ইউজার লগইন

দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের নিত্য দিনের জীবন

দু:খজনক বাস্তবতা হলো সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের দেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতিনিয়ত দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে হয়। নিম্নবর্ণের হিন্দু যাদের সহায়-সম্বল ভিটে মাটিটুকুই , এই মাটিতে জন্ম এ মাটিতে দাহ হওয়ার পরও প্রতিনিয়ত ভারতপ্রেমের গঞ্জনা শুনতে হয় যাদের, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট নয় এমন দেশগুলোর মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশী মুসলমান বসবাস করলেও সাম্প্রদায়িক বাস্তবতায় ভারত এখনও আমাদের কাছে হিন্দু রাষ্ট্র এবং একই সাম্প্রদায়িক কারণে এই দেশের প্রতিটি হিন্দুই ভারতপ্রেমিক দেশদ্রোহী।

ক্রমাগত অবমাননা, লাঞ্ছনার এই ইতিহাস মনে রেখেই এই দেশে একজন হিন্দু বসবাস করে। সংখ্যালঘুদের ভেতরে সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন বাস্তবতার ছবিতে বাংলাদেশের অপরাপর সংখ্যালঘুদের জীবনযাপনের বাস্তবতা মূর্ত প্রতিনিয়তই। বৌদ্ধ অধ্যুষিত বার্মা কিংবা শ্রীলংকা কিংবা চীন কিংবা জাপানের স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘাতের আঁচে পূড়ে যেতে পারে রামু যেভাবে ভারতের আভ্যন্তরীণ কোন্দলে পুড়ে যায় এই দেশের হিন্দুবাড়ীগুলো। আমরা সাম্প্রদায়িক দানবপূজা করছি, ধর্মের আড়ালে মানুষ পোড়ানোর নৃশংসতায় সমঝোতা করছি।

এ দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিম্ন বর্ণের হিন্দু আর আদিবাসীরা নিজস্ব বাঙালী ধর্মমত প্রচলন করেছে। বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা যে ধর্মের প্রধান ভিত্তি, ঈশ্বরবিহীন সে ধর্মে আমাদের জাতীয় দিবসগুলো উদযাপিত হয়। ক্রমাগত লাঞ্ছনা, ঘৃণা আর হয়রানির প্রতিবাদে একদল মানুষ এমন একটি জীবন সংস্কৃতির চর্চা করছে যেখানে পোশাকী দেশপ্রেমই ধর্মাচারের অংশ হয়েছে।

দেশের সংখ্যালঘু মানুষদের কৃষ্টি, ধর্ম এবং সংস্কৃতির প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ সংখ্যাগুরু মুসলমানদের কখনও ছিলো না, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনে এক ধরণের আপাত সহনশীল শোভনতার আড়াল ছিলো। ক্রমশ: আরও বেশী ধার্মিক হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশ্রয়ে সেই শোভন সহনশীলতার আড়াল রাখার প্রয়োজন মনে করছে না সংখ্যাগুরু ধর্মের অনুসারী দুবৃত্তরা।

বনগ্রাম বাজারে সাম্প্রদায়িক হামলার দুই সপ্তাহ পরেও হামলার দাগ মুছে যায় নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ত্রানের টিনের দেয়ালের পাশে এখনও হামলায় ভেঙে চুড়ে যাওয়া টিনের দেয়াল সাক্ষ্য দিচ্ছে কালীপূজার দিনে সংঘবদ্ধ আক্রমণে কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলো বনগ্রাম বাজারের সামান্য দুরের এই বসতি।
নিষ্ঠুর আক্রোশে মুর্তি ভেঙে, মন্দিরে আগুণ জ্বালিয়ে, পূজার নৈবদ্য, দেবতাকে উৎসর্গ করা প্রসাদ আর ফুল পায়ে মারিয়ে যারা প্রায় ৩ ঘন্টা নারকীয় উল্লাসে বনগ্রমের এইসব মানুষদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভ্রান্তি ভাঙালো, তারা একই সাথে সরস্বতি মুর্তি, হারমোনিয়াম এবং মাদল ভেঙেছে। আলাদা করে দেখলে তেমন কিছুই নয় কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক উপাদানে শিক্ষা-সৈন্দর্য্য -প্রেম ও ভক্তির এসব উপকরণ ভেঙে আমাদের সাংস্কৃতিক দীনতাটুকুই প্রকাশ করলো এইসব দুবৃত্তরা।

