ইউজার লগইন

গ্যালিলিও

ছোটো বেলা স্টেশনের মজমার ভীড় দেখলে ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখতাম কি হচ্ছে। তখনও ঘরে ঘরে টেপ-রেকর্ডার আর ক্যাসেট আসে নি, মজমার কেন্দ্রে যে যুবক, তার হাতে মাইক্রোফোন, সে কথা বলছে আর টেপ রেকর্ডারে সে কথা শোনা যাচ্ছে- অবাক করা বিষয়। শহরের এ রাস্তা সে রাস্তায় সিনেমার বিজ্ঞাপনের রিকশায় লাগানো মাইকের চোঙা, মাইক্রোফোন আর তার দেখে খুব বেশী অবাক লাগতো না, অনুমান করে নিয়েছিলাম টেলিফোন যেভাবে কাজ করে এইসব মাইক- মাইক্রোফোন আর তার সেভাবেই কাজ করে, কিন্তু তার-ছাড়া মাইক্রোফোন তখনো খুব বেশী পরিচিত কোনো দৃশ্য ছিলো না।
সবচেয়ে আশ্চর্য ছিলো যুবকের হাতের যাদুর বল, বলগুলো উপর থেকে গড়িয়ে নীচে না পরে বরং যুবকের হাতের তালু থেকে কাঁধের দিকে উঠে যেতো- ম্যাজিকের ভেল্কিবাজীর ভেতরেও কোনো না কোনো কৌশল থাকে কিন্তু সেইসব বল হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে বুঝতে পারি নি কৌশলটা কি? ম্যাজিক আর মাইক্রোফোনের পর যখন স্বপ্নে পাওয়া ঔষধের বিজ্ঞাপন শুরু হতো তারপর মজমা আমাকে আর আকর্ষণ করতো না।
সে সময় কিংবা তার দুই এক বছর পরে মাঠে খেলতে যাওয়ার সময় একই যুবককে দেখলাম, এবার স্টেশনের পেছনের চাতালে, একজন মানুষকে চাদরে মুড়ে মাটি থেকে ৬ ফুট উপরে উঠিয়ে ফেললো। কামরুপ-কামাখ্যার ভেল্কিবাজীর উপরে আমার কোনো আস্থা ছিলো না, হিং-টিং-চং-বং বললেই যে চাদর মোড়ানো মানুষ ৬ ফুট উপরে শূণ্যে ভাসবে না সেটুকু বিশ্বাস নিজের ভেতরে ছিলো কিন্তু কোনোভাবেই কৌশলটা বুঝতে পারি নি।

