কখ
জ্ঞুলশান হত্যাযজ্ঞের বিহ্বলতা আমরা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারি নি। গত দশকের বাঁশখালী ঘটনা যখন ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে একই পরিবারের ১১ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো কিংবা ৩ বছর আগে বিহারী ক্যাম্পের অন্তত ৪টি ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে ৬-৭ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো, ঘটনাগুলোর বীভৎসতা আমাদের ভেতরে ততটা দাগ কাটতে পারে নি। বাঁশখালীর ঘটনায় আক্রান্ত পরিবারটি সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলো এবং বিহারী ক্যাম্পের ঘটনায় আক্রান্ত মানুষগুলো মোটা দাগে ঘৃনিত উর্দুভাষী বাংলাদেশী বলেই সম্ভবত জিঘাংসা এত মর্মান্তিক হয়ে বাজে নি।
বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে আমরা অসংখ্য খুনীর নৃশংসতার ভাষ্য পড়েছি গণমাধ্যমে, অযশোরের যে মানুষটা ঝামেলা এড়াতে ইটের ভাটার মানুষ পুড়িয়ে মারতো নির্দ্বিধায় কিংবা খুলনার এরশাদ শিকদার কিংবা গেন্ডারিয়ার সুমন ভাইয়েরা কিংবা এমন অনেকের নৃশংসতার ঘটনা আমরা পড়েছি, অপরাধীদের বিচার হয়েছে, ফাঁসীও হয়েছে।
এদের নৃশংসতাও আমাদের খুব বেশী বিচলিত করে নি। রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা বিপ্লবের নামে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির বিভিন্ন উপদল নিজেদের ভেতরের আদর্শিক সংঘাতে নিয়মিত একে অন্যকে জবাই করছে আমরা ড্রইং রুমে সংবাদপত্রের পাতা উলটে ভেবেছি নরকের কীটগুলো এভাবেই একে অন্যকে মেরে সাফ করে ফেলবে, আমাদের চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু ঘটে নি। আমাদের বাংলা মায়ের সোনার বদন মলিন হয় নি, আমাদের আছে ধন-ধান্য-পুষ্পভরা রথ, আমাদের আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারী আমরা পথ হারাবো না।
প্রায় নিয়ম করে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর মতো নিধর্মী ব্লগার ফেসবুকারদের উপরে চাপাতি হামলা হচ্ছিলো যখন আমাদের সংস্কৃতিমনা মানুষেরা তখন বাক-স্বাধীনতার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা মাপছিলেন। তারা শহীদ মিনারে প্রদীপ জ্বেলে বাংলাদেশের অন্ধকার দুর করে ফেলছেন নিয়মিতই। তারা এইসব সংখ্যাগুরুর স্পর্শ্বকাতর ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানা বাক্যবাগীশদের সংযত হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন ।
বাংলাদেশে তথ্য সহজলভ্য। র্যাব-পুলিশ- প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং তার অপোগন্ড মন্ত্রীসভার সকল সদস্যের ভান্ডারে মনি-মুক্তার মতো থরে থরে তথ্য সাজানো। কারা ষড়যন্ত্র করছে, কারা জঙ্গীবাদকে সহযোগিতা করছে, কারা উস্কানী দিচ্ছে সব তথ্যই তাদের কাছে আছে। এমন কি গুলশানে এমন নারকীয় ঘটনা ঘটে যাবে এমন আগাম তথ্যও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ছিলো। আধুনিক পৃথিবীতে তথ্যের মতো মূল্যবান কিছু নেই তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার পর তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে তথ্য জমা দিয়েছিলেন।
মতাদর্শিক সংঘাত, ভিন্ন সংস্কৃতিগুলোর ভেতরে এক ধরণের বৈরিতার সম্পর্ক সব সমাজেই আছে। সমাজের মানুষগুলো এইসব বৈরিতা সংঘাতের ভেতরেই নিজেদের মিলগুলো খুঁজে নেয়, নিজেদের ভেতরে এক ধরণের শান্তিপূর্ণ সমঝোতামূলক পরিবেশ তৈরী করে। বাংলাদেশে এই ধরণের সংঘাতগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করার পর আমাদের অতি আত্মবিশ্বাসী প্রশাসন বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করেছে, স্থুলমাপের বুদ্ধিজীবীরা পরিবর্তনগুলো দেখতে পারেন নি। অথচ বিপর্যয়ের চিহ্নগুলো আমাদের চোখের সামনেই ছিলো, সমঝোতার ফাটল আমাদের চোখের সামনে বাড়তে বাড়তে খাদ হয়ে গেলো। আমরা এর তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে উন্নয়নের জয়গান গাইলাম।
বিদেশী দুতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমনের আগে এক ধরণের আচরণবিধি ধরিয়ে দিচ্ছে দেখে আমাদের জাতীয়তাবাদী মন বিক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের উন্নাসিকতায় ক্রুদ্ধ হয়েছি আমরা। আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, আমাদের বাংলার হিন্দু বাংলার মুসলিম বাংলার বৌদ্ধ আমরা সবাই বাঙালী শ্লোগান, আমাদের চেতনার জপমন্ত্র জপলেই হবে। বিদেশীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানে ভীত। তারা বিরোধী দলের সাথে ষড়যন্ত্র করছে। কারা কারা বিদেশী দুতাবাসে গিয়ে বদনাম গেয়ে আসে সেসবের তালিকা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দফতরে থাকে। সময় হলেই সবার মুখোশ উন্মোচনের হুংকার দিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা।
দজ্জালের যন্ত্রনায় গত ৮ বছর বই মেলায় যাওয়া যাচ্ছে না।বইমেলা প্রাঙ্গন থেকে বের হলেই দজ্জালবাহিনীর খপ্পড়ে পরছে মানুষ। কেনো ইহুদী নাসারারা মুসলমানদের শত্রু, তাদের প্রতিরোধে করনীয় বিষয়গুলো পুলিশের নাকের সামনে ঝুলিয়ে ফেরী করছে বইমেলায়, পুলিশ শিবিরের মেসে হানা দিয়ে মওদুদীবাদের পুস্তক জব্দ করছে। গণতন্ত্রকামী দেশগুলোতে ধর্মবাদী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য উঠতি মধ্যবিত্তের মনোরঞ্জন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াত ই ইসলামী কিংবা ছাত্র শিবিরের টার্গেট গ্রুপ মূলতঃ মধ্যবিত্ত, দরিদ্র পরিবারের অপেক্ষাকৃত মেধাবী ছাত্র যারা একটা সময়ে নিজের মেধায় মধ্যবিত্ত হয়ে উঠবে। তারা কখনও দরিদ্র কিংবা শ্রমজীবীদের জন্যে রাজনীতি করে নি। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোও মোটা দাগে দরিদ্র কিংবা শ্রমজীবী মানুষকে উপেক্ষা করেছে। উচ্চবিত্তেরা রাজনৈতিক মতাদর্শ বিষয়ে উদাসীন। ব্যবসায়ীরা নিয়ম করে সকল রাজনৈতিক দলকেই চাঁদা দেয়। তাদের কোনো পছন্দসই রাজনৈতিক দল নেই। আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদের অধিকাংশই অনুকরণপ্রিয়। সংগীতকারেরা বিদেশী সংগীত অনুকরণ করছেন কিংবা নকল করছেন, নাট্যকারেরা বিদেশী সিনেমার চিত্রনাট্য মেরে দিচ্ছেন, সাহিত্যিকেরা লেখার মান নীচে নামানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, এমন কি যারা ঘোষণা দিয়ে বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ করছেন তাদের লেখার মান প্রশ্নবিদ্ধ।





মন্তব্য করুন