ইউজার লগইন

নড়বড়ে রবি ঠাকুর আর বিস্মৃত কিছু সময়..

আমার ভাতিঝির বয়স সাড়ে ছয় বছর। সিমেন্টের ফ্লোরে খেলে আর আই ফোন দিয়ে রাগী পাখি তাড়ায়। ভাবতে অবাক লাগে আসলেই কি অদ্ভুদ ত্রৈধ বিন্দু দেখেছে এবং দেখছে আমাদের প্রজন্ম। আজব বাক্সটা ডিম আকার ছেড়ে সমান হলো..এখন আবার টেবিল ছেড়ে দেয়ালে ঝুলছে। ছবি প্রিন্ট করা আর আকাশ থেকে পড়া এখন সমান। সেই ছবি অ্যালবাম ছেড়ে আজ মানুষের ক্লিক নির্ভর। আম্মা প্রায়ই বকা দিত, 'ছবির উপরে হাত দিবানা- আঙুলের ছাপ পরবে'..এখন মানুষ কয়-'ম্যাকের উপরে হাত দিবানা- ছাপ পড়ে..'
এখন মানুষের মনে দাগ কাটার চাইতে যন্ত্রে আচঁড় কাটা সহজ...
সেই যন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা এখন এতই কোন একদিন আমার ভাতিঝি হয়তো বলবে, আমরা মানব নই যানব..!!
আমরা যেহেতু একদমই মাটির মানব - তাই মাঝে মাঝে এখনকার সময়ের সাথে নিজেদের সময়টা মিলিয়ে নেই। কি অদ্ভুদ ছিল আমাদের স্কুল জীবন! খুব বেশিদিন আগে তো না।
এই তো সেদিনই টিফিন পিরিয়ডের ডালডা ভেজা গজা..কখনো নিমকি, কখনো লুচি ভাজি বা লুচি-সুজি...আহা! অাহা! ক্লাস ক্যাপ্টেন হলে ভাগে বেশি থাকবে নিশ্চিত। বৃষ্টি হলেই স্কুলে গানের আসর। বেচার আমার বন্ধু পলিকে টানা ৫টা বছর একই গান গাইতে হয়েছে - মঙ্গলবারতা..
স্কুল শেষে পানির ট্যাংকির উপর খেলা..বউচি..ডাঙ্গুলি নয়তো সাতচারা..আমাদের বাচ্চারা খেলাগুলোর নামই কেবল জানবে! ভাবতে খারাপ লাগে। অথবা নাও জানতে পারে..কে জানে..
তখন সিক্সে উঠে গেলে কামিজ বানানোর আগ পযর্ন্ত ফ্রকের সাথে সেলোয়ার পড়তে হতো। বিষয়টি খুবই আনস্মার্ট- স্বাভাবিকভাবেই পছন্দে কোনই কারণ নাই। কিন্তু আমার আম্মাকে বোঝানোর ক্ষমতাও আমার নাই। তাই রোজ বিকেলে খেলার ছলে ছ্যাড়াৎ করে পড়ে সেই পায়জামার হাটু ধ্বংসা করা একসময় হয়ে গেল পবিত্র দ্বায়িত্ব। সেই দ্বায়িত্ব পালনে অসীম নিষ্ঠার কারণে আজও আমার হাটু ভর্তি ক্ষত! কনুই-এ দাগ!! একশ বার পড়ে গিয়ে হাজার বার উঠে দাড়ানোর চেষ্টায় হাড্ডি আজো শক্ত..বৃষ্টির বার্তা কানে আসতেই জুতা-মোজা পলিথিনে..মাঠ কাপানোর প্রস্তুতি..টাকা পয়সার বালাই নাই..তাও কতো দামী সময়গুলো...
আজিমপুরে বড় হওয়ার সুবাদে ঢাকাতেও মাশাল্লাহ ব্যাপক ছোটবেলা ছিল আমাদের..এ বাসায় ও বাসায় একই বয়সের একগাদা পোলাপাইন। পড়ালেখার প্রতিযোগিতা, প্রেমের সাগর আর খেলায় টেক্কা দেয়ার মহরত চলতো সারাদিন..আর বছর ধরে অপেক্ষা করা মেলার জন্য। তখন কিসের বৈশাখী মেলা আর কিসের ধানমণ্ডি লেক!! সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম কখন কবে মহরমের মেলা শুরু হবে। আজিমপুর কলোনির একটা রাস্তা জুড়ে বসতো মেলা! লিটল অ্যানজেলস স্কুল-এর সামনে দিয়ে এ মাথা ও মাথা..কতকিছু যে পাওয়া যেতো! তার মাঝে যা প্রতিবছরই কেনা হতো - তাহলো টিনের জাহাজ..কেরোসিনে চলতো আর ভটরভটর আওয়াজ করতো..সেই জাহাজ নিয়ে চলে যেতাম পলাশী কলোনী। বড়ফুপুর বাসা। তখন একতলা টিনের চালের বাসায় একটা পানি রিজার্ভ করার অদ্ভুদ ব্যবস্থা ছিল। কুয়োর মতো..নামটা মনে করতে পারছিনা। যাই হোক, সেখানে আমরা নানা এক্সপেরিমেন্ট করতাম..ড্রেনের মাছ তো বটেই, সেই কুয়াতে বাইন মাছ, কচ্ছপ এবং বছরে একবার অন্তত ঠাঁই পেতো আমার ভটভটি জাহাজ। এজন্য বড় ফুপুর চোখ রাঙানিও হজম করতে হতো..তারপরও, জাহাজ চালানোর সেই সুখ হাতছাড়া করতাম না..
আর হাত ছাড়া করতাম না রবি ঠাকুরকে দোলানোর। স্প্রিং-এর উপর অদ্ভুদ ভাবে একটা বুড়ো বানানো হতো আর ফেরিওয়ালা সেই বুড়োকে বিক্রি করতো রবি ঠাকুর নামে। আমরা রবি ঠাকুর কিনতাম সর্বোচ্চ ৪০ টাকায়! Big smile

