নিষিদ্ধ না নিষিদ্ধ নিবন্ধিত অনিবন্ধিত জামায়াত
আদালতের নির্দেশের জামায়াত ই ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। নিবন্ধনের অবৈধতা ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, এবং জামায়াত আগামী ১২ এবং ১৩ তারিখে হরতাল ডেকেছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় হরতাল কেনো ১২ দিন পরে আহ্বান করা হলো? জামায়াতে ইসলামীও জানে এই ভরা ঈদের কেনাকাটার মৌসুমে হরতাল দিলে তার হরতাল মান্য করার মতো মানসিকতা এই ক্রয়উন্মাদ মানুষদের নেই। চাঁদের হিসেব মতে ঈদ হবে ৮ কিংবা ৯ই আগস্ট, ঈদ ফেরত মানুষদের ভোগান্তির বাইরে এ হরতাল নতুন কিছু যুক্ত করতে পারবে না। জামায়াত এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করে রায় পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মাওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ জন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে একটি রিট আবেদন করেন।
তরিকতে ফেডারেশন, জাকের পার্টি, সম্মিলিত ইসলামী জোট জামায়াত ই ইসলামীর মতোই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে আগ্রহী। তারা রিট আবেদনে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধের বিরুদ্ধে চারটি কারণ দেখান।
প্রথমত, জামায়াত নীতিগতভাবে জনগণকে সব ক্ষমতার উৎস বলে মনে করে না। সেইসঙ্গে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকেও স্বীকার করে না।
[ জামায়াতের গঠনতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণা ছিলো]
দ্বিতীয়ত, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে কোনো সাম্প্রদায়িক দল নিবন্ধন পেতে পারে না। অথচ কাজে কর্মে ও বিশ্বাসে জামায়াত একটি সাম্প্রদায়িক দল।
[ ধর্মভিত্তিক প্রতিটি রাজনৈতিক দলই মোটা দাগে সাম্প্রদায়িক, তাদের অন্য ধর্মের কোনো রাজনৈতিক নেতা নেই। তরিকতে ফেডারেশন কিংবা সম্মিলিত ইসলামী জোটের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উত্থাপন করা যায় এবং তারা তাদের এই সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়েই নির্বচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল]
তৃতীয়ত, নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষপদে কখনো কোনো নারী বা অমুসলিম যেতে পারবে না।
[ তরিকতে ফেডারেশন কিংবা জাকের পার্টি কিংবা সম্মিলিত ইসলামী জোটের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উত্থাপন করা যায়। ]
চতুর্থত, কোনো দলের বিদেশে কোনো শাখা থাকতে পারবে না। অথচ জামায়াত বিদেশের একটি সংগঠনের শাখা। তারা স্বীকারই করে তাদের জন্ম ভারতে। বিশ্বজুড়ে তাদের শাখা রয়েছে।
[ এই অভিযোগটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিবেচনার দাবী রাখে।]
ওই রিটের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হাই কোর্ট একটি রুল জারি করে। রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১)(বি)(২) ও ৯০(সি) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী, নির্বাচন কমিশনসহ চার বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
প্রায় ৩ বছর বরফ ঘরে পরে থাকার পর এ বছর এই রীটের শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। সে শুনানীতে তানিয়া আমীর বলেন,
যে গঠনতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল নিবন্ধনের অযোগ্য। তাই নিবন্ধনের পর ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের সুযোগ নেই। জামায়াতের নিবন্ধন সংবিধানের ৭ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সংবিধানে রাজনৈতিক দল করার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে; তবে কোনো দলের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে, দলের নীতিতে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গবৈষম্য থাকলে সংগঠন বা রাজনৈতিক দল করা যাবে না।
অবশ্য নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এই জটিলতা নির্বাচন কমিশন নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছিলো, তারা জামায়াতকে গঠনতন্ত্র সংশোধনের নির্দেশনা পাঠায় এবং গত বছর ডিসেম্বর মাসে জামায়াত তাদের সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে পেশ করে। নির্বাচন কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন "আইনের বাইরে গিয়ে কারও অনুভূতি বা বক্তব্য গ্রহণ করে কোন দলের নিবন্ধন বাতিল করবে না নির্বাচন কমিশন। "
আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর পুনরায় জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে, তার প্রেক্ষিতেই এ বছরের ২৫শে জানুয়ারী নির্বাচন কমিশনার আব্দুল মোবারক জানিয়েছিলেন " গত বছরের ২ ডিসেম্বর জামায়াত সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্র ইসিতে জমা দেয়। তবে তাতে ইসি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি "
নির্বাচন কমিশন যদিও জামায়াতের গঠনতন্ত্র পরিবর্তনে সন্তুষ্ট ছিলো না কিন্তু গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্যে তাদের আরও সময় দেওয়ার পক্ষপাতি তারা ছিলো। কামরুল ইসলাম মনে করেন নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে না কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের রায় দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের ‘আইনি প্রক্রিয়ায় শক্ত ভিত্তি’ হিসেবে কাজ করবে
২০০৯ এর রিট আবেদন গণজাগরণ মঞ্চের জামায়াত নিষিদ্ধের দাবীর চাপে হাইকোর্টে পাঠানো হয় ২০১৩ সালে। যখন জামায়াত নিবন্ধনের শুনানী শুরু হয়েছে তখন আমার ধারণা ছিলো ইত্যবসরে জামায়াত ও নির্বাচন কমিশন যেভাবে বিষয়টির আইনী জটিলতা এড়ানোর চেষ্টা করছে সেটা আদালত বিবেচনায় আনবে। যে গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে জামায়াতকে নিবন্ধিত করা হয়েছিলো সেটা অনুমোদনের সম্পূর্ণ দায় সে সময়ের নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের। এই ভ্রান্ত বিবেচনার দায়ে তাদের কি পরামর্শ দিয়েছে আদালত তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় নি।
গঠনতন্ত্রে উপযুক্ত সংশোধন করে জামায়াত ই ইসলামী পুনরায় নির্বাচনে যাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠবে। গঠনতন্ত্র সংশোধনের ধারাবাহিকতায় হয়তো দলটির ঘোষণাপত্রে ইসলামী সুশাসন কায়েমের বিষয়টি ততটা স্পষ্ট থাকবে না কিন্তু গঠনতন্ত্রে কি বিশেষ বাক্য যুক্ত আছে সেটা দেখে কেউ কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয় না, দলটি সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েই আছে, সে ধারণার ভিত্তিতেই লোকজন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে, সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠে। গঠনতন্ত্র সংশোধন করে জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক বৈধ্যতা নিশ্চিত করে ফেললে আমাদের আইনী পদক্ষেপ কি হবে?