আমাদের শৈশবে জুয়েল আইচ এসেছিলো আমাদের মফঃস্বলে, অনেক রাত বলে আমি জুয়েল আইচের ম্যাজিক দেখতে যেতে পারি নি কিন্তু পরের দিন সকালে দর্শকদের আশ্চর্য মুগ্ধ গল্প শুনেছি, কিভাবে জুয়েল আইচ বিপাশাকে কেটে দুটোকরো করে ফেললো, তারপর আবার কাটা মানুষকে জুড়ে দিলো, কিভাবে শূণ্য থেকে পায়রা আর কাগজ থেকে ফুল বের হয়ে আসলো, পরের এক সপ্তাহ আমাদের মহল্লায় শুধুমাত্র জুয়েল আইচের ম্যাজিকের মুগ্ধ বর্ণনা। স্কুলের বার্ষিক উৎসবে আসা ম্যাজিশিয়ান আঙুল নাড়লেই একটা পিংপং বল চলে আসছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে, হাত নাড়ালে কান থেকে পানি পরছে ম্যাজিকগুলো তখন প্রচলিত ছিলো। সেসব কৌশল জানা যায়, চেষ্টা করলে এই ধরণের ম্যাজিক দেখানো যায়- কাচারি মার্কেটে( জেলা জজ কোর্টের পাশের সেকেন্ড হ্যান্ড কাপড়ের দোকান) ম্যাজিশিয়ানকে ৫ টাকা দিয়ে একটা যাদুর কৌশল শিখে আসা মানুষটার কাছে গিয়ে কৌশল শেখার কসরত এবং ব্যার্থতার পরও সেসবকে অধিভৌতিক- অলৌকিক কিছু মনে হয় নি। হাত সাফাইয়ের কৌশল আর দর্শককে বোকা বানানো ম্যাজিকের সাফল্যের রহস্য এটুকুই। জুয়েল আইচ নিজেকে ম্যাজিশিয়ান বললেও তার পরিচয় ছিলো যাদুকর- যাদু-টোনা কুফরি কাজ- যারা যাদুকর তারা আসলে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রী করে যাদু টোনা শিখে- যাদুকরদের ভয়ংকর সব জল্পনা কল্পনার উৎস কোনো বিদেশী ফ্যান্টাসী ছবি কিংবা ব্ল্যাক ম্যাজিকের উপরে লেখা কোনো হরর উপন্যাস, চোখের সামনে রহস্যময় অনেক কিছু ঘটছে যা আমাদের পরিচিত পৃথিবীর সাথে খাপ খায় না- নিজের চোখের দেখাকে অবিশ্বাস করতে না পারা এবং ধর্মবিশ্বাস সব মিলে আমার শৈশবে বয়স্কদের ভাবনায় ম্যাজিশিয়ানদের নিয়ে মুগ্ধতা এবং যাদু টোনার ভীতি শান্তি-সম্প্রীতিতে পাশাপাশি বসবাস করতো।

আমাদের আগের প্রজন্মের শিক্ষিত মানুষেরা অবাক বিস্ময়ে চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদক্ষেপের ঘটনা জেনেছে, সৌভাগ্যবান কেউ কেউ টেলিভিশনে সে দৃশ্য দেখে শিহরিত হয়েছে আর বাকী সবাই পেপারের পাতায় প্রথমবারের মতো চাঁদের অন্য পিঠের ছবি দেখেছে। চন্দ্রঅভিযান সভ্যতার ইতিহাসে এবং বিজ্ঞানের সামাজিক ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা। আমরা বেড়ে ওঠার সময় মানুষের চন্দ্রঅভিযান বৈজ্ঞানিক সাফল্যের একটা মাত্র তথ্য, তবে চন্দ্র অভিযানের গল্প আমাকে খুব বেশী অবাক করে নি। প্রায় প্রতিদিন রাতে আকাশে চাঁদ দেখা যায়, পরিচিত মানুষেরা প্লেনে চেপে এই দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছে, নিরাপদে ফিরে আসছে, চাঁদে অভিযান তেমনই খুব স্বাভাবিক একটা তথ্য হিসেবে গ্রহন করেছিলাম। এখন ভেবে আশ্চর্য লাগছে- চন্দ্র অভিযানের তুলনায় হিলারীর মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার ঘটনা আমার কাছে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতো। সে সময়ে প্রগতি প্রকাশনীর মহাকাশে মহাযাত্রা ( নামটা ভুলও হতে পারে) পড়ে মনে হলো মহাকাশবিজ্ঞানী না হলে জীবন পূর্ণতা পাবে না। স্পেশশীপ বানাতে হবে, সেই স্পেশ শীপ চাঁদ, সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে দুরের কোনো নক্ষত্রের দিকে যাবে-

