মাইনক্যা চিপা
বছর দশেক আগে যখন শহরের কেন্দ্র থেকে শহরের পরিধিতে জায়গা বদলের সিদ্ধান্ত নিলো শহর কতৃপক্ষ তখন এখানে ছোটো ছোটো টিলা আর জঙ্গলের বাইরে কোনো জনবসতি ছিলো না। জঙ্গল পরিস্কার করে টিলা ছেঁটে বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা বদলে করে এখানে স্থিতু হলেও শহরের কেন্দ্রে এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশিষ্টাংশ রয়ে গেছে। জনবসতিবিহীন এই জঙ্গলের কোনো নাম ছিলো না, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ জায়গার নাম ঠিক করেছে "কোণার মাঝখানে বসতি" আমি কিছুটা বদল বদল করে খাঁটি বাংলায় ডাকছি " মাইনক্যা চিপায়"। জায়গাটা দুটো আলাদা শাসনাঞ্চলের সংযোগস্থলে। সম্ভবত দুটো আলাদা শাসনাঞ্চলকে সংযুক্ত করা সড়কের বাইরে এখানে দীর্ঘদিন তেমন জনসমাগম ছিলো না। টিলা ছেঁটে বানানো বিশ্ববিদ্যালইয়ের ভবনগুলো বিভিন্ন মাপের ওভারব্রীজে সংযুক্ত। উত্তর ক্যাম্পাসে কলা ভবন, দক্ষিণ ক্যাম্পাসে বিজ্ঞান ভবন আর দুটোর মাঝের পাহাড়গুলোতে এডমিনিস্ট্রেশন ভবন। পাহাড়ের গা ঘেষে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে হয়তো বিজ্ঞানভবন থেকে এডমিনিস্ট্রেশন ভবনে যেতে ২০ মিনিট লাগবে কিন্তু ওভারব্রীজ দিয়ে পাহাড় আর খাল ডিঙালে মাত্র ১০ মিনিটেই সেখানে চলে যাওয়া যায়। এডমিনিস্ট্রেশন ভবন থেকে কলা ভবনে যেতে আরও ১০ মিনিট। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আবাসিক ভবনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যানে কাছাকাছি জনবসতিগুলোতে ভাড়াবাসার পরিমাণ বেড়েছে।
বহরে গতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান হলেও ছাত্র সংখ্যা দেশের যেকোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় কম। ছোটো বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০ ল্যাবরেটরী আছে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ের সকল শিক্ষার্থী গবেষণার সাথে জড়িত। স্নাতক পর্যায়ে ন্যুনতম ১ বছর আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ন্যুনতম ২ বছর গবেষণা না করলে ডিগ্রী পাওয়া যাবে না।
গতবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সাথে কথা হচ্ছিলো, যদিও তার ল্যাবরেটরীতে তখন ১৩ জন শিক্ষার্থী গবেষণা করছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পর্যাপ্ত গবেষণামঞ্জুরী পান নি । বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক এবং বিজ্ঞান অনুষদের ডিন তাকে বলেছেন "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়" অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং এটা "টিচিং ইউনিভার্সিটি", এখানে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে, গবেষণা এখানে বাহুল্য। মৌলিক দর্শণের তফাতটুকু পরিবেশে প্রকট।
দুই সপ্তাহ আগে এখানে গ্রাজুয়েট রিক্রুট ফেয়ার হলো, এক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন কোম্পানীর প্রতিনিধিরা এসে এখানকার সদ্যগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলেন। ক্লাশরুমে প্রজেক্টর লাগিয়ে, রঙচঙে ব্রোশিও বানিয়ে নিজেদের কোম্পানীর বিজ্ঞাপন করলেন তারা। শিক্ষার্থীরা মাছের বাজারে ঘোরার মতো সকালে এক কোম্পানী বিকেলে আরেক কোম্পানীর এইসব প্রেজেন্টেশন ঘুরে ঘুরে দেখলো। কতজন শেষ পর্যন্ত চাকুরি করার সিদ্ধান্ত নিলো এখনও সে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয় নি।
