ইউজার লগইন

একাকীত্বের নিঃসঙ্গতায়

প্রিয় বন্ধু এসেছে ঢাকা থেকে বেড়াতে। খুব আনন্দের দিন কাটছে আমার। বন্ধুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। কথা আর শেষ হয়না আমাদের। মেয়েরা নাকি সারাদিন বক বক করতে পারে নন স্টপ এমন শুনেছি। এখন দেখছি ছেলেরাও অনেক বক বক করতে পারে।
আমি এমনিতে অনেক কথা বলার মানুষ না, কিন্তু ছাত্র জীবনের অনেক প্রিয় বন্ধুকে কাছে পেয়ে কথা আর ফুরোয় না। পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করি দুজনে মিলে আর প্রান খুলে হাসি। ইচ্ছা মত খাই দাই আর রাত জেগে অফুরন্ত আড্ডা চলে।

আমি সিগারেট ছেড়েছি দুই মাস হোলো। খুব ভয়ে ছিলাম বন্ধু এলে সিগারেট না টেনে থাকতে পারবো তো। বন্ধু আমার সিগারেট খায়না, বরং সিগারেট তাকে খায়। প্রতি ১০/২০ মিনিট পর পর একটা ধরায়। মাঝ রাতে ঘুমিয়ে পড়েও ডোর চাইমের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বুঝতে পারি বন্ধু সিগারেট ধরিয়েছে দরজা খুলে।

বন্ধু আসার কারণে বেশ কয়দিন আর ব্লগে ঢুকি নাই, লিখি নাই। আজ সময় করে ঢুকে দেখি অনেক্ লেখা। এই ব্লগের সব প্রিয় মানুষ গুলি'র মনে হয় ঈদ উপলক্ষে মনে দয়া হইসে । আর তাই সবাই লেখা দিসে। পড়ে শেষ করতে পারছি না। আমার সাথে কারও পরিচয় নাই কিন্তু সবার পুরনো লেখা আর কমেন্টস পড়ে সবাইকে চিনে নিয়েছি মোটামুটি। আর সবার ব্লগে ফিরে আসা দেখে একদিকে যেমন খুব খুশি আর ঈদ ঈদ লাগতেসে তেমনি ভয় লাগতেসে নিজে কিছু লিখতে।
এত হেভি হিটারদের মাঝে আমার মত নির্বোধের কিছু লেখা ঠিক হবে কিনা কে জানে!

রোযা সব গুলি রাখা হচ্ছে না। কিন্তু বন্ধু আসার কারনে প্রচুর দাওয়াত আর ভাল খাওয়া দাওয়া হচ্ছে । পরিচিতরা একদিকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াচ্ছে অন্যদিকে আমিও হাইকোর্ট দেখানোর মত বন্ধুকে নিয়ে এই শহরের সব ভিন দেশি খাবারের দোকানের খাবার খাই আর ভাব নিয়ে বলি কোনটা কোন দেশের রেসিপি।

১৮ মাস ধরে হাসপাতালে শুয়ে আছে আরেক বন্ধু। দেখাতে নিয়ে গেলাম বন্ধুককে সেই হাসপাতালে। রুজভেল্ট আইল্যান্ডের হাসপাতালে শুয়ে আছে ঢাকা'র রামপুরার তুখোড় ছেলে মুন্না। পুলিশের ছেলে হয়েও পুলিশ পিটিয়ে ফেরার হয়ে দেশ ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে এই শহরে পড়ে আছে মুন্না। নয় ভাই বোনের বড় মুন্না বিদেশে এসে রিটায়ার্ড বাপের দায়িত্বের বোঝা নিজের কাঁধে নিয়ে নিলো। সাত দিন কঠিন পরিশ্রম করে নিজের খরচ রেখে সব পয়সা দেশে পাঠাতো মুন্না। দেশে রেখে আসা প্রেমিকা আর অপেক্ষা না করতে পেরে বিয়ে করে হারিয়ে গেলো। মুন্না তার প্রেম ভুলে ভাই বোন মানুষ করে গেলো নিরলস ভাবে।

আমার সাথে এখানেই পরিচয় মুন্নার। বিশাল হৃদয়ের মানুষ মুন্না আমাকে অনেক পছন্দ করতো। ব্যাচেলর থাকায় মুন্নার বাসাতেই সব আড্ডা জমতো। নিজেই দারুন রান্না করতো। খাশির মাথা দিয়ে মুগ ডাল, নান রুটি সাথে এবসলুট ভদকা। সন্ধায় শুরু হলে কথা বলতে বলতে রাত শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু তবুও যেন শেষ হত না কথা। তারেক জিয়া থেকে শুরু করে সব বড় রথি মহারথিদের সাথে উঠা বসা ছিল মুন্নার দেশে থাকতে। আর এখন কেউ খবর নেয়না মুন্নার।

