিত করলেন- সেখানে ইসলামের বহুবিধ রূপের সম্ভাবনা সম্পর্কে এক ধরণের আশ্বাস ছিলো- প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ । হয়তো স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া যায়- শাসক গোষ্ঠীর প্রশ্রয় থাকলে, সহানুভুতি থাকলে খলিফা শাসিত রাজ্যেও কেতাবী ইসলামের বাইরের ধারণা ও বিশ্বাস চর্চা করা যায় এবং খলিফার সম্মতিতে সেসব ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার অস্তিত্ব ইসলামী সম্রাজ্যে ছিলো- সুতরাং শুধুমাত্র কেতাবী ইসলামই প্রকৃত ইসলাম এমনটা বলা যাবে না।
ইসলামের ইতিহাসে অনেক ধরণের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার উপস্থিতি ছিলো- এবং শাসক গোষ্ঠীর প্রশ্রয় থাকলে এই ধরণের ব্যাখ্যাগুলো ক্ষেত্রবিশেষে বিকশিতও হয়েছে। ধর্ম আদতে ধর্মবিশ্বাসীদের জীবনাচরণ- সংস্কৃতি চর্চা, ধর্ম এখানে যতটা না কেতাবী তার চেয়ে বেশী পারিবারিক বিশ্বাস কিংবা সংস্কারের অনুসরণ- খিলাফতের উৎস অনুসন্ধানে পারভেজ এমন অনেকগুলো সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে যারা কেতাবী ইসলাম অনুসরণ না করলেও নিজেদের মুসলমান ভাবতো এবং তাদের এই মুসলিম পরিচয় নিয়ে কিছু কিছু উলেমাদের ভেতরে সংশয় থাকলেও শাসক গোষ্ঠী তাদের এই মতবিচ্যুতিতে তেমন বিপদজনক ভাবেন না। ৫ কালেমা প্রশ্নে কোনো সংশয় না থাকলেও নিজস্ব জীবন ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না কি স্রষ্টায় নির্ধারিত বিধিলিপিতে নিয়ন্ত্রিত হয় প্রশ্নটিতে এই আলোচনার সমাপ্তি ঘটে। আধুনিক মানুষের মতোই পারভেজের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকে নিজের কর্মফল বহন করতে হয়। সেক্যুলার রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনী কাঠামোর ভেতরে নাগরিকের বৃহত্ত্বর মঙ্গল কামনায় যেসব রাষ্ট্রীয় বিধি রয়েছে- সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে সেসব বিধি বিধান মেনে ব্যক্তিকে জীবনযাপন করতে হবে। অনুচ্চারিত হলেও পারভেজের বক্তব্য ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস রাষ্ট্রের সেক্যুলার আইনী কাঠামোর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হওয়াটাই মঙ্গলজনক, ইহলৌকিকতা এবং প্রলৌকিকতার সংঘাতে ইহলৌকিক জীবনে ইহলৌকিক বিধি এবং পরলৌকিক জীবনের জন্যে শুভ কাজের পূঞ্জীভূত পূঁজি সংগ্রহ করে যাওয়াই মানুষের ধর্মচারণের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামের ইতিহাস এবং অন্যান্য যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের মতো ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সহিংসতা, অকারণ হত্যা কিংবা প্রতিহিংসাকে কিভাবে ধর্মের মোড়কে বৈধ্যতা দেওয়া হয়েছে, কিভাবে এই ধরণের অপরাধগুলোর সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা তৈরী করা হয়েছে এইসব স্পর্শ্বকাতর বিষয়ে গবেষণাধর্মী বই লেখাটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, লেখককে অসংখ্য সাম্ভাব্য বিতর্ক থেকে , অসংখ্য প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে আড়াল করলে যথেষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম করতে হয়। পারভেজ শেষ পর্যন্ত অসংখ্য বিতর্কিত মন্তব্য- পরিসংখ্যান বর্জন করেছে( আমার ধারণা এটাই- তথ্যগুলো তার জানা ছিলো না এমন না) সর্বমহলে খুশী রেখে নিজের রাজনৈতিক-মতাদর্শিক আনতির সাথে সাযুজ্যতাপূর্ণ উপসংহারে পৌঁছেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং বর্ণণার সাথে পাঠক প্রথমবারের মতো পরিচিত হবেন- এইসব পাঠকদের একাংশ নিজের আগ্রহে আরও কিছু বাড়তি পড়াশোনা করবে- প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে যেসব তথ্যসূত্র সংযোজিত হয়েছে- সেসবের বাইরে গিয়েও তারা পড়বে- সহনশীল সংস্কৃত মুসলমান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে।

বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া কিংবা সকলকে খুশী রাখার প্রক্রিয়ায় কিছু ঘটনার গুরুত্ব খাটো করা এবং কিছু বিতর্ককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার সামান্য বিচ্যুতি বাদ দিলে বিভিন্ন তথ্যসূত্রের সহযোগিতায় ১১টি অধ্যায়ে ইসলামের ইতিহাসে খেলাফতের সূচনা এবং সম্রাট তথা খলিফা শাসিত ইসলামী রাজ্যগুলোতে সংগঘতিত বিভিন্ন বিদ্রোহ সংস্কার আন্দোলন এবং সেসব সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া বর্তমানেও ইসলামী খেলাফতের আন্দোলনে কিভাবে জ্যান্ত হয়ে আছে সে উপসংহারে পৌঁছানোর প্রচন্ড পরিশ্রম অনেকাংশেই সফল।

বঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিজেদের বঞ্চনার বাস্তবতা বদলে দিতে মহানায়কের প্রতীক্ষায় থাকে। সুদিনের প্রতীক্ষায় একজন সাম্ভাব্য নায়কের আগমনের রূপকথা তাদের বর্তমানের সাদাকালো জীবনকে দিন শেষে স্বস্তিতে মুড়ে দেয়। লোককথায় অতীতের কোনো সাধারণ নায়কের শৈর্য্যবীর্যের বর্ণনা এবং তার ন্যায়পরায়নতার গল্প শুনে শুনেই এরা বেড়ে ওঠে, ফলে প্রতিটি পিছিয়ে পরা জনবসতিতেই একজন ইমাম মাহদীর প্রতীক্ষা থাকে। রাজ্যহারা ইহুদীরাও এমন পথপ্রদর্শকের অপেক্ষায় থেকেছে, তাদের ধর্মগ্রন্থের ভেতরে এমন প্রত্যাশা প্রকাশিত এবং প্রার্থনায় নিয়মিত সেসব পূরাণ কথা পড়ে পড়ে তারা সেই পথপ্রদর্শক, দুর্দশানিবারকের অপেক্ষায় থাকে। ইসার আগমণ তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিলো কিন্তু ইসার মতবাদ সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা পাওয়ার পর ইসাকেও ইহুদী ধর্ম নিজের কাঠামোতে গ্রহন করে একই একই সাথে খ্রীষ্টান ধর্মও ইহুদী ধর্মের অতীত ঐতিহ্যকে নিজের ভেতরে গ্রহন করে ফেলে।

মদীনার মানুষ মুহাম্মদ প্রস্তাবিত আল্লাহ'র স্বরূপ কতটুকু উপলব্ধি করেছিলো বলা কঠিন কিন্তু মুহাম্মদকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা মক্কাপ্রত্যাখ্যাত সকল নওমুসলিমকেই নিজেদের ভাই হিসেবে গ্রহন করেছে। মদীনার অপরাপর ধর্মাবলম্বী মানুষদের সাথে কিংবা মদীনার সাথে যেসব প্রতিবেশী অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো সেসব অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছেও ইসলাম নতুন ধর্মমত হিসেব গ্রহনযোগ্য ছিলো না। শান্তিচুক্তি, নিজের ধর্মমতে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে মদীনার ইসলাম ইব্রাহিম ধর্মের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলে। যদিও পারভেজের সিদ্ধান্ত মুহাম্মদকে কখনও প্রতিশ্রুত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণের কষ্ট করতে হয় নি কিন্তু মুহাম্মদ নিজের ঐশ্বরিক ঐতিহ্য এবং ইব্রাহিম ধর্মের প্রস্তাবিত পথপ্রদর্শকের স্থান গ্রহনের জন্যে ইহুদি এবং খ্রীষ্টান উভয় ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সাথে আলোচনা করেছেন, এবং মদীনার প্রথম কয়েকটি বছরে এ ধরণের সংলাপ এবং সেই সময়সীমায় প্রাপ্ত ঐশী অনুপ্রেরণায় ইব্রাহিম ধর্মের উত্তরসূরীতায় পথপরিক্রমা স্পষ্ট হয়ে আছে।

যদিও শিয়া সুন্নী সংঘাত বিশ্লেষনের প্রয়োজনে পারভেজ আলী এবং আবু বকরের ভেতরে খেলাফতের দ্বন্দ্ব এবং সেই দ্বন্দ্ব কিভাবে পারিবারিক কলহে পরিণত হলো সেসবের বিস্তারিত লিখেছে কিন্তু সবচেয়ে মৌলিক যে প্রশ্নটি- মদীনার মানুষেরা যাকে তাদের নেতা হিসেবে স্বীকার করেছিলো সেই মানুষটিকে অস্বীকার করে মক্কাবাসী এবং কোরাইশ বংশভুত বলে সাম্যবাদী ইসলামের কাঠামোর ভেতরেও বর্ণবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটালো আবু বকর এবং উমর সেই প্রশ্নটিকে কোনোভাবেই আলোচনায় আনে নি।