যন্ত্র কি বস্তু, খায় না মাথায় দেয় তা জানতামনা বলেই হয়তো 'মঙ্গলবারতা' থেকেও রবি ঠাকুরের নড়াচড়া বেশি মজার ছিল..আরো মজার ছিল কদমা, বাতাসা, চিনির পুতুল, গুড়ের মুড়কি, চিনির মুড়কি, মোয়া- আরো কত কিছু খাবার! আহারে সেই অম্লমধুর দিনগুলি..আজকের বাচ্চার হয়তো এখনই ব্লগে শৈশব টুকে রাখতে পারবে..আর আমাদের মনে পড়ে হুটহাট। পার্থক্য কি শুধু এটাই? না... এখনকার বাচ্চাদের হাটুর চামড়া ছিলেনা..বৃষ্টির কাদাকে তারা এড়িয়ে চলে..মহররমের মেলা কি- তারা জানবেনা..একদিন হয়তো ভুলেই যাবে দেশটিতে কোন নদী ছিল..ছিল না উত্তরে -দক্ষিণে ভাগ করা ঢাকা..
আমার বাচ্চারা থাকবে রাগী পাখি নিয়ে..কেউ তো সেই রবি ঠাকুরকে নিয়ে অ্যাপেলের গেমও বানাবে না! যে অন্তত ওরা খেলায় খেলায় রবি ঠাকুরকে চিনবে!!

এভাবেই দিনে দিনে বাচ্চাগুলোর যানব হওয়ায় কষ্ট কি আমাদের থেকে বেশি আর কারো হবে!

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

এ টি এম কাদের's picture


খুবই ভাল লিখেছেন ! আপনার যানব গুলো আমার ভাবনায় খাঁচায় পোষা মুরগীর বাচ্চা যেন । বদ্ধ ঘরের দূষণে ভরা আলো হাওয়ায় ওদের বেড়ে উঠা ! গড নোজ এ যানবদের পরবর্তী প্রজন্ম কিরূপ হবে !

রুম্পা's picture


ধন্যবাদ ভাইয়া..। আমি কিন্তু এখনও 'যানব' হওয়ার অবস্থায় যাই নাই ...তবে এতটুকু জানি যখন মানব হবে তখন আর যাই হউক ফার্মের মুরগী হবে না...কখনোই না..Smile

এ টি এম কাদের's picture


১) আমি জানিনা আপনি আমাকে ঠিক ধরতে পারছেন কিনা । ফার্মের মুরগীর বাচ্চা বলতে আমি বুঝাতে চেয়েছিলাম যে অল্প পরিসরে বা বদ্ধ ঘরে বেড়ে উঠা । বর্তমানে শহরের বাচ্চাগুলো তো অনেকটা তাই ! নয় কি ?

২) প্রকাশ করার আগে কষ্ট করে প্রিভিউ দেখে নিয়েন । আপনার তিনটা শব্দ পড়তে পারা যায়নি ।

রুম্পা's picture


ভাইজান, শব্দের গ্যান্জামটি একটি যানবীয় সমস্যা। আগেও হয়েছে। Puzzled
কারণ অনেক কষ্ট করে রিভিউ দেখার পর দেখি ঠিক..কিন্তু পরে কি যেন হয়!!! শব্দ তিনটি কোথায় একটু বলবেন??
আর ১ম ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আচ্ছা বিশাল পরিসরে গ্যান্দাদের বড় করার..দেখা যাক..সাধ আর সামর্থের সমন্বয় ঘটে কিনা..
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ.. Smile

এ টি এম কাদের's picture


আমাকে লেখা আপনার প্রথম মন্তব্যের ২য় বাক্যটি দেখুন !

রুম্পা's picture


আমি ঠিকই দেখতে পাচ্ছি..এই হইলো ঘটনা.. Shock
....বাই দ্যা ওয়ে, ম্যাক ব্যবহার করছি..এটাকি কোন কারণ!

লীনা দিলরুবা's picture


লেখা এত সাবলীল...
বিস্মৃত সময় মনে হল না। আপনার তো সবই মনে আছে!