আমার ধারণা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের সাথে তুলনীয় নয়। গত কয়েক দশকে আমাদের প্রাযুক্তিক দক্ষতার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে। গত কয়েক দশকে প্রযুক্তির অগ্রগতির সমান্তরালে বৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা বিকশিত হয় নি, সাম্প্রতিক সময়ের ট্রেন্ডী প্রযুক্তি ষাটের দশকের কোনো এক গবেষণালব্ধ ফলাফলের চুড়ান্ত বিকাশ। মানুষের ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে সে গবেষণাকে চার দশকের পথ পার হতে হয়েছে কিন্তু মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্য উৎপাদনের দক্ষতা এবং যে যন্ত্রের সুক্ষ্ণতা- কর্মদক্ষতা- কার্যকারিতা উন্নয়নের জন্যে খুব বেশী বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রয়োজন হয় না। প্রচুর পরিমাণ জ্ঞান উৎপাদন হয়, বিকল্প অনেকগুলো পরিকল্পনার ভেতরে যাচাই বাছাই শেষে যেকোনো একটি কিংবা একাধিক প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রোডাক্ট লাইনে আসে- বৈজ্ঞানিক তথ্য থেকে যন্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়াটা বিজ্ঞানের ব্যবহার-সেখানে তত্ত্বের কচকচানি তেমন নেই- কিংবা তত্ত্বটা সামগ্রীক বিজ্ঞানের পরিধির এতক্ষুদ্র একটা অংশ- যন্ত্র হয়ে ওঠার আগে সে বৈজ্ঞানিক তথ্য গুটিকয় গবেষকদের বাইরে অনেককেই আকর্ষণ করে নি।

আমরা শৈশব থেকে যেসব যন্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত- সেসব যন্ত্র কিংবা সেসব যন্ত্রের কার্যকারিতার পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমাদের কাছে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। প্রতিদিন আকাশে দেখা চাঁদে মানুষের প্রথম পদক্ষেপের ঘটনা আমাকে খুব বেশী আলোড়িত করে নি কিন্তু না দেখা মাউন্ট এভারেস্টের ৮৮৮৮ মিটার উঁচু চুড়ায় স্যার হিলারীর প্রথম পদক্ষেপ মানব জাতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে হয়েছিলো। আমরা যে বাস্তবতায় বসবাস করছি সে বাস্তবতা দিয়ে গ্যালিলিও-কোপার্নিকাস-কেপলারের সমসাময়িক লড়াইএর গুরুত্ব উপলব্ধি করা কঠিন। তখনও পৃথিবীতে যন্ত্রযূগের সূচনা হয় নি। মাত্র কয়েক দশক আগে প্রথম ছাপাখানা তৈরী হয়েছে এবং একই কৌশল ব্যবহার করে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ছাপাখানার ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছে। পুঁথির যুগে মানুষের চাহিদা মেটাতে কবি-সাহিত্যিক-বৈজ্ঞানিক- সবাই লিখছে। রাষ্ট্রের পৃষ্টপোষকতায় নির্মিত লাইব্রেরীর বদলে ব্যক্তি উদ্যোগে লাইব্রেরী তৈরীর সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে। ছাপাখানার বদৌলতে পঞ্চদশ শতকে কয়েকজন আবিস্কার করেছে শুধুমাত্র লিখেই জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব।

পৃথিবীর সূর্যের চারপাশে ঘুরছে এই তথ্য জানিয়ে গ্যালিলিও চার্চের চক্ষুশূল হয়েছিলো এবং চার্চের হাতে বিজ্ঞানী হিসেবে নির্যাতিত হয়েছিলো- গ্যালিলিও মহান নায়ক- বিজ্ঞানবাদীতার দেবতা- এমন সরলীকরণ গ্যালিলিওর মেধা বৈজ্ঞানিক অর্জনের প্রতি এক ধরণের তাচ্ছিল্য, তাকে কয়েকটা বাক্যের নির্দিষ্ট বক্তব্যে সীমাবদ্ধ কিংবা সীমিত করে ফেলা। গ্যালিলিও তার সময়ে দাঁড়িয়ে যা ভেবেছেন, যেভাবে তার দেখা জগতকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন এবং যেভাবে নিজের উদ্ভাবনকূশলতায় প্রতিকূলতাগুলো অতিক্রম করেছেন, ধর্মযাজকের সাথে ব্যক্তিগত বৈরীতায় সৌরকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের ধারণা ছাত্রদের পড়িয়ে পাওয়া শাস্তি সেসব বিবেচনায় খুব নগন্য একটা প্রতিকূলতা। সময় এবং সীমাবদ্ধতাকে আমলে না নিয়ে কয়েকটা পরিচিত বাক্যে বিজ্ঞানের ইতিহাসের নির্যাতিতের তালিকায় গ্যালিলিওর শীর্ষাবস্থান তার ভূমিকাকে খুব খর্বিত করে দেখার প্রয়াস বলে মনে হয় আমার।

