ইউজার লগইন

বর্তমানের ভাবনা ১

হঠাৎ করেই সমাজে জঙ্গীবাদ, পরধর্মঅসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি বিস্তৃত হয় না। মানববৈরী মানসিকতা সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা পেতে দীর্ঘ প্রস্তুতিকালীন সময়ের প্রয়োজন হয়।

ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধ উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলনের প্রধান স্বর ছিলো। আমরা অন্তত ৫ প্রজন্ম ধরে অমুসলিম প্রতিবেশীদের প্রতি ঘৃণার সংস্কৃতির চর্চা করেছি। আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অন্যতম প্রতিবন্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছি তাদের, তাদের শিক্ষানুরাগ, তাদের কৃষ্টিলগ্নতা আমাদের ঘৃণা উস্কে দিয়েছে।

আমাদের রক্ষনশীল সমাজ ব্যবস্থায় কাব্যানুরাগ, নাট্যানুরাগ কিংবা সংগীতচর্চার সহজ প্রতিশব্দ ছিলো চারিত্রিক স্খলন। কবি, উপন্যাসিক, গায়ক-গায়িকা, অভিনয়শিল্পীদের শিল্পকুশলতা খুব কম সময়ই আমাদের নিত্যদিনের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়েছে, আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো তাদের যৌনজীবন।

আমরা যখন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধকে আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রধান স্বর চিহ্নিত করলাম আমাদের যাবতীয় রোষ এবং ঘৃণাচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠলো অভিবাসী, উপজাতি নির্বিশেষে সকল অবাঙালী মানুষ।

আমরা শত বছরের ধারাবাহিক চর্চায় এমন একটা সমাজ নির্মাণ করেছিলাম সে সমাজটা মোটা দাগে অমুসলমান, অবাঙালী সবাইকে সমাপ মাপে ঘৃণা করে। মুক্তিযুদ্ধের অমানবিক নৃশংসতা আমাদের জিঘাংসার বোধ স্তম্ভিত করতে পারে নি। সকল মানুষের সমান মর্যাদা, সমান অধিকারের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভুলতে খুব বেশী সময় লাগে নি আমাদের।

স্বার্থপর, স্বজনতোষী রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার কারণে অসংখ্য রাজনৈতিক বাটপারকে আমরা আমাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা, অযোগ্যতা আড়াল করতে এইসব রাজনৈতিক বাটপার অসংখ্য অপরাধীকে স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে এনেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর জেলা উপজেলা কার্যালয় অভিজ্ঞ জেলখাটা কয়েদীদের বিশ্রামাগারে পরিণত হয়েছে।

তোষণ এবং চাটুকারিতা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সহজ পন্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে আত্মমর্যাদাবোধ গোয়ার্তুমি কিংবা অপ্রয়োজনীয় চারিত্রিক বিলাসিতা গণ্য হয়। ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য, বঞ্চনা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের সহমর্মিতাবোধ, পারস্পরিক সংস্কৃতি এবং জীবনচর্চার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অনুভুতি ধ্বংস করে ফেলে।
জনবিচ্ছিন্ন আদর্শবিহীন রাজনীতি জনকল্যানের পথ ভুলে প্রতিনিয়ত পারস্পরিক ঘৃণা উৎপাদনের কৌশল খুঁজে।

সকল ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে যে রাষ্ট্র তার পথ চলা শুরু করেছিলো, ধর্ম সে রাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্র। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ২০০৯ সালের শুরুতে ব্লগার- অনলাইন এক্টিভিস্টরা একটা সংবাদ সম্মেলন করেছিলো। সেই সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে " রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে" দাবীটার বিরোধিতা করেছিলেন অসংখ্য সহব্লগার।

কেনো রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা উচিত- সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কোনো আলোচনা হয় নি। শাহবাগ আন্দোলনের শুরুর দিকে যখন রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করার ছোটো একটা স্বর তৈরী হয়েছিলো একই মানুষগুলো এই দাবীর বিরোধিতা করেছে। তাদের আপত্তির প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবী প্রতিস্থাপন করা হয়েছিলো। "সকল রাজনৈতিক দল" নিষিদ্ধের দাবীটা "জামায়াত ই ইসলামী" নিষিদ্ধের দাবীতে পরিণত হলো যেনো নেজামে ইসলামী, মুসলীম লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সপক্ষ শক্তি ছিলো।

রাষ্ট্র ইহজাগতিক প্রতিষ্ঠান। একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক পরিসরে বসবাস করা সকল মানুষের জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড রাষ্ট্রের নীতি এবং রাষ্ট্রের প্রস্তাবিত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রের ভুল নীতি অনুসরণের ভুক্তভোগী হয় রাষ্ট্রের সকল নাগরিক।ইহজাগতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্যে আইন প্রণয়ন করবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় বিবেচনা হবে সকল মানুষের সমান মর্যাদার দাবী প্রতিষ্ঠা করা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কিংবা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অবশ্যপালনীয় শর্তে পরিণত হলে রাষ্ট্রের কর্মকান্ডে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায়। সংখ্যাগুরুর অনুভুতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠা রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বিবেচিত হয়-
রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধের দাবী উত্থাপনের পেছনে এর বাইরে অন্য কোনো ষড়যন্ত্রমূলক মনোভাবের উপস্থিতি ছিলো না। আমার ধারণা একাত্তরের চেতনায় উদ্ভাসিত সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধানতম শর্ত রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা।