পাবনা বনগ্রাম বাজার থেকে পূর্ব দিকে সামান্য এগিয়ে গেলেই হিন্দু পাড়া, সে বসতিতে ৩-৪ শত হিন্দু পরিবারের বসবাস। বিভিন্ন বাসার বাইরের দেয়ালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্টিকার লাগানো ত্রানের টিন, ক্ষতিগ্রস্ত ১২টি পরিবারকে ত্রান হিসেবে দেওয়া হয়েছিলো নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।এই ত্রানের টিনে সহিংসতা আড়ালের প্রচেষ্টাকে নিতান্তই প্রশাসনের নিজস্ব লজ্জা ও অক্ষমতা আড়ালের উদ্যোগ বলা যায়। গত এক বছরে এমন পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে কয়েকবারই। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার কর্মী ও পর্যবেক্ষক দল ছুটে গেছেন ঘটনাস্থলে, পাবনার বনগ্রামের ঘটনা একই রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে প্রশাসনের অনুমিতই ছিলো, তাই গলির সামনে যে কয়টা বাসা দৃশ্যমান সবগুলোর দেয়ালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চিহ্ন লুকিয়ে ফেলেছেন। আড়াল করতে চাইলেও সব আড়াল করা যায় না, তাই ভেঙে চুড়ে যাওয়া টিনের পাশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্টিকার লাগানো টিনগুলো পরিহাসের মতো দেখায়।
আপনারা কি যেতে পারবেন? সামনে কিন্তু পানি জমে আছে বাবু। বাবলু সাহার ভগ্নিপতির বাড়ী যেতে হলে এই পানির উপর দিয়েই যেতে হবে। প্রশাসন যখন দাবী করেছে তারা বনগ্রাম বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রনে এনেছে, ঠিক সে সময়ে এই বাসায় সংঘবদ্ধ হামলা চলছে। ঘন্টাখানেক পরিকল্পিত লুটপাট চালিয়েছে"বিক্ষুব্ধ জনতা।" প্রসুতা নারী এবং তার ২০ দিনের শিশুর সামনেই তারা ঘর ভেঙেছে, ফ্রিজ, সিন্দুক ভেঙেছে, তারপর ৮ ভরি সোনার গয়না আর অন্যান্য সামগ্রী লুট করেছে। যখন "উত্তেজিত জনতা" ঘরের মন্দির ভাঙতে উদ্যত হয়েছিলো, গৃহকর্তী বলেছিলেন " বাবারা তোমাদের যেমন মসজিদ, এটাও আমাদের মসজিদের মতোই, এখানে আমরা উপাসনা করি।" গৃহকর্তীকে "বিক্ষুব্ধ জনতা" জানিয়েছে " এটাই তো আগে ভাঙতে হবে।" তারা মুর্তি ভেঙেছে, লুট করেছে, তারপর বীরদর্পে হেঁটে চলে গিয়েছে, প্রশাসন তখন বনগ্রাম বাজারের বিক্ষোভ শান্ত করার উল্লাসে মত্ত। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) দাবি করেছে, পাবনার সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারীদের প্রশ্রয় দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। হামলার পরপরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বনগ্রামে বাজারে উপস্থিত হয়েছেন, পায়ে হেঁটে দেখেছেন ক্ষয়ক্ষতি তবে এক হাঁটু বৃষ্টির পানি ডিঙিয়ে তিনি এই বাসায় আসেন নি। ক্ষমতাবানের নামী দামী পায়ে কাদা আর ময়লা লেগে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন দাবী করছে এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পাবনাকে আহবায়ক করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জেলা বিশেষ শাখা) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর সমন্বয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়া হয়।তাৎক্ষণিকভাবে নিরুপিত ১২টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে পরিবার প্রতি ২ বান্ডিল করে ঢেউ টিন, নগদ ৬ হাজার করে টাকা এবং ৩০ কেজি করে চাউল প্রদান করা হয়। বাবলু সাহার ভগ্নিপতি এবং আরও কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দাবী করেছে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় তাদের নাম আসে নি। যেসব সরকারী কর্মকর্তারা সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, পায়ে কাদা লেগে যাওয়ার ভয়ে তারা ক্ষয়-ক্ষতি নিরুপন করতে সেখানে যান নি।

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় এই হিন্দু বসতি, বাজারের সব পানি জমা হয় সেখানেই, চারপাশে উঁচু করে দেয়াল দিয়েছে মানুষ, বৃষ্টির পানিও বেড়িয়ে যাওয়ার পথ পায় না সেখানে।
আপনারা কিছু করেন না কেনো? অস্বাস্থ্যকর জলাবদ্ধ পরিবেশে মশা জন্মাবে, আপনারা অসুস্থ হয়ে যাবেন। কাউকে বলেন না কেনো?
তারা জানালেন, আশেপাশের মানুষেরা কেউই নালা কেটে পানি বের করে দেওয়ার পথ দিচ্ছেন না।
" আপনারা তো মানুষের সাথে বিবাদ করবেন না। আশেপাশের মানুষজন এটা করছে না যখন, আপনারা অভিযোগ জানাবেন উপজেলার কর্মকর্তাদের কাছে।তাদের ভোট দিচ্ছেন, তাদের ট্যাক্স দিচ্ছেন, এটা করে দেওয়ার দায়িত্ব তো তাদের। তারা এই কাজ করে দিবে।
প্রায় সংশয় নিয়েই একজন বললেন, উপজেলা অফিসের লোকজন ড্রেনেজ ব্যবস্থা করে দিবে? আমরা হিন্দু, আমাদের তো কেউ মানুষ মনে করে না।

