পরীক্ষা
আমি সব সময়ই মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম। ক্লাশের শেষ ব্রেঞ্চে বসে অন্য সব অমনোযোগী ছাত্রদের বিভিন্ন ধরণের কায়দাকেতা দেখে প্রতিনিয়ত বিস্মিত এবং মুগ্ধ হতাম। পরীক্ষার আগের রাতে নাক-মুখ গুঁজে বইয়ের পাতা উল্টানোর সময় ক্লাশে প্রথম হয়ে সবাইকে চমকে দেওয়ার অলীক ভাবনা মাথায় আসতো না, কোনোমতে ৫৫ থেকে ৬০ পেলেই আমি খুশি। আমার পরীক্ষাময় জীবন সব সময়ই প্রথম শ্রেণীর নম্বর পেয়ে পরবর্তী ক্লাশে উত্ত্বীর্ণ হয়ে মাণ-সম্মান বাঁচানোর লড়াই।এভাবেই হেলতে দুলতে যখন এইচএসসি পাশ করলাম, ভালো ছাত্রেরা সবাই বুয়েট- মেডিক্যাল কোচিং করে ভীষণ রকম ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছে। আমার যেহেতু এত বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস নেই, আমার লক্ষ্য কোনোমতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।
অলস- অমেধাবী মাঝারি মানের ছাত্র হিসেবে গাইড বই খুলে বিভিন্ন রকম হিসেব কষে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ভর্তি পরীক্ষায় ৬০ পেলেই হবে। সারা জীবন ৫৫ থেকে ৬০ এর লড়াই করে অভিজ্ঞ আমি তেমন দুর্ভাবনায় ভুগি নি এটা নিয়ে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দেই, তখন ৪ বিষয়ে ২৫ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হতো, লক্ষ্য যেহেতু ৬০ প্রথমেই জীববিজ্ঞান পড়ার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিলাম। পরিশ্রম করলে ৭৫ নম্বরের ভেতরে ৬০ পাওয়া খুব সম্ভব।
আমার সে সময়ের জীবনযাপনধারা সকাল ১০টায় কলেজ যাওয়া, বিকেলে বাসায় ফিরে খেয়ে খেলতে যাওয়া, খেলা শেষে ৩-৪টা আলাদা গ্রুপে আড্ডা দিয়ে রাত ১১টায় বাসায় ফিরে একটু আধটু বই পড়া। এই সময়েই হঠাৎ এক জনের সাথে পরিচয় হলো। তার নাম মনে নেই। আমাকে ডেকে বললো তোমার নাম কি? তুমি তো হাসু খালদুদের সাথে আড্ডা দাও। তোমাকে ওদের সাথে দেখছি আমি। অল্প বিস্তর আলোচনার পর জানলাম, সে প্রেম করে বিয়ে করে ফেলছে। বাসার লোকজন মেনেও নিয়েছে। কোনো একদিন তার বৌয়ের সাথে অন্য এক ছেলেকে কথা বলতে দেখে তার মাথা গরম হয়ে যায়, তার জবানীতে " আমার তখন মাথা ঠিক নাই, কোপায়া পোলাটাকে দুই অর্ধেক করে ফেললাম। অবশ্য এখন সীমাংসা হয়ে গেছে, ঐ ছেলের ফ্যামিলিকে ৪ লাখ টাকা দিছি।"
প্রাক তারুণ্যের আবেগে বিভিন্ন মহল্লার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ছাদে কিংবা বাগানে হেঁটে চলে বেড়ানো মেয়েদের ভেতরে কোনো সময় তার স্ত্রীকে দেখে প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সময় তাকিয়ে থাকা যাবে না। সমস্যা হলো তার স্ত্রীকে আমি চিনি না। চিন্তা ভাবনা করে দেখলাম ওরা যে মহল্লায় থাকে, ঐ মহল্লায় আমার তেমন যাতায়ত নাই, তবে পরবর্তীতে কোনো সময় সেই মহল্লার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ভুলেও কোনো মেয়ের দিকে তাকানো যাবে না।
