ইউজার লগইন

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা

আদালতের কাগজপত্রে তাকালে প্রতিবার চোখে পরে রাষ্ট্র বনাম রাসেল পারভেজ কিন্তু কখন কোন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র নামের এই প্রতিষ্ঠান আমার প্রতি বৈরী হয়ে উঠলো, কেনো রাষ্ট্র তার সমস্ত দম্ভ নিয়ে ব্যক্তি "আমি"র মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণ শুরু করলো?

রাষ্ট্র বনাম রাসেল পারভেজের লড়াই ব্যক্তির সাথে আধিপত্যবাদী প্রতিষ্ঠানের অসম লড়াই। আধিপত্যবাদী দমনমূলক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তির অধিকারের সীমানা রাষ্ট্র যখন তখন দখল করতে চায়, কখনও অস্পষ্ট ভয় দেখিয়ে কখনও তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা দিয়ে ব্যক্তিকে দমন করতে চায়, ব্যক্তিকে পীড়ন করতে চায়। রাষ্ট্র শুধুমাত্র আমার রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধাচারণ করেছে কিংবা রাষ্ট্র আমার অনলাইন জীবনযাপনের কথোপকথনে আক্রান্ত বোধ করেছে এমনটা হওয়া সম্ভব না। ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ এর পূর্বে সন্ত্রাস ও অপরাধ পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে সংহত ক্ষমতা কখনও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং পরিচালকদের ভেতরে কখনও এমন ভাবনার উদয় হয় নি।

রাষ্ট্র পরিচালকদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ই ফেব্রুয়ারীর শাহবাগ অবরোধ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখোমুখি করে ফেলেছিলো। রাজনৈতিক আনুগত্যবিহীন অনলাইনচারী মানুষের পাশে উপেক্ষিত সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে এস্টাবলিশমেন্টকে ক্ষমতার সংকটে ফেলে দিবে এমনটা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো কখনও কল্পনাও করে নি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা, তাদের নানাবিধ উপঢৌকন এবং অপরাধী পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে সন্ত্রস্ত জনগণকে নিয়ন্ত্রন করতে চাওয়ার অভিপ্রায় হুমকির মুখে পরে যাবে, তাদের দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাসের বেলুন এমন জাগরণে চুপসে যাবে এমনটা তারা দুঃস্বপ্নেও দেখে নি। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসী না হওয়ায় ক্রুদ্ধ মানুষ ফাঁসীর দাবীতে শাহবাগ দখল করে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাচর্চার বৈধ্যতাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে ফেলেছে।

রাষ্ট্রের সাথে রাসেল পারভেজের এই অসম লড়াই আদতে অভাবিত সাধারণ মানুষের উত্থানের বিরুদ্ধে সন্ত্রস্ত রাষ্ট্র পরিচালকদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যা প্রতিহিংসাপরায়ন, বৈরী এবং তীব্র হয়ে উঠেছে সময়ের সাথে। রাষ্ট্র তার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নিয়ে ব্যক্তির নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে শুধু এখানেই প্রক্রিয়াটা থেমে থাকছে না বরং রাষ্ট্র ব্যক্তির উত্থানকে দমন করতে চাইছে। ৫৭(২) ধারার অস্পষ্ট দলনে পিষ্ট সকল মানুষকে নিপীড়ণ করে রাষ্ট্র অনলাইনজীবী মানুষদের বশ্যতার পাঠ শেখাতে চাইছে। বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠা অনলাইনজীবীদের সামনে উদাহরণ হিশেবে তুলে রাখা হয়েছে আমাদের এবং আমাদের বিরুদ্ধে এক ধরণের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে রাষ্ট্র অপরাপর সবাইকে রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণ মেনে নেওয়ার শিক্ষা দিতে চাইছে। রাষ্ট্র অবিচার করবে, রাষ্ট্র অপরাধ করবে, রাষ্ট্র অধিকার হরণ করবে, সেসব অন্যায়-অপরাধ- অধিকারহরণের কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। শুধুমাত্র যাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি কোনো না কোনো ধাঁচে আনুগত্য আছে, এই দেশে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার শুধুমাত্র তাদেরই আছে। যাদের রাজনৈতিক আনুগত্যে তেমন স্পষ্টতা নেই, তারা সবাই সাম্ভাব্য " এনার্কিস্ট"। রাষ্ট্র হাইপার লিবারেল, এনার্কিস্ট, ডিজলয়াল টু এনি পলিটিক্যাল আইডিওলজি এমন ধাঁচের সংঘকে সংশয়ের চোখে দেখে। ভীত-সন্ত্রস্ত করে বিচ্ছিন্ন করার বাইরে এই মানুষগুলোকে প্রতিরোধের কোনো কার্যকরী পন্থা রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের জানা নেই।

রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনী কাঠামোর ভেতরে রাষ্ট্রকতৃক ঘটে যাওয়া অবিচারের প্রতিকার এবং রাষ্ট্রের অন্যায় আগ্রাসনের প্রতিরোধের লড়াইয়ের গত ১ বছরে প্রতিষ্ঠানের সামনে ব্যক্তির অসহায়ত্ব বিভিন্ন ভাবে উপলব্ধি করেছি । বিচার প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপন অবিচারের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিমূহুর্তে প্রতিরোধের স্পৃহা উবে যায়, মানসিক পীড়ন এবং অসহায়ত্ববোধ লড়াকু মানসিকতাকে ধ্বংস করে ফেলে। রাষ্ট্র ক্ষমতা চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তির উদ্যমকে ধ্বংস করে ফেলে, ব্যক্তি পরাজিত হয়।
বিচার প্রক্রিয়াকে বিভিন্ন পর্যায়ে বাধাগ্রস্ত করে, হতাশার সময়সীমা বৃদ্ধি করে রাষ্ট্র ব্যক্তি আমাকে যেসব ক্ষতি্র মুখোমুখি করেছে এবং এইসব ক্ষতির প্রতিক্রিয়ায় আমার ভেতরে যে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব তৈরী হয়েছে তার করুণ বিবরণ দিয়ে সহানুভুতি অর্জনের আত্মমর্যাদাহীন প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের আগ্রহ বোধ করছি না। রাষ্ট্র ব্যক্তিকে ধ্বংস করতে গিয়ে তার আত্মমর্যাদাবোধকে পীড়িত করতে পারে কিন্তু যদি ব্যক্তির লড়াইয়ে অসংখ্য সহানুভুতিশীল সচেতন মানুষ সংযুক্ত থাকে, তাদের সম্মিলিত সাহস আর প্রতিরোধের মুখে হাল ছেড়ে দেওয়া আত্মসমর্পনের উদাহরণ তৈরির আগ্রহ আমার নেই। ব্যক্তি আমাকে এক ধরণের সামাজিক বৈরীতার মুখোমুখি করে এক ধরনের জীবনযাপনের গ্লানিবোধ তৈরীর চেষ্টা করেছে রাষ্ট্র, সচেতনভাবে যে অপরাধ কখনও করা হয় নি, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের আরোপে সে ধরণের অপরাধের মানসিক ধকল সহ্য করেও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে আমি প্রস্তুত।

গত ১ বছরে শুধু রাষ্ট্রীয় বৈরীতার মুখোমুখি হয়েছি এমন না, বরং একদল মানুষকে বন্ধু হিশেবে পেয়েছি যারা আমার অগোছালো প্রতিরোধী মানসকে আরও বলিষ্ট করেছে, প্রতিনিয়ত সাহস দিয়েছে এবং আইনী লড়াইয়ে সহযোগিতা করেছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।
'আমি' এবং আমরার ভেতরে মাত্রাগত, পর্যায়গত ব্যবধান ন্যুন। আদালতের সামনে আইনী হয়রানির মুখোমুখি " আমি" রা আসলে আমরার সংকীর্ণ অংশ যাদের দৃষ্টান্ত সকল আমিকে আনুগত্য শিক্ষা দিতে পারে। অস্পষ্ট নিবর্তনমূলক আইন আমাদের স্বাধীন মত-প্রকাশের বাধা । এই হয়রানিমূলক আইন সংস্কার করা প্রয়োজন। আমাদের সামনে কল্পিত শত্রু হিশেবে যাদের উপস্থাপন করা হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রগতিশীল গণমাধ্যম যাদের প্রতিক্রিয়াশীল সাম্ভাব্য জঙ্গী হিশেবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী, তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাষ্ট্র ব্যক্তির স্বতঃস্ফুর্ততা ধ্বংস করতে চায়। ব্যক্তির আত্ম অহংকার কলুষিত করে ভয়-ভীতির মাধ্যমে তার মানসিক প্রতিরোধবাসনাকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়।

