আবোল তাবোল - ৯
#
প্রায় সপ্তাহখানেক ঢাকার বাইরে থেকে আজ রাতে বাসায় ফিরলাম। ঘরোয়া একটা কাজে সিলেট গিয়েছিলাম। ছিলাম সিলেট সদর থেকে প্রায় ৩০/৪০ কিমি দুরে। গ্যাস ফিল্ডের কোয়ার্টারে, ওখানে ২৪ ঘন্টাই নিজস্ব জেনারেটর স্বারম্বরে কাজ করে যাচ্ছে তাই ওখানে কারেন্ট বলতে গেলে যায় ই না!
তা সেই গ্যাসফিল্ডের সীমানা প্রাচীরের চারিদিকে চা বাগান আর দুরে বিশুদ্ধ গাওগেরাম। দিনে দুপুরেই ঝিঝির ডাকে মাথা ধরে. আর মাঝে মাঝেই আশেপাশের পাহাড় থেকে বানরেরা নেমে আসে। দুয়েকটা পুরাই বাঘা বাঙালি; ঘরে ঢুকে পায়চারী করে, এটা ওটা খেয়ে যায়।
ওদিকে আবার ইলেকট্রিসিটি যায়নি এখনো, আশেপাশে কোথাও লোকজনের বসতি নাই। তাই সন্ধ্যা পেরুতেই ওখানে নিঝুম অন্ধকার। এ কারনেই হয়তো, ওদিকে সবাই ১১ টার মাঝেই দেখা যায় ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে!
এবার বলতে গেলে পুরোটা ট্যুর বাসাতেই কেটেছে। একদিন শুধু বিকেলে চা বাগানে ঘুরতে বেড়িয়ে ২ কিমির সোজা রাস্তা শর্টকাটে ১০ কিমি হয়ে গেছিল!গ্রামের লোকজনের দুরত্বজ্ঞানের উপর ভরসা করা আসলেই খুব কঠিন এবং বোকামীর একটা কাজ।
ঐদিন পায়ের উপর দিয়ে ভালই ধকল গেছে। তবুও
তাতে আমার মত রাতের প্যাচার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে বয়েই গেছে!
ওখানে যে কয় দিন ছিলাম প্রায় প্রতিরাতেই লম্বা একটা সময় কেটেছে কানে গান লাগিয়ে বারান্দায় বসে।
চারদিকে নিঝুম অন্ধকার, একটা দুইটা ক্লান্ত ল্যাম্পপোস্ট। স্তদ্ধ কিছু গাছের পাতা আর ঘাসে জমে থাকা নীরবতা। পাশেই পাহাড়ে বানরের কিচ কিচ, ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ অথবা দূর থেকে ভেসে আসা একলা কোন শেয়ালের নিশিডাকা হুক্কা হুয়া!
আর এইসবকিছুর সাথে তাল মেলাতেই বোধহয়,
হঠাৎ করেই গা শিরশিরে করা বাশঝাড়ের সড়সড় শব্দকে পেছন ফেলে একটু উপরে চাইতেই আধখাওয়া এক রুপালী চাঁদ। এই পৃথিবীতে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, তা ভাষায় ফুটিয়ে তোলা এক কথায় অসম্ভব!
আমার এইবারের ট্যুর থেকে উপলদ্বি একটাই,
ঢাকার বাইরে না গেলে প্রকৃত অর্থে রাত দেখা যায় না।
#
এমনিতে আমি ছেলে হিসেবে খুব একটা মিশুক নই। তবে যাদের সাথে মিশতে পারি, বেশ ভালই মিশে যাই।
আমার নিজের লাইফ নিয়ে অনেক হতাশা থাকলেও একটা জিনিস বরাবরই অনেক কেই হিংসান্বিত করে তোলে!
কিভাবে কিভাবে যেন দুনিয়ার যত পিচ্চি কাচ্চা আমাকে বেশ পছন্দ করে ফেলে!
একবার তো সিলেট যাওয়ার সময় পুরোটা সময় কেটে গিয়েছিল ক্লাস ফোরের এক পিচ্চির সাথে আড্ডা দিয়ে, বিষয় কার্টুন আর গেমস । অনেকটা সময় ধরে আশেপাশের বড় বড় মানুষ জনের জুলজুল করে চেয়ে থাকা মনে থাকবে অনেক দিন!
