একজন সিরাজ ভাই
আমার খুব বড় অসুখ বিশুখ হয়না , এই হাল্কা পাতলা ঠান্ডা লাগে, সর্দি, কাশ্ হাঁচি এসব হয় এ্রর বেশি সিরিয়াস কিছু না।
এমনিতে আমি হাল্কা পাতলা, কখনোই বেশি মোটা হই না যতই খাই না কেন, কিন্তু বেশি বসে থাকলে এই চিকন শরীরের ভিতর একটা পেট বের হয়ে যায়, খুব দৃষ্টিকটু ব্যাপার। পেট যাতে বের না হয় তাই একটু হাটা হাটি করি পার্কে গিয়ে। অসুখ না থাকলেও বয়স বাড়ছে, বন্ধু দের অনেকের খবর পাই হটাত করে হার্টের সমস্যা নিয়ে দেশ বিদেশের হাসপাতালে দৌড়াচ্ছে, ওপেন হার্ট করতে হয়েছে কয়েকজনের, আর ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার এসব তো খুব কমন ব্যাপার সবার ।সকাল বিকাল এক গাদা ট্যাব্লেট খায় সবাই ।
শুনেছি পরিবারের কারো কঠিন অসুখের ইতিহাস থাকলে নাকি সেটা পরের জেনারেশনের উপর আছর করতে পারে। তাই নিয়ম করে বছরে ২ বার ডাক্তারের কাছে যাই সব পরিক্ষা করে দেখতে যে যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা, আচমকা যেন বড় ধাক্কা না খাই। জীবনের প্রতি কার না মায়া আসে কন ? আর নিজেরে নিজে সবাই সব চাইতে বেশি ভালবাসে আর আয়নায় বার বার দেখে এটা হয়ত কেউ স্বীকার করেনা, কিন্তু সত্যি কথা।
বেশ ক'বছর হল ডাক্তার আমার এই চিকন শরীরে কলেস্টরালের আলামত পেয়ে আমারে প্রতিদিন একটা করে ১০ মিলিগ্রামের বড়ি খাইতে দিসে আর ব্যায়াম করার কথা বলসে। খুব আগ্রহ নিয়া এলিপ্টিক্যাল মেসিন কিনলাম।
প্রথম কয়দিন নিয়ম করে ওই মেসিনে লাফা লাফি করলাম, তারপর বিকেল হলে পার্কে গিয়ে ঘন্টা খানেক করে হাটাহাটি করলাম। কিন্তু শীতকাল এত লম্বা এখানে তাই আর হাটার জন্য বাইরে যেতে ভাল লাগেনা, ফাঁকি দেয়ার জন্য নানারকম অজুহাত নিজেই নিজের সাথে বানাই।
যাইহোক এখন গরম পড়ে গেসে, আর পার্কে যাবার আগ্রহ ও বেড়ে গেসে নানা কারণে।ব্যায়াম আর হাটা হাটি ঠিকমত না করলেও খাবার দাবারের ব্যাপারে আমি বেশ হুশিয়ার এখন।
দেশে থাকতে পয়সার অভাবে ভাল খাইতে পারতাম না। একপ্লেট বিরিয়ানি খেলে আরেক প্লেট খাওয়ার জন্য মন আকুঁ পাকুঁ করতো। বিয়ের দাওয়াত পাইলে জীবনেও মিস করতাম না। দাওয়াতে কিভাবে দুইটা চিকেন রোস্ট খাওয়া যায় তার ফন্দি ফিকির বের করতাম।দাওয়াত ছাড়াই হাই রিস্ক নিয়ে কত বিয়ে বাড়িতে দল বেঁধে খাইতে গেসি , কিন্তু ধরা পড়ি নাই।
সেই হাভাতে আমার কিনা এখন আর ওইসব রসালো রিচ খাবারের প্রতি কোন ই দুর্বলতা নাই।
অভাবে স্বভাব নস্ট এমন কিছু মনে করতেসেন সবাই। কি জানি, হইলেও হইতে পারে।