এমন অকপট স্বীকারোক্তির পর কোনো পালটা মন্তব্য করা যায় না। আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বলছি, বলছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা। দীর্ঘ দিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের গল্প শোনাচ্ছি না কি নিজেদের ভেতরের সাম্প্রদায়িক দানবকে আশ্বস্ত করছি, পোষ মানাচ্ছি? ঠাট্টাচ্ছলে "মালাউন" বলা, কিংবা "তোদের এই দেশে কি, সবই তো ভারতে পাচার করে দিলি।" এমন ধরণের প্রচলিত মন্তব্যের ভেতরে আমরা কোনো সাম্প্রদায়িকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাই না। দীর্ঘ দিনের চর্চায় আমাদের এইসব "সাম্প্রদায়িক" আচরণ এক ধরণের সামাজিক বৈধ্যতা পেয়েছে। সমাজে এসবের বিরুদ্ধে তেমন শক্ত প্রতিরোধ না থাকায় সংখ্যাগুরুর উদ্ধত্ব দৃষ্টির সামনে মাথা নীচু করে হাঁটে " মালাউন"রা।
যার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেই রাজীব সাহা আত্মমগ্ন কিশোর। কারো সাথেই তার কোনো বিবাদ নেই, কারো কটুক্তিতেও ক্ষুব্ধ হয় না, সব ধরণের ঝামেলা এড়িয়ে চলে সে। স্থানীয় স্কুলের দুইজন ছাত্র এমনটাই জানালো। তারা বিশ্বাস করে না " রাজীব সাহা" এমন কিছু করতে পারে।
যেই ফেসবুকের পেইজে লাইক দেওয়া নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, ফটোকপি দেখা একজন জানিয়েছেন, সেই ফেসবুক পেজটি ' দেবাশীষ রায়" নামের একজনের। সেখানে কোরান অবমাননারত যেই ৩ কিশোরের ছবি আছে, সেখানেও রাজীব নেই। রাজীব সাহার নাম সেখানে ছিলো না।
২রা নভেম্বর কেনো তবে রাজীব সাহার নাম উল্লেখ করে স্থানীয় মসজিদে মাইকিং করে সাম্প্রদায়িক হামলার পরিস্থিতি তৈরি করা হলো? একজন আক্রান্ত জানিয়েছেন, বাবলু সাহাকে যখন তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ জনতা, তিনি তখন বাজারেই উপস্থিত ছিলেন, লোকজন চড়াও হলে তাকে রক্ষা করেন সোহেল নামের একজন ব্যবসায়ী, তিনি গত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। সে সময়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হন, তিনি বিক্ষোভের কারণ জিজ্ঞাসা করলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে কোরান অবমাননার ফটোকপি দেখায়। তিনি খুব সাদামাটা গলায় মন্তব্য করেন " এই ব্যাপারে আমি আপনাদের সাথেই আছি।" এবং উত্তেজিত জনতা মুহূর্তের মধ্যেই সহিংস হয়ে হিন্দু বসতিতে হামলা চালায়। এ সময়ে বাসার পুরুষেরা কেউই বাসায় ছিলো না, সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ছিলো, স্থানীয় বাজারে যাদের জীবন-জীবিকা, তারা সবাই উর্ধ্বশ্বাসে ছুটোছিলো প্রাণের ভয়ে, কেউ বাসায় ফিরে আসতে পারে নি। এক দঙ্গল সহিংস মানুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে হিন্দু বসতির নারী ও শিশুদের। অবশ্য তারা নারী কিংবা শিশুদের উপরে আক্রমণ করে নি। বাসার টেলিভিশন- ফ্রিজ- আসবাবপত্র এবং লুণ্ঠনযোগ্য সামগ্রী ছিলো তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। তারা ধর্ম অবমাননার বানোয়াট অভিযোগ করে মূলত লুটপাটে ব্যস্ত ছিলো।
এই যে আক্রমণ হলো এমন আক্রমন আবার হলে সেটা প্রতিরোধের কোনো উদ্যোগ কি আপনারা নিয়েছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ভদ্রলোক জানালেন আশেপাশের মুসলমানরা তাদের রক্ষা করবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সৌহার্দ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারণাগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আজকে মানবাধিকার কমিশনের যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে সাদামাটা সত্য প্রকাশ পেয়েছে, এদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হন। শুধুমাত্র পাবনার বনগ্রামেই এমন চাঁদাবাজীর ঘটনা ঘটছে এমনটা ধারণা করা ভুল, বরং সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু-ধর্মানুভুতির রাজনীতিতে পরোক্ষ জিজিয়া কর দিয়ে এই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিজের এবং পরিবারের মানসম্মান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী বাবুল সাহার মেয়ের বিয়েতে ২ লক্ষ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিলো, তিনি কি চাঁদা দিয়েছিলেন? কারা চাঁদা চেয়েছিলো? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় নি, পানিতে বাস করে কুমীরের সাথে বিবাদ করা মুর্খতা, বাবুল সাহা জানেন, তাই তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সমাবেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লিখিত ভাষণ দিয়ে এসেছেন। স্থানীয় বাজারের মানুষ বলছে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘটনার দিন বাজারে এসে মন্তব্য করেছেন " তোদের কোনো বাবুই তো তোদের বাঁচাতে আসলো না?" কথাটির নেপথ্যে অন্য ধরণের নিরাপত্তার আশ্বাস আছে, যা শুধুমাত্র স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে শামসুল হক টুকুই প্রদান করতে পারেন।
