এক বৈশাখে

আমরাবন্ধুতে যখন বৈশাখের স্মৃতি নিয়ে লেখা আহবান করা হলো, আমি আঁটঘাঁট বেঁধে বসলাম - কিছু একটা লিখেই ফেলবো এইবার! কিন্তু একটা অক্ষরও লেখতে পারলাম না। আমার জন্য লেখালেখিটা কোনোকালে সহজ ছিল না, এমনকি স্মৃতিকথাও না। স্মৃতি বলতেই সবার মনসচক্ষুতে ভেসে আসে হাসি-কান্না-অভিমান-ভালোবাসার মিশেলে টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা। আমি এইদিক দিয়ে বড়ই অভাগা। আমার স্মৃতির সাথে দল বেঁধে ছুটে আসে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রাট সহ নানা গুন্ডা-পান্ডারা; আমাকে স্মৃতিভ্রষ্ট করে দিয়ে তারপর দাঁত কেলিয়ে হাসে।
একটা দারুণ ভয়ের স্বপ্ন দেখে লাফ দিয়ে জেগে ওঠার পরে অনেকসময় স্বপ্নটার কিছুই মনে থাকে না, শুধু ভয়ে তখনো গা'টা একটু শিরশির করে উঠে। আমার স্মৃতিরা এরকম; খুব আনন্দের কিংবা খুব বেদনার হয়তো, তবে তার সূক্ষ্ণ কিংবা স্থূল ডিটেইলগুলো আমার মনে থাকে না, শুধু অনুভূতিটা টিকে থাকে। আমি তাই সেই স্মৃতির অনুভূতিতে ইচ্ছেমতো রং চড়াই। ভাঙ্গা পেন্সিলের কোনো স্মৃতিই হয়তো আমার স্মৃতি না, তবে অবশ্যই আমার স্মৃতির অনুভূতি।
এক বৈশাখের কথা ... ১৪১৪'র পহেলা বৈশাখ। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় পা রাখলেও স্কুল-কলেজের বন্ধুত্বের টানটা তখনো বেশ গাঢ়। তার উপরে সিনিয়রদের বিশ্বকাপ দেখার মাশুল গুনছি, চার মাস ধরে বেকার। ক্লাশ শুরু হয় না। অন্যসব বন্ধুদের ক্লাশ চলছে। এমনই সময় এল পহেলা বৈশাখ। স্কুল-কলেজের সব বন্ধু আবার এক হলাম। পুরোদমে ক্লাশ শুরু না হওয়ায় কিংবা "সব গোল্লায় যাক" ভেবে ঢাকার বাইরের বন্ধুরাও এসে পড়েছে। ইউনিভার্সিটি এলাকায় জমলো আমাদের আড্ডা। নতুন জীবনের নানা কথা, দেখা-অদেখা স্বপ্ন আর পুরোনো যতো স্বপ্ন ভাঙার গল্প চলছে। আমাদের সময় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস গণতন্ত্রের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। দুই-তিন লাখ থেকে শুরু করে দশ-বারো লাখ পর্যন্ত খরচ করে অনেকে প্রশ্ন কিনে এখন আধা-ডাক্তার। আর যেসব বন্ধুরা ডাক্তার হবার স্বপ্ন দেখেছিল, তারা কেউ কেউ মাথায় ল্যাপ্লাস-ফুরিয়ারের ইকুয়েশন ইনজেক্ট করে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেষ্টা করছে; কারো কারো সামর্থ্য আছে, প্রাইভেট মেডিক্যালে পড়ছে; আর কাউকে কাউকে প্রশ্ন-ফাঁসও আটকাতে পারেনি, ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে দেশের কোন না কোন চিপার এক মেডিক্যালে। সে যাক গে, পহেলা বৈশাখের কথা বলি। খুশির দিনে দুঃখবিলাস না-ইবা করলাম!
টিএসসির সামনের দেয়ালে বসে আছি। আড্ডা দিচ্ছি বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সামনের ফুটপাথ ভরা মানুষের ভিড়। পাশেই রাস্তার ধারে মেলা চলছে টিএসসি আর দোয়েল চত্বরের মাঝের রাস্তা জুড়ে। গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভিড়...এলোমেলো আড্ডা দিতে দিতে যখন বিরক্ত হতে শুরু করবো প্রায়, তখনই হঠাৎ মেডিক্যাল-দুর্ভাগারা বললো, "আয় ভিক্ষা করি।" প্রথমে বুঝলাম না কি করতে চায়। পরে সত্যি সত্যি রুমাল বিছিয়ে ফুটপাথে বসে পড়লো অত্যুৎসাহী বন্ধুরা। অত্যুৎসাহীদের সবাই ডাক্তারি লাইনের ছিল না, কিন্তু তাতে কি যায় আসে?! আমিও বসলাম তাল মিলিয়ে। খানিকটা মুখচোরা হওয়ায় চুপচাপ দেখতে লাগলাম কে ক্যাম্নে কি করে! এক বন্ধু কোত্থেকে এক রুমাল জোগাড় করলো। সামনে পেতে বসলো। তারপর শুরু হলো ভিক্ষা প্রