ইউজার লগইন

শৈশব

মানুষ বদলায় না, ঘোর নিঃসঙ্গ ব্যস্ত শহরের মানুষের ভেতরেও নিস্তব্ধ অবসর থাকে, তারাও উত্তেজনার খোরাক চায়, এই যে বয়স্ক মানুষটা হুট করে চিৎকার করে উঠলো, ফ্ল্যাটবাড়ীর গ্যারেজের দরজায়, অমনি আশেপাশের চায়ের দোকান-মুদির দোকান থেকে ছেলে বুড়ো সবাই হই হই হাজির হয়ে গেলো মজা দেখতে। এর ভেতরেও নিখাদ গ্রাম্যতা যে যে গ্রাম্যতায় পোষা গরু ছাগলের মতো গ্রামের পোষা পাগলকে দেখে ভয় ভয় উত্তেজনায় চলে আসে। এইসব মানুষদের ভেতরের ক্ষোভ কাউকে ক্ষুব্ধ করে না বরং এক ধরণের কৌতুকের জন্ম দেয়।
গ্রামের নিস্তরঙ্গ আলুনি জীবনে উত্তেজনা বয়ে নিয়ে আসতো এইসব বায়ুচড়া মানুষেরা, হঠাৎ চৈত মাসের দুপুরে লোকটা মাঠ থেকে ফিরে কিরম হয়ে গেল, বললো বৌ ভালো লাগে না- আমি তো বুঝি নি বু, আমার কি যে সর্বনাশ হয়ে গেলো, মানুষটা হাসুয়া নিয়ে দৌড় দেয়, লোকজন আতংকে চিৎকার করে, আবার একটু দূরে দাঁড়িয়ে টিপটিপ হাসে। পরস্পরের গা টিপে, কাঁধ ঝাকিয়ে মৃদু উল্লাসে ফেটে পরা মানুষেরা আসলে সার্কাস দেখে। সার্কাসের জন্তুদের বলের উপরে বসে পরা কিংবা সাইকেল চালানোর মতো এই বায়ুচড়া মানুষটার হাসুয়া চালানোও এক ধরণের মাংনার উত্তেজনা তাদের জীবনে।

আমাদের মফঃস্বলের জীবনেও এমন পাগল ছিলো আমাদের ছেলেবেলায়, জব্বার পাগলা, আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে কামারের দোকানের হাঁপড়ের সাথে তাল মিলিয়ে যার বুকের ছাতি উঠা নামা করতো আর কামারের আগুণের মতো ধ্বকধ্বক জ্বলতো যার চোখের মনি, আমরা স্কুলে যাওয়ার পর খানিকটা ভয়ে সিঁটিয়ে যেতাম, দম বন্ধ করে পা টিপে কোনো মতে দোকানটা পার হলেই স্বাধীনতা।
স্কুলের রাস্তায় বারো মিশালীর গন্ধ, কাগজে লেগে থাকা চালতার আঁচারের লাল রঙ আর বারান্দায় জমে থাকা চালতার আঁশ ডিঙিয়ে আমরা ক্লাশে যেতাম, আমাদের স্কুলটায় সকালে মেয়েদের ক্লাশ হতো আর দুপুরে ছেলেদের স্কুল। সেই মেয়েরাই টিফিনটাইমে চালতার আঁচার খেয়ে কাগজ ছড়িয়ে রেখেছে সকাল ১১টায় আমরা ধীরে ধীরে স্কুলের এসেম্বলীতে দাঁড়িয়ে গাইছি আমার সোনার বাংলা।

এমন কোনো এক দিন বিকেলে বড় মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে দেখলাম জব্বার পাগলা, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথার উস্কোখুস্কো চুল আর গাল ভর্তি দাড়ির জঙ্গলের মাঝে ফিকে হলুদ চোখ, আতংকে মাথাটা এলেমেলো, কোনো এক দিকে দ্রুতই পালিয়ে যেতে হবে, বড় মাঠের এক প্রান্তে শিশুপার্কের দোলনায় উঠতে চাওয়ার নেশায় এই নির্জন বিকেলে সার্কিট হাউজের সামনের রাস্তায় আমি আর জব্বার পাগলা অসম দ্বন্দ্বযুদ্ধে মুখোমুখি অনর্থক, আমি কোনো মতে শরীর ঘুরিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছি আর বাসা ফেরার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে, আমার বাসা ফেরার রাস্তাটা ধীরে ধীরে ঘুলিয়ে যাচ্ছে, সেই বড় মাঠ আরও বিস্তৃত হয়ে আমাকে গিলে খাচ্ছে, লোকে বলতো ভুল-ভুলাইয়া, কানাওলা, আমাকে সম্ভবত সেই কানাওলা ধরে এই মাঠের ভেতরেই লুকিয়ে রাখবে, ভীত-সন্ত্রস্ত আমি আশেপাশের আবছা আলোয় তন্ন তন্ন করে খুঁজছি এক জোড়া খেঁজুর গাছ, তার পাশেই মিশন রোড, সেখানে শিশু একাডেমীর সামনে দাঁড়াতে পারলেই আমার এই দিকভ্রান্তি- সাময়িক অন্ধত্ব কেটে যাবে, আমি নিরাপদে বাসা ফিরতে পারবো।