মুসলমানরাই আমাদের রক্ষা করবে, এমন বক্তব্য শুনে কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছিলাম, তাই পালটা তাকে বলেছিলাম, এমন তো ঘটলো না। আপনাদের নিজেদের জন্যে হলেও এক ধরণের সংঘবদ্ধতা প্রয়োজন। স্থানীয় লোকদের সাথে নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকমিটি তৈরি করবেন, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর এক ধরণের কাঠামো তৈরি করে ফেলতে হবে আপনাদের । সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় একজন আমাকে ডাকলেন। তিনি বললেন রাস্তার ভেতরে হওয়ায় কেউই ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় তার নাম লেখায় নি, তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তার বাসায় ঢুকলাম, তিনি মিস্টির প্যাকেট বানান, সেগুলো দোকানে সরবরাহ করেন, অন্য একজনের বাসায় ভাড়া থাকেন। সাম্প্রদায়িক হাওলায় ক্ষতিগ্রস্থ ভদ্রলোক স্পষ্টই বিক্ষুব্ধ, তিনি বসতভিটাবিহীন অভদ্রলোক, তার ক্ষতিতে কারো কিছু যায় আসে না। তার স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বললেন "এইসব বলার দরকার নাই। ভিখারীর মতো সাহায্য আমাদের দরকার নেই।" তাকে বলতে পারলাম না ত্রান-সাহায্য-সহযোগিতা করার ক্ষমতা আমার নেই। এমন কোনো ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করতেও আমি সেখানে যাই নি। বাসাটির বাইরে তেমন ক্ষতির চিহ্ন নেই, অন্তত পায়ে চলা রাস্তায় যেভাবে লাঠির আঘাতে ভেঙে যাওয়া দেয়াল আর উপরে ফেলা দরজা আছে, এখানে তেমন দৃশ্যমাণ ক্ষতির চিহ্ন নেই। বানানো মিস্টির প্যাকেটগুলো ভেঙেছে, শোবার ঘরের জানালা ভেঙেছে, তার পাশের বাসার মন্দিরে আগুণ জ্বালানো হয়েছিলো, সেই মন্দিরের আগুণ যতটা নজর কেড়েছে, তাদের এই সামান্য "ক্ষতি" ততটা সুনজর পায় নি। পুড়ে যাওয়া মন্দিরের ভেঙে যাওয়া মুর্তি, পূজার নৈবদ্য পায়ে পিষে ফেলার ঘটনাগুলো মানুষের নিরাপত্তাবোধকে ভেঙেচুড়ে ফেলে, ধর্ম পালনের অধিকার যখন চাঁদা দিয়ে আদায় করতে হয়, যখন পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রিত সাম্প্রদায়িক হামলায় সব ধরণের আশ্বাস আর নিরাপত্তাবোধ উবে যায়, মানুষ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে একটি দেশে বসবাসের গ্লানিতে নিজেই দগ্ধ হয়। বনগ্রামে তাই ঘটেছে। এখানে ফেসবুকের পেজে লাইক দেওয়ার ইস্যুকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে, ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ক্ষমতা দেখানো এবং লুটপাট ছিলো এই পরিকল্পিত হামলার মূল উদ্দেশ্যে।
সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর রাজনীতি এবং তথাকথিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আড়ালে লুকানো সাম্প্রদায়িকতা, যেখানে সংখ্যাগুরুর নিরাপত্তাকুশনে সংখ্যালঘুর জান-মাল-সমান-সম্ভ্রম প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হয় সেখানে ব্যক্তি নিজের হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করার সাহস পায় না। তাদের স্থানীয় রাজনীতি-ক্ষমতাবানদের নিজেদের আভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষমতাকেন্দ্রীক দ্বন্দ্ব এবং হানাহানির ভেতরে নিজের নিরাপদ পক্ষ খুঁজে পেটে মরিয়া মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তগ্রহনের স্বাধীনতা থাকে না। সংখ্যালঘুর বহুমাত্রিক অসহায়ত্ব, অনুচ্চারিত করুণা কিংবা অনুচ্চারিত বিদ্বেষ সব পুষে রেখে আক্রান্ত মানুষেরা বলছে " সবাই আসলে একই, আমাদের হিন্দু হিসাবেই দেখে।" এই সংখ্যাগুরুর দেখা এবং সংখ্যালঘুর অবনত অনুভুতিটুকু ভীষণ জ্যান্ত পাবনা বনগ্রামে। তারা কেউই দেখে নি প্রকাশ্য দিবালোকে লাঠি-সরকি হাতে কারা কারা হিন্দু পাড়ায় হামলা করলো, কারা মন্দির ভাঙলো, মুর্তি পোড়ালো, কারা ঘরের দেয়াল ভাঙলো আর রান্না ঘরের আনাজ সব মাটিতে ফেলে দু পায়ে পিষলো, এই ভীড়ের মানুষদের কেউই আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে নি।
আমাদের মানসিকতায় লুকানো সাম্প্রদায়িকতা যা সামান্য উস্কানিতে সহিংস হতে চায় এমন সাম্প্রদায়িক মানসিক বৈকল্য না কি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি নিয়মতান্ত্রিক সংঘবদ্ধ পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলার নেপথ্যের মূল চালিকাশক্তি? নিরাপদ দুরত্বে থেকে আমরা সাম্প্রদায়িক হামলার নেপথ্য কারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরণের তত্ত্বচর্চা করতে পারি। বাস্তবতা হলো ঘটনার দুই সপ্তাহ পরেও স্থানীয় মানুষজন ঘটনার শিকার মানুষগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নিজেদের অনুভুতি-উপলব্ধি প্রকাশে অনিচ্ছুক। সন্ত্রস্ত মানুষ আগ্রাসনকারীকে আলাদা করতে পারে না, ভীতি এক ধরণের বিভ্রম তৈরি করে, কিংবা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বগুলোতে এই টালমাটাল সময়ে কে চুড়ান্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে শেষ পর্যন্ত এই হিসাব জানা না থাকায় তারা প্রতিটি চেহারা স্মৃতির গহীনে লুকিয়ে রাখে-
তারা ভুলে যায় না কি তারা ভুলে থাকতে বাধ্য হয়- এই সত্যের মীমাংসা হলো না।