রুম্পা's picture


কেনো থাকবে না!..সবই মনে আছে...ধীরে ধীরে সব লিখে ফেলবো ইনশাল্লাহ..Smile
আর ইয়ে মানে আপু..আমি তো অতটা বুড়ো না..মানে বুড়োর কোন পর্যায়ে মনে হয় এখনো পড়ি না.. Crazy

লীনা দিলরুবা's picture


না না বুড়া হবেন ক্যান! আপনারে দেখেছিতো Smile ঝকঝকে তরুণী Love

১০

রুম্পা's picture


আমিতো অলোয়েছ ছুইট ছিক্সটিন.. Love
কই দেখসেন!!!

১১

লীনা দিলরুবা's picture


বইমেলায়, ২৮/০২/২০১১ সন্ধ্যায়- আপনার পরনে ছিল নীল রঙের শাড়ী Big smile

১২

রুম্পা's picture


Love

১৩

ফিদা মেহরান's picture


রুম্পা, এতো সুন্দর লেখা !!! অসাধারণ লাগলো।।.
ভাষা পাচ্ছি না।

১৪

ফিদা মেহরান's picture


রুম্পা, এতো সুন্দর লেখা !!! অসাধারণ লাগলো।।.
ভাষা পাচ্ছি না।

১৫

রায়েহাত শুভ's picture


আহারে আমাগো সেই ভটভটিয়া লঞ্চ আর তুলার দাড়িওয়ালা রবীঠাকুর...
এখনকার পিচ্চি গুলা আমাদের আনন্দগুলোর কিছুমাত্র ভাগ পাইতেছে না ভাবলেই কষ্ট লাগে Sad

১৬

রুম্পা's picture


হুম.. Sad(

১৭

রায়েহাত শুভ's picture


ওহো রুম্পা, ব্লগের প্রকাশিতব্য বইয়ের জন্য লেখা দিছেন তো? না দিলে তাড়াতাড়ি পাঠাইয়া দেন প্লিজ...

১৮

রুম্পা's picture


এইডা কি ঠাডা ফেললেন??... Crazy মাটি ফেটে গেল যে!!... Tongue

১৯

রায়েহাত শুভ's picture


ঠাডা মাডা কিচ্ছু না। লেখা দেন ১৫ তারিখ লাস্ট ডেট লেখা জমার।

২০

নাহীদ Hossain's picture


আমরা রবি ঠাকুর কিনতাম সর্বোচ্চ ৪০ টাকায়! ..........খিক্‌জ
লেখা লাইর্ক্কলাম Fishing

২১

অতিথি's picture


ভালো লাগলো

২২

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


৪০?!

এত্ত টাকার অপচয়!
আমি তো ১৫/২০ এর বেশি দাম চাইতেই দেখিনাই! Tongue

লেখা ভালু পাইছি! Big smile

২৩

রুম্পা's picture


Crazy আপনি আমার আগের আমলের তাইলে..

২৪

তানবীরা's picture


এখনের বাচ্চারা রবি ঠাকুর না চিনলেই বরং ভালো। ইউটিউবে রবীন্দ্র সংগীতের র‍্যাপ, মাই গস কানে হাত দিয়ে রাখতে হয়

২৫

রাসেল আশরাফ's picture


আহারে সেই তুলার দাড়িওয়ালা রবীন্দ্রনাথ!!! কই হারিয়ে গেলো Puzzled Puzzled

মেলার প্রিয় ছিলো আমার গুড়ের জিলাপী। আচ্ছামতো খেয়ে সারারাত পেটের ব্যাথায় অস্থির Big smile

২৬

রুম্পা's picture


আমার গুড়ের বাতাসা.. Sad

২৭

Reshma's picture


Khub valo likhsis dosto.. mone achhe tui j diary likhti school-a thhakte?? r amra shobai mile sheta portam? Big smile

hotat kore shei school-er din-guli'r kotha mone pore galo dosto.. best days of life re.. Sad

২৮

রুম্পা's picture


দেখসস আমি ছোটবেলা থেকেই লিখি...বড় হয়ে লেখক হবো... Glasses

২৯

একজন মায়াবতী's picture


টিনের জাহাজ, রবীঠাকুর তো আমিও দেখি নাই।
লেখা অনেক ভালো লাগছে আপু।

৩০

রুম্পা's picture


মহররমের মেলা পেয়েেছন কী?

৩১

জ্যোতি's picture


কি সুন্দর লিখলেন! ছোটবেলার কথা পড়তে বেশ ভালো লাগে।

৩২

রুম্পা's picture


ধন্যবাদ..আমারো ছোটবেলার কথা লিখতে ভালো লাগে...

৩৩

 নাদিম's picture


ভালো লাগলো..

৩৪

রুম্পা's picture


ধইন্যা পাতা

৩৫

 নাদিম's picture


ভালো লাগলো

৩৬

ethel's picture


ছোট বেলার কথা মনে পরে গেল.।কত মজা করতাম।লিখাটা খুব সুন্দর হয়েছে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রুম্পা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি তো ভালো মানুষ। বেড়াতে, বই পড়তে আর ঘুমাতে পছন্দ করি। আর অন্তত তিন মাস পর পর একদিন একদম একা থাকতে পছন্দ করি।