সাম্প্রতিক ভাবনা
স্টিফেন হকিং বলেছেন ঈশ্বর নেই-
হকিং বললেন ঈশ্বর নেই- কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকায় এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো।
হকিং বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তার মেধা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই, তার প্রেম, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনরায় বিবাহ- সবই সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। রানী এলিজাবেথ, প্রিন্স চার্লস এবং তার পূত্র হ্যারি যেমন সেলিব্রিটি- টম ক্রুজ, জেনিফার লোপেজ যেমন সেলিব্রিটি- বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার বিনোদন পাতায় তিন খান, দিপীকা পাডুকোন এবং অন্যান্য হিন্দি ছবির নায়িকারা যেমন সেলিব্রিটি , ব্রায়ান গ্রীন, স্টিফেন হকিং সেলিব্রিটি বিজ্ঞানী। তাদের হাঁটা-চলা সবই সাংবাদিকদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, তারা যা বলেন, যা করেন, যা পড়েন এবং পরেন- সবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে জনসাধারনের সামনে উপস্থাপিত হয়। সুতরাং হকিং বলেছেন ঈশ্বর নেই সেটা গার্ডিয়ান পত্রিকা গুরুত্বের সাথে সংবাদে উপস্থাপন করেছে, বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো তেমনই অনলাইন ঘেঁটে এই সংবাদ পাঠকদের জন্যে উপস্থাপন করেছে।
হকিং ব্যক্তিগত জীবনে ঈশ্বর অবিশ্বাসী, তার কাছে ঈশ্বর নামক ধারণাটা গুরুত্বহীন, সুতরাং এই বিষয়টা সংবাদ শিরোণাম হওয়ার কিছু নেই। তবে গত ৫০ বছরে মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, দুরবীক্ষণে মহাকাশ দেখে, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাটা আরও স্পষ্ট হয়েছে, তবে সকল প্রশ্ন, সকল কৌতুহলের চুড়ান্ত মীমাংসা এখনও হয় নি। আমাদের বর্তমান পর্যবেক্ষণ মোটা দাগে নিশ্চিত করেছে ১৩০০ থেকে ২৫০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং এ মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিলো। স্টিফেন হকিং তার ব্রিফ হিস্টোরি অফ টাইমে এই বিষয়ে সাধারন পাঠকদের জন্যে বিস্তারিত লিখেছেন। তারপর মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে, মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হতে হতে বিলীন হয়ে যাবে না কি কোনো এক সময় মহাবিশ্বের প্রসারণ থেমে গিয়ে আবার মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে শুরু করবে নিশ্চিত বলা যায় না।
ফ্রিডম্যান ১৯২১ সালে আইনস্টাইনের সমীকরণ সমাধান করার সময় অনুমাণ করেছিলেন মহাবিশ্বের গঠন সুষম, যেভাবেই দেখি না কেনো মহাবিশ্বকে সব দিক থেকে একই রকম লাগবে। আমরা খোলা চোখে আকাশ দেখলে যেভাবে যেভাবে আকাশের কোনো নির্দিষ্ট একটি অংশে বেশী নক্ষত্র দেখি আর কোনো একটি অংশ নক্ষত্রশূণ্য- মহাবিশ্ব মোটেও তেমন না। গত ২০ বছরে দুটো আলাদা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত জানাচ্ছেন মহাবিশ্বের তাপমাত্রা সব দিকেই সমান, একটি অংশ থেকে অন্য অংশের তাপমাত্রার তফাত এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ। কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কিলোমিটার বিস্তৃত মহাবিশ্বের প্রতিটি অংশের তাপমাত্রা সমান- তথ্যটা আমজনতার জন্যে তেমন অবাক করা না, তবে যারা বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করছে তারা তাপমাত্রার সুষমতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনুমাণ করছে সুদুর অতীতে, মহাবিশ্বের বয়েস যখন এক সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ কিংবা তারও কম ছিলো তখন মহাবিশ্ব হঠাৎ করেই সম্প্রসারিত হয়েছিলো- সেই সম্প্রসারণের ফলে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা এমন সুষম, এমন ব্যপক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা না করলে বর্তমান মহাবিশ্বের তাপমাত্রার সুষমতা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
