হাসপাতাল নিবাস- কয়েকটি টুকরো ঘটনা
মেযবাহ ভাইয়ের রাতের গল্প পড়ে প্রায়ই ভাবি আমারও হাসপাতালের গল্প আছে। আজ লিখবো, কাল লিখবো। কিন্তু "অকাজের কাজি- মস্তবড় পাজি' হবার কারণে তা আর করা হয়ে ওঠেনা। অবশেষে আজ কাজ করার মাঝে প্রচণ্ড আলসেমীতে মনে হলো আমার হাসপাতালের গল্প কিছুটা শেয়ার করা যায়।
ব্যক্তিগতভাবে হাসপাতাল বিষয়টি আমার ভীষণ অপছন্দের। হাসপাতাল মানেই মন খারাপ, ঔষুধের গন্ধ আর অসুস্থতা ধরিয়ে দেয়া। নিজের ডেঙ্গু আমলে ৪৫ দিনের বদলে ১৫ দিন থাকা ছিল অপছন্দ থেকেই। এবং সেটার ফলে শারীরিক অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি এবং ডাক্তার সাহেবের সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ টাইপের অভিমানও সহ্য করতে হয়েছে।
এবার হাসপাতালের নিবাসের কারণ আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষের তালিকায় থাকা একজন। আমার নানু। গেল মাসের শেষে তিনি ভর্তি হলেন ঢাকার নামকরা এক হাসপাতালে। রোগটির কথা নাই বা বললাম। রোগ যেটাই হোক, মন খারাপের রোগ ছড়িয়ে পরলো বাসার প্রতিটা মানুষের মাঝে। সবচেয়ে বিরক্তি বা রাগের কারণ হলো, দুই-একজন ফিসফাস করে এটা সেটা বলছে কিন্তু জন সাধারণের সামনে মুখে তালা। যে তালার চাবি তারা ক্ষণে ক্ষণে ফেলে আসে ধানমণ্ডির লেকে। কেউ কিছু বলে না। ওদিকে আমার নানু, বিরাশি বছর বয়সী, তাতে কী, জ্ঞানবুদ্ধি মাশাআল্লাহ টনটনা। কি বুঝলো আল্লাহ মালুম। একদম সেনাপতির মতো সিনা টান টান করে ডাক্তারদের সাথে কথা বলা শুরু করলো। প্রথম দিনই একটি অপারেশনের দরকার ছিল। অপারেশন হলো। এবং বেচারি ডাক্তার জানেন না, তিনি দারোগার বউ এর অপারেশন করছেন। পেটে ছুড়ি চালানোর পর ডাক্তার সাহেবের মোবাইল বেজে উঠে। যথারীতি তিনি ফোনটি ধরে গালগপ্পও শুরু করে দেন। তাও আবার নাকী ইলিশ মাছ খাওয়ার গপ্প। ঠিক তখন, হাসপাতালের অপরেশন থিয়েটারের বেডে শুয়ে আমার বিরাশি বছরের নানুর প্রচণ্ড ধমক-
" আমারে অর্ধেক কাইট্টা তুই ফোনে কথা কস..ফোন রাখ..'
এহেন ধমকের পর আর যাই হোক ভদ্রলোক আর ফোনে কথা বলতে পারেনি।
সেই অপারেশনের যে রিপোর্ট এলো এমনই যে আমাদের অবস্থা বাকহীণ। আরেক বঙ্গসন্তান মহান ডাক্তার ঘোষণা দিলেন, অবস্থা যখন তখন। আমাদের কারো চোখ বাধা মানছেনা। যারা আমার পরিবারের সদস্যদের কিঞ্চিৎ চিনেন তারা জানেন এরা কেমন দৈর্ঘ প্রস্থে সমান। এরা একেকটা এখানে সেখানে কান্নাকাটি করছে। বলতে দ্বিধা নেই। হাসপাতালের বারান্দায় আমিও..
আর আমার নানু, তার আধা পরিষ্কার দৃষ্টিতে সবকিছুই দেখলেন, সবকিছুই বুঝলেন। হাতে স্যালাইন, ক্যাথেডার শরীরের সাথে যুক্ত। তিনি বললেন, "আমি হাজীর বিরিয়ানি খাবো.."