পোস্টটি ২৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

এ টি এম কাদের's picture


আশচর্য ! ১৮৩ পঠিত হবার পরও কোন মন্তব্য নাই ! আমরা দিন দিন ভিতু হয়ে
যাচ্ছি , মন্তব্য করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছি মনে হয় !

বাবুল সাহা বি এন পি'র হয়ে নির্বাচন করেছিলেন । অতি অবশ্যই দূঃসাহস । হিন্দু
হয়ে বি এন পি'র জন্য নির্বাচন করা অবশ্যই ধৃষ্টতা ! খাস প্রজা বিরোধী পার্টির হয়ে কাজ করবে, এটা সহ্য কি করা যায় ?

শুনেছি রামুর ঘটনায় ও প্রথম যারা ইগনাইট করেছিল তাদের নেতৃত্বে ছিল স্থানীয় যুব লীগ । প্রিন্ট মিডিয়ায় এদের নাম কিন্তু আসেনি এবং বরাবরের মতো বুদোর ঘাড়েই পিন্ড চাপানো হয়েছিল । আজ পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্ট ও প্রকাশিত হয়নি ।

বাবরী মসজিদ ধ্বংস হবার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে কিছু কিছু এলাকায় হিন্দুদের বাড়ি-ঘর আক্রান্ত হয়েছিল । তখন দেশে ছিলাম । আমাদের বড়ি থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে একটি পাড়া জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল । গিয়েছিলাম । সব প্রশ্নের উত্তর দিলেও "কারা করেছে ? চিনেছেন কিনা ?" এ প্রশ্ন দুটির উত্তর কেউ দেননি । তখন চেয়ারে ছিলেন বি এন পি ।

নষ্ট রাজনীতির বলি সংখ্যালঘুরা আর সাধারন মানুষেরা । যারা এগুলো করাচ্ছে তাদের নধর গতরে কিন্তু কুটোটি পড়ছেনা । স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও একটি সঠিক নির্বাচন পদ্ধতি পড়ে তোলা যায়নি । দুই মহিলার সেচ্ছাচারিতার নাম এখন রাজনীতি । এই রাজনীতির কপালে জাতি কেন ঝাঁটা মারেনা বুঝতে পারিনা ।

আরাফাত শান্ত's picture


অসাধারণ একটা লেখা!

টুটুল's picture


চমৎকার একটা লেখা

অতিথি's picture


amra sobai bengali..tai pakistan theka amra alada holum.kano holum?
tar theka pakistan thakai valo chilo.ato kosto kore sadhinota peye ki lav holo?

সামছা আকিদা জাহান's picture


চমৎকার লেখা ।

টোকাই's picture


অনেক দরকারী একটা লেখা . কিন্তু কজ হবে এসব লিখে ? আর আমরা লেখায় কমেনট করলেই কি ওই মানুষ গুলির কষ্ট লাঘব হবে ? Sad

তানবীরা's picture


আমরা বাংলাদেশীরা যে কি পরিমান সাম্প্রদায়িকতা মনে ধারন করি, হিনদু - মুসলমান, বরিশাল -সিলেট - চিটাগাং কীসে নয়

কুয়োর ব্যাং সব

মীর's picture


আমরা সবাই কুয়ার ব্যাং। ব্যাংদেরকে ভালো কথা শুনিয়ে লাভ নেই রাসেল ভাই।

Saifu Islam's picture


রাসেল ভাই কিভাবে যে আপনি এমন লেখেন? আমি অবাক হয়ে যাই। তবু বলি লিখে যান। শুভ কামনা রইলো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.