না লেখার মতো লেখা
অনেক দিন ধরেই লেখার চেষ্টা করছি কিন্তু লেখা হচ্ছে না। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগিয়ে একটা কিছু লিখেছিলাম, লেখাটা শেষ হওয়ার আগেই উবে গেলো, ব্যাকস্পেস, ফ্রন্টপেজ সব কিছু ঘুরে দেখলাম এক ঘন্টার মানসিক পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত বৃথা গেলো। ল্যাপটপে যারা দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে লিখতে পারে তারা ভীষণ দক্ষ মানুষ, আমার মোটা মোটা আঙ্গুল তার থ্যাবড়ানো তালুতে কষে থাপ্পর দেওয়া যায় হয়তো কিন্তু ল্যাপটপের কোমল স্পর্শ্বকাতর পরিসরে দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে কিছু লেখা সম্ভব না। ল্যাপটপে লেখাটা অনেকটা অফিসটাইমে ভুল করে ভীড় লেডিস বাসে বিশাল ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে উঠে পরার মতো, একটা অঘটন ঘটবেই- সেই অঘটনের সময় গুণে সময় কাটানো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে এক বন্ধুকে বলেছিলাম জীবনে যাই হোক, প্রতিষ্ঠার কথা না ভেবে লিখবো, তখন জীবনের জটিলতা তেমন ছিলো না, মাথাভর্তি রোমান্টিকতা ছিলো, একজন প্রেমিকা ছিলো, সে বয়েসটা কিছুটা অদ্ভুত, যখন মনে হয় পৃথিবীতে প্রেমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু না, প্রতিটা প্রত্যাখ্যানে মৃত্যুর অনুভুতি আর প্রতিটা চুম্বনে নতুন জন্ম।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেলো রাতারাতি, পৃথিবী এবং পরিপার্শ্ব একই থাকলেও প্রেমের দ্বিতীয় বর্ষে সংলাপ বদলে যায়- প্রথম বর্ষে চাঁদ সুন্দর, নদী সুন্দর, তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে কথাগুলোর প্রতিটির জন্যে একটি চুমু বরাদ্দ থাকলেও প্রেমের দ্বিতীয় বর্ষে প্রতিটা সংলাপের অনিবার্য সমাপ্তি তোমার বাসা থেকে দেখতে আসবে কবে?
কি চমৎকার ফুল ফুটেছে দেখছো?
উম্ম, খুব সুন্দর, এই জানো গতকাল বাসায় না আমাকে দেখতে এসেছিলো।
ও আচ্ছা-
ও আচ্ছা কি, বুঝতে পারতেছো বিষয়টা, তুমি রিলেশনের ব্যাপারে একদম সিরিয়াস না। । আমি কিন্তু আর মা-কে না বলতে পারবো না। তোমার বাসা থেকে কবে আসবে?
এই কবে বিয়ে করবো, কবে বাসায় আসছো প্যাঁচের ভেতরে প্রেম টিকিয়ে রাখা কঠিন।। বিশেষত যারা বিয়ের জন্যে মেয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে তাদের সবারই একটা করে ভালো বেতনের চাকুরী আছে, পরিবারের একটা প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে, তাদের বায়োডাটায় তাদের মার্কশীটের ফটোকপির সাথে মা বাবার মামাতো চাচাতো খালাতো ফুপাতো ভাইবোনের কে মন্ত্রীর শালা কে শিল্পপতির উপপতি- সব তালিকা দেওয়া আছে- সে তুলনায় আমার সাদামাটা জীবনবৃত্তান্তে শুধু আমি তোমাকে ভালোবাসি যোগ্যতার বাইরে বাড়তি কিছু নেই।