কেনো মহাবিশ্বের উৎপত্তি হলো, কেনো মহাবিশ্ব নির্দিষ্ট সে সময়েই প্রসারিত হলো, কেনো মহাবিশ্বের ধরণটা এমন? প্রযুক্তি আমাদের পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা এবং সীমানা দুটোই বহুগুণ বাড়িয়েছে, আমরা অনেক বেশী তথ্য সংগ্রহ করেছি, তথ্য বিশ্লেষণা আমাদের দক্ষতা বেড়েছে কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের অজ্ঞানতাও বেড়েছে। নতুন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করছে আমরা এখনও অনেক কিছুই জানি না। আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনেকটাই অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে হাঁটার মতো, যতটুকু আলোকিত হচ্ছে, সেই আলোকিত অংশের সীমানার বাইরের সবটুকুই আমরা অনুমাণ করছি, সে অনুমাণের সত্যতা নিশ্চিত বলা কঠিন। প্রযুক্তি আমাদের আলোকিত অংশটুকু প্রসারিত করছে তবে সবটুকুই আলোয় উদ্ভাসিত এমনটা দাবী করা মুর্খতা।
কেনো বিগব্যাং হলো, কিভাবে বিগব্যাং হলো, মহাবিশ্বের সূচনার ঠিক আগে কিংবা এক সেকেন্ডের লক্ষ কোটি ভাগের একভাগ সময় পরে আসলে কি ঘটেছিলো আমরা জানি না, কিন্তু সেই সময়ে যা কিছু ঘটেছে, প্রায় ১৪ শত কোটি বছর পর এবং আরও পরবর্তী অন্তত ১৪ শত কোটি বছর পর্যন্ত মহাবিশ্ব যেভাবে প্রসারিত, বিকশিত , সংকুচিত হবে সবটুকু নিয়ন্ত্রন করছে। সে সময়ে বিভিন্ন অনুপাতে আণুবীক্ষনিক পরিবর্তন মহাবিশ্বের সাম্ভাব্য ভবিষ্যত বদলে দিতে পারতো- কিন্তু তেমনটা হয় নি। আমরা প্রাণধারণ এবং প্রাণবিস্তারণের সক্ষম একটি মহাবিশ্বে বসবাস করছি, মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে এমন অসংখ্য প্রাণধারণে সক্ষম গ্রহের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করছি। হকিং ব্রিফ হিস্টোরি অফ টাইমে লিখেছিলেন সম্ভবত কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী ভবিষ্যতে এমন প্রশ্ন করবে বলেই মহাবিশ্ব এভাবে বিকশিত হয়েছে- কিন্তু যেকোনো গবেষকের জন্যে এমন অনুমাণ অসস্তিকর। প্রকারান্তরে ঈশ্বরের অভিপ্রায় কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তির অস্তিত্ব মেনে নেওয়া, বোধগম্যতার অতীত কোনো ধারণাকে প্রশ্রয় দেওয়া এই অনুমাণ গবেষকদের গলার কাঁটা হয়ে ছিলো দীর্ঘদিন। ২০১০ সালে হকিং যখন দি গ্রান্ড ডিজাইন প্রকাশ করলেন, তিনি সেখানে অনুমাণ করেছেন ঈশ্বর ধারণা কিংবা বোধগম্যতার অতীত কোনো ধারণাকে আশ্রয় না করেও মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং বিকাশ ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
নক্ষত্রের মৃত্যু কোনো নক্ষত্রই মরে যায় না, বরং মৃত নক্ষত্রের শব থেকে নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়- তবে প্রথম নক্ষত্রের মৃত্যু মহাবিশ্বের প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীতে যেসব প্রাণ বিকশিত হয়েছে কার্বন তাদের মূল গাঠনিক উপাদান, কার্বন- হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, সালফার , ফসফরাস পৃথিবীর অধিকাংশ জীবের ৯৯% এই কয়েকটা পরমাণু দিয়ে তৈরী। দুরবীক্ষণ পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করছে মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে এমোনিয়ার অস্তিত্ব আছে। প্রাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রোটিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এমোনিয়া।
মহাবিশ্বের সূচনা কিংবা পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা কখন কিভাবে হয়েছিলো আমরা এখনও নিশ্চিত জানি না। নিয়মতান্ত্রিক গবেষণায় প্রতিটি আলাদা তথ্যসূত্র যাচাই করে, ডিএনএ এর প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাংশের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে জীবের ক্ষেত্রে কেনো সেই ক্ষুদ্র উপাংশের উপস্থিতি প্রয়োজনীয় আমরা সেটুকু নির্ধারণ করতে পারি। প্রতিটি ক্ষুদ্র উপাংশ কিভাবে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে বিশাল ডিএনএ কাঠামো তৈরী করে, তাপমাত্রা এবং