ইউজার লগইন

বাবার পোশাক

বাবাকে নিয়ে কিছু লেখা আমার জন্য কঠিন,বাবার সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো না, বরং বলা যায় আমি তাকে চিনতাম না। যে বয়েসে অন্তরঙ্গ নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে উঠে, যে বয়েসটাতে আবদার আর প্রশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয় সম্ভবত সরকারী চাকুরে বাবার অনুপস্থিতিতে সেই সম্পর্কটা তৈরি হতে পারে নি। বাবার সাথে আমার সম্মানজনক দুরত্ব ছিলো এবং এখন মনে হয় এই দুরত্বটা পারস্পরিক নির্লিপ্ততার চেয়েও বেশী ছিলো সম্পর্কহীনতার দুরত্ব। তার সাথে আমার যে সম্পর্কটা তৈরি হয় নি শৈশবে পরবর্তী জীবনে সে সম্পর্কের ছায়াটা আর দীর্ঘ হতে পারে নি।

প্রতি বছর বড় কোনো চুটির সময় যখন পাশের বাসার খালা ছুটে এসে আম্মাকে খবর দিতো বুবু দুলাভাই এসেছে তখন আমার ভেতরে নতুন কোনো প্রত্যাশা তৈরি হতো না। বাবা ট্রেনে করে বাসায় যত রাতেই পৌছাক না কেনো কলপাড়ে গিয়ে ঝাপুস ঝুপুস গোসল করছে, তারপর লম্বা চুলটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে খেতে বসছে, আমি তখন কাচা ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি, সেই গোসলের শব্দের বাইরে শৈশবের বাবার চেহারা মনে পড়ে না এখন।

প্রতিবারই আমার আর আমার বোনের জন্য বিস্কুট কিংবা আনন্দের কেকের সাথে বাড়তি আসতো বইয়ের বোঝা, শিশু, নবারুণ, আব্দুল্লাহ আল মুতি আর আলী ইমামের বইয়ের সাথে পরদিন সকালটা শুরু হতো ভিন্ন আবদারে।

আমাকে সুসংস্কৃত করবার সবকটা উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে বলা যায় নিশ্চিত ভাবে, সকালের নাস্তা খেতে খেতে প্রথম যে কথাটা শুনতাম, বাবু একটা কবিতা লিখো। একটা ছবি আঁক , আমার ছবি আঁকবার কিংবা গল্প লিখবার কিংবা কবিতা লিখবার ক্ষমতা ছিলো না, আমি নিতান্ত নির্বোধটাইপ বাচ্চা ছিলাম, বাসার সদর দরজা থেকে আম তলার শেকড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো আমার শৈশবের গন্ডী। সেখানেই বাসার বাতিল জিনিষ নিয়ে আমার খেলাঘর ছিলো। ঘুম থেকে উঠেই যখন আমার সাধ্যাতীতি বিভিন্ন কাজের আবদার শুরু হতো সেটা যে আমার খুব আনন্দের সময় ছিলো এমন না, আমি কোনো মতে কাকের ঠ্যাং বগের ঠ্যাঙ লিখে, এঁকে , বিস্কুটের কৌটা নিয়ে ঘরের কোণে বসে বই পড়তাম।

পরবর্তীতে বাবার শখ হলো আমাকে গান শেখাবেন, তালকানা আমার গান শেখা হয় নি, রেওয়াজের দ্বিতীয় দিন ওস্তাদজী বের করে দেওয়ার পর গায়ক হিসেবে আমার ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেটা বুঝে নিতে বাবার দেরী হয় নি। সুতরাং আমি ক্যাবলাকান্ত থেকে গেলাম। বাবাও ছুটি শেষে চলে গেলো কুমিল্লা, যশোর কুমিল্লা হয়ে যখন দিনাজপুরে ফিরলো বাবা তখন আমি বেশ বড়, তবে সে বয়েসে বাবার কল্যানে আমি তাস খেলা শিখেছি। অন্তত এই একটা বিষয়ে আমার দক্ষতা তৈরির কৃতিত্ব বাবার।

তাসের সুবাদেই বাবার সাথে একটা প্রতিদন্ডীতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো, রঙ মেলানো, জোড়া মেলানো দিয়ে শুরু করে ফিশ, স্ক্রু, স্পেড ট্রাম, ব্রে আর ব্রীজ , সেসব তাসের আড্ডায় অন্তত আমি শিখেছি হাতের তাসের হিসাব ভুল করতে হয় না। সবার হাতের তাসের খবর নিতে হয়, জানতে হয়, গুনতে হয় হাতের সব তাস, সেকানে ভুল করা চলবে না। ভুল করলেই, একটু বেখেয়াল হলেই ব্রের বিবি কপালে জুটবে। গড়পরতা মানুষের চেয়ে আমি এখনও তাস ভালো খেলি কিংবা নিজের হাতটা ভালো করে খেলতে পারি।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নিজেকে যেমন বড় বড় লাগে, যেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নিজেকে আমাদের অগ্রজেরা তেমন গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত ছিলো না, সুতরাং নাটকের টিকেট না পেয়ে যখন বাসার সামনের নাচ গান শেখানোর স্কুলটার ফুলের টব আর জানালার কাঁচ ভাঙলাম
তখন বাবা ডেকে নিয়ে বেশ শক্ত ধ্যাতানি দিলো, বললো এরপর যদি কখনও শুনি তাহলে আমি তোমাকে পুলিশে দিবো, আমাকে গিয়ে সব কর্তাব্যক্তিদের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করে আসতে হলো।

বাবার আপাত নির্লিপ্ততা কিংবা সম্পর্ক নির্মানের অনভ্যস্ততা হয়তো আমাকেও আক্রান্ত করেছে, যে মেয়েটাকে ভালোবাসতাম তখনও তাকে ভালোবাসি বলা হয় নি, এই রুদ্ধ ভালোবাসার চাপে এইচএসসিতে দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতা লিখবার ব্যামোও ধরলো ভালোমতোই, কবিতা, নেশা সব কিছু মিলিয়ে উপভোগ্য সময়টা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেলো, এইচএসসি পরীক্ষার তারিখও দিয়ে দিলো। উপলব্ধি করলাম আসলে আড্ডায় আড্ডায় ব্যস্ত থেকে পড়া হয় নি কিছুই। এভাবেই পরীক্ষার আগের রাতে হঠাৎ করেই প্রচন্ড জ্বরে কাঁপছি থরথর, বাবা ঘরে ঢুকেই প্রথম বললো ' কি রাসেল পরীক্ষার ভয়ে জ্বর চলে আসলো?'

প্যাকেটের সিগারেট তিতা লাগছে, মেজাজ প্রচন্ড খারাপ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম, শুয়ে শুয়ে বাবার স্যান্ডেলের শব্দ শুনছি, বারান্দায় বাবা হাটছে, তার স্যান্ডেলের শব্দ একবার ঘরের দরজা থেকে অন্য দিকে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে ঘরের দরজায়।