আমরা কি শেষ পদক্ষেপ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্যে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কথা বিবেচনা করবো? ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতা করার অভিযোগে নিষিদ্ধ করার দাবী গত ৫ মাস তরুণেরা জানাচ্ছেই, তারা ২৬শে মার্চের একটা সময়সীমাও দিয়েছিলো, এই বিচারিক উদ্যোগ শুরু করার দাবীতে ২৬শে মার্চ রাত থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছিলো রুমী স্কোয়াডের কয়েকজন সদস্য। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা একে খন্দকার তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, বলেছিলেন জামায়াত নিষিদ্ধের বিচারিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। তিনি পদত্যাগ করেন নি এখনও। জামায়াত এ ইসলামীর রাজনৈতিক বৈধ্যতা এখনও বিদ্যমান।
এটাকে অনেকে আহ্লাদ করে জামায়াত নিষিদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এই অহেতুক আহ্লাদ, আবেগপ্রবন নির্বোধ উচ্চারণ সব সময়ই মর্মপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। আমার কাছে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন এর বক্তব্যটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন " এ রায় দিয়ে হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। কারণ ইসি জামায়াতকে নিবন্ধন দিয়েছিল। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির নিবন্ধন বাতিল করায় ইসির অক্ষমতারই প্রকাশ ঘটেছে।"
ত্রুটিপূর্ণ গঠনতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও জামায়াত এ ইসলামীকে নিবন্ধন দেওয়ার সম্পূর্ণ দায় বিগত নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের। সাখাওয়াৎ, ছহুল হোসেইনকে এই দায় বহন করতে হবে । তারা হাইকোর্টে শুনানীতে কি জবাব দিয়েছেন সেটা জানা সম্ভব হয় নি, সাখাওয়াৎ সাহেব কলাম লিখেন, তার বিবেচনা বোধ যে আইনপরিপন্থী ছিলো এ বিষয়টি প্রকাশ্য হওয়ার পরে তিনি এর প্রতিক্রিয়ায় কি জানাচ্ছেন সেটা জানতে আগ্রহী আমি। হয়তো শীঘ্রই তিনি তার বিবেচনাবোধের উপরে যে সংশয় তৈরি করেছেন হাইকোর্ট তার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে দীর্ঘ কলাম লিখবেন, হয়তো কয়েকটি টক শোতে গিয়ে আবোল তাবোল ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন





দেখা যাক কী হয়!
খেলা দেখতে দেখতে টায়ার্ড লাগে আজকাল..
১/১১ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের শেষদিকে সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনই ছিলো সকল পক্ষের মুখ্য টার্গেট। যে কারণে সে সময় এ বিষয়গুলো রাজনৈতিক ও ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর দেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না, যেটা বরাবরের মতোই ঘটনা। তাদের জানাশোনাতেও বিষয়টা এখনকার মতো ব্যপক পর্যায়ে ছিলো না। এবার যখন জানাশোনার মধ্যে থাকা অবস্থায় এ বিষয়ে একটি রায় হয়েছে, তখন এ রায় টিকিয়ে রাখার দিকে সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে কার্যকর সমাধান। এর বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেদেরকে দেশ ও দশের বিরুদ্ধে দাঁড়া করিয়ে দেয়ার মধ্যে কোনো লাভ আছে বলে মনে করি না।
আশা করি এটিএম ছহুল হোসাইন, এম সাখাওয়াত হোসেনরা বিষয়টা বুঝতে পারবেন। নিজের ভুল সময় থাকতে নিজে নিজেই অনুধাবন করে ফেলার মধ্যে লজ্জার কিছু দেখি না। এমনকি ভুল যদি অন্য কারো নিদের্শে করা হয়ে থাকে, সেটা প্রকাশেও পিছপা হওয়া উক্ত ব্যক্তিবর্গের উচিত হবে বলে মনে করি না।
জামাতের মতো সাংবিধানিক বিরোধীতা নিয়ে যদি আর কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেয়ে থাকে, তাদের নিবন্ধনও বাতিল হোক। সংশ্লিষ্টরা তাদের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করুক। আমার সমর্থন থাকবে।
বাংলাদেশে এ ঘটনা বিরল
কিছুতো হচ্ছে। দেখি না এরপর।এতটুকুওতো এতদিন পাইনি।
মন্তব্য করুন