ইউজার লগইন

বাংলাদেশ ডায়েরি ০১

আকাশখামচে ধরা স্থাপনাগুলোর ভেতর দিয়ে বাঁক নিয়ে যতবার বিমান ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরন করে, সম্পূর্ণ সময়টাতেই আতংকে সিঁটকে থাকি। তীরে এসে তরী ডোবার মতো এয়ারপোর্টে আছড়ে বেমক্কা মরে যাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করি। সাজানো গোছানো কোনো এয়ারপোর্ট থেকে বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে নামলে নানাবিধ অসংগতি দেখে বিব্রত লাগে।
বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমায় পৌঁছানোর পরপরই সবার হাতের মুঠোফোন সক্রিয়। অসহ বিদেশযাপন শেষে বাড়ী ফিরছি উত্তেজনা সবার কণ্ঠে। পাইলট খোলা মাঠে ডানাওয়ালা বাস চালাতে চালাতে এয়ারপোর্ট টার্মিনালের দিকে আগাচ্ছে, মাথার উপরে ইংরেজী-বাংলায় ক্রমাগত সীট বেল্ট না খোলার নির্দেশনা বাজছে- যাত্রীরা লাগেজ কম্পার্টমেন্ট থেকে হ্যান্ডব্যাগ নামাচ্ছেন, জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছেন টার্মিনালের যাত্রী-অতিথিসমাগম। অনেক দুর থেকে কারো চেহারা স্পষ্ট ঠাওড় করা যায় না কিন্তু এইসব আদলবিহীন কাঠামোতে পরিচিতের মুখের আদল খুঁজে ফেরা যাত্রীদের শিথিল উত্তেজনা আর এক ছুটে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর দুর্দম আকাঙ্ক্ষা ভালো লাগে। যদি এই মুহুর্তেই বিমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় প্রিয়জনবিরহব্যাকুল এইসব মানুষেরা পাসপোর্টে আগমনসাক্ষরের তোয়াক্কা না করেই প্রিয়জনকে আঁকড়ে ধরবে। এইসব দাপ্তরিক বিধির কোনো প্রয়োজন তাদের নেই। তারা দেশে ফিরে এসেছে।

চোখ-মুখ-চোয়াল শক্ত করে বাংলাদেশীদের বিদেশযাপনকাল শেষ হওয়ার পর তাদের উচ্ছ্বাস- উচ্ছলতা, তাদের এই নিয়ম না মানার তাড়না আর আবেগ আমাকেও স্পর্শ্ব করে, যদিও আমি তাদের মতো টগবগে আবেগে ভেসে যাচ্ছি না, আমিও বাসায় ফিরছি। আমার সন্তানের হাসিমুখ ছুঁয়ে দেখার প্রবল আগ্রহ নিস্পৃহ দমন করে ধীরে ধীরে আমিও পাইলট আর বিমানকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে এইসব রাষ্ট্রীয় নীতি-রীতি মেনে প্রায় অসহ্য লাগেজ বন্টন ব্যবস্থার ভেতরে নিজের বোচকা খুঁজে বের হয়ে আসবো।

সবাই সবাইকে টপকে লাইনের প্রথমে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বের হয়ে যাবে তাড়ায় অভিবাসন-আগমন নিয়ন্ত্রন কর্মকর্তাদের নিজেদের ভেতরের হাসি-ঠাট্টা প্রতিটা অপেক্ষমান সারিতেই অস্থিরতা বাড়ায়। একজন একজন এয়ারপোর্ট থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। দীর্ঘ ভ্রমন আর অপেক্ষায় অবসন্ন শরীরে পাসপোর্ট দাগিয়ে বোচকা খুঁজে বাংলাদেশের দিকে হাঁটি।

জানি না কেনো, প্রতিবারই একটা দুটো আলাদা দেশের বিমান কাছাকাছি সময়ে অবতরণ করে। মধ্যপ্রাচ্য- মালোয়শিয়া আর থাইল্যান্ড থেকে ফিরে আসা মানুষগুলোর প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তাদের আগ্রহ বেশী। আমাদের মেদমলিন পেলবতা তাদের আকৃষ্ট করে না। বরং দৃঢ় শক্ত কাঠামোর শ্রমজীবী মানুষ যারা ব্যাগের বাড়তি ওজন এড়াতে প্লাস্টিকে মুড়ে প্রিয়জনদের জন্যে উপহার এনেছেন তাদের প্রতিটি বোচকাই এয়ারপোর্ট স্ক্যানারের ভেতরে যায়, তাদের কাঁধের ব্যাগ তন্নতন্ন করে খুঁজে কিছু একটা পেতে চায় কাস্টমস কর্মকর্তারা। পেলব-মসৃন চামড়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের তারা সম্মান করে আর শক্তকাঠামো মানুষগুলোর চোয়ারে চেহারায় কল্পিত অপরাধী খুঁজে পায়।

আমার যাত্রাবিবরনী জেনে কেউ কখনও খানাতল্লাশী করে নি আমাকে। এতসব বিমানবন্দরে অহেতুক তল্লাশীর পর বাংলাদেশে নেমে এই সস্ত্বিটুকু আমি উপভোগ করি। এই সবুজ পাসপোর্ট দেখে এখানে কেউ মুখ কুঁচকে তাকাবে না। আমার চেহারায় কল্পিত অপরাধী খুঁজবে না। এখানে আমি স্বাধীন- মুক্ত- সম্মানিত নাগরিক।

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.