পরীক্ষা শেষের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগের সম্পূর্ণ সময়টা কেটেছে নেশায়, প্রচন্ড নেশায় টলোমলো বাসায় ফিরে ঘরের আসবাব উলটে পালটে , সারা রাত বমি করে, কোনোমতে বিছানায় উপুর , পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে বাবার সাথে দেখা, বাবা সরল গলায় প্রশ্ন করলো , তোমার দিনে কয়টা সিগারেট লাগে? তুমি কিসের নেশা করো?
নেশার স্বীকারোক্তি দেওয়া নিয়ে তেমন সমস্যা হলো না, বললো ঠিক আছে আর করবে না। আমিও বললাম ঠিক আছে আর করবো না। সেখানেই আমার নেশার এডভেঞ্চার শেষ, পরে টুকটাক দুই একবার গাঁজায় টান দেওয়া হয়েছে কিন্তু নিয়মিত সিগারেটের বাইরে অন্য কোনো নেশা আর করা হয় নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বাবাকে যখন রাজনৈতিক কারণে ফরিদপুরে বদলি করা হলো তারপর বাবার সাথে আমার খুব বেশী দেখা হয় নি, ফরিদপুরে আমি গিয়েছি দুইবার দুই বিকেলের জন্য, আর এখানে এত ব্যস্ততায় বাবার সাথে দেখাও হয় নি। এমএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের পর যখন বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনলাম তখন মনে পড়লো গত কয়েক মাসে বাবার সাথে আমার কোনো কথাই হয় নি।

আমি বাবার মৃত্যুতে কাদতে পারি নি, আমরা পরস্পরকে চিনতাম, পরস্পরের ভালোও হয়তো চাইতাম, কিন্তু আমাদের ভেতরে সম্পর্কের উত্তাপ ছিলো না, আমি জানি না বাবা আমার অভাব কখনও উপলব্ধি করেছে কি না, আমি সে সময়টাতে বাবার অভাব বোধ করি নি, বাবার গুরুত্ব আমাকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে হয়েছে, বাবা গাছের মতো আগলে রেখেছিলো বলে সংসারের অনেক কিছুর আঁচ আমারে গায়ে লাগে নি, আমি দিব্যি গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরতে পেরেছিলাম, অর্থের মর্যাদা বুঝি নি, উপার্জন করতে শিখি নি, সেসব ঝাপটা পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন ভাবে উপলব্ধি করেছি। শিক্ষার একটা অংশ সন্তানকে স্বাবলম্বী হতে শেখানো, স্নেহবশত হয়তো বাবা জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটাই আমাকে শেখাতে পারে নি।

আমি বাবা হয়েছি, বাবা হওয়ার পর থেকেই উপলব্ধি করছি বাবা হওয়াটা একটা বিশাল চাপের বিষয়, আমাকে শিখতে হচ্ছে, প্রতিনিয়ত শিখছি, বাবারা এভাবেই হয়তো বাবা হয়ে উঠে, বাবা মারা যাওয়ার পর আম্মা আনুষ্ঠানিক ভাবে বাবার ঘড়িতা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলো, সে ঘড়ি আমি ব্যবহার করি নি কখনও, হয়তো সে ঘড়ি অবহেলায় হারিয়ে গিয়েছে কোথাও, কিন্তু যত সময় যাচ্ছে আমার মনে হচ্ছে আমার অসতর্ক কোনো মূহূর্তে বাবার অভ্যাসগুলো ঢুকে গেছে আমার ভেতরে , আমি প্রতিদিনই আরও বেশী করে বাবার রেখে যাওয়া পোশাকে ঢুকে যাচ্ছি।

পোস্টটি ২২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রুম্পা's picture


লেখাটির জন্য ধন্যবাদ..

লীনা দিলরুবা's picture


লেখাটা পড়ে মন টা খারাপ হয়ে গেল।
লেখককে বাবা রূপে দেখেছি - অসাধারণ এক পিতা তিনি। অনন্য।

রাসেল আশরাফ's picture


লেখাটা ভালো লেগেছে ।

রায়েহাত শুভ's picture


বাবা দিবসের শুভেচ্ছা...

যদিও আমি দিবস মেনে চলার পক্ষপাতী না, তবুও...