গ্যালিলিওর যুক্তিনির্ভর মানস নির্মানে তার পরিবারের ভূমিকা খুব বেশী আলোচিত হয় নি। তার বাবা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। তারের পুরুত্ব এবং টান( ব্যবহৃত ওজন) এর সাথে সুরের সম্পর্ক অনুধাবনের প্রয়াসে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন প্রাচীন পূঁথিতে লিপিবদ্ধ সকল বাক্যকে অভ্রান্ত মনে করার কোনো কারণ নেই। গ্যালিলিও সম্ভবত তার বাবার অনুপ্রেরণা কিংবা অভিজ্ঞতার কারণেই প্রাচীন পূঁথিগত বাক্যকে খুব বেশী গুরুত্ব না দিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিকে নিজের যুক্তি প্রমাণের সবচেয়ে কার্যকরী পথ মনে করেছেন।

যখন তিনি পড়ন্ত বস্তুর গতির ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন তখন পর্যবেক্ষণলব্ধ সিদ্ধান্ত ছিলো ভারী বস্তু হালকা বস্তুর তুলনায় দ্রুত নীচের দিকে পরে। একই সাথে ছেড়ে দিলে পাথর পালকের আগে মাটিতে পরছে এই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে তার বক্তব্য সকল বস্তু সমান গতিতে মাটির দিকে পরবে। তখনও বাতাসের বাধা পরিমাপের কোনো যন্ত্র ছিলো না। সে পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র যৌক্তিক কারণে পালক এবং পাথরের স্বাভাবিক গতির বিচ্যুতিকে বাতাসের বাধার ফলাফল হিসেবে কল্পনা করা এবং বাতাসের বাধা না থাকলে বস্তুগুলো কিভাবে পরবে তা অনুধাবন করার মতো বৈপ্লবিক ধারণার সাথে পৃথিবী পরিচিত ছিলো না। নিরেট যুক্তি ব্যবহার করে এই অনুমাণের পক্ষে যথার্থতা তুলে ধরার প্রয়াস বিজ্ঞান এবং পৃথিবীর ইতিহাসকে আমূল বদলে দিয়েছে।

তিনি যেভাবে তার অনুমানের যথার্থতা প্রমাণ করেছিলেন সেটা বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকের অবশ্যপাঠ্য হওয়ার মতো বিষয়। তার যৌক্তিক চিন্তনের পথটা অনেকটা এমন
ধরা যাক আমরা যেভাবে দেখছি- ভারী বস্তু হালকা বস্তুর তুলনায় তাড়াতাড়ি নিচের দিকে পরে, সেটাই পৃথিবীতে একমাত্র সত্য- তাহলে যদি দুটো আলাদা ভরের বস্তু ছেড়ে দেওয়া হয়, ভারী বস্তুটা হালকা বস্তুর তুলনায় আগে মাটিতে পরবে। কিন্তু যদি আমরা দুটো বস্তুকে এক সাথে বেধে নীচের দিকে ফেলি তাহলে কি ঘটবে? হালকা বস্তুটা ভারী বস্তুর চেয়ে ধীরে মাটির দিকে পরবে, ফলে হালকা বস্তুটা ভারী বস্তুকে উপরের দিকে টানবে। যদি হালকা বস্তু এবং ভারী বস্তুর গতির পার্থক্য থাকে তাহলে একটা ভারী বস্তুকে হালকা বস্তুর সাথে বেধে নীচের দিকে ফেললে তা ভারী বস্তুর চেয়ে ধীরে নীচের দিকে পরবে।