প্রতিটি বিভেদের শেকড় লুকিয়ে থাকে সূচনায়। মোহাম্মদের মৃত্যুর পর উমরের ক্রুদ্ধ গর্জনকে স্থিমিত করে আবু বকর যখন বলছেন দেখো উমর মুহাম্মদ তোমার আমার মতোই একজন মানুষ এবং তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে- তার আগেই মদীনাবাসী তাদের ইতকর্তব্য নির্ধারণ করে মোহাম্মদপরবর্তী নেতৃত্বকে অভিষেকের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। আবু বকর উমর এবং অন্যান্য মক্কাবাসী মুসলমান সেখানে গিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেন ।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর পরবর্তী নেতৃত্বের সংঘাতের সাথে সাথে মুহাম্মদের সম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়েও বিতর্ক তৈরী হয়। ইসলামী কেতাব অনুসারে তার সন্তানদের সকল সম্পদের উত্তরাধকার থাকলেও আবু বকর ভিন্ন একটি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। দাস, উট আর খেজুর বাগানের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিশিষ্ট মুসলমানদের ঝগড়াঝাঁটি আর পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তৃত ইসলামী সম্রাজ্যে স্বজনপ্রীতি করে ওসমানের নিজস্ব ভাই বেরাদারদের বিভিন্ন অধিকৃত ভূখন্ডে প্রশাসক হিসেবে পাঠানো, তাদের অকর্মন্যতা এবং অদক্ষতার বিরুদ্ধে উত্থিত কণ্ঠস্বরগুলোকে কৌশলে, বল প্রয়োগে দমানোর চেষ্টা বিভিন্ন ধরণের আন্তঃসংঘাতের পরিস্থিতি তৈরী করে। আলী কখনও এই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন না, তবে পরিস্থিতির কারণে তাকে এই ক্ষমতার বাদ বিসম্বাদে অংশগ্রহন করতে হয় এবং সেই বিবাদমূখর পরিস্থিতিতে সকল মুসলমান ভাই ভাই- তোমরা পরস্পরের প্রতিরক্ষা করবে বানীগুলো ভুলে তারা আত্মঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হয়। পরবর্তী ১৪০০ বছর কখনও নিরবে কখনও সরবে এই সংঘাত অব্যহত আছে।

বিশ্বে যা কিছু ঘটছে সবকিছুর পেছনেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কলকাঠি নাড়ছে- অর্থনৈতিক,মনস্তাত্বিক আধিপত্য কায়েমের জন্যে তৈরী করা গ্রান্ড ডিজাইনের অংশ হিসেবেই বর্তমানে বিশ্ব ইসলাম জঙ্গীবাদ নিয়ে এক ধরণের প্রচারণা চলছে এবং সেটাও সাম্রাজ্যবাদী চাল- এই বিশ্বাসটুকু আমার কাছে পীড়াদায়ক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের জন্যে সুবিধাজনক পররাষ্ট্র নীতি এবং কৌশল নির্ধারণের দক্ষতায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলো অনুন্নত দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে। তারা সাপের গালেও চুমু দেয়, ব্যাঙের নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখে- ফলে নিজেদের লড়াইয়ে সাপ মরে গেলো না কি ব্যাঙ সাপের উদরে গেলো এসব নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না, সবপক্ষই তাদের পক্ষ কিংবা কোনো পক্ষই তাদের পক্ষ না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ইয়াহিয়ার সাথে নিক্সনের ব্যক্তিগত সখ্যতা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রন করলেও আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের বিকল্প প্রস্তাব ছিলো নিজেদের উৎপাদিত অস্ত্র তারা তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করবে, ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছেও আমেরিকার গ্রহনযোগ্যতা থাকবে- যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে জাতিসংঘে পাকিস্তানপন্থী মার্কিন কুটনৈতিক তৎপরতার সাথে সাথে আমেরিকার সরবরাহকৃত অস্ত্রে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা পাকিস্তানের আক্রমন কোনোটার পেছনেই আমেরিকার চক্রান্ত ছিলো না- কিন্তু তারা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে প্রতিটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে, কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিকল্প হাতে রেখে সবগুলোতেই সমান মনোযোগ দিয়েছে- চক্রান্তপ্রবনতার চেয়ে এই ধরণের বিশ্লেষনী দক্ষতাকে স্বার্থকভাবে প্রয়োগ করতে পারাটাই আমেরিকার শক্তিশালী দিক। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরী করে তাদের উপস্থিতি শক্তিশালী করার জন্যে তারা আইএসআইএসকে সহযোগিতা করছে কিংবা ইসলামফোবিয়ার পালে হাওয়া দিচ্ছে এমনটা সর্বাংশে সঠিক না। পারভেজের এই ব্যক্তিগত অবস্থান অবশ্য বইয়ের উপস্থাপিত যুক্তিগুলোকে দুর্বল করে দেয় না। সংঘাতের নেপথ্যে বঞ্চনা অবহেলার বাস্তব উপস্থিতি থাকতে হয় ,সেসব আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি বিপ্লব বিদ্রোহের বীজ হিসেবে কাজ করে- এই সারাংশ অস্বীকার করা যাবে না।

পারভেজ আরও বই লিখুক, আরও কিছু বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে ই মেইলে বই পাঠাক এই কামনা করি।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


বইটা পড়বো!

তানবীরা's picture


রিভিউ পাঠককে পড়তে উদ্বুদ্ধ করবে

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,