ইউজার লগইন

আধুনিক জীবনযাপ্ন ০১

এভাবেই চক্র পূর্ণ হয়, তুমি সন্তান হিসেবে জন্মেছিলে, পৃথিবীর রং-রূপ-রসআস্বাদন করে তুমিও যুবক হবে- তোমার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য বহন করছো তুমি, তোমারও সন্তান হবে- আবারও নতুন চক্রের শুরু হবে- এ চক্রের শেষ নেই।

এই কথাগুলো অতীতে কেউ না কেউ বলে গেছে আমি নিশ্চিত- যেকোনো ধর্মগ্রন্থে কিংবা তার ব্যাখ্যায় কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের চক্রের বর্ণনায় এটা উদ্ধৃত হয়েছে নিশ্চিত ভাবেই- পৃথিবীতে নতুন কিছুই ঘটে না, অতীত পুনরাবৃত হয়। কোথায় পড়েছি, শুনেছি মনে নেই বলে উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া সম্ভব হলো না।

আমরাও অতীতে ফিরে যাচ্ছি, আহারে- আভুষণে- অলংকারে আমাদের অতীতচারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিদিন। অনেক দিন পরে বিজ্ঞান আবিস্কার করছে অতীতের জীবনযাপনপদ্ধতি অনেক বেশী স্বাস্থ্যসম্মত ছিলো, অতীতে নিতান্ত বাধ্য হয়েই মানুষেরা যেমন জীবনযাপন করতো সে জীবনযাপনে ফিরে যেতে আমাদের দিস্তা দিস্তা কাগজ ক্ষয় করতে হয়েছে- কাউকে না কাউকে গবেষণা করে বলতে হয়েছে আমাদের জীবনযাপন অস্বাস্থ্যকর হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

সামাজিক জীবনটা অনেক দিন ধরেই অস্বাস্থ্যকর- অস্থিরতা ভীষণ রকম বেড়েছে, সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে- বিবাহবহির্ভুত অবৈধ সম্পর্কের পরিমাণ হয়তো স্থির আছে কিন্তু আধুনিকতা বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কে এক ধরণের অপরাধবোধ সংযুক্ত করেছে। আপত্তিকর মানসিক যন্ত্রনাটুকুর বাইরে বিবাহবহির্ভুত কিংবা অবৈধ সম্পর্কগুলো স্বমহিমায় বহাল। নৃশংসতা কিংবা অকারণ নৃশংসতার পরিমাণটুকু নিশ্চিত ভাবেই বেড়েছে। এই সামাজিক অধোগতি আমলে না আনলে আমাদের জীবনে তেমন বাড়তি কোনো পরিবর্তন আসে নি।

আমরা আগেও বর্বর ছিলাম, এখনও বর্বর- কেউ কেউ নিজেকে বর্বর হিসেবে মেনে নিতে ভীষণ রকম আপত্তি জানাবে- আমাদের বর্বরতা অতীত বর্বরতার চেয়েও ভয়ানক এবং স্বস্তিদায়ক সে বিবেচনায়। অতীতে গোত্রে গোত্রে ব্যবধান ছিলো এবং সে ব্যবধানে অন্য গোত্র আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ সময়ই অপরাপর গোত্রে কোনো ভাবান্তর হতো না, এখন বিষয়টা ব্যক্তিগত- আশেপাশের বর্বরতায় আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই, আপাতত আমরা বেঁচে আছি সেটুকুই সুখবর- পৃথিবী উচ্ছন্নে গেলে যাক, এই চর্চিত বিচ্ছিন্নতা কিংবা আধুনিকতা আমাদের বাড়তি কিছু সুবিধা দিয়েছে। সাংস্কৃতিক উচ্যমন্যতার পরিসর তৈরি করেছে, ওরা পঁচা আমরা উঁচার চর্চা সম্ভব হয়েছে।

উপমহাদেশের অর্থনীতিতে গ্রাম এক ধরণের স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট ছিলো, সেখানেই গ্রামের সকলের চাহিদা পুরণের পর্যাপ্ত দ্রব্য উৎপাদিত হতো, সেখানেই বিপণন হতো- সম্রাটের রাজস্ব হিসেবে উৎপাদিত শস্য গুণে দিলে অন্য কোনো কারণে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন পরতো না।
রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলেও কৃষকের ক্ষেতে আগুণ জ্বলতো না অধিকাংশ সময়ই।
ইংরেজদের আগমণে সাময়িকভাবে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিতে নগদমুদ্রার প্রচলন হলো, উৎপাদক কিছু সময়ের জন্য কাঁচাপয়সার মুখ দেখলো কিন্তু মাত্র ৫০ বছরেই গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিতে উৎপাদক খাতকে পরিণত হলো। পূঁজিবাদী শোষণের সবচেয়ে জঘন্য পরিস্থিতিটুকুর স্বীকার হলো উপমহাদেশের গ্রামীণ উৎপাদকেরা।

কলের কাপড়, কলের তৈজস, কলের কালি, শিল্পায়নের যুগে ব্রিটিশ শিল্পের নিশ্চিত বাজার তৈরির জন্য ধীরে ধীরে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংস করে দেওয়ার অপরাধটুকু ক্ষমা করা যায় না। উৎপাদককে উৎসবিচ্ছিন্ন করে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকে পরিণত করেছে ঔপনিবেশিক শাসন।

আগে যে মানুষটা মাটির হাঁড়ি বানাতো, সে হাঁড়ি সে বিক্রি করতো গ্রামের হাটে- সেখান থেকে দ্রব্য নিয়ে নিজের চাহিদা পুরণ করতো সে, যে মানুষটা কাঠের চামচ বানাতো, সে মানুষটাও গ্রামের হাট থেকে তার নিজের চাহিদামতো দ্রব্য নিতে পারতো তার শ্রম এবং সৃষ্টিশীলতা ব্যয় করে। কলের চামচ টেকসই বেশী, কলর হাঁড়ি টেকসই বেশী- মিলের কাপড় সস্তা টেকসই- এভাবেই কামার-কুমোর- সবাই নিজের জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছে।
প্রায় ২০০ বছর আমরা এভাবেই কলের জিনিষের জয়গান গেয়েছি।

এখন আবার উৎসে ফেরার পালা, আার মাটির বাসন, মাটির হাঁড়ি, কাঠের চামচ, সবই ফিরে আসছে, অর্থনীতিতেই ব্যপক পরিবর্তন এসেছে। আগে এসব ছিলো দরিদ্র মানুষের নিজস্ব প্রয়োজনের জিনিষ, সেটা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী ছিলো না কিন্তু তৈজসের ভঙ্গুরতা অর্থনীতির চক্রটা ঠিকঠাক সামলে রাখতো। এখন এসব একটু হালফ্যাশানের সঠিক বাঁচতে চাওয়া মানুষের চাহিদায় পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের আগ্রহে তারা পুনরায় অতীতচারী জীবনযাপন করছে- কিন্তু এখন এইসব উৎপাদক স্বাধীন ব্যবসায়ি নন, তারা কোনো এনজিওঅর্থায়নে পরিচালিত সমবায়ের শ্রমিক, ঋণখাতক কিংবা নিছক পেটেভাতে চালিয়ে যাচ্ছেন কাজটা।

সেদিন দেখলাম অবসরপ্রাপ্ত দেহপসারিনীদের তৈরি বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন- এসব প্রসাধনী, সাবান- উপটান- গৃহস্বজ্জার জিনিষপত্র সবই মূলত বিদেশী ক্রেতাদের জন্য- দেশের মাত্র কয়েকটি দোকানে এই এনজিও জিনিষপত্র সরবরাহ করে। সেসব স্বাস্থ্যসম্মত রুপটান তৈরি করা মানুষদের জীবন কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত সে সংবাদ অবশ্য বিজ্ঞাপনে খুঁজে পাই নি।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


মূল কথা কোনটা ঠিক ধরতে পারলাম না Puzzled

রাসেল's picture


চক্রসমাপ্ত হচ্ছে,সেটাই সংবাদ- প্রতি চক্র আসলে একই রকম থাকে না, চক্রের উপাদান সব ঠিক থাকলেও উপাদানগুলোর সম্পর্ক বদলায়

আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে মাটির-কাঠের থালা, গহনা, তাঁতের পোশাক ত্যাগ করেছিলো আমাদের আগের কয়েকটা প্রজন্ম- আমরা পুনরায় আরও আধুনিক হয়ে মাটির-কাঠার থালা গহনা তাঁতের পোশাকে ফিরে গেছি

বহুজাতিক রূপটানের বদলে এখন আবারও ভেষজ রূপটানে ফিরে যাচ্ছে মানুষ সেটাই স্বাস্থ্যসম্মত-

এই অর্থনৈতিক চক্র রূপান্তরের ভেতরে উৎপাদক-ভোক্তার সম্পর্ক এমন কি উৎপাদন উৎপাদকের সম্পর্ক বদলে গেছে-

আগের উৎপাদক-শিল্পী হয়তো ততটা বিখ্যাত ছিলেন না , কিন্তু তার জীবনযাপনের মাণ ভোক্তার তুলনায় একেবারে খারাপ ছিলো না, নতুন পরিস্থিতিতে যারা এমন উৎপাদক তাদের জীবনযাপন ভোক্তার তুলনায় হীন , আগের স্বাধীন উৎপাদন, শৈল্পিকতার সম্পর্ক এখন কাজ তুলে দেওয়ার সম্পর্ক, সেখানে সৃষ্টিশীলতার অবকাশ নেই।

তানবীরা's picture


আমার মতে, আসলে পুরো ব্যাপারটাই বানিজ্য। আমাদের দেশে বিভিনন ধরনের মেশিনের প্রতি মানুষের অনেক আকরষন। বিদেশ এলেই যেটা আগে কিনতে যায় তাহলো মেশিন। ডিম সিদধ করার মেশিন শুদধ কিনবে।

এদিকের লোক এখন ভেষজ রূপটানে ঝুকেছে। কিনতু ব্যাপারটা সাময়িক। আবার অন্যদিকে ঘুরে যাবে সময়র সাথে। মানুষ জীবনে আসলে রেনডম পরিবরতন চায়

সামছা আকিদা জাহান's picture


আমি একটু কঠিন করে চক্র বুঝাই । কার্ল মার্কসের ভাষায় শাসক ----শোষিত-----শোষিত-- শাসক---- থাক আর বেশি বললে সবাই আতেল বলবে।

অনিমেষ রহমান's picture


কলের কাপড়, কলের তৈজস, কলের কালি, শিল্পায়নের যুগে ব্রিটিশ শিল্পের নিশ্চিত বাজার তৈরির জন্য ধীরে ধীরে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংস করে দেওয়ার অপরাধটুকু ক্ষমা করা যায় না। উৎপাদককে উৎসবিচ্ছিন্ন করে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকে পরিণত করেছে ঔপনিবেশিক শাসন।

হুম !!

৬ টি তার's picture


মাথার উপর দিয়ে গেল।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এখন আবার উৎসে ফেরার পালা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.