এখন আমার আর বিরিয়ানি রোস্ট খেতে ভাল লাগেনা। দাওয়াতে গেলেও আমি মানুষের বাসার ফ্রিজে ঠান্ডা সাদা ভাত আর বাসি কোন তরকারি , কাচামরিচ আছে কিনা খুজি। সকালে পরোটা মাংস আর খাওয়ার লোভ হয়না, বরং অভ্যস্থ হয়ে গেসি স্কিম মিল্ক দিয়ে এক বাটি ওট মিল সিরিয়াল, একটা সাগর কলা, আর এক কাপ লিকার চা খেতে।এখন কেউ অন্য কিছু খেতে দিলেও ভাল লাগেনা খেতে।দুপুরের খাবারে সালাদ , গ্রিল্ড চিকেন খেতেই অনেক আরাম লাগে, সুজোগ পেলে ডাল আর মাছ দিয়ে ভাত খাই কাচামরিচে কামড় দিয়ে, কিন্তু অন্য কিছুতে একেবারেই অরুচি।আর রাতে কবে শেষবার ভাত খাইসি ভুলে গেসি।
আমার এত ঢং দেখে দেশে গেলে বন্ধুরা,ভাইবোন রা খুব বিরক্ত হয়। কারন আত্মীয়রা দাওয়াত দিলে আমি আগেই বলে দেই যে ভর্তা ভাজি ডাল আর সাদা ভাত ছাড়া আমি অন্য কিছু খাবোনা। আর দেশের মানুষরা দাওয়াতে এসব খেতে লাইক করেনা। সবাই আমার উপর পুরাই খাপ্পা থাকে।আমি কি করব , দেশে গিয়ে যখুনি আমি তেলে ভাসা বিরিয়ানি আর রোস্ট খাই তারপর সারা রাত হার্ট বার্ন করে, ঘুমাতে পারিনা। বন্ধুরা বলে ," হায়রে শালা ইটালিয়ান হোটেলে খাইসস ( গুলিস্তানের রাস্তার উপর ইটে বসে খাওয়া) সারাজীবন কিছু হয় নাই, আর এখন তর ভাব বারসে " , আমি কই আরে রাগস কেন, আমিতো তগো বাজারের পয়সা বাচায়া দিলাম।
যাইহোক, আমার জীবনে চলার পথে যখন যার সাথে যেখানে পরিচয় হইসে, তার সাথে আজীবন যোগাযোগ থেকে যায় যদি না কেউ আমার লেজে পাড়া না দেয়। তেমনি একজন হলেন সিরাজ ভাই। ভার্সিটির বড়ভাই, এক ই হলে থাকতাম। ভাইএর বান্ধবি হলে আসত, কেউ যাতে বাঁকা চোখে না দেখে সেটাও দেখতে হইতো। ভাই সেসব কথা সব সময় মনে রাখে।
ভার্সিটি থেকে বের হবার পর অনেকদিন যোগাযোগ ছিলনা। শুনছিলাম বেক্সিমকোতে সাপ্লাইয়ের কাজ করে, আর আমি বিসিএস দেই, ব্যাংকে ইন্টারভিউ দেই, ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই ৬ নম্বর বাসে করে বিনা ভাড়ায় , কারন ভার্সিটির আইডি কার্ড তখনো ছিল , ওটা দেখিয়ে পার পেয়ে যেতাম।
কিছুদিন একটা ব্যাংকে কাজ করে কোন প্ল্যান ছাড়াই বন্ধুদের খোচা খুচিতে আমিও একদিন ভিসা নিয়ে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় চলে এলাম।এসে বন্ধুর ঘাড়ে বসে খাচ্ছি আর জীবনের প্রথম কেবল টিভিতে অসংখ্য চ্যানেল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম। শুনলাম সিরাজ ভাই ও নাকি এখানেই। খুশি লাগলো। বন্ধু ওনাকে ফোন করে খবর দিল আমি এসেছি। উনি শুনেই ওইদিন ই আমাকে দেখা করতে বলল। খুব আদর করে কাছে ডেকে নিয়ে খোজ খবর নিলো। ওইদিন থেকে আমার কাজ হল ওনার কাজে গিয়ে ওনার সাথে বসে গল্প করা, ওনার পয়সায় লাঞ্চ করা, ওনার সিগারেট ধংষ করা, তারপর যখন ওনার কাজ শেষ হোতো, উনি আমাকে ট্রেনের টিকেট কেটে বিদায় দিয়ে বাসায় যেতো।