এখন লিখছি ঠিকই, কিন্তু ঐ সময়ে এই কথাটি কতটা তীব্র ব্যাথার ছিল তা হয়তো বলে বোঝাবার প্রয়োজন নেই।
অতঃপর নানুর গল্প এমন। সেই রিপোর্ট খানা আসলে সামান্য অতিরঞ্জিত ছিল। তিনি এখনও মাশাআল্লাহ ভালো আছেন। মাঝে মাঝে এমন ভুল হতেই পারে। হাজার হোক ডাক্তারও মানুষ। তবে এর পর আমাদের পরিবারের আর কেউ ঐ ডাক্তারের চেহারা দেখবেননা আশা করি।
নানুর অবস্থা বিবেচনা করে ঠিক করা হলো তিনি রেডিও ও কেমো থেরাপী চলা পর্যন্ত হাসপাতালেই থাকবেন। ফলে আমরা রোজই সেখানে সময় মিলিয়ে ঢুঁ মারি।
তেমনই একটি দিন ছিল, যেদিন একজন ভিইপি দেশে ফিরেন। আমরা হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম হাসপাতালের একদল এক রোগীর জন্য অপেক্ষায়। কিন্তু ভিভিআইপি-এর জন্য রোগী আটকা জ্যামে।
ভিভিআইপি হয়তো নিজেও জানেননা তার আসার উপলক্ষ্যে আমাদের কতোটা দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়। সেদিন ঢাকায় জ্যাম ছিল বর্তমানের প্রতিদিনের স্বাভাবিক জ্যামের তুলনাতেও বেশি। অপর দিকে বিশাল এক সড়ক দুর্ঘটনাও হলো। ফলে ঢাকা- যানে আটকা তখন।
রোগী ছিলেন একজন গর্ভবতী মা, প্রসবের একেবারে সন্ধিক্ষণে, তিনি আসছেন। অ্যাম্বুলেন্সে।
আমাদের আজব শহরের কোন বঙ্গ সন্তানই হয়তো জানেননা, অন্তত অ্যাম্বুলেনসের রাস্তাটা ছেড়ে দেয়া কতোটা জরুরী, কতোটা মানবিক। ঐ ভীড় ভাট্টায় কোন নেতা, কোন নেত্রী রাস্তা আগলে রাখা ছিঁচকে অনুসারিকে লক্ষ্য করেন, সেটাও প্রশ্ন। কিন্তু একজন মা সেদিন সেই রাস্তা আগলে রাখাকে টের পেয়েছেন হাড়ে হাড়ে। শিশুটি মারা যায় রাস্তার সাড়ে তিন ঘণ্টার জ্যামে, মা'র গর্ভে..
আর মা হাসপাতালে এসে ভর্তি হোন আইসিইউ-এ..
সরাসরি।
এই গেলো সপ্তাহে, আরেক রোগী প্রকৃত মৃত কিন্তু লাইফ সাপোর্টে তখনও আপাত জীবিত। কিছুতেই তার আত্মীয় স্বজন সাপোর্ট খুলতে দেবেনা। সে এক মানসিক দ্বন্দ্ব। হাসপাতালের যুক্তি, লাইফ সাপোর্টের জন্য অপেক্ষায় আছে আরো রোগী। একজনের অবস্থার উন্নতি না হলে কতোদিন অপরকে অপেক্ষায় রাখা যায়! আর স্বজনের যুক্তি- যা ভাবা যায় তাই..ফলাফলটা দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে মন সায় দেয়নি...
মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে..লেখা বড়ও হয়ে যাচ্ছে..আজ এতো টুকুই। প্রতিদিনই হাসপাতালের একএকটি কেবিন, বেড মানেই এক একটি ভিন্ন ঘটনা..পরে কখনো ইচ্ছে হলে আবার বলবো।
তবে হাসপাতালের ফিসফাস দিয়ে শেষ করি। নিজেকে দিয়ে বুঝি, অযথাই কানাকানি রোগীকে আরো ভয় পাইয়ে দেয়। আমার ডেঙ্গু আমলে ডাক্তার যখন ফিসফাস করছিল আমি সমান বিরক্ত ছিলাম। ডাক্তার ডেকে বলেছিলাম, ....