যে কোন লম্বা জার্নিতে ট্রেনই আমার সবচাইতে বেশি পছন্দের।
এবার সিলেট যাওয়ার সময় কাউন্টারের ভুলে সিট পড়েছিল ৬ জনের কেবিনে। একটা কাপল বাদে ছিল ৩ বছরের একটা ফুটফুটে পুতুলের মত পিচ্চি সহ আরেকটা কাপল। নাম তার আরিবা। মা বাবা অনেক চেষ্টা করেও ঘণ্টা খানেকের বেশি ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারলেন না। উনি কিছুক্ষণ গল্প শুনলেন, একটু পর পর কাহিনির এটা সেটা বদলাতে হল তার নির্দেশে। শেষে, তিনি নিজেই গল্প বলে শোনালেন আমাদের সবাই কে।
ছড়াও আবৃতি করল কয়েকটা। কি একটা জানি ছড়া আছে না, শেষ লাইন 'পা পিছলে আলুর দম' -এটা বলেই হুট করে শরীর এলিয়ে পড়ে বারবার উনার সে কি হাসি!
ওঁদের সাথে জার্নিটা বেশ ভালই লেগেছিল।
প্রায় ৪/৫ দিন পর, ফেরার সময় ট্রেনে সিট থেকে উঠে চা খেতে গিয়ে আবার আরিবা'র আব্বুর সাথে দেখা। তিনিই ডেকে নিয়ে গেলেন ওঁদের কেবিনে। পিচ্চিটা দিব্যি মনে রেখেছে আমাকে!
বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল, কথা নিলেন- ঢাকায় ফিরে কোনদিন ওঁদের বাসার দিকে গেলে অবশ্যই যেন দেখা করে আসি। ভাল লাগল খুব।
কিছু মানুষ আসলেই খুব তাড়াতাড়ি খুব আপন ভেবে মিশে যেতে পারে।
#
হোম ইজ হয়ার দ্যা হার্ট ইজ।
আমার খুব খুব প্রিয় একটা লাইন।
সিলেট থেকে ফেরার সময় একরাত-একদিন কাটিয়ে এলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
আমার প্রানের শহর, আমার জন্মভূমি। স্কুল কলেজ আর বেড়ে উঠার শহর।
ছোট্ট ছিমছাম একটা শহর। বলার মত খুব বেশি কিছু নেই। ভাল মিষ্টি আর প্রাণ জুড়ান ঠাণ্ডা সুমিষ্ট পানি ছাড়া আর কিছুই বলতে গেলে এখন আর নেই।
নানাবাসাও ওখানেই, ছেলেবেলার প্রত্যেকটা অসাধারণ দিনের স্মৃতি তাই মিশে আছে শহরের একেকটা রাস্তায়। আমার জীবনের সবচাইতে প্রিয় মানুষ আমার নানা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ৪ বছর হয়ে গেছে। নানু আর ছোট মামা এখন ঢাকাতেই আছেন, আমাদের সাথেই। কেবল বড়মামা থেকে গেছেন ওখানে। এখন সময় অনেক বদলে গেছে, বলতে গেলে ওখানে আর যাওয়াই হয়না খুব একটা।
তবুও যখনি ওখানে যাই,
দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা দুঃখ আপনাতেই কিভাবে যেন ভুলে বসে থাকি।
যতটুকু সময় ওখানে থাকি মনে হয়, আই এম অ্যাট পিস!
আসলেই,
হোম ইজ হয়ার দ্যা হার্ট ইজ!