ভর্তিপরীক্ষায় কোনো মতে ৫৭ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম। দ্বিতীয় পছন্দ ছিলো ফিজিক্স তবে ভর্তি হতে হলো ভূতত্ত্ব বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ভবিষ্যতের মেধাবী ছাত্র হিসেবে মফঃস্বল শহরে যখন ফিরলাম, এক বন্ধু বললো, তোমার রেজাল্ট শুনে ভালো লাগলো মামা। তুমি তো এখন আর আমাদের মনে রাখবা না। তোমার নতুন নতুন বন্ধু হবে, তুমি ঢাকা শহরের মায়ায় আটকা পরবা। সময় পাইলে দিনাজপুর আসিও। চা সিগারেটের দাম আমি দিবো, তোমার ঐটা নিয়া চিন্তা করতে হবে না।
এর ভেতরেই খবর আসলো আবার ঢাকা যেতে হবে বিভাগ পরিবর্তনের জন্যে। দুপুর পর্যন্ত বাজীতে তাস খেলে, বাজীর টাকায় হোটেলে খেয়ে বিকেলের ট্রেনে ওঠার সময় আক্ষরিক অর্থেই পাছায় লাথি মেরে আমাকে বিদায় জানালো বন্ধুরা। ভূতত্ত্ববিভাগের বারান্দায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধুদের সাথে পরিচয় হলো। আমি তখনও বিভাগ পরিবর্তনের নিয়ম জানি না। এই ডিপার্টমেন্টের অফিস থেকে কাগজ তুলে অন্য ডিপার্টমেন্টের অফিসে দিতে হবে- অন্য ডিপার্টমেন্ট কাগজটা পেলে সে ছাত্রকে নিজেদের বিভাগের ছাত্র হিসেবে ক্লাশ করার অনুমতি দিবে। এক টুকরো কাগজ মাত্র ২৫ গজ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পারি দিতে হবে কেনো? কেনো তারা এই কাজটা নিজেরা নিজেরা করতে পারে না? লাল চুলের এক ছেলে তার লাল গোঁফের কোণা পাকাতে পাকাতে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো বললো। আমি পেছনে পেছনে হেঁটে হেঁটে ভর্তি কার্যক্রম সমাপ্ত করলাম। এই লাল চুল লাল গোঁফের ছেলে পরবর্তী ৫ বছর বেতনভাতা, পরীক্ষার ফি এবং অন্যান্য জরিমানা দেওয়ার সবগুলো পদক্ষেপে আমাকে সহযোগিতা করেছে। তার সহযোগিতা ছাড়া এইসব অহেতুক দাপ্তরিক ঝঞ্ঝাট সামাল দেওয়া আমার জন্যে কঠিন হতো।
কোনোমতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জীবন আনন্দময়। কোনো পরীক্ষা নাই, ইনকোর্স মিডটার্ম নাই। ব্যাগে খাতা কলম নিয়ে গম্ভীর মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসো, ক্যান্টিনে ডিমবন খাও, ক্লাশের পর দল বেধে ক্যান্টিনে সিগারেট টানো, আড্ডা দাও, বিকেল বেলা বাসায় ফিরো। ক্লাশের উপস্থিতি কোনো ব্যপার না, নিয়মিত ল্যাব ক্লাশে উপস্থিত থাকলেই পরীক্ষা দেওয়া যাবে এই সত্য আবিস্কারের পর অহেতুক ক্লাশে গিয়ে সময় অপচয়ের ঝামেলায় জড়াই নি। সায়েন্স ক্যাফেটারিয়ায় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ম্যারাথন তাসের আড্ডা, ১ টাকা কাপ লেবু চা আর বিভিন্ন ধরণের ঠাট্টা রসিকতা। স্পেডট্রাম, ব্রীজ না হলে ব্রে, টুয়েন্টি নাইন কখনও খুব জনপ্রিয় খেলা ছিলো না সে সময়। এমন আড্ডার মাঝখানে সহপাঠিনী এসে বললো এইবার পহেলা বৈশাখে কিন্তু তোমরা শুধু পাঞ্জাবী পরে আসবা। ঠোঁট ফস্কে বের হয়ে গেলো- শুধু পাঞ্জাবী? নীচে কিছু পরবো না? যত্তসব অসভ্য বলে সহপাঠিনী চলে গেলো।