আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
জীবনে অনেকদুর পাড়ি দিয়ে এসে আজ যখন পিছনে ফিরে তাকাই আর জাবর কাটি তখন মনে হয় আহা, কতই না সহজ আর সুন্দর দিনগুলি ছিল।যদি ফিরে পাওয়া যেতো সেই দিন গুলি ,কতই না ভাল হত !
তখন মনে হত , ইস কেন আরো তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছিনা, লেখা পড়া শেষ হচ্ছেনা, বিদেশ যেতে পারছিনা কেন? আর এখন মনে হয় যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ।
ছেলেবেলায় অল্প কিছু পেলেই মনের ভিতর একটা অন্যরকম আনন্দের অনুভুতি হোতো, যেটা এখন অনেক বড় কিছু পেলেও আর হয়না। সখের জিনিস জমানোর শুরু হয় বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট জমানো দিয়ে।
বনানি আর গুলশানের দুতাবাস আর বিদেশীদের আবাসিক বাসাগুলির আশে পাশে খুজে বেড়াতাম সিগারেটের প্যাকেট , পেয়েও যেতাম, তখন কাগজের ঠোঙ্গার নীচের সাপোর্ট দিত সিগা্রাটের প্যাকেট দিয়ে আর তাই বাসায় বাজার আনলে সব ঠোঙ্গা উল্টায়ে দেখতাম নতুন কোন সিগারেটের প্যাকেট আছে কিনা। নতুন কিছু পাইলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাইতাম।
হাইস্কুলে গিয়ে নতুন শিখলাম ডাক্ টিকেট জমানো।আর এই ডাক্ টিকেট জমাতে গিয়ে বলা যায় স্কুলের শিক্ষার বাইরেও দুনিয়া সম্পর্কে এত কিছু জানতে শুরু করলাম যে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। কত কি যে জানার আছে একটা দেশের ছোট্ট একটা স্ট্যাম্পের ভিতর যারা এটা জমায়নি বুজতে পারবে না কোন দিন। স্কুলের বন্ধুরা খোকন, মামুন, জাকির নাসিমুল আর আমি একসাথে বের হতাম নতুন স্ট্যাম্পের সন্ধানে। আমাদের সোর্স ছিল ডাকপিওন, বিভিন্ন বাসার সামনে অপেক্ষা করতাম কখন ডাকপিওন চিঠি ডেলিভারি দিতে আসবে , আর আমরা আড়চোখে দেখে নিতাম ওই চিঠিগুলির ভিতর এয়ারমেইল এনভেলাপ দেখা যায় কিনা, দেখলে আমাদের গবেষনা শুরু হত কেমন করে ওই চিঠির খামটা যোগাড় করা যায়। খামটা পেলে সেটাকে আবার পানিতে ভিজিয়ে রেখে যখন স্ট্যাম্পের আঠা নরম হোতো তারপর সেটা খাম থেকে তুলে নিয়ে নিউজপ্রিন্টের বইয়ের ভিতর রেখে দিতাম শুখানোর জন্য। বিভিন্ন দোকানপাটে স্ট্যাম্প বিক্রি করতো, আমরা কিনতে যেতাম, অনেক সময় পয়সায় কুলাতো না, দোকান্দারের দিকে করুন চোখে তাকাতাম যদি দয়া করে দাম একটু কম নেয় এই আশায়, যদি সেটা হত কি যে খুশি লাগত বলে বোঝানো যাবেনা সেই ফিলিং।
স্ট্যাম্প রাখার জন্য আবার বিশেষ ধরনের এল্বাম পাওয়া যেতো। অনেক সাধনা করে একটা এলবাম কিনতে হত।নিজেদের ভিতর আমরা ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্প একচেঞ্জ করতাম। তখন সবচেয়ে বড় স্ট্যাম্পের দোকান ছিল ফার্মগেটের " সালাম স্ট্যাম্প সেন্টার" ( এটা এখনো আছে) । এয়ারপোর্ট রোডের উপর এয়ার কন্ডিশন দেয়া খুব সুন্দর একটা দোকানের সব শোকেইস আর দেয়াল ভর্তি ছিল সারা দুনিয়ার স্ট্যাম্প। তখনকার ইচ্ছা টা হোতো এমন, " ইস আমি যদি এই সব স্ট্যাম্প গুলি নিজের জন্য পেতাম তাহলে এই জীবনে আর কিছুই চাইতাম না " , ওই দোকানে সালাম একাই থাকতো টুপি মাথায় দিয়ে। আমরা কয়জন মিলে স্ট্যাম্প দেখার ছলে দুই চারটা চুরিও করতাম ফাঁক বুঝে, পরে নিজেদের মধ্যে ভাগা ভাগি করতাম।
তারপর আবিস্কার করলাম ঢাকার জি,পি,ও তে ফিলাটেলিক বুরো নামে একটা শাখা আছে, যেখানে দেশের সব স্ট্যাম্প এর কালেকশন আছে। এবং বিক্রি ও করে। আমরা প্রায় ই যেতাম ওই বুরোতে যদি কিছু কিনতে পারি এই আশায়। ওখানে দেখতাম কিছু দুর্লভ কালেকশন যেমন দেশ স্বাধীন হবার পর পুর্ব পাকিস্তানের স্ট্যাম্পের উপর মুজিব নগর সরকারের ছাপ দেয়া বাংলাদেশ লেখা স্ট্যাম্প। যেই স্ট্যাম্প গুলি দেশের কিছু প্রবীন সংগ্রাহকরা অনেক বেশি দামে অকশনে বিক্রি করতো। শুনলে হয়ত অবাক হবেন যে, একটা ৫০ পয়সার স্বাধীনতার স্বারক ডাক্টিকেট অকশনে হাজার টাকাতেও মিলতো না।
প্রধান ডাকঘর দেশের জাতীয় দিবস, দেশের শ্রেষ্ঠ বীরদের নিয়ে, দেশের জাতীয় সম্পদ, মুক্তিযুদ্ধ, বংগবন্ধু সহ আর অনেক বিষয় নিয়ে স্বারক ডাক্ টিকেট বের করতো। ফিলাটেলিক বুরো আর পত্রিকার মাধ্যমে আমরা এসব খবর পেয়ে যেদিন টিকেট বের হবে সেদিন ভোর রাতে গিয়ে জিপিও র সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম যেনো সবার আগে কিনতে পারি। যে বিষয়ে ডাক টিকেট বের হচ্ছে সেই বিষয়ের আর্ট ওয়ার্ক যা কিনা স্ট্যাম্পে থাক্তো সেটা আবার সাদা খামের উপর লাগিয়ে ওইদিনের বিশেষ সীল মারা হোতো, আর ওই খামটাকে বলা হোতো " ফার্ট ডে কভার", অনেক প্রতিক্ষার পর যখন ওইরকম একটা নতুন প্রকাশিত স্ট্যাম্পের ফার্স্ট ডে কভার হাতে পেতাম, মনে হত যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। আহা কি যে আনন্দ লাগতো সেই মুহুর্ত গুলি, আজ যেটা কোন কিছুতেই খুজে পাইনা।
স্কুলে থাকা অবস্থাতেই শিখলাম পত্রমিতালি করা। তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ব্যাক্তিগত বিজ্ঞাপনে অনেকে পত্র মিতালি করতে চাইতো দেশ বিদেশ থেকে। আর বিদেশি ঠিকানা দেখলে চোখের সামনে ভেসে উঠতো ওই দেশের রঙ বেরঙ্গের ডাক টিকেট। আমার প্রথম পত্রমিতা ছিল সিঙ্গাপুরে থাকা একজন বাংলাদেশি ডাক্তার। উনি খুব সুন্দর কলাম লিখতেন বিচিত্রায়। সিঙ্গাপুর থেকে ডাক্তার বুলা এই টাইপের হেডলাইন দিয়ে লিখতো, আর নীচে ওনার ঠিকানা দেয়া থাকতো। ওনাকে চিঠি লিখে আহবান করেছিলাম আমার পত্রমিতা হতে আর উনি সানন্দে রাজি হয়ে আমাকে লিখতো, ওনাকে বলতাম প্রতিবারের চিঠিতে যেন ভিন্ন ভিন্ন ডাক্টিকেট লাগায়। এটা শুনে খুব হাসতো, পরে একবার এক খাম ভর্তি করে আমার জন্য অনেক টিকেট পাঠিয়েছিলেন।দেশে বেড়াতে এসে আমাকে খুব সুন্দর একটা এল্বাম, স্ট্যাম্প ক্যাটালগ, এনে দিয়েছিলেন। এত্ত খুশি হইসিলাম যে মনে হইসিলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি। তখন বন্ধুদের ভিতর আমারি একমাত্র স্ট্যাম্প চেনার ক্যটালগ ছিল, যা দেখে দেখে আমরা বুঝতাম কোন স্ট্যাম্প আসল আর তার বর্তমান দাম কত।
তখন স্টেডিয়ামের ফুটপাথে ক্রিকেটের উপর পাকিস্তানি ম্যাগাজিন পাওয়া যেতো। আর ওই পত্রিকাগুলিতে পেন ফ্রেন্ডস কলাম থাকতো, না কিনে ওখানেই দাঁড়িয়ে আমরা ঠিকানা লিখে এনে চিঠি লিখতাম, অনেক গুলি লিখলে ২/১ টা হয়ত উত্তর পাওয়া যেতো। এভাবেই অনেক পত্র মিতা যোগাড় হয়ে গেল অনেক দেশে। তখন ও এস এস সি পরিক্ষা দেই নাই অথচ ১০/১২ টা দেশে নিয়মিত চিঠি লিখে যাচ্ছি, কি যে মজা লাগতো। ওদের মাধ্যমেই আরো অনেক স্ট্যাম্প পেতাম।
এছাড়াও পেতাম ভিউ কার্ড, ম্যাগাজিন এসব। টিফিনের পয়সা জমিয়ে, বাজারের খরচ থেকে হাত সাফাই করে, শুধু স্ট্যাম্প কিনতাম আর বিদেশে চিঠি লিখতাম। আর এর মাধ্যমে আমি ওই বয়সেই দুনিয়া সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম যেটা হয়ত অনেক পরে জানতাম আরো অনেক পরে।
এই স্ট্যাম্প কালেকশনের সুবাধে চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর সব দেশের নাম বলে দিতে পারতাম, কোন দেশের রাজধানী কি, কোন দেশ কোন মহাদেশে, কোন দেশের আগে কি নাম ছিলো, কার কলোনী ছিল, তাদের ভাষা কি, মুদ্রার নাম কি, এসব জেনে ফেলতাম খুব দ্রুত।
এখন মানুষ আর কালির কলম আর কাগজে হাতে চিঠি লিখে খামে ভরে স্ট্যাম্প লাগিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে ২/৩ সপ্তাহ বা আরো বেশি দিন অপেক্ষা করেনা উত্তর পাবার জন্য। সেকেন্ডের ভিতর ই-মেইল আর টেক্সট মেসেজ করে উত্তর ও পেয়ে যাচ্ছে ছবি সমেত। আমিও এখন তাই করি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে। কিন্তু আমি বল্বো যারা কখনো হাতে চিঠি লিখে নাই আর চিঠির জন্য অপেক্ষা করে ডাকপিওনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নাই তারা কোন দিন বুঝবে না , কাগজে চিঠি লিখা আর এয়ারমেইল খামে চিঠির উত্তর পেতে আর ওই খাম খুলে ভিন দেশের মানুষের ভিন্ন গন্ধ লেগে থাকা চিঠি পড়তে কি আনন্দ ।
দেশ থেকে অনেক দূরে বসে বিজ্ঞানের অনেক আবিস্কারের ফলে আজ সব কিছু হাতের মুঠোয়। চাইলেই সেকেন্ডের ভিতর পৃথিবির যে কোন দেশে বন্ধু আত্মীয়;র সাথে কথা বলা যায় বিনা খরচে, ভিডিও ও দেখা যায়, চাইলেই যে কোন দেশ ভ্রমন করা যায়, চাইলেই যা ইচ্ছা কেনা যায়। কিন্তু তারপর ও ছোটবেলার স্ট্যাম্প জমানোর আনন্দের সাথে আজকের আনন্দের কোন ই তুলনা নাই। এখন আর কোন কিছুতেই বুকের ভিতর শিহরন জাগে না, রাতের ঘুম হারাম হয়না আনন্দে , যেমন হত ছোটবেলার ঈদের আগের দিন এই ভেবে যে কখন ভোর হবে আর কখন নতুন কাপড় পড়ে ঈদের নামায পড়ে বড়দের সালাম করলেই কচ কচে নতুন টাকা দিবে সবাই। আর সেই টাকা নিয়েই স্ট্যাম্প কিনতে যাওয়া।
হয়ত আমি আগের জমানার সেকেলে মানুষ, আর তাই আমার আনন্দ ও ছিল সেকেলে ধরনের। আজকের এই আধুনিক যুগের মানুষেরা যেভাবে আনন্দ পায় আমার কাছে সেটা নিতান্তই ঠুনকো আর কৃতিম মনে হয়।
এটা একান্ত ই আমার নিজের ভাবনা, কারো অনুভুতিতে আঘাত করে থাকলে মাফ করবেন।





দারুন দিন ছিলো!
আমার কেবলই মনে হত আমিই কেবল স্মৃতিচারণ লিখি, এখন দেখি সবাই নস্টালজিক হয়!
ভাল লাগলো।
সিঙ্গাপুরের সেই ডাক্তার বুলুর কথা ভোলা যায় ! বিচিত্রার খুল্লেই উনার লেখা পাওয়া যেতো, অবশ্যই পড়া হতো।
৫৫৪ এর দাম মনে হয় সবচাইতে বেশি ছিলো খেলায়। ম্যাচের খাপও কালেকশন হইতো, সারা দিন ঘুড়া ঐতো সিগারেট আর ম্যাচের কাপ খোঁজার জন্য।
এখন
নেন
সিগারেটের প্যাকেট !! চারা দিয়া খেলতাম, টাকার বদলে সিগারেটের প্যাকেট। কে২, বগা, ক্যাপেস্টান, গোল্ড লিফ, ৫৫৫
স্ট্যাম্প কালেকশন করা হয় নাই, গ্রামে গনজে থাকায়।
নস্টালজিক করা দেয়ায় কইষা
আমি মানুষটাই নষ্টালজিক।
থ্যাঙ্কিউ
মন্তব্য করুন