ইউজার লগইন

আমাদের পাঠশালা

আমাদের চোখের সামনে লাইব্রেরীর তাকগুলো থেকে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের বইগুলোকে হটিয়ে ক্যারিয়ার গাইড আর "৩০ দিনে সহজে শিখুন" জায়গা করে নিলো। সাফল্যের সহজ পথ খুঁজতে খুঁজতে আমরা পাঠ্যবই বাদ দিয়ে গাইড আর কোচিং এর সাজেশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেলাম। স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরামর্শক হয়ে ওঠার তাড়নায় তাদের মৌলিক গবেষণার আগ্রহ কমে গেলো । এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্বাদু পানিতে তেলাপিয়ার প্রজননের ১০টি নিয়ম আর জীববিজ্ঞানের গবেষক উপসম্পাদকীয় পাতায় দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত লিখে পদোন্নতির সুযোগ পেয়ে যান।

যাদের যা করার কথা ছিলো তারা সে দায়িত্ব পালন করছেন না। অন্তর্বর্তী মেধাশূণ্যতার আঁচর লাগছে শিক্ষায়াতনে, পদলেহী আত্মমর্যাদাজ্ঞানহীন বুদ্ধিজীবী সমাজ কৃষ্টি-সংস্কৃতি চর্চায় মননের উন্নয়নের পথ না খুঁজে নৈতিকতা খুঁজছেন ধর্মগ্রন্থে। সাহিত্য-ইতিহাস-ভাষাবিজ্ঞানের ভালো বইগুলোর তালিকা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পরবর্তী ৪ দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলা একাডেমী থেকে হাতে তোলার মতো গবেষণাগ্রন্থ খুব বেশী প্রকাশিত হয় নি।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন উদাসীনতায় এনজিওগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে আর সেইসব এনজিওর অনুদানের চিঠির ভূমিকা লিখছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

সেভাবেই আমরা শিখছি সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাতপদ অংশের শিশুদের "ফকিন্নীর পোলা" বলা যাবে না, তাদের আদর করে "সুবিধাবঞ্চিত শিশু" বলতে হবে। অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক বৈষম্য ঘুচানোর প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়ে যে রাষ্ট্র তার যাত্রা শুরু করেছিলো প্রতিনিয়ত সেসব বৈষম্যের দেয়াল আরও পুরু হয়েছে।

সবার জন্যে সমান মাপের শিক্ষার সুবিধা আমরা তৈরি করতে পারি নি। শিক্ষার বুনিয়াদী ধাপ হিশেবে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু কার্যত সবচেয়ে অবহেলিত এই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। জাতিসংঘের বিপূল অংকের অনুদানে রাষ্ট্রশাসক প্রতিবছর জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের উৎসব করছে। ইউনিসেফ প্রতিবছর বাংলাদেশের অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্যে পেনসিল, কাগজ, ইরেজার, জিওমেট্রী বক্সের অনুদানও দিচ্ছে- রাষ্ট্র শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ভাতা দেওয়ার কাজটাও সাফল্যের সাথে করতে পারছে না। দেশের ৯০% মানুষ হয় স্থানীয় অনুদানে পরিচালিত মাদ্রাসায় কিংবা ৫ হাজার টাকা বেতনে বেগারখাটা প্রাথমিক শিক্ষকদের হাতে প্রতিপালিত হচ্ছে। এই আক্রার বাজারে ৫ হাজারে ভদ্রভাবে জীবনযাপন করা অসম্ভব তাই ভোর বেলা জমিতে লাঙল ঠেলে, গরুর জাবনা দিয়ে ক্লান্ত শিক্ষক আসছেন স্কুলে, কোনোমতে তোতা পাখীর মতো বিদ্যাবিতরণ করছেন।

গ্রামের চেয়ে শহরের পরিস্থিতি আরও খারাপ, শহরের বস্তি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত এনজিও স্কুলের হাতে জিম্মি। শিক্ষা গবেষণার নামে ব্রাকের মোটামুটি তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষা ব্যবস্থার জোয়াল টানছে একদল শিক্ষার্থী, অন্যরা অপরাপর অনুদানপ্রত্যাশী এনজিওর কর্মীদের হাতে শিক্ষিত হচ্ছে। কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি আর বিদেশী অনুদাননির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় মাথা গুণতি শিক্ষা কার্যত এইসব এনজিও পরিচালিত শিক্ষার্থীদের অক্ষরজ্ঞানের বেশী কিছু শেখাতে পারছে না। এনজিও পরিচালিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা বর্ণমালা, এলফাবেট চিনছে, এক থেকে একশ গুণতে শিখছে, ২ সংখ্যার যোগ শিখে যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পৌঁছাচ্ছে তখন রাষ্ট্র বলছে এইসব শিশুদের কোটি পর্যন্ত সংখ্যা গুণতে-লিখতে- চিনতে শিখতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিস্থিতির ভেতরে আমাদের পাঠশালা কিছুটা ব্যতিক্রমী প্রয়াস। সমাজের সেই তথাকথিত " সুবিধাবঞ্চিত শিশু"রা এই স্কুলের শিক্ষার্থী। এদের একাংশ হাউজিং প্রকল্পের পাশে গড়ে ওঠা বস্তিতে থাকে, হাউজিং প্রকল্পের বিভিন্ন বাসায় ফুটফরমাশ খাটে আর ছেলে শিশুরা একটু শক্ত-পোক্ত হলে লেদের দোকানে হাতের কাজ শিখে, কিন্তু গত ৫ বছরে এদের বড় একটা অংশ আমাদের পাঠশালায় শিক্ষার্থী হিশেবে ভর্তি হয়েছে। মূলত অবৈতনিক এই পাঠশালা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত অরাজক পরিস্থিতির বাইরে ভিন্ন কিছুর প্রত্যাশা তৈরি করেছে, শিক্ষার্থীদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস- আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করছে, সাজেশন আর গাইড বইয়ের বাইরে গিয়ে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ পাঠ্যবই পড়ছে, পিএসসি পরীক্ষায় একজন বাদ দিলে সকল শিক্ষার্থীই এ কিংবা এ+ পেয়েছে। গাইড বই আর সাজেশন অনুসরণ করেই ফলাফল ভালো করতে হয়, শহরের নামকরা স্কুলগুলোর এই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