রাজশাহীর বাগমারায় জেএমবির ব্যানারে ধর্মনীতির ঝান্ডা তুলে অসংখ্য সাধারণ মানুষের উপরে নৃশংসতার চর্চা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যে ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে, দিলকুশায় বলাকা ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশের রাস্তায় স্থাপিত বাউল ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা হয়েছে-
একই সময়ে বিভিন্ন পূজামন্ডপে প্রতিমা ভাঙচুড় হয়েছে এবং প্রতিবছর এই ধরণের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পূজামন্ডপের সংখ্যা বাড়ছে।

রাষ্ট্র স্পষ্টতই ধর্মীয় সন্ত্রাস কিংবা সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় আগ্রাসনের প্রতিরোধে অনাগ্রহী- তারা স্পষ্ট বৈষম্যের পরিস্থিতি বজায় রেখে একাত্তরের চেতনায় রাষ্ট্র নির্মাণের মাদক বিক্রী করছেন।

সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভুতিকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারনী বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত পূনবিবেচনা করার প্রবনতা বন্ধ করতে হবে,

রাষ্ট্র দম্পতিদের বিবাহনিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন নাগরিক পারস্পরিক সম্মতিতে যৌথজীবন যাপন করতে পারবেন, বিবাহইচ্ছুক নাগরিকদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস তাদের বিবাহনিবন্ধনে প্রতিবন্ধকতা হতে পারবে না, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্যে সিভিল ম্যারেজ এক্ট প্রণয়ন করতে হবে,

স্থানীয় প্রশাসনের পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ওয়াজ মহফিল অনুষ্ঠিত হবে না, ওয়াজ মহফিলের সময় সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং ওয়াজ মহফিলে কোনো বক্তাই ভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতির অনুসারী কোনো ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে কটুক্তি করতে পারবে না কিংবা কোনো ঘৃণামূলক বাক্য ব্যবহার করতে পারবে না- এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে

রাষ্ট্র সকল নাগরিকের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহন করবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা আলিয়া ও ক্বাওমী মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রম সংশোধন করে যেনো রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের একই পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহন করতে পারে এমন পরিস্থিতি তৈরী করতে হবে

ছয় বছর আগে যখন এইসব দাবী উত্থাপন করেছিলাম তখন ধর্মভিত্তিক জঙ্গীবাদ এতটা বিস্তৃত হয় নি। আমাদের দীর্ঘদিনের চর্চিত ধর্মীয় ঘৃণার সংস্কৃতি সহিংস হয়ে উঠে নি। এখন পরিস্থিতির প্রচন্ড অবনতি হয়েছে তারপরও আমি বিশ্বাস করি এই ধর্মীয় জঙ্গীবাদ, ঘৃণা এবং জিঘাংসার সংস্কৃতি প্রতিহত করা সম্ভব।

শুধুমাত্র জামায়াত ই ইসলামী ধর্মীয় জঙ্গীবাদের পৃষ্টপোষক এবং মদতদাতা এই জনপ্রিয় ধারণা ত্যাগ করে আমাদের প্রথমে মেনে নিতে হবে আমাদের সকল ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলই ধর্মীয় জঙ্গীবাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ পৃষ্টপোষক। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, মানববৈরী পরিস্থিতি নির্মাণ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের অপকৌশলমাত্র।

মসজিদের ইমাম নিয়োগ করতে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন লাগবে। মসজিদ কমিটির বদলে ইমামের বেতন ভাতা নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র।

পরবর্তী ৬ মাস বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদের শুক্রবারের বয়ান লিপিবদ্ধ করবে স্থানীয় প্রশাসন, সেইসব বয়ান পর্যালোচনা করে বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুপারিশক্রমে ধর্মীয় ঘৃণা এবং ধর্মীয় সহিংসতার প্রনোদনা দেওয়া প্রতিটি ইমামকে বরখাস্ত করা হবে এবং অন্যান্য ইমামদের খুৎবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু সৎপরামর্শ দেওয়া হবে। তাদের মুসলিম ভাতৃত্ববোধের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ধোঁয়াশা ভুলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভুতিশীল হতে অনুরোধ করতে হবে।

আমরা জঙ্গীবাদের যে পর্যায়ে পৌঁছেছি রাষ্ট্র তার আইন শৃঙ্খলারক্ষীবাহিনীর সহযোগিতায় ধর্মীয় জঙ্গীবাদ প্রতিহত করতে পারবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সহযোগিতা ছাড়া এই সামষ্টিক অধঃপতন প্রতিহত করা অসম্ভব । রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে। নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে সুরক্ষা এবং নাগরিক মর্যাদা পেলে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ হবে।
রাষ্ট্রের সামনে সেক্যুলার হয়ে ওঠা ভিন্ন অন্য কোনো পথ খোলা নেই এখন।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.