প্রচুর প্রানশক্তিতে ভরা মুন্না দেশের বাইরে এসে কোন দিন ডাক্তারের কাছে যায় নাই কোন সমস্যা নিয়ে। লাগামহীন জীবন আর খাওয়া দাওয়া করে দিন কাটানো মুন্না হটাত একদিন অজ্ঞ্যান হয়ে গেলো গাড়ির ভিতরেই। সাথে ছিল তিন বন্ধু। এল্মহার্স্ট হাস্পতালে নেয়া হোলো। ডাক্তার বলল স্ট্রোক করেছে মুন্না। একদম "কমা"তে চলে গেলো। খবর পেয়ে সবাই ছুটে গেলো মুন্না কে দেখতে। মুন্না তখন ইন্টেন্সিভ কেয়ারএ। দিন, সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে গেলো। কিন্তু মুন্নার আর জ্ঞ্যান ফিরছে না। তিন মাস পর ডাক্তাররা লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলতে অনুমতি চাইলো। কিন্তু বন্ধুরা অনুমতি দিলো না। এখানে মুন্নার কোন আত্মিয়স্বজন নাই। বন্ধুরাই সব ডিসিশন দেয়। সবাই জানে মুন্না আর ফিরবে না। কিন্তু কেউ আশা ছাড়ে নাই।ছয় মাস পর ঠিক মুন্না ফিরে পেলো জ্ঞ্যান। আর চোখ ,মেলে তাকালো সব ডাক্তার নার্সদের অবাক করে দিয়ে। জ্ঞ্যান ফিরলো ঠিক কিন্তু স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেললো। কাউকেই চিনতে পারছিলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সবার দিকে। বন্ধুদের পিড়া পিড়িতে হাসপাতাল পরিবর্তন করা হোলো। আরো ভাল চিকিতসা'র ব্যবস্থা হোলো। আস্তে আস্তে ফিরে পেলো মুন্না তার স্মৃতি শক্তিও। কিন্তু শারিরীক ভাবে হোয়ে গেলো প্রচন্ড দুর্বল। নিজের শক্তিতে নিঃশাস নিতে পারে না। গলায় ফুটো করে নল লাগিয়ে নিঃশ্বাস নেবার ব্যবস্থা হোলো। হুইল চেয়ারে করে চলা ফেরা করে। অনেক নিঃসংগ আর পঙ্গু বৃদ্ধদের মাঝে মুন্নাও ওদের একজন হয়ে নাম মাত্র ভাবে বেচে আছে। নিজেদের ব্যস্ততায় সবার ওকে দেখতে যাওয়াও কমে গেসে। কোন কমপ্লেইন করেনা। ঢাকা থেকে আসা বন্ধুকে নিয়ে বাঙ্গালী রেস্তোরার খাবার, পত্রিকা আর ফোন কার্ড নিয়ে দেখতে গেসিলাম মুন্নাকে । আমাদের দেখে খুশিতে চোখ চক চক করে উঠলো।ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে অনেক কথাই বলল। তার থেকে যা বুঝলাম সেটা হল ৬৫ ডলারের জন্য ইফতার আর সেহেরি খেতে পারছে না হাসপাতালের মসজিদে মুস্লিম রোগীদের জন্য ব্যবস্থা করা রোযার আয়োজন থেকে। শুনে বুক ব্যাথা করে উঠলো। যেই মুন্না যে কোন বন্ধু'র জন্য নিমিসেই শয়ে শয়ে ডলার খরচ করে ফেলতো আজ ৬৫ ডলারের জন্য ইফতার খেতে পারছে না এই কথা আমাকে শুনতে হোলো। নিরবে মুন্নার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে বের হয়ে এলাম। বের হয়ে আসার সময় দেখলাম মুন্নার চোখে পানি। দেখেও না দেখার ভান করে চলে এলাম।

ফেরার পথে দুই বন্ধু আর কথা বলতে পারি নাই। শুধু ভাবছিলাম এমন করুন অবস্থা আমাদের যে কারো যে কোন সময়েই হতে পারে। আর তখন আমাদের ও এমন একাকি নিঃসংগ সময় কাটাতে হবে হাসপাতের বেড এ শুয়ে।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কয়েকদিন আপনাকে না দেখে একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল
যে ভালো আছেন কি না। ভালোই আছেন দেখে ভালো লাগলো।

সত্যিকারের বন্ধুদের সাথে কখনোই কথা ফুঁড়ায় না, এটাই নিয়ম।

বন্ধুর সাথে সময় ভালো কাটুক। ধূমপান মুক্ত জীবনে খুব খুব ভালো থাকুন।

নিয়মিত লিখবেন, প্রথম পাতা জমজমাট দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।

টোকাই's picture


ভাই, ভাল লাগলো শুনে যে আপ্নে আমারে মিস করসেন Smile
যাক এ বি তে কেউ কেউ আমার লেখা পড়ে। অনেক ধন্যবাদ।
হ, এখন পর্যন্ত বিড়ি টানি নাই। দেখা যাক কতদিন থাকা যায়। বন্ধু নিয়ে মহা ব্যস্ত আড্ডাবাজিতে।