শহুরে কোচিং নির্ভর ভালো স্কুলগুলোতে শিক্ষকরা জ্ঞানের সেলসম্যান, এদের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কটা ব্যবসায়িক সুতরাং শ্রেণীকক্ষের বাইরে একজন শিক্ষার্থী খুব কম সময়ই শিক্ষকের বিনামূল্যে শিক্ষকদের সহযোগিতা চাইতে পারে। আমাদের পাঠশালার পরিস্থিতি এইক্ষেত্রে আলাদা, শিক্ষার্থীরা যেকোনো সময়ই শিক্ষকদের কাছে গিয়ে বলতে পারে স্যার আমাকে এইটা দেখিয়ে দেন।
শিক্ষকদের কোচিং ক্লাশের জন্যে না স্কুল মূলত শিক্ষার্থীদের জন্যে ধারণা অনুসারে এখানে শিক্ষার্থীরা নিজের আগ্রহে যেটুকু সময় স্কুলে থাকতে চায়, স্কুলের দরজা সেটুকু সময় খোলা।

শ্রেণীকক্ষের অপ্রতুলতা, স্থানের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় নি " আমাদের পাঠশালা" প্রতিষ্ঠানের, কিন্তু শিক্ষার্থী-- শিক্ষকদের সম্পর্কের আন্তরিকতায় এই স্থানের সংকট শিক্ষাদানে তেমন প্রকট বাধা হতে পারে নি। এদের একাংশ স্কুল ছেড়ে যাবে, যাদের মোটামুটি আর্থিক সংগতি আছে তারা হয়তো প্রচলিত "ভালো-সরকারী" স্কুলে ভর্তি হবে তবে অধিকাংশই এই অবৈতনিক স্কুলের সুবিধার বাইরে বাড়তি শিক্ষার সুবিধা পাবে না। তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক বৈষম্য সহনীয় করার লড়াইয়ে নামতে হবে। এনজিওর ভাষায় এরা সুবিধাবঞ্চিত শিশু, সরকারী তালিকায় এরা দারিদ্র এবং প্রান্তিক দারিদ্র রেখার আশেপাশে ঝুলতে থাকা পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্য। সমাজের অর্থবিনিময়ের নিয়মে এরা অনেক সেবাই পয়সার অভাবে গ্রহন করতে পারে না, কিন্তু এরা " আমাদের পাঠশালা"কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান মনে করে। তাই সদ্য ৮ম শ্রেণী উত্তীর্ণ ছেলেটা জানুয়ারীতে স্কুলে ফিরে এসে নিজের আগ্রহে পরবর্তী ক্লাশের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছে। শিক্ষার্থী হিশেবে স্কুলের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর শিক্ষক হিশেবে যেনো কিছুটা সম্পর্ক রয়ে যায়- এই সম্পর্কটুকু আঁকড়ে রাখার তাগিদ যে বিদ্যালয়ে তৈরি হয়-সেইসব শিশুদের "সুবিধাবঞ্চিত" শিশু বলতে চাই না আমি।
তাদের অনেক ধরণের সীমাবদ্ধতার ভেতরে নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই অদম্য শিশুরা সকল প্রতিকূলতার পাহাড় ঠেলে ভাঙাচোরা পথ অতিক্রমের সিদ্ধান্তে অটল। তারা লড়ছে, মানবিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সবাই তাদের পাশে পয়সার থলে হাতে দাঁড়াবে এমন না। সহযোগিতা মানে খোলা গামছায় দুই টাকা ছুড়ে দেওয়া না, বরং বাসার সবার ১০ বার পড়ে নেওয়া বইগুলো যা হয়তো পরবর্তীতে আর কখনও পড়া হবে, সেসব বইও এদের উপহার দেওয়া যায়, কয়েক প্যাকেট রঙের প্যালেট, কয়েকটা রঙ পেন্সিল। বিশাল বাক্স ভরে অনুদানের বদলে নিজের সীমিত সামর্থে বছরের একটা সময় কিছু একটা দিয়ে এই সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিকতাটুকুই এদের প্রাপ্তি হতে পারে।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


অসাধারণ উদ্যোগ! সাফল্য কামনা করি।
তবে সমগ্র পোষ্ট জুড়ে দারুণ দারুণ সব কোটেশন দেয়ার মতো কথা বলেছেন ভাইয়া, কিন্তু ভালো কথার এইদেশে শোনার মানুষ নাই!

তানবীরা's picture


বহুদিন কোন কিছুতে জড়াই না।
অনেকদিন পর শুধু এদের সাথে জড়িয়েছি। আরো কিছু লিখুন এদের জন্যে

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,