নানাবিধ কারণে এই দেশের লোকজন সন্তান লালন পালন করতে আগ্রহী না। সরকার বিভিন্ন ধরনের উস্কানীমূলক প্রলোভন দিলেও কতিপয় দেশপ্রেমিক নাগরিক একাই ৪-৫টা বাচ্চা নিয়েও জনসংখ্যার ক্রমাবনতি প্রতিরোধ করতে পারছে না। আর ২০ বছর পরে দেশটার মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অবসরে যাবে, কোম্পানীগুলোর চাহিদা মেটানোর মতো ওয়ার্ক ফোর্স নেই। তারা বিভিন্নভাবে কর্মী সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিদেশী কর্মী আমদানী, অটোমোশন কিংবা অবসরের বয়েসসীমা বাড়ানো- সংকট এড়াতে এসব মিলিয়ে একটা কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশটাকে।
জনবসতির আশে পাশে কোনো সুন্দর অমলিন প্রকৃতি নেই, সম্ভবত পরিমিত পরিচর্যায় সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকৃতিকে উপস্থাপন করাটা বর্তমানের নগরস্থাপনার নীতি । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে নতুন ভবন উঠছে, গাছ কেটে পাহাড় ছেঁটে নতুন ভবন নির্মাণ করলেও নগরকতৃপক্ষ কিংবা নির্মাতা সংস্থাগুলো পাহাড় পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটায়। কংক্রীট দেয়াল দিয়ে ছোটো ছোটো টিলা বাঁধাই করছে, সেখানে নাইলনের জাল বিছিয়ে ঘাস লাগাচ্ছে, কংক্রীটের দেয়ালের মাঝ দিয়ে ছোটো ছোটো পরিকল্পিত ড্রেন যেনো বৃষ্টির পানি বিনা বাধায় নেমে যেতে পারে, প্রথমবার যখন পাহাড়ে কংক্রীটের ঢালাই দেখলাম কিছুটা অবাক হয়েছিলাম, আমরা বাংলাদেশের মানুষ, কাঁচের প্লেট বানানোর জন্যে আমরা পাহাড় কেটে পুকুর বানাচ্ছি নেত্রকোণায়, খাগড়াছড়িতে পাহাড় কেটে ব্যক্তিগত বাংলো বানাচ্ছি, চট্টগ্রামে প্রতি বর্ষায় পাহাড় ধ্বসে ১০জন ২০ জন মারা যাচ্ছে, মাননীয় ডিসি গাছে বিপদজনক, অবৈধ বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২০ বছরে বনভুমি, জলাভুমি আর টিলাগুলো সরকারের খাসজমির বদলে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে এবং ব্যক্তিমালিকানার হার প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, আর এখানে লোকজন বোকার মতো পাহাড়ের ঢালে কংক্রীট জমাচ্ছে। অভিযাত্রী দল এভারেস্ট বিজয় বিষয়টাকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে গ্রহন করার পর থেকে এত এত লোকজন বিভিন্ন পথে এভারেস্টে ওঠার প্রতিযোগিতা করছে। অভিযাত্রীদের হাগু বরফে জমে গেছে। আর কয়েক বছর পর গ্লোবাল ওয়ার্মিং একটু তেতে উঠলে ফটোগ্রাফারকে নাকে হাত দিয়ে এভারেস্টের ছবি তুলতে হবে।
পাথুরে পাহাড়ী এলাকা বলে এখানে ছোটো বড় ১৫টার মতো নদী আছে, সবগুলো নদী গিয়ে জাপান সমুদ্রে পরেছে। শরৎ আর শীতে নদীর বহর খুব বড় না, আড়াআড়ি হয়তো একশ দেড়শো গজ হবে, সে নদীর উপরে দুই কিলোমিটার ব্রীজ বানিয়ে বসে আছে এরা। নদীর প্রস্থের ৫ গুন এলাকা খালি রেখে কংক্রীট স্ল্যাব বসিয়েছে। সামনে ঘোর বর্ষায় ভরা নদীর প্রস্থ দেখে বুঝতে হবে এত জায়গা অপচয়ের প্রয়োজন কি ছিলো? ওদের কি বসুন্ধরা ইস্ট ওয়েস্ট মধুমতি মডেল টাউন বানানোর মতো উদ্যোক্তা নেই?





আমরা বানাই ভার্সিটির নামে কোচিং সেন্টার, আর ওরা বানায় ল্যাব- লাইব্রেরী
পড়ছি, পরের পর্বের অপেক্ষায়
মন্তব্য করুন