#
এইচ এস সি পরীক্ষার আগে টিভি দেখা সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলাম, তখন থেকেই টিভি দেখার নেশা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে এসেছে।
আজকাল বলা যায় টিভি দেখাই হয়না। অনেক দিন পর এই সপ্তাহে আবার ইত্যাদি দেখা হ্ল, তখন থেকেই ভাবছি একটা কিছু লিখব।
ছোটবেলা থেকেই আমার খুব খুব প্রিয় একটা অনুষ্ঠান হল এই 'ইত্যাদি'।
বাসার সবাই একসাথে বসে মজা করে হাসতে হাসতে 'ইত্যাদি' দেখতেছি, এইটা আমার ছেলেবেলার বিনোদন সংশ্লিষ্ট খুব প্রিয় একটা স্মৃতি।
এক ছিল 'আলপিন'! তার খোঁচা থেকে কেউই রেহাই পেত না।
আর সেই কবে থেকেই দেখে আসছি এই 'ইত্যাদি', আজ পর্যন্ত একই রকম নিরলস ভাবে-
চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজের যত অসঙ্গতি,
অন্ধকার ঘুনে ধরা যত ক্ষত। নিরন্তর আবেদন জানিয়ে যাচ্ছে এসবের সমাধানের জন্য।
নানা রকম মজার যত অংশে পরিপূর্ণ 'ইত্যাদি' কে আরও সমৃদ্ধ করে আসছে হানিফ সংকেতের অসাধারণ ছন্দমিলের উপস্থাপনা যা মনে করিয়ে দিয়ে যায় সত্যজিৎ রায় এর 'হীরক রাজার দেশে'-র কথা।
তবে, আমার কাছে হানিফ সংকেতের সবচাইতে বড় গুন বা বৈশিষ্ট্য মনে হয় আমাদের সোনার দেশ টার যত আনাচ কানাচ থেকে হিরের টুকরার মত জলজলে আলোকিত সব মানুষজনদের তুলে নিয়ে আসা। প্রায়সই তাদের উৎসাহ প্রদানে বেশ ভাল অঙ্কের সাহায্যকারী অর্থ প্রণোদনা।
আমাদের ছোট্ট দেশটার বিশাল বিশাল হৃদয়ের মানুষ গুলোকে এতটুকু সম্মান জানানোর কাজ আর কেউ এভাবে নিয়মিত ভাবে করতে পারে বলে মনে হয় না।
মাঝে মাঝে এ ভেবে খুব কষ্ট হয় যে, এই লোকটা কখনই তার অসাধারণ কর্মযজ্ঞের বলার মত কোন স্বীকৃতি পেলেন না। জানি, এরকম মানুষেরা কখনই এইসব তথাকথিত সম্মান প্রদর্শনের স্বীকৃতির পরোয়া করেন না।
তবু-ও কেন জানি মনে হয়,
এরকম লোকেদের তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু না দিতে পারা তা যে কোন দেশ বা জাতির জন্যই লজ্জার বিষয়।
যতদিন পর্যন্ত হানিফ সংকেতের মত মানুষেরা দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা গুলোতে ভূষিত হবেন না,
ততদিন পর্যন্ত আমাদের দেশ ও জাতির সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার কোন আশা আছে বলে আমার মনে হয় না।
#
অনেক ভারী ভারী সব কথা বলা হল আজ। এখন একটু রিল্যাক্স করি!
আমি মোটামুটি বড় হবার পর একবারই কেবল কোন গানের উপর ক্র্যাশ খাইছিলাম!
সারারাত অথবা সারাদিন ওই এক গানই শুনতাম, হাবিবের 'সহেনা যাতনা'।
অনেক বার মনে হইছে, এমন কোন গান কি আর শোনা হবে না?!
শেষমেশ, আরও একবার সেই আগের অবস্থা। গত বেশ কিছুদিন হল একটা গানের লুপেই আটকা পড়ে আছি। ১০/১২ দিনের মধ্যে অন্তত পাঁচ ছয়শ বার শুনে ফেলছি। দিন রাত এই এক গানই শুনছি। মিফতাহ জামান এর 'অতঃপর' ।
গানের কথাগুলো এরকম-
''যদি শেষ দেখায় এ হাত ধরে ঐ চোখ জলে ভরে;
যদি বাঁচতে ইচ্ছে হয় আরো কিছুক্ষন,
তবে রেখো না অভিমান
মনে অকারন..
মমতা যদি বা গড়ে উঠে;
যদি চেনা টানে মন ছোটে,
তবে দাও গেথে এ বেলায়
অদেখা বাধন-
ছুঁয়ে যাওয়ার এ অনুরোধে
কর না বারন..