এর বিপরীতে বলা যায় যেহেতু আমরা দুটো বস্তুকে এক রশিতে বেঁধেছি, তাই নতুন বেঁধে রাখা বস্তুর ভর আগের দুটোর তুলনায় বেশী- এবং ভর বেশী হওয়ার কারণে এটা আগের বস্তুগুলোর তুলনায় দ্রুত মাটিতে পরবে। এমন যৌক্তিক বৈপীরত্বর ব্যবহার থেকে তার মনে হয়েছে বস্তুর ভরের সাথে তার নীচে পরার গতির কোনো সম্পর্ক নেই। গ্যালিলিও এই ধারণা প্রমাণের জন্যে পিসার হেলানো টাওয়ারে উঠেছিলেন এমন জনশ্রুতি আছে- তবে সে পর্যবেক্ষণের ফলাফলের কোনো রেকর্ড নেই।

কোনো সুতার সাথে ভারী পাথর বেধে তাকে দোলালে সেটা নির্দিষ্ট সময় পরপর আগের জায়গায় ফিরে আসে। এই পর্যবেক্ষণকে সময় পরিমাপের কাজে লাগিয়ে তিনি মানুষের হার্ট বীট পরিমাপের কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন, কিন্তু একই সাথে এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রথম প্রমাণ করেছেন কোনো ঢালু জায়গা দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া গোলকের গতি ঢালের উচ্চতা এবং ঢালের দৌর্ঘ্যের সাথে সমানুপাতিক। একটি নির্দিষ্ট দৌর্ঘ্যের ঢালের উচ্চতা বাড়ালে গোলকের গতি বাড়বে। গোলকের ওজনের সাথে এর গতির কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু ঢালের মসৃণতার সাথে গোলকের গতি সম্পর্কিত। ঢাল যত মসৃণ হবে, গোলক তত দ্রুত ঢাল অতিক্রম করবে এবং যদি ঢালের পরের পথটাও সমান মসৃণ হয় তবে সেটা বেশী দুরত্ব অতিক্রম করবে।

এইসব পর্যবেক্ষণের সাথে বাতাস এবং ঢালের বাধা বিবেচনা করে- এইসব পার্থিব বাধা না থাকলে বস্তু কি ধরণের আচরণ করতো সেটার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা তার গবেষক জীবনের অন্যতম অর্জন।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে দুরবীক্ষণ যন্ত্র আবিস্কৃত হয়। গ্যালিলিও নিজেও একটি দুরবীক্ষণ যন্ত্র কিনেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেটার দক্ষতা বাড়িয়েছিলেন। নিজের বৈজ্ঞানিক অর্জনের প্রদর্শনী হিসেবে তিনি চার্চের সমাবেশে দুরবীক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহার দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন চাঁদের পিঠে মোটেও মসৃণ নয় বরং এররো-থেবরো ভাঙা চোড়া। চার্চের ধর্মযাজকদের ধারণা ছিলো চাঁদ যেহেতু সৃষ্টিকর্তা নির্মিত সুতরাং চাঁদ খুবই মসৃণ গোলক হবে। গ্যালিলিওর নিজস্ব বক্তব্য সেইসব ধর্মযাজককে আহত করেছিলো, তাই তাদের পক্ষ থেকে একজন যুক্তি দিলেন চাদের বাইরের অংশটা খুবই স্বচ্ছ একটা আবরণে আবৃত- সেই স্বচ্ছ মসৃণ আবরণের ভেতরে হয়তো কিছু অংশ ভাঙাচোরা থাকতে পারে কিন্তু চাঁদের বাইরের পিঠ অবশ্যই মসৃণ। গ্যালিলিও ঠোঁটকাটা মানুষের মতো পালটা যুক্তি দিলেন- যদি চাদের বাইরের পিঠটা খুবই স্বচ্ছ কোনো আবরণে মোড়া থাকে তবে সে আবরণটাও ভাঙাচোড়া- তার পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতার বাইরে ব্যক্তির নিজস্ব ভাবনাকে খুব বেশী গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন গ্যালিলিও অনুভব করেন নি। বরং সে ধর্মযাজককে নিয়ে ঠাট্টামশকরা করেছেন।