কবিতা লিখে বাংলাদেশ বদলে দেবো ভাবনাটা বাদ দিয়ে শিল্পচর্চাকে অবসরবিনোদনের পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার কাজটা সহজ ছিলো না। , মাঝের একটা পথ খুঁজতে খুঁজতে মাথার ভেতরের কবিতার মাঠে আগাছা আর জঞ্জাল জমলো কিছুদিন, তারপর ধীরে ধীরে শব্দসংকট তৈরী হলো, এরপর একদিন কবিতা ছেড়ে গেলো- তারপর অংক মেলানোর মতো কিছুদিন কবিতা লেখার চেষ্টা করে- বুঝে গেলাম- এ পথে আর যাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে এখনও নিখাদ শিল্পচর্চা করে জীবনযাপনের কোনো পরিস্থিতি তৈরী হয় নি। শিল্পচর্চা এখানে সাইডবিজনেসের মতো, সার্টিফিকেটের সাথে বাড়তি যোগ্যতা- উপার্জনের ভিন্ন একটা রাস্তা খুলে দিতে পারে কিন্তু জীবিকার মূল উপলক্ষ্য হতে পারে না। , বাংলা ভাষায় শুধুমাত্র লিখে উপার্জন করা মানুষের সংখ্যা হাতের আঙ্গুলে গুনে ফেলা সম্ভব। । অর্থভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের, যদিও বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার জন্যে নয় বরং তার বই পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো বলে, বই বেঁচে বিত্তশালী হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিলো, ।
পরের উদাহরণ সম্ভবত শরৎচন্দ্র এবং তারপর বাংলাদেশের হুমায়ুন আহমেদ যারা জীবনের একটা পর্যায়ে শুধু বইয়ের রয়ালিটি দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। । এর বাইরে অনেকেই চেষ্টা করেছেন তবে অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত বিকল্প উপার্জনের পথ খুঁজতে গিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন, কায়েস আহমেদের মতো কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন আর অন্যদের সমাজ হত্যা করেছে। ।, ।
আমাদের বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একটা অন্ধকূপ, এখানে বিখ্যাত কবি সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় অবিচুয়ারি লিখে, যারা সংবাদপত্রে অবিচুয়ারি লেখার সুযোগ পায় না, তারা এনজিওতে মানুষের জীবনের করুন গল্পগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে দাতাগোষ্ঠীর টেবিলে সাজিয়ে রাখে, জীবনের করুন গল্পগুলো কফির চুমুকে তারা পান করে, আদ্র হয়।
এখানে নির্মম সমালোচকদের চেয়ে উন্নাসিক পাঠকের সংখ্যা বেশী। লেখার বদলে লেখক-সাহিত্যিকদের জীবনের কুৎসা গাওয়াটা যারা নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। কবি-সাহিত্যিকের জীবনে আদর্শ জুড়ে দিতে গিয়ে এরা সস্তা সাহিত্যিককে অধিক গুরুত্ব দিতে রাজী, আদর্শচ্যুত হয়ে যাওয়া সাহিত্যিক-কবিদের প্রতি এরা ভীষণ ক্রুদ্ধ।
এদের কুৎসা গাওয়ার ধরণ দেখে মনে হয় কবিদের প্যান্টের নীচে বিশাল শিশ্ন আছে, মাথা, দু-খানা হাত আর হৃৎপিন্ডের নীচ থেকে আভূমিলম্বিত শিশ্ন- এই তাদের কল্পনার কবির ছবি- কবির উদর নেই, পরিবার নেই, উদরবিহীন এইসব কবি-সাহিত্যিক ক্লোরোফিল খেয়ে সাহিত্যরচিবে- পাঠ করিবে উন্নাসিকজনা-
