ইউজার লগইন

রোযার মাসের হাল চাল

নিয়মিত নামায না পড়লেও ছোটবেলা থেকেই কেন জানিনা আমার রোযা রাখার অভ্যাস হয়ে গেসে। আর সেই অভ্যাস দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও বাদ যায় নাই। দেশে থাকার সময়ে ঘটা করে সেহরি খাওয়ার ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন আর সেহরি খেতে পারিনা। সন্ধ্যা রাতেই যা খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি । আর ভোর রাতে উঠা হয়না।

বাচ্চাদের স্কুল সামারের দীর্ঘ বন্ধ। ওরা সবাই দেশে চলে গেসে রো্যার শুরুতেই। আমি মনে মনে প্ল্যান করসিলাম, থাক খাওয়া দাওয়ার কষ্ট হবে, তাই এবার আর রোযা করবো না। আর এমন ভেবে প্রথম দুই রোযা রাখি নাই। আমি কোন বিশাল ধার্মিক মানুষ নই, বরং ওসব পালনের বেলায় চরম অলস। কিন্তু রোযার মাসে রোযা না রাখলে এত খারাপ কেন লাগে আমি বুঝি না। নিজেকে খুব অপরাধি মনে হয়।

বন্ধুরা / ভাবীরা ফোন করে ইফতারের দাওয়াত দেয়। কিন্তু ইফতার খেতে কারো বাসায় যেতে আমার মহা আপত্তি । কাজের যায়গায় প্রথম দুই দিন রোযা না রাখাতে লাঞ্চ কিনতে যেতে হোলো। কিনে ফেরার সময় রাস্তা'র আফ্রিকান মুসলমান হকার যে কিনা আমাকে দেখলেই প্রতিদিন হাত তুলে বিশাল হাসি দিয়ে বলে "হাও আর ইউ মাই ব্রাদার।

আজ সে আমার হাতে খাবারের প্যাকেট দেখে মন খারাপ করে আমাকে না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে তাকলো। খুব অপরাধি মনে হোলো নিজেকে। আর তখুনি প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম মনে মনে, নাহ, আর ফাঁকিবাজি না, কাল থেকেই রোযা রাখবো।

প্রথম দুইটা ভেঙ্গে তৃতীয় দিন থেকে রোযা রাখা শুরু করে দিলাম। ফ্রিজে অনেক রান্না করা খাবার আছে । কিন্তু রোযার দিনে আমার হাল্কা তরকারি আর ডাল ভাত খেতেই ভাল লাগে।কিন্তু রাতে খেতে গিয়ে ফ্রিজে কোন সবজি পেলাম না রান্না করা। আছে শুধু মাছ আর মাংস রান্না করা। কোন্ মতে অল্প খেয়ে নিয়ে প্ল্যান করলাম পরদিন রান্না করবো কাজ থেকে ফিরে।

শুক্রবারে কাজ শেষ করে জ্যাকসন হাইটস এর বাঙ্গালী মার্কেটে গেলাম। দেশী চাচা'র বাঙালি চাইনিজ রেস্তোরা থেকে ইফতার বক্স কিনলাম । ছয় ডলারে দারুন ইফতার দেয়। ফ্রাইড রাইসের সাথে দুইটা ললিপপ চিকেন, একটা শ্রীম্প ফ্রাই, একটা ভেজিটেবল পাকোরা, এক টুকরা গ্রিল্ড চিকেন আর শষা গাজর। বেশি ভাজি পোড়া নাই, খেতে আরাম লাগে। প্ল্যান করেছি আজ সবজি আর ডাল রান্না করবো। তাই প্যাটেল ব্রাদার্স থেকে ফ্রেস সবজি লাউ , পুইশাক আর কাঁচামরিচ, ধনিয়া পাতা কিনে বাড়ির পথ ধরলাম।

শুধু রোযার মাসেই আমার নামায পড়া হয়। কিন্তু ফজর, এশা , তারাবি পড়ার বেলায় আমি ফাঁকিবাজ।শুধু দিনের বাকি তিন নামায পড়ি। সামারের দিন অনেক লম্বা নিউইয়র্কে। আর সেহরি খেতে না উঠার কারনে আমার রোযা আরো অনেক লম্বা হয়ে যায়। প্রায় ১৭ ঘন্টা'র রোযা। রাত সাড়ে আটটায় ইফতার করলাম চাচার দোকানের স্বুসাধু ইফতার খেয়ে, তারপর এক মগ রঙ চা। সারাদিনের উপবাসের পর এই চা অনেক আরাম দেয়। আগের সময় হলে চা এ চুমুক দিয়েই ঘরের বাইরে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ফেলতাম। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম । বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো সিগারেট টানা ছেড়েছি। এখনো ধরি নাই। ইচ্ছা আছে একেবারে ছাড়ার। জানিনা আসোলেই পারবো কিনা।

