পেডাগগি
বিল গেটস ডেস্কটপ কম্পিউটার সহজলভ্য করে তুলবার আগে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ গবেষকগণ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এ দক্ষ ছিলেন, তাদের গবেষণাগারের বাইরে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর আবেদন ততটা ছিলো না, শুধুমাত্র বিজ্ঞানের ছাত্রদের একাংশ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সম্পর্কে জানতো, ফোরট্যান শিখতো , অন্য সব কম্পিউটার প্রোগ্রাম তখনও সম্ভবত জন্ম নেয় নি, কিন্তু উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম বাজারে আসবার পর মূলত পরিস্থিতি বদলে যায়, আইসিটি ক্লাশরুমের ধারণাটা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠে, শিক্ষাগবেষণাক্ষেত্রে আইসিটি ক্লাশরুমের প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো কতটা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে, কতটা মূলত শিক্ষাবিস্তারের আন্তরিকতায় এ সংশয়টুকু রয়েই যাচ্ছে।
শিক্ষাগ্রহন পদ্ধতি সম্পর্কে খুব বেশী পড়াশোনা করি নি, তেমন গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাও যে জানি এমনটা বলবো না, তবে পড়তে গিয়ে জেনেছি কিছু কিছু শিক্ষার্থী ভিজ্যুয়াল, তারা চলমান দৃশ্য কিংবা শব্দ ও চলচিত্র দেখে শিক্ষাগ্রহন করতে দক্ষ, তাদের জন্য আইসিটি আদর্শ। তিন দশক আগেই সঙ্গীত, সুরে গণিত পড়ানোর ধারণাটা প্রচলিত হয়েছিলো এবং ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো, তখন শিক্ষাগবেষণায় জানা গেলো শিক্ষার্থীরা গণিত ভয় পায়,তাদের সঙ্গীতপ্রীতি এবং গণিতভীতিকে কাজে লাগিয়ে এক দল মানুষ বিভিন্ন ছন্দে সুরে গণিতের সূত্রগুলো উপস্থাপন করলেন, মেমোরাইজেশনের সুবিধা হলো, কারণ গবেষণায় জানা গেছে ছন্দোবদ্ধ বিষয়গুলো মানুষ বেশী মনে রাখতে পারে কিংবা এ বিষয়গুলোতে তাদের অধিকতর মনোযোগ
অপরাপর শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ " চক এন্ড টক" অর্থ্যাৎ পুরোনো প্রথাগত শিক্ষাপ্রদান পদ্ধতি যেখানে সীমিত কয়েকটা যন্ত্র হাতে নিয়ে শিক্ষক ক্লাশ রুমে ঢুকবেন, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা শুরু করবেন, কখনও প্রয়োজনে তিনি সরল যন্ত্র হাতে নিয়ে আসবেন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন মূল নীতি শেখানোর জন্য হয়তো কয়েকটা সরল যন্ত্র নিয়ে আসবেন, এভাবে প্যাসিভ কিংবা একটিভ পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান চলবে, শিক্ষার্থীরা শিখবে।
দুরশিক্ষণ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়েছে, ক্লাশরুম লেকচার কিংবা ভিডিও লেকচার দুটোর ব্যবসাই জমজমাট, এমন কি ঘরে বসেই কিভাবে ক্লাশরুমে ছাত্রদের শেখাতে হয় এমন কোর্স করছে লোকজন, তাদের অনেকেই ক্যারিয়ার বদলাতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহন করতে চায়, তাদের অন্যান্য কাজের ফাঁকে টিচিং ডিপ্লোমার পর্যাপ্ত সময় নেই, তারা অনলাইন টিচিং ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হচ্ছে অন লাইন লেকচার নামাচ্ছে, ভিডিও দেখছে, সপ্তাহে েকবার কোর্স ইনস্ট্রাকটরের সাথে ফোনে আলোচনা করে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষকতা সনদও পেয়ে যাচ্ছে- বাংলাদেশে পরিস্থিতি অন্য রকম, এখানে স্কুল শিক্ষকতার জন্য কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না, শিক্ষাপ্রদান পদ্ধতিতে যে যুগান্তকারি পরিবর্তন এসেছে এমনটাও বলা যাবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ধারা আছে, সেখানে তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করে, কেউ কেউ হয়তো বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহায়তা নেয়।
শিক্ষকতা একটা পারফর্মিং আর্ট, বাচনিক যতটা ততটাই শরীর সঞ্চালনের- একই সাথে বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানটাও প্রয়োজনীয়। আমি মাঝে মাঝেই অন লাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টার্যাকটিভ লেকচারগুলো দেখি, কিছুটা আক্ষেপও জন্ম নেয়, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের এই সুযোগটা হলোই না কখনও, কলোরেডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা আছে, মূলত মিডল স্কুল কিংবা ক্লাশ এইট থেকে এইচ এসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা এইসব লেকচারে বিষয়বস্তুর গভীরতা খুব বেশী নেই, কিন্তু দৃষ্টিনন্দন এবং কিছুটা ধারণা তৈরি করতে সক্ষম সেসব।
এমন পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড তৈরি কিংবা ভিডিওগ্রাফিক্সের সাহায্যে পড়ানোর ধারণাটার জন্ম ও বিকাশ হয়তো এক যুগের, তার সামান্য আগেই প্রাচীণ ল্যাবরেটরিতে পুরোনো এনালগ জিনিষ বাদ দিয়ে ডিজিট্যাল যুগের সূচনা হয়েছে, ভাবছি আমাদের অতীত প্রজন্মের মানুষজন, যাদের যশ প্রতিপত্তি এবং দক্ষতা ও জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই এদের কেউই এত প্রাযুক্তিক সুবিধা পেয়ে বেড়ে উঠেন নি, তাদের সময়ে তারা সেই চক এন্ড টক মাধ্যমেই শিখেছেন যা কিছু শেখার
একজন নিউটন হয়তো তার সমস্ত জীবনে তেমন ভাবে শিক্ষাপ্রদান পদ্ধতির গবেষণা সম্পর্কেই অবহিত ছিলেন না, তার মেধার বিকাশ থেমে থাকে নি, একজন আইনস্টাইন তার সমস্ত জীবনে আইসিটি ক্লাশরুম দেখেন নি, তার ভাবনার থট এক্সপেরিমেন্ট বিষয়ে অনেকের অনেক রকম রিজার্ভেশন ছিলো কিন্তু সেসব থট এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল এবং গুরুত্ব বিষয়ে কারো দ্বিমত ছিলো না।
আমি তালিকা লম্বা করতে পারি, গত ২ দশকে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নতুন করে প্রযুক্তি দক্ষতা অর্জন করতে হয়েছে, তাদের কেউই কম্পিউটার সহজলভ্য হওয়ার আগে এইসব বিষয়ে তেমন অবগত ছিলেন না। হালের প্রযুক্তিনির্ভর ভাবনা বিষয়ে আমার নিজের এক ধরণের রিজার্ভেশন আছে- আমার প্রায়শ:ই মনে হয় এই অতিরিক্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা আমাদের ভাবনার পরিসর সীমিত করে দিচ্ছে





লেখা আরেকটু বিশদ হলে ভাল হত, মূল সুরের সাথে একমত।
"আমার প্রায়শ:ই মনে হয় এই অতিরিক্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা আমাদের ভাবনার পরিসর সীমিত করে দিচ্ছে" - খুবই একমত।
( শব্দটার উচ্চারণ মনে হয় পেডাগজি হবে।)
"পেডাগোজি" উচ্চারণ করে দেখলাম, এতদিন জানতাম পেডাগগি, কি যে ঝামেলা শালাদের, একটা উচ্চারণ ঠিক মতো করতে পারে না।
বিশদ আর কি লিখা যেতো, মাথায় আসে নি, একটাই মনে ছিলো যে এইসব ইকুয়েশন সলভার প্রোগ্রাম আসার আগে হাতে লিখে লোকজন যা সমাধান করতো, সিমুলেশন হওয়ার পর সেই ঝামেলাটা কমছে। প্রযুক্তির সুবিধা আছে
সহমত।
মূল চিন্তার সাথে দ্বিমত পোষন করার সুযোগ নেই তবে এইটাও মানতে হবে যে বর্তমান প্রযুক্তির অপর নির্ভর করেই আমরা নতুন প্রযুক্তি বের করতে সক্ষম হচ্ছি, নতুন কিছু ভাবার শক্তি যোগাচ্ছে!
এইরকম লেখা আরো চাই
প্রযুক্তি আমাদের ভাবনাকে একদিকে সীমিত করলেও আরেকদিকে ঠিকই বিস্তৃত করতে হেল্পাচ্ছে।
মন্তব্য করুন