শিল্পচর্চা অবসরবিনোদন না, এটা ২৪ ঘন্টার কাজ। প্রুফ রিডিং এবং কপি এডিটিং শেষে বিধ্বস্ত সাহিত্যিক যখন লেখার টেবিলে বসেন- তার মাথায় তখন সারা দিনের টুকরো হেডলাইন ঘুরে- সুতরাং জীবনঘনিষ্ট উপন্যাসগুলো প্রতিদিন আরও বেশী সংবাদপত্রের রিপোর্ট হয়ে যায়।, সে রিপোর্ট আলাদা করে কেনার প্রয়োজন নেই, মধ্যবিত্তের সাহিত্য উপভোগের জন্যে সংবাদপত্রগুলো শুক্রবারের বিশেষ সাহিত্যপাতা খুলেছে, সেখানে সাহিত্য বিক্রী হচ্ছে।
সেই সাহিত্যপাতায় জায়গা পাওয়ার জন্যে আগ্রহী লেখক-কবিদের ভেতরের লড়াইগুলো অন্তর্জালের কল্যানে এখন নিয়মিত চোখের সামনে চলে আসে। , সে লড়াই উপভোগ্য কিছু না, উন্নাসিক পাঠকদের জঞ্জাল জমানোর নির্দিষ্ট ভাগাড়ে সাহিত্যিকদের মুন্ডুচটকানোর নিয়মিত আয়োজন আছে, সেখানে জাতীয়তাবাদের মোড়কে শিল্পীকে আবৃত করে তাকে আচ্ছামতো পেঁদিয়ে নিজেদের যৌনকাতরতার লালা ঝড়ায় উন্নাসিক পাঠকেরা। , বাংলাদেশে যদি কখনও ছড়াকার লীগ তৈরী হয় তার প্রধান আহ্ববায়ক, সাধারণ সম্পাদক এবং প্রফু এডিটর সেই ভাগাড়ে নিয়মিত সমালোচনা লিখে, নিত্যনতুন শব্দ উদ্ভাবন করে।, সে কি ভীষণ লড়াই, যেনো রাম-রাবনের যুদ্ধ হচ্ছে,
ভাগাড়ের মাপে ছাঁটা একজন নয়াদিগন্তের ঈদ সংখ্যার নিয়মিত ছড়াকার- ঈদ মৌসুম শেষ হলে মীর কাশেম রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড় হাঁক দিয়ে জাতীয়তাবাদী হিজাবে ঢেকে গেলে সব পাপ শুদ্ধ হয়ে যায় সম্ভবত, আমরা এখনও আমাদের সাহিত্যিকদের জীবিকার নিয়মিত বন্দোবস্ত করতে পারি নি।।
যাকে কলম পিষে খেতে হয়, সে পারিশ্রমিকের অংক দেখবে। আদর্শের কারণে হয়তো সরাসরি সংগ্রামের ঈদ সংখ্যায় লিখবে না কিন্তু বাংলাদেশের আদর্শবাদী সংবাদপত্র জগতে কোন প্রকাশনা সংস্থাটা ইসলামী ব্যাংকের বিজ্ঞাপন ছাপায় না। , বাংলাদেশে প্রগতিশীলতার দুটো পথ- হাড়ে মাংসে দুবৃত্ত্ব একদল মানুষকে তোয়াজ করা অথবা জামায়াতী ইসলামের সমর্থকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তোয়াজ করা। , জাতীয়তাবাদ বলছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক অঙ্গীগারগুলোকে বিশ্বাস করে না, স্বাধীনতার চেতনাকে বিশ্বাস করে না এমন একদল অপরাধীকে তোয়াজ করতে হবে- কারণ সেটা মন্দের ভালো। জামায়াত ই ইসলামী বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা এবং অঙ্গীকারে বিশ্বাস না রাখা এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস না রাখার ভেতরে তফাতটুকু আমি বুঝতে পারি নি এখনও। । , নিশ্চয়ই একটা গুরুতর প্রয়োজনীয় পার্থক্য আছে। , আমার বোধগম্যতার ভেতরে তা আপাতত নেই, আশা করবো ভাগাড়ের অনুগত মানুষেরা সে তফাত হাতে ধরে উপস্থিত হবে মন্তব্যের কলামে।





বাংলাদেশে যে যখন চায় তখনই কাংখিত লেখকের লেখা পেতে পারে! আমার ধারনা লেখা তাঁরা জমা রাখে আর থোক বরাদ্দ দেয়।
কঠিন সত্য একটা লেখা।
কঠিন সত্য একটা লেখা।
এত বাস্তবতা অসহ্য।
খুব ভাল লাগলো লেখাটা পড়ে... [[কোক]]
মন্তব্য করুন