গ্যালিলিওর দুরবীক্ষণ যন্ত্রে যখন গ্যালিলিও বৃহঃস্পতির উপগ্রহ আবিস্কার করলেন এবং উপগ্রহের গতি পর্যবেক্ষণ করে আলোর গতি পরিমাপের উদ্যোগ নিলেন- আমরা যারা শৈশবে পৃথিবীর একটিমাত্র উপগ্রহ চাঁদের তথ্যের সাথে পরিচিত তাদের কাছে বিষয়টা খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ কিংবা বৈপ্লবিক মনে হবে না। কিন্তু পৃথিবীকেন্দ্রীক মহাবিশ্বে যখন সকল বস্তু সরল কিংবা জটিল দুর্বোধ্য পথে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে এমনটা প্রমাণের তীব্র তাগিদ ধর্মযাজকদের ভেতরে- সে পটভূমিতে বৃহঃস্পতির উপগ্রহগুলো শুধুমাত্র বৃহঃস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে- নির্ভয়ে এই ধারণা প্রকাশ করা ভীষণ সাহসিকতার কাজ।

গ্যালিলিওর দুঃসাহসের প্রধান কারণ সম্ভবত ধর্মযাজকের সাথে তার ব্যক্তিগত সখ্যতা। তার আকস্মিক মৃত্যুর পর প্রধান ধর্মযাজক হলেন যে ব্যক্তি-সে ব্যাক্তি অতীতে প্রধান ধর্মযাজকের কাছে গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে নালিশ করলেও ধর্মযাজক সে নালিশ আমলে নেন নি, গ্যালিলিওকে মৃদু তিরস্কার করেছেন। প্রধান ধর্মযাজক হওয়ার পর সে ব্যাক্তি অতীতের ঠাট্টা মশকরার প্রতিশোধ নিতেই কি না বলা যায় না, গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে চার্চের নির্দেশ অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করলেন। গ্যালিলিও চার্চের বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের কথা পড়াচ্ছেন অথচ চার্চ স্পষ্ট বলেছে পৃথিবীকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের ধারণার বাইরে অন্য কোনো ধারণা চার্চের শিক্ষার্থীদের শেখানো যাবে না। গ্যালিলিও বলেছেন চার্চের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য কিন্তু গাণিতিক বিকল্প হিসেবে সৌরকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের ধারণা শিখলেও খুব বেশী ক্ষতি নেই। তিনি নিশ্চিত করেই জানাচ্ছেন এটা বিকল্প একটি ধারণা মাত্র,এটার সত্যতা এখনও নিশ্চিত হয় নি। প্রথমবার অভিযুক্ত হওয়ার পর এই যুক্তিতে অভিযোগ থেকে অব্যহতি পেলেও ক্ষমতার পটপরিবর্তনে এবার গ্যালিলিও চার্চ অবমাননার অভিযোগে শাস্তি পেলেন- এবং গৃহবন্দী অবস্থায় ক্যাথলিক চার্চের ধারণায় অটল বিশ্বাস রেখেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম------যুগে যুগে শাস্তি পাওয়া লোকের সংখ্যাতো নেহাত কম নয়

আরাফাত শান্ত's picture


ফরহাদ মযাহার সাব বলে গেছেনঃ বিজ্ঞান চাই, বিজ্ঞানবাদীতা চাই না।
আমি অবশ্য বলি সব চাই, বিজ্ঞান চাই, বিজ্ঞানবাদীতা চাই, ধর্মও চাই, সামাজিক আচার রীতিনীতিও বহাল চাই! কেউ তো কারো দুশমন নয়।

জ্যোতি's picture


টিপ সই

sohelঅতিথি's picture


ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,