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার দৈনিক বরাদ্দ ছিলো ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা। কয়েকদফা চা সিগারেটের পর দুপুরে পকেটে থাকতো ২০ থেকে ৩০ টাকা, এর ভেতরে দুপুরে খেতে হবে, বাসায় যাওয়ার ভাড়া রাখতে হবে, চা সিগারেটের জন্যেও ন্যুনতম বরাদ্দ রাখতে হবে। একবার আড্ডা জমে যাওয়ার পর আমরা বন্ধুরা পকেট উলটে সবার সবটুকু সঞ্চয় সামনে রেখে হিসেব করতাম- বাস ভাড়া ৩ টাকা, সন্ধ্যা আর রাতের সিগারেট ৫ টাকা, যা বাকী থাকলো যা সেটা দিয়ে কতক্ষণ নির্বিঘ্নে আড্ডা দেওয়া যাবে আর এই যক্ষের ধনের ভেতরে কতটুকু দুপুরের খাওয়ার পেছনে খরচ করা যাবে।
এইসব অভাবের দিনে আমরা হেঁটে হেঁটে নীলক্ষেত পুলিশ হোটেলে যেতাম। ৬ টাকায় দুইটা তন্দুরী রুটি আর ৩ কিংবা ৪ টাকার সব্জী ভাজি শেষ হওয়ার পর আয়েশ করে এক কাপ দুধ চা। এমন কোনো একদিন দুইটা তন্দুরীর পরও কিছু ক্ষিধে অবশিষ্ট ছিলো। প্লেটের কোণা থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তন্দুরির টুকরো তুলে মুখে দিচ্ছি- দেখলাম যে লোকটা তন্দুরি বানাচ্ছে সে চোখ সরু করে দেখতেছে আমার দিকে। এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে আমি কিছুটা লজ্জিত পরে পেছনে ঘুরে তাকানোর পর দেখলাম ওখানে এক মেয়ে দিব্যি গাল ফুলিয়ে সিগারেট টানতেছে। আমি না ঐ মেয়ে তন্দুরুচির নজরদারিতে আছে। সেই মেয়ে আবার আমার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললো কি খবর কেমন আছো তুমি? লাল গোঁফ লাল চুলের পোলার সাথে যে এই মেয়ের পরিচয় থাকতে পারে এইটা আমার কল্পনায় আসে নি। বন্ধুর বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে না। এভাবেই টুকরো টুকরো বন্ধুর বন্ধু, বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু এবং বিভিন্ন তুতো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে অনার্স পরীক্ষার সময় হয়ে গেলো। লাল গুঁফো প্রথম পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় ঘোষণা দিলো ও পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত না, ও পরীক্ষা ড্রপ করবে, পরের বছর পরীক্ষা দিবে। আমার যে খুব ভালো প্রস্তুতি ছিলো তেমনও না তার উপরে প্রথম দুইটা পরীক্ষায় পুরো বাঁশ, অনার্স পরীক্ষায় ফলাফল ভালো হয় নি।
কোনো এক অভাবের দিনে আমাদের দুই বন্ধুর দুপুরের খাওয়ার পেছনে বরাদ্দ ছিলো ১০ টাকা, আমরা ২টা বাটার বন, দুই কাপ চা আর একটা সিগারেট দিয়ে সে দিন বিকেল পর্যন্ত পার করছি। অ





মন্তব্য করুন