এনেছি তোমার অনেক শখের সেই মিষ্টি উপহার;
আঙ্গুলের ছোট ছোট আদরে
নাও না শেষ বার,
কাজলের দীঘি ছুয়েই বুঝি
এত মায়ার কারন..
বুঝলো না শুধু এই
অবাক ভূবন,
দুটি হৃদয়ের সেই কথোপকথন..
এ রাতের আকাশে নেই কোথাও আজ কথা শান্তনার;
আগামী ভোরে আমাকে দেখবে না তুমি আর,
তবু কপালের এ কালো টিপ দেখবে চেয়ে যখন-
ভেবো যতদুরে থাকি করবো স্মরণ,
ভালবাসা রয়ে যাবে
আগের মতন.. ''
#
যাই হোক, অনেক হইছে।
লেখতে লেখতে রাত শেষ। এখন ঘুমানো দরকার।
আমি যাই। ঘুমাই। হাইইইইইইইইইইইইইম!!!!
ভাল থাকেন সবাই। অনেক ভাল। সবসময়।





ভালোই তো ঘুইরা ফিরা বেড়াইতেছেন। সাথে দু চারটা ছবি দিলে খুব ভালো হতো।
===================
গানটা শুনতেছি।
কেমন লাগলো গান?
এইবার ছবি তুলিনাই। সারাদিন তো বাসায়, আর রাতের ছবি মোবাইলে ভাল আসে না।
যেভাবে বললেন আমার একটু ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে। কি আর করব বলুন! পরীক্ষা চলছে। দোয়া করবেন যেন ভাল হয়, তাহলে ঘুরতে একটু শান্তি লাগবে। এমন কিছু পোস্ট আরো চাই॥ বিদায়
তোমার নাম টা খুব সুন্দর।
পরীক্ষা ভাল হবে, দোয়া রইল।
তোমার লেখা পড়ে, তোমার সম্পর্কে জেনে, মনে হচ্ছে তুমি অনেক আল্লাদি টাইপের ছেলে
। একটা কথা, শিশুরা কিন্তু তাদের মত সরল মানুষদের পছন্দ করে ।
গানটা শুনলাম ।
আহ্লাদী না
আমার তো মনে হয়
ইমোশনার বান্দর একটা! হিঃ হিঃ
আপনার লেখা চমৎকার লাগে... আচ্ছা বারান্দায় বইসা যে গান শুঞ্ছেন মশায় ধরে নাই?
মশায় তো কামড়াইবই!
পোলাপাইন মানুষ অত কিছু ভাবলে চলে নাকি!
যতো দিন যাচছে লেখার হাত আরো খুলছে। কিপ ইট আপ।
খুব ভালো লেগেছে লেখা
অনেক অনেক ধন্যবাদ, আপু।
ঢাকার বাইরে ঘোরার মজাই আলাদা... আর থাকার আশে পাশে যদি চা-বাগান থাকে, তাহলেতো কথাই নেই...
হ..
পছন্দের ডাইরী লেখকের পোষ্ট পড়তেই ভালো লাগে!
আমার একটা বন্ধু বলতো, রাত ব্যাপারটাই মারাত্নক! মনের আগল থাকে না!
মন ভালা কইরা দিলেন,আপু!
খান!
লন,
আপনের বন্ধু ২৪ ক্যারেট খাটি একখান কথা বলছে।
রাতের বেলা মানুষজনের সব মুখোস খুইলা যায়,
কপট অভিনয় আর মিথ্যা কথা বলতে ভুলেই যায়!
দারুণ সময় কাটিয়ে আসলেন। বরাবরের মতই আমি হিংসিত।
বাচ্চারা সুইট মানুষদের পছন্দ করে।
ইত্যাদি একসময় দেখতাম আগ্রহ নিয়েই। এখন আর দেখি না।
ভালো থাকেন। আপনার লেখা ভালু পাই।
এরকম মন্তব্য পেলে মন খুব খুব ভাল হয়ে যায়। অনেক অনেক ধন্যবাদ,আপু।
মন্তব্য করুন