রাসেল আশরাফ's picture


আপনার বন্ধুটার জন্য মন খারাপ হলো।
ভালো হয়ে উঠুক এই কামনা রইলো।

টোকাই's picture


দোয়া করবেন আমার এই ভাল মানুষ বন্ধুটির জন্য। অনেক কষ্ট হয় এই মানুষটার জন্য। দেশ থেকে প্রতিদিন কত গরু ছাগল, চোর বাটপার চলে আসে ভিসা নিয়ে এই সুদুর আমেরিকায় চোরাই পয়সা খরচ করতে । কিন্তু এই অভাগা মানুষটার বাবা মা কে ভিসা দেয়না ছেলেকে দেলহতে আসার জন্য। কি অদ্ভুত দুনিয়া। Sad

রায়েহাত শুভ's picture


মনটা খারাপ হয়ে গেল...

কেউ বলছে কি না জানিনা, আমার কাছে আপনার লেখা অনেক সহজ আর সাবলীল লাগলো ...

টোকাই's picture


অনেক ধন্যবাদ আমার লেখা পড়ার জন্য। মাথায় যা আসে লিখে ফেলি তাড়াহুড়া করে। লিখার পর না পড়েই পোস্ট করে দেখি দুনিয়ার ভুল ভ্রান্তি।

জ্যোতি's picture


আহারে! খুবই মন খারাপ লাগছে লেখাটা পড়ে । অাল্লাহ কারো অবস্থাই এমন না করুন ।

টোকাই's picture


হ্যাঁ, আসোলেই মন খারাপ করার মত ব্যাপারটা। নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায়না। এক সময়ের প্রানবন্ত আসর জমানো মানুষটা এখন একা শুয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে নিরবে।

আরাফাত শান্ত's picture


খুবই চমৎকার লেখা। আপনাকে তো কবেই বলছিলাম যে আপনার লেখা পড়লে শান্তি লাগে। ভালো থাকুক বন্ধুত্ব। ভালো থাকুক বন্ধুরা।

১০

টোকাই's picture


শান্ত, আমার লেখা আমি নিজে পড়েই বিরক্ত হয়ে যাই ভুল ভ্রান্তির চোটে। তবুও আপনার ভাল লাগে শুনে খুশি হইলাম/ Party

১১

টুটুল's picture


Sad

১২

টোকাই's picture


Sad

১৩

মানুষ's picture


পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

১৪

টোকাই's picture


্মানুষটার জন্য দোয়া কইরেন ।

১৫

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ভাল লাগলো বন্ধুকে নিয়ে চমৎকার লেখাটা।

১৬

টোকাই's picture


অনেক ধন্যবাদ Smile

১৭

জেবীন's picture


আপনার লেখা অনেক সাবলীল, কারুর সাথে কেন তুলনায় যাবেন, নিজের মনের মতোন লিখতে থাকেন।
এই যে বন্ধুটার কথা জানালেন তার ইচ্ছে স্বপ্ন, স্ট্রাগল আর উনার এখনকার কষ্ট এই যে সবাইকে ছুয়েঁ যাচ্ছে, উনার জন্যে সবার মন খারাপ হচ্ছে, এসব তো আপনার লেখার কারনেই হচ্ছে, এমনি করেই নিজের মতোই লিখেন।

১৮

টোকাই's picture


না ভাই, কারো সাথে তুলনা করার সাহস আমার নাই। আমি কোন লেখক না। দলিল লেখক টাইপ। এক আঙ্গুলে টাইপ করি। নিজের যা মনে আসে লিখে ফেলতে পারলে খুব শান্তি লাগে। যদিও অনেক ভুল লিখে ফেলি। এ বি'তে লিখে মজা পাই। সবাইকে আপন আর কাছের বন্ধু মনে হয় না চিনেই। ভাল লাগে যহন দেখি সবাই একটা পরিবারের মত আন্তরিক। এমন যদি আমাদের দেশের সব মানুষগুলি হত, ভাবতেই মন ভরে যায়।

আপনার কমেন্ট এর জন্য অনেক খুশি।

১৯

মীর's picture


কষ্ট হচ্ছে আপনার বন্ধুর জন্য।

২০

বিষাক্ত মানুষ's picture


সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন

২১

তানবীরা's picture


আপনার বন্ধুটার জন্য মন খারাপ হলো।
ভালো হয়ে উঠুক এই কামনা রইলো।

২২

টোকাই's picture


সবাই দোয়া করবেন এই মানুষটির জন্য। ৫ আগষ্টে ওর একটা বড় অপারেশন হবার কথা

২৩

সামছা আকিদা জাহান's picture


ভাল থাকুক বন্ধুরা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.