অন্যান্য পরিপার্শ্বিকতার প্রভাবে এই কাঠামোগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয় আমরা সেসকল প্রক্রিয়া উদ্ঘাটন করতে পারি। অনুকূল পরিবেশে এমোনিয়া, পানি, কার্বন ডাই অক্সাইড, পানিতে দ্রবীভুত সালফার ডাই অক্সাইড কিংবা অন্যান্য যৌগ পরস্পরের সাথে বিক্রিয়া করে জৈব অণু তৈরী করতে পারে। অজৈব অণু-পরমাণু থেকে জৈব অণু তৈরীর জন্যে অলৌকিক "লাইফ ফোর্স" এর কোনো প্রয়োজন নেই। এক কোষীয় কিংবা বহুকোষীয় প্রাণী প্রাকৃতিক উপযোগ থেকে পুষ্টি( প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহ করে) গ্রহন করে প্রায় নির্ভুল ভাবে অসংখ্য জৈব অণুর প্রতিলিপি তৈরী করতে পারে। সেসব জৈব অণু পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে শরীরে শক্তির জোগান দেয়, শরীরের ক্ষত নিরাময় করে, শরীরের জীবাণু সংক্রামণের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়।
নক্ষত্রের বিস্ফোরণে নক্ষত্রের কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পরা কার্বন, সালফার, ফসফরাস কোথায় কিভাবে সংযুক্ত হয়ে নিজের অবিকল প্রতিলিপি নির্মাণে সক্ষম অণু গঠন করেছিলো আমরা এখনও নিশ্চিত বলতে পারি না, কিন্তু নিজের অবিকল প্রতিলিপি তৈরী করতে দক্ষ এমন অণুসংগঠন থেকে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী বিকশিত হয়েছে, অসংখ্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন অসংখ্য প্রাণী বিকশিত এবং বিলুপ্ত হবে।
ব্যক্তিগত জীবনে ঈশ্বর অবিশ্বাসী হকিং যখন বলেন ঈশ্বর নেই,যখন তিনি স্বর্গ-নরকের ধারণাকে পৌরাণিক শিশুতোষ বিশ্বাস বলেন, সে বক্তব্য কেনো সংবাদ শিরোণাম হয়ে উঠে? এমন না যে স্টিফেন হকিং পৃথিবীর বুকে প্রথম ব্যক্তি যিনি এমন নিশ্চিত স্বরে ঈশ্বরের অনস্তিত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখলেন, ধর্মের আনুষ্ঠানিক সূচনার সময় থেকেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রশ্নে এমন বিতর্ক সভ্যতায় ছিলো। প্রকৃতিবাদী দার্শণিক, বিজ্ঞানী এবং ঈশ্বরবাদী দার্শণিক-বিজ্ঞানীদের বিতর্ক বিবাদ সভ্যতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অসীম ক্ষমতাধর অলৌকিক অস্তিত্বের স্পষ্ট হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণেই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা সম্ভব ধারণাটা আরও আড়াই বছর আগে থেকেই অন্তত পৃথিবীতে বিদ্যমান। যারা মহাবিশ্ব এবং প্রাণকে অলৌকিক বিস্ময় অনুমাণ করতে চায়- তারাও নিজের মতো যুক্তি সাজিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। শুধুমাত্র মহাবিশ্বের বিকাশ এবং পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ব্যাখ্যার জন্যেই শুধুমাত্র ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণা মেনে নেওয়া প্রয়োজনে এমন না, বরং ঈশ্বর ধারণার সামাজিক প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন ইশ্বরবাদী দার্শণিকেরা।
উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যখন ইউরোপের দার্শণিক এবং বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিকে গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করছেন, সকল অলৌকিকতা, কুসংস্কার থেকে জ্ঞানকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, সে সময়ে বিবর্তনবাদের ভ্রূণ জন্মেছে। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হার্বার্ট স্পেনসার, চার্লস ডারউইন, আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, হাক্সলে, ডালটন হুকার, চার্লস লিয়েল বিবর্তনবাদ সম্প্রসারণের ভূমিকা রেখেছেন।