মাঠের আড়াআড়ি ছুটছি, হেলিপ্যাড আর তার কাছে বানানো উঁচু মঞ্চ যেখানে দাঁড়িয়ে এরশাদ ভাষন দিয়েছিলো, সব এড়িয়ে আমাকে সন্ধ্যা নামার আগেই খুঁজে পেতে হবে সেই নিরাপদ লাইট হাউজ, জোড়া খেঁজুর গাছ। ক্লান্তি পা টেনে ধরে, আমি বিভ্রান্তের মতো না হাঁটা না দৌড়ানো পথ হারানো মানুষ, চিৎকার করে কাঁদতে পারি না বড় হয়ে গেছি আবার ততটা বড় নয় যে বাসা ফিরতে হবে না স্বস্তিতে আনন্দিত হতে পারি, আর মাত্র কয়েকটা মিনিট, আর এই ১০০ কদম হেঁটে তারপর যদি কিছু না হয় যেকনো এক দিকে ছুটে যাওয়া যাবে, এই মাঠে শেয়াল আর বেওয়ারিশ কুকুর ছাড়া আর কারা থাকবে?

আকাশের লাল রং ধুসর হওয়ার আগেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেই খেঁজুর গাছ, আর একই সাথে আমি সাহসী হয়ে উঠেছিলাম, জব্বার পাগলার এলেমেলো চুল, তার ধ্বকধ্বকে ফিকে হলুদ চোখের ভীতি কাটিয়ে উঠেছিলাম এক বিকেলের গোলক ধাঁধায়। সেই গোলকধাঁধায় আমি আতংক কবর দিয়ে যখন রাস্তায় উঠে এসেছিলাম, আমি জানলাম অসহায় উদ্বেগে মাথা এলেমেলো হতে না দেওয়াটাই সাহসিকতা। সামনের বিঘ্ন ভীতি সবই কেটে যাবে যদি অহেতুক উদ্বেগে মাথার চুল কেউ না ছিঁড়ে, আর একই সাথে আমি জব্বার পাগলার জন্যে দু:খিত হলাম, রাস্তার ছোটো ছোটো টংঘর আর স্টেশনের বারান্দায় স্নেহহীন তার বেঁচে থাকা, তার নি:সঙ্গতা উপলব্ধি করলাম, বুঝলাম চলার পথে কোনো এক সময় সে গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলেছিলো, তার জোড়া খেঁজুরগাছের খোঁজ সে পায় নি তাই নিজের ভেতরেই অহর্নিশ নিজেকে হারিয়ে খুঁজছে সে নিজেকেই।

পোস্টটি ১৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ইশ, এত্ত সুন্দর করে কেউ কেমনে লেখে..

সামছা আকিদা জাহান's picture


আপনার লেখায় ফুটে উঠা শৈশবের তুলনায় আমার শৈশব আলুনি। ভাল লেগেছে ।

টোকাই's picture


মনের ভিতর প্রকাশ করার জন্য কত কথাই থাকে . কিন্তু প্রকাশ করতে গেলে ভাষার সঠিক ব্যবহার আর প্রয়োগ সবাই পারেনা . যেমন আমি . রাসেল এর তুলনা রাসেল নিজেই . এর বেশি আর কি বলব?

রায়েহাত শুভ's picture


আহ্‌!!! রাসেল ভাই...
পুরো দৃশ্যটা দেখলাম, আপনার ক্লান্তি ও ভীতির সাথে আমিও নিজের বুকের উঠানামাটা টের পেলাম, শেষমেষ গোধুলীর লাইটপোস্ট জোড়া খেজুর গাছ খুঁজে পেয়ে আমিও আপনার সাথে সাথে হাঁফ ছাড়লাম...

আরাফাত শান্ত's picture


অসাধারণ লাগলো!

সাঈদ's picture


দারুণ

জ্যোতি's picture


ভালো লাগলো খুবই।

তানবীরা's picture


আপনার লেখায় ফুটে উঠা শৈশবের তুলনায় আমার শৈশব আলুনি। ভাল লেগেছে ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.