ইফতার খেয়ে মাগরেবের নামায পড়ে রান্না শুরু করে দিলাম। খুব সহজ রান্না। রাইস কুকারে ভাত চড়িয়ে দিলাম। ডাল বসালাম । চিংরি মাছ , ডাল দিয়ে পুইশাক (আমার ভিষন প্রিয় খাবার ), আর চিংড়ী মাছ দিয়ে লাউ রান্না করে ফেললাম। টেস্ট খারাপ হয় নাই। রাত বারোটায় ডিনার কাম সেহরি খাই।

দুইটা রোযা রাখা হয়ে গেসে। প্ল্যান করসিলাম এবার আর বুট মুড়ি পিয়াজু এসব ভাজি পোড়া খাবো না। স্বাস্থের জন্য খারাপ। হার্ট বার্ন করে। কিন্তু পিয়াজু খাবার জন্য জান বের হয়ে যাচ্ছিলো। আমার আবার ২/৪টা পিয়াজু হলে চলে না। খেতে শুরু করলে ১০/১২ টা খেয়ে ফেলি যদি সেটা অনেক মজা হয়।

আজ শনিবার । কাজ নাই। দেরিতে ঘুম থেকে উঠে ফোনে আরো দুই ঘন্টা পার করে দিলাম। মন্ট্রিয়েল থেকে ভাগ্নি ফোন করে খবর নিলো আমি ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করছি কিনা। যখন শুনলো পিয়াজু বুট এখনো খাই নাই খুব মন খারাপ করলো। বললো , ইস কাছে থাকলে বানিয়ে দিতে পারতাম এইসব। তারপর হটাত বলে বস্লো, " মামা আপনি তো রান্না করতে পারেন, তাহলে পিয়াজু ও বানাতে পারবেন, খুব সোজা।" তারপর রেসিপি দিলো স্টেপ বাই স্টেপ।

প্রিয় ভাগনি'র রেসিপি ফলো করে ডাল ভিজিয়ে রেখে , পরে ব্লেন্ড করে আদা কুঁচি, পিয়াজ, একটু হলুদ মরিচের গুড়া, প্রচুর কাঁচামরিচ, পুদিনা পাতা কুচি দিয়ে গরম তেলে গোল্লা গোল্লা করে ভেজে ফেললাম গোটা বিশেক পিয়াজু। য়ার ক্যান এ থাকা চিকপি'স দিয়ে বানিয়ে ফেললাম বুট।সাথে জ্যুস, সালাদ আর ফল ত আছেই। ব্যস , হয়ে গেলো আমার মজাদার বাঙালি ইফতার। খারাপ হয় নাই আমার জীবনের প্রথম নিজের হাতে বানানো পিয়াজু।

খাবার আগে সব কিছু সাজিয়ে ছবি তুলে দেখতে কেমন হইলো দেখানোর জন্য ভাগনিকে পাঠালাম ভাইবারে। ওর বাচ্চারা ছবি দেখেই হোক আর মায়ের আদেশেই হোক, খুব বাহবা দিলো ওদের নানাভাই কে।আমিও দাঁত বের করে হাসির একটা ইমো পাঠিয়ে ওদের খুশি করে দিলাম।

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


ছবিটা আমাদেরও দেখাতেন। তাহলেও আমরাও বাহবা দিতাম Smile

এরকম পোস্ট চাই। পড়তে মজাই লাগে।

টোকাই's picture


থ্যাঙ্কিউ

পরাজিত মধ্যবিত্তের একজন's picture


মাহে রমজানে বাস্তবে কি ঘটে তা নিয়ে আমার একটি গদ্য রয়েছে। পড়ার আহবান জানাই

হ্যাপি মাহে রমজান, ক্ষুধা ও খাদ্য বিলাস শুভ হোক

আরাফাত শান্ত's picture


ভালো লাগল আপনার রোজার মাসের হাল হাকিকত জেনে!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.