চাঁদবেনে's picture


প্রতি মূহুর্তে মনে হচ্ছিল আমার বাবার কথাই পড়ছি।
সিজার পাভিস একবার বলেছিল, মানুষ তখনই বড় হয়ে ওঠে যখন দেখে তার চেহারা আস্তে আস্তে তার বাবার মত হয়ে উঠছে। মনে আছে, একবার আমার চেহারার মধ্যে বাবার প্রোফাইল ফেলে একটা পোর্ট্রেট একেছিলাম। আমিও ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে বাবাকে খুঁজে পাচ্ছি। একেই হয়ত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া বলে।
আমার বাবাও রাতের ট্রেনে আসতেন। আমার ঘুম ভাঙ্ত না। মা আমাকে জাগানোর চেষ্টা করে বাবার আনা কমলার কোয়া মুখে পুরে দিতেন। আধাঘুমজাগরনের মধ্যে কমলার ঠান্ডা এখনো আমার মুখে লেগে আছে।

সামছা আকিদা জাহান's picture


লেখককে কিছু বলার নেই আমার। আমার দুষ্ট বাবাটা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আমাকে কোন খবর না দিয়েই হঠাৎ করে।
আমি আমার বাবাকে নিয়ে লিখতে বসি পারি না। বাবা আমার জীবনের একটা খুব বড় আংশ। আমি আর লিখতে পারছি না। ধন্যবাদ।

হাসান রায়হান's picture


অনেক অমিল আমার সাথে।

রাসেল's picture


আপনি কি তাস খেলতে গিয়া ধরা খাইয়া বাপের পিটানি খাইছেন?

একজন মায়াবতী's picture


ভালো লাগলো আপনার বাবার পোশাকে ঢুকে যাওয়া।

১০

শওকত মাসুম's picture


বাবার সাথে এর চেয়েও বেশি দূরত্ব ছিল। বাবা সহজে আমাদের মিশতে পারতেন না। স্নেহ, আদর প্রকাশও করতে পারতেন না। আজ বাবা নেই। এখন মনে হয় আরেকটু কাছে নিজেই কেন গেলাম না। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবাকে বেশি মিস করি, জীবিত থাকার সময়ের চেয়ে।

১১

রাসেল's picture


হোস্টেলে থাকলে মনে হয় মায়ের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয় চিঠিতে, বাবার সাথে চিঠিপত্রের সম্পর্ক তৈরি হয় না, ক্ল্যাসিক্যাল অর্থ চাহিয়া চিঠি লেখা ব্যতিত বাবার কাছে চিঠি লেখার উপকরণের অভাব আছে মনে হয়।

বিষয়টা অন্য দিক থেকে ভাবলে মনে হয় বেড়ে উঠবার সময়ের দ্বন্দ্বটা বাবার সাথে ভাগাভাগি করার সুযোগ থাকে না, পারিবারিক কারণে কিংবা সামাজিক কারণে সেইসব সম্ভব হয় না।

১২

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এত সুন্দর করে বাবার সাথে আপনার দুরত্বপূর্ণ সম্পর্কটা তুলে ধরলেন ! থ্যাংকু জনাব Big smile

১৩

রাসেল's picture


গ্লোবালাইজেশনের ধাক্কায় দুরত্বটা আরও মারাত্মক হবে ভবিষ্যতে, এখন যতটুকু আছে তার চেয়ে অনেক বেশী দুরত্বের সম্ভবনা নিয়েই বেচে থাকতে হবে আমাদের, সেসব বিচ্ছিন্নতা আরও সুন্দর করে তুলে ধরা কি সম্ভব হবে?

১৪

মাহবুব সুমন's picture


Sad

১৫

জ্যোতি's picture


আমার নিজেকে মনে হয় যেনো বাবারই যেনো এক ছায়া আমি। মন ছুঁয়ে গেলো লেখাটা। আপনার ছেলের সাথে আপনাকে দেখলেও মন ভরে যায়।

১৬

সামী মিয়াদাদ's picture


পুরাই উল্টা...আমাদের সম্পর্কটা পুরাই উল্টা

ভালো লাগলো আপনার অনুভূতি...

১৭

তানবীরা's picture


প্রচন্ড মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা Sad

১৮

সুমি হোসেন's picture


ভালো লেগেছে খুব।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.