গ্রহ-নক্ষত্র- প্রাণ সবই বিবর্তিত হয়, সময়ে আঁচড় রেখে যায়। যারা পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে বদলে নিতে পারে, নতুন পৃথিবীতে তারাই টিকে থাকে- মোটা দাগে বিবর্তনবাদের ধারণাটা এমনই। ভূ প্রাকৃতিক পরিবর্তন, প্রাণী ও উদ্ভিদের বিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক সংস্কার, প্রথা কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের বিবর্তনের ধারা পর্যালোচনার মাধ্যমে এন্থ্রোপলোজিক্যাল এভ্যুলুশন এর ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন সে সময়ের গবেষকেরা। উঠতি মধ্যবিত্তের বাজার ধরতে ব্যাগ্র প্রকাশকেরা পাঠকের আগ্রহ বিবেচনা করে এক দিকে যেমন বিবর্তনের ধারণাসম্পর্কিত বিভিন্ন পুস্তিকা প্রকাশ করছেন, উঠতি মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিকদের নৈতিকতা এবং মানসকাঠামো এই ধরণের বস্তুবাদীতার কলুষমুক্ত রাখতে যাজকেরাও বিজ্ঞানচর্চায় কলম ধরেছেন, শিশু ও নারীদের উপযোগী সহজপাচ্য বিজ্ঞানের বই লিখছেন মূলত নারী বিজ্ঞান লেখকেরা। বিজ্ঞান চর্চার ছদ্মবেশে এইসব যাজক-নারী বিজ্ঞান লেখকেরা আসলে কথার মারপ্যাঁচে ঈশ্বরের ধারণা গেঁথে দিচ্ছে পাঠকদের মানসে- থমাস হাক্সলের উদ্যোগে গঠিত এক্স ক্লাবের সদস্যরা এমনটাই ভাবতেন। জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকিগুলো যেনো এই ধরণের ছদ্মবিজ্ঞানচর্চার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। এক্স ক্লাবের সক্রিয় সদস্য এবং তাদের শিষ্যরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন সক্রিয় গবেষকদের বাইরে এইসব আধাপেশাদার বিজ্ঞান লেখকেরা বিজ্ঞান ধারণার বিকাশের চেয়ে বিজ্ঞান ধারণাকে কলুষিত করছে বেশী।
প্রতিরোধের ধরণটা কেমন হবে? সেক্যুলার আন্দোলন আদতে চার্চবিরোধী, ধর্মবিরোধী আন্দোলন হবে না কি শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের তথ্য বিশ্লেষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে অপেশাদার- আধাপেশাদার বিজ্ঞান লেখকদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধী আন্দোলন হবে এ নিয়ে সে সময়ের একটিভিস্টদের ভেতরেও মতানৈক্য ছিলো। কট্টর সেক্যুলারিস্ট একটিভিস্ট কাগজ-কলম জনবল নিয়ে ধর্মবিরোধী ক্রুসেড শুরু করেছে- অন্য দিকে মডারেট সেক্যুলারিস্টরা এমন কট্টর সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলছে ধর্ম নামক অনুশাসনটা বিজ্ঞান চর্চার জন্যে অপ্রয়োজনীয় কিন্তু এটার সামাজিক গুরুত্ব আছে। ধর্ম যেসব সামাজিক নৈতিকতা নির্মাণ করে সমাজে এই ধরনের নৈতিকতা কাঠামোর প্রয়োজন আছে।
বিবর্তনবাদের বিকাশের সাথে সাথে বিবর্তনবাদের প্রভাবে সামাজিক কাঠামোর ভেতরে যেসব ছোটো বড় ঢেউ উঠেছিলো সেসবের ইতিহাস পর্যালোচনাও আকর্ষনীয় পাঠ্য হতে পারে। সব সময়ই সমাজের ভেতরে ঈশ্বর ধারণার পক্ষে বিপক্ষে, একেশ্বরবাদী পক্ষের সাথে বহুঈশ্বরবাদী পক্ষের বাদ বিবাদে, জঙ্গীবাদী ঈশ্বরভক্ত এবং জঙ্গী নিরীশ্বরবাদী ভক্তের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে। তাদের মানসিক, দার্শণিক এবং শাররীক সংঘাত নির্দিষ্ট একটি সমাজে সর্বমত গ্রহনযোগ্যতার প্রেক্ষাপট তৈরী করেছে। বর্তমানের বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখে নিশ্চিত বলা যায় অন্তত এই সময়ে একেশ্বরবাদী মতাদর্শিক জঙ্গীবাদের সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা বেশী, এখানে ডাক্তার- হবু ডাক্তারেরা বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করে না, এখানে প্রকৌশলী যন্ত্র নষ্ট হলে পীরের দরগায় সুতো বেধে আসে, এমন অদ্ভুতুড়ে দেশে কোনোমতে প্রাণ টিকিয়ে রাখা সেক্যুলারিস্ট জঙ্গী নিরীশ্বরবাদের ভক্ত হয়ে উঠতে পারছে না।
যখন এই দেশে দৈনিকে শিরোণাম হয় হকিং বলেছেন ঈশ্বর নেই, স্বর্গ নরক শিশুতোষ গল্প, তখন সম্পাদক কিসের আশায় এই সংবাদ প্রকাশ করেন? হুজুরে কেবলা হাটহাজারী সংবাদ সম্মেলন করে বলবে স্টিফেন হকিং এর মাথার দাম ৫১ হাজার ১ টাকা ধার্য করা হলো- তারা কি এই দিনের অপেক্ষায় আছেন?





পত্রিকার বিক্রি বাড়াতে বাংলাদেশে অন্তত এই শিরোনামের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই
ভাগ্য ভালো যে হকিং বাংলাদেশে জন্মাননি নইলে এতদিনে রাস্তায় খুন হয়ে পড়ে থাকত
সম্পাদক মনে হয় তেঁতুল হুজুরের কাছ থেকে একটা দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচী চায়
মন্তব্য করুন