থাক, অনেকটা নানুর মতোই সংলাপ ছিল..এবং অতঃপর ৪৫ দিনের বদলে ১৫ দিন এবং ডাক্তারের সাথে সম্পর্ক খতম।
.....................





বর্ননা এতো সাবলীল যে মনে হয় চোখে দেখছি এই ঘটনাগুলো।
" আমিরে অর্ধেক কাইট্টা তুই ফোনে কথা কস..ফোন রাখ..'
মারাত্বক ডায়লগ। নানুরে সালাম।
নানুরে স্যালুট।
জি ভাই, নানুরে স্যালুট..
হেটস্ অফ টু নানু।
রুম্পা'পুর লেখা দারুণ লাগে। 'আমি হাজীর বিরিয়ানী খাবো।'
আপনি কিন্তু আমার কাছ থেকেই এই খানাটা পেতে পারেন। আপনার মন্তব্যে আমার মন ভালো হয়ে যায়..
সেরা ডায়লগ... " আমিরে অর্ধেক কাইট্টা তুই ফোনে কথা কস..ফোন রাখ..''
আসল কথা... "আমি হাজীর বিরিয়ানী খাব"
মূল কথা... লেখা সেরাম হৈছে। মাশাল্লাহ...
ভাইজান আমিইইইইইইই সেইইইইইই..চারুকলায় দেখা হলো। সাথে শরৎ ছিল..
সে আর বলতে...!!!
তাহলে আমি এ দফা খিচুরীর দাওয়াতটা পাচ্ছি..তাই তোহ!
আইচ্ছা...
অসাধারন লেখা।
শুরুর হাসি ঠাঁট্টার মুড টা, জ্যাম জনিত মাতৃগর্ভের যন্ত্রনার কাহিনিতে এসে ভয়ানক হয়ে উঠলো--
একদম ঠিক কথা, হাসপাতালের প্রতিটি কেবিন, বেড এমনকি দেয়ালেও হয়তো অনেক অনেক কাহিনি আছে।
" আমারে অর্ধেক কাইট্টা তুই ফোনে কথা কস..ফোন রাখ..'.....ব্যাপক। সবারই এমন হওয়া উচিত।
শেষে মন্টা খারাপ হলো। দারুণ লিখেছেন।
হায় ডাক্তার, হায় চিকিৎসা, হায়রে হাসপাতাল ! শরীর না থাকলে অসুখ থাকতো না, আর ওখানে যেতেও হত না ! হায়রে ঢাকার জ্যাম, হায়রে ভিভিআইপি ! এদের সুমতি হোক ।
মানুষ জন ধান্ধায় থাকে এমবুলেন্সের আগে আগে থাকার, তাইলে যদি সিগ্ন্যালে কমসময় থাকা লাগে।
লেখাটা এই হাসালো, এই ভয় ধরালো, মন খারাপ করালো। নানুতো গ্রেট, রুম্পার লেখনীও দারুণ। এতো কম লিখলে চলবে না।
আমিও সেই কথা বলি, এত কম লিখলে চলবে না।
থেঙ্কু পেঙ্কু...
আরেকবার তোর লেখা পরে আমার মনে ফটোগ্রাফী ছেড়ে কলম ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে....সত্যি কথা বলতে আমি খুব বেশী লেখকের লেখা পড়িনি,পড়েছি অনেক কিন্তু বাছা কয়েকজনের.....তাদের মধ্যে লেখায় সহজ সাবলীল ভাব টা এক হূমায়ুন আহমেদের লেখায় petam r tor likha pora suru korar por theke mone hochche amra arekjon ke pelam sabolil lekhok...God bless you,dosto!
(hotat Avro kaj na korai sharing korte holo
হাসপাতালের মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে সহজ-সাবলিল লেখা ! ভালো লাগলো রুম্পা।
জীবন বিষয়টাই সিরিয়াস। তাই সহজভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা মাত্র। ধন্যবাদ ঈশান।
কঠিন লেখার হাত আপ্নের রুম্পা'পু। ঈদ মুবারক।
ঈদ মাংস...থুক্কু ঈদ মুবারাক..
মন্তব্য করুন