হেফাজত ই ইসলামীর ভীতিকে যেভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয় তার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় প্রণোদনা আছে। ক্ষমতাচর্চাকারী রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে হেফাজত ই ইসলামী সৃজন করেছে। রাষ্ট্র আগ্রহী হলে সঠিক পরিকল্পনার নিয়ন্ত্রিত চর্চায় এইসব মাদ্রাসাশিক্ষিত মানুষদের পরমতসহিষ্ণু নাগরিক হিশেবে নির্মাণ করতে পারে। তাদের ভেতরে সহনশীলতা, সংবেদনশীলতা, ব্যক্তির অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকেই সংস্কার করে নিরাপদ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে।

মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াশীলতা নয় বরং আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার প্রধানতম বাধা আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিচর্চাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অনাগ্রহ। তাদের নির্লিপ্ততা এবং তাদের উৎসাহ ও প্রনোদনা আমাদের ধর্মীয় সহনশীলতাবোধকে ধ্বংস করেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড় ধ্বংস করে আমাদের সামাজিক চেতনায় আমরা যেসব পরিচয়কে ধারণ করতে চাই সেসব পরিচয়কে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের ভেতরে আত্মপরিচয় সংকট উস্কে দিয়ে এক ধরণের আত্মপরিচয়ের সংঘাত তৈরি করে দিয়েছে।

রাষ্ট্র দাতা গোষ্ঠীর চাপে বিভিন্ন সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে, রাষ্ট্র তথ্য অধিকার আইন অনুমোদন করেছে কিন্তু তথ্যের অবাধ প্রবাহের পথটা নিজেরাই রুদ্ধ করেছে। তথ্য অধিকার আইনের সঠিক চর্চা যেভাবে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারতো, আমাদের আইনী অধিকার চর্চার পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাষ্ট্র আসলে নিজের জবাবদিহিতা এড়াতে চায়। আমাদের তথ্য ও প্রযুক্তি আইন তথ্য অধিকার আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার বদলে বরং বিরোধিতামূলক দুটো ভিন্ন আইন হিশেবে আমাদের রাষ্ট্রবিধির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিদ্যমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের সংস্কার সময়ের দাবী। জনকল্যানমুখী আইনী কাঠামো নির্মানের বদলে দমনমূলক আইনী কাঠামো বাস্তবায়নের উদাহরণের শীর্ষে থাকবে আমাদের বর্তমানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন।রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক মানসিকতা চরিতার্থ করার বাইরে অস্পষ্ট, অবোধ্য, নির্বোধ এই আইন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ যথাযথ রক্ষা করতে পারবে না। আমাদের তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে একটি জনমুখী তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের কাঠামো নির্মানের আলোচনা শুরু করার সময় এখন। সেখানে একজন ব্যবহারকারী হিশেবে আমি কি কি চাইছি তা আমার কাছে স্পষ্ট। দীর্ঘ নিষ্পেষনের অভিজ্ঞতায় আমি জানি ব্যক্তিগত ভাবে আমি চাই না এই অস্পষ্ট আইনের মাধ্যমে আমার মতো অন্য কোনো ব্যক্তি এমন রাষ্ট্রীয় হয়রানির মুখোমুখি হোক। আমি ৫৭ ধারা বিলোপের পক্ষে।

নারী ও শিশু নির্যাতন ও হয়রানী রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোতে অপরাধ চিহ্নিত হলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে অন লাইনে হয়রানির শিকার নারী ও শিশুদের হয়রানীর আইনী প্রতিকার পাওয়া সম্ভব না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়কে আরও দক্ষ করে তোলার দাবী তুলতে হবে আমাদের। আমার প্রত্যাশা ব্যক্তিকে হয়রানির মুখোমুখি না করে ব্যক্তির অধিকার সংরক্ষণে জনগণোমুখী আইনী কাঠামো নির্মানের প্রক্রিয়ায় আমরা সবাই আলোচনার মাধ্যমে একটা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের কাঠামো সরকারের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো ।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


আমরাও আপনার সাথে আছি ও থাকবো, ভাইয়া!

সামছা আকিদা জাহান's picture


ভাল বলেছেন। সহমত।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,