জরায়ুর জখম
ব্যাক্তিগত অনুভব অধিকাংশ সময়ই আমাদের ভাবনা আর বিচার বিশ্লেষণকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, প্রাপ্য কিংবা উপযুক্ত পর্যালোচনা কিংবা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না বক্তব্যগুলো। সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন পিতার কর্মকান্ডে বিতর্কিত হওয়ার আগেই নিজগুণে বিতর্কিত হয়েছেন, তার পরিচালনায় নির্মিত মেহেরজান ছবির মাণের বিষয়ে অনেকের অনেক ধরণের বক্তব্য ছিলো, তিনি নিজের ছবি তৈরির বিষয়বস্তু নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ইতিহাসে নিজের বুৎপত্তি প্রমাণের জন্য তার স্নাতকোত্তর গবেষণানিবন্ধও পেশ করেছিলেন বিজ্ঞজনের বিবেচনার জন্য।
মেহেরজান বিষয়ক ব্যক্তিগত বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রেই শোভন প্রতিবাদের মাত্রা ছাড়িয়ে যৌনফ্যান্টাসী এবং স্যাডিস্ট কামচর্চার উপকরণ হয়ে উঠেছে, এক ধরণের যৌনসহিংস ক্ষুব্ধ প্রতিরোধের শিকার হয়েছে মেহেরজান পরিচালিকা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একরৈখিক ভাবনা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপন বিষয়ে এক ধরণের স্পষ্ট অবস্থান রাজনৈতিক সচেতনতা কিংবা অন্ধ আবেগে অনেকেই ধারণ করে আছেন, মেহেরজান ছবিটা সেই রাজনৈতিক সচেতনতা কিংবা আবেগকে আহত করেছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একরৈখিক ভাবনায় অন্ধ মানুষদের প্রচন্ড ক্ষুব্ধ করেছে। সেই ক্ষোভ বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং এই সময়ে বোধগম্য এবং অবোধ্য কারণে মেহেরজান পরিচালিকাকে সমর্থন করা মানুষগুলোও একই ধরণের বৈরিতার মুখোমুখি হয়েছে।
তবে সম্পূর্ণ সময়টাতেই এই মেহেরজান বিষয়ক ব্যক্তিগত বিদ্বেষ সৈয়দা রুবাইয়াতের গবেষণা নিবন্ধের উপযুক্ত গুরুত্ব প্রদানে এক ধরণের দ্বিধা হিসেবে সবসময়ই ক্রিয়াশীল ছিলো। মুক্তিযুদ্ধে নারীর উপস্থিতি, স্বাধীনতার ইতিহাসে নারীর উপস্থাপন এবং তাদের অবমূল্যায়ন বিষয়ে স্পষ্ট ক্ষোভের উপস্থিতি সব সময়ই ছিলো। পুরুষতান্ত্রিক ভাবধারা নারীকে তার প্রাপ্য অবস্থান দিতে সব সময়ই অনীহ ছিলো বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী বিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, তবে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসে নারীর উপস্থিতি মূলত: সহযোগীর ভূমিকায়, নারীর ধর্ষিতা পরিচয়টাই এখানে মূখ্য হয়ে উঠেছে। নারীর শরীর যুদ্ধবিক্ষত হয়েছে, তার কোমল যোনীর উপরে যুদ্ধের করাঘাত এবং এই বিষয়ক আবেগ ও পুরুষতান্ত্রিকতা যতটা প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, এক ধরণের প্রতিশোধস্পৃহার জন্ম দিয়েছে নারী যোদ্ধাদের অবদান ততটা গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হয় নি। নারীর বিক্ষত শরীরের উপস্থিতি নারীর ভুমিকাকে কতটুকু সম্মানিত করেছে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন সক্রিয় নারী রাজনৈতিক কর্মীরা।
পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসে যৌননিপীড়িত নারীরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের অবদানের স্বীকৃতি পেতে পৃথক নারীবাদী ইতিহাস রচনায় অনুপ্রাণীত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান বিষয়ে তারা বেশ কয়েকটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের সবগুলো প্রকাশিত বই যে পড়া হয়েছে এমন না, তবে তাদের অবদানের স্পষ্ট স্বীকৃতি না থাকার বিষয়ে তাদের ক্ষোভ এসব গ্রন্থে স্পষ্টই ফুটে উঠেছে।
ফরিদা আখতার সম্পাদিত মহিলা মুক্তিযোদ্ধা( ১৯৯১), ড. নুরুন্নাহার ফয়জুন্নেসা সম্পাদিত একাত্তরের প্রচ্ছন্ন প্রচ্ছদ (১৯৯৪) ফোরকান বেগম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নারী (১৯৯৮) গ্রন্থগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পুরুষতান্ত্রিকতাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরপ্রতীক পদক প্রাপ্ত নারী যোদ্ধা তারামন বিবিকে রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভুষিত করা হলেও তার স্বীকৃতি দিতে তাকে রাষ্ট্র খুঁজে নি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাকে যখন খুঁজে বের করা হলো তিনি তখন অসুস্থ। অন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সিতারা বেগম প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহন না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন।
পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস নারী যোদ্ধাকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের পরোক্ষ সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীযোদ্ধার উপস্থিতি থাকলেও তাদের বিষয়ে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস আশ্চর্যজনক ভাবে নিরব। বলিষ্ঠ নারী পুরুষতান্ত্রিক কোমল নারীর পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় তাদের স্পষ্ট উপেক্ষা করে হয়েছে না কি অপমানিত নারীর মুখ পুরুষতান্ত্রিক প্রতিশোধস্পৃহাকে সদা জাগ্রত রাখবে এমন ভাবনা থেকে ইতিহাসে যোদ্ধা নারীর উপস্থিতি সচেতনা মুছে ফেলা হয়েছে এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মিলে না।
ব্যপক ধ্বংসের ভেতরে, অসংখ্য মানবাধিকার লংঘনের ইতিহাসে নারীর শরীর আক্রান্ত হয়েছিলো, বিভিন্ন মাত্রায় তা নারীর শরীর জুড়ে যুদ্ধের সহিংস ছাপ রেখে গেছে। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যুদ্ধকালীন নির্যাতনে গর্ভবতী নারী ও কিশোরীদের গর্ভপাত করানো হয়েছে, অনেকের ক্ষেত্রেই সেটা সম্ভব হয় নি, এইসব শিশুদের রেডক্রস ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র এইসব যুদ্ধশিশুদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো সম্ভবত।
নারীদের এই রূপায়নকে প্রশ্নবিদ্ধকারী একমাত্র গবেষক সৈয়দা রুবাইয়াত না, এটা নারীবাদী ইতিহাস চর্চার একটা ধারা, অনেক নারী অধিকার কর্মীরা সে ধারায় অগ্রনী ভূমিকা রেখেছেন । নারীদের উপস্থিতি বিষয়ে তাদের ক্ষোভটা এরপরও ততটা প্রকাশিত হয় নি। মেহেরজান বিতর্কের সময়ে নারীদের এই স্পষ্ট ক্ষোভটা আলোচিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিলো, কিন্তু সৈয়দা রুবাইয়াতের প্রতি ব্যক্তিবিদ্বেষবশত: এই বিষয়টা প্রত্যাশিত গুরুত্ব পাওয়ার আগেই মেহেরজান পরিচালিকার ইতিহাস বিকৃতির অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছে।
সেলিনা হোসেনের যুদ্ধ উপন্যাসের নারী চরিত্রের একটি বক্তব্য ভালো লাগলো পড়ে
যুদ্ধ? মাখন বিষন্ন দৃষ্টিতে নিজের পায়ের দিকে তাকায়
- কি ভাবছ? পায়ের কথা?
- যুদ্ধে আমি পা হারালাম।
- তাতে কি হয়েছে? যুদ্ধ এমনই। মেয়েরাটা যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়েও অঙ্গ হারায়
- কিভাবে?
ধর্ষিত হলে ওদের গর্ভ হয়। সেটা মাতৃত্বের গর্ভ না। সেটা জরায়ুর জখম।
বেনু বলে, ভালো কইরে দেখো হামাক। তুমহি দেছো পা। হামি দিছি জরায়ু। তোমার পায়ের ঘা শুকায়ে গেছে। কয়দিন পর আমার জরায়ুর ঘা শুকায়ে যাবে।
স্বাধীনতা কি সোজা কথা? স্বাধীনতা কত কিছু নেয়। হের লাইগ্যা মন খারাপ করবা ক্যান হে?
জরায়ুর জখমের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের বিবৃত ইতিহাসে নারীর উপস্থিতি নেই। আমাদের পুরুষতান্ত্রিকতা জরায়ুর ক্ষত দেখিয়ে আমাদের প্রতিশোধকাতর করে তুলে।





লেখাটা প্রিয়তে নিলাম। এত ভাল লাগল লেখাটা। এর পক্ষে বিপক্ষে কিছু বলবো না শুধু এইটুকুই--- বলি নারীকে শুধু সম্মান কর, তবেই নারী পারবে মানুষ হতে।
বন্ধ হবে তাকে অবহেলা করা, আদায় করে নিতে পারবে তার অধিকার, বন্ধ হবে তাকেনিয়ে ব্যাবসা, বন্ধ হবে যৌন নির্যাতন, নারীকে শুধু যৌনতার কাজে ব্যাবহার।
সিনেমাটা দেখেছিলাম দল বেধে । পক্ষে বিপক্ষে অনেক লেখা পড়েছি ,নিজেও অনুভব করেছি , তবে আপনার এই লেখাটা এত যে ভালো লাগলো!
"জরায়ুর জখম" - বেশ নাড়া দেয়া একটা শব্দগুচ্ছ
~
শব্দটা নাড়া দিলো
সম্মান দেয়া কিংবা স্বীকৃতি দেয়ার অনুশীলন ঘরে আগে শুরু করতে হবে। রোজ মা রেধে দেন, বউ রেধে দেন, তাদের রাননার সমালোচনা করা হয়, তাদের অন্যান্য কাজ আরো নিপুন কেন নয় সেই আলোচনা হয় কিনতু তাদের কাজের জন্য ধণ্যবাদ কয়জন দেয়? চ্যারিটি ঘর থেকে শুরু করলেই সবদিকে ছড়িয়ে যাবে
রাসেল ভাই, আজ চার দশক পরও মনে হয় মানুষের মনোভাব বদলায়নি । আমরা শিখিনা, শিখতে চাইনা । আমরা বদলাইনা, বদলাতে চাইওনা । আপনার মতো করে কখনো ভাবিনি--তরুণরা ভাবুক আপনার মতো, কামনা করছি ।
মন্তব্য করুন