সেই সিরাজ ভাই হটাত একদিন বলল , উনি দেশে চলে যাবেন, এই দেশে আর থাকবেন না, কাগজ হচ্ছে না, থেকে লাভ নাই, দেশে গিয়ে ব্যবসা করবেন এবং চলেও গেলো। আমি রয়ে গেলাম।আর ওনার দিয়ে যাওয়া চাকরি ই করতে লাগলাম। আবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
আট বছর বছর প্রথম দেশে গিয়ে ওনার খোজ করলাম। দেখি ভাই আমার বিশাল ব্যবসায়ী। বিশাল অফিস। বিশাল বাড়িতে থাকেন গুলশানে। বিয়ে করসেন। বন্দুক ওয়ালা দারয়ান বাড়ি পাহারা দেয়। ভাই রে দেখি আমার চাইতেও ইয়ং লাগতেসে। এত বিরাট পরিবর্তন দেখে আমি ত পুরাই টাস্কি।জিগাইলাম , ভাই কি লটারি পাইসেন নাকি! এত কিছুর পর ও ভাই কিন্তু আমারে আগের মতই আদর করে।যখন তখন গাড়ি পাঠায়ে ধরে নিয়ে যায় অফিসে। সারাদিন বসে পুরান দিনের গপ্প গুজব হয়, উনি বিড়ি টানেন না, আমি টানি। অফিসের বাবুর্চি মারাত্তক ভাল রান্না করে। একবার খাইলে বার বার খাইতে মন চায়। তাই ওনারে বুদ্ধি দিসি, " ভাই এক বউ গেলে দশ বউ পাইবেন, মাগার এই বাবুর্চি আর পাইবেন না, যেম্নে পারেন ওরে আটকায়া রাইখেন, আর আমি যে এই কথা কইসি এইটা ভাবিরে কইয়েন না " ,
ভাই আমার খুব স্বাস্থ সচেতন। সকাল বেলায় গুলশান পার্কে হাটতে আসে। আমারে উঠায়ে নেয় সাথে। দুই ভাই পার্কে হাটি আর পুরান দিনের গল্প করি। ওনার পার্কের বন্ধুরা হটাত আমাকে ওনার সাথে হাটতে দেখে জিজ্ঞেস করে " দোস্ত , ওবামা রে কই থিকা আমদানী করলা ",
ভার্সিটিতে পড়ার সময় মাথা ভর্তি কোকড়া চুল দাড়ির জন্য সবাই ডাকতো বব মারলি, আর এখন চুল নাই হয়ে যাওয়াতে যা আছে ছোট করে ছেটে রাখাতে নাকি ওবামা হয়ে গেসি। কি আর কমু !
দেশে যাবার আগে ভাইরে ফোন করে জিগাই, ভাই কিছু আনতে হবে আপনার জন্য? ভাই উত্তর দেয়," কি আর আনবা, জিনিস্পত্র লাগবো না, বুজলা মেয়া, আমাগো দেশে সব কিসুতেই ফর্মালিন মারে, খাইয়া শান্তি পাইনা। শুন, যদি পারো, আমার লেইগা কয়টা ফুল কপি নিয়া আইসো, অনেক দিন ফ্রেশ ফুলকপি দিয়া মাছ খাইনা " , এটা শুনা আমি হাসবো না কাদবো অনেক্ষন চিন্তা করে পরে বললাম , আচ্ছা নিয়ে আসবো। এরপর থেকে আমি যখুনি দেশে যাই অন্যদের জন্য অন্য কিছু , কিন্তু ভাই এর জন্য ফ্রেস সবজি নিয়ে যাই।





শান্তি পাইলাম সহজাত গল্প পড়ে!
ভাল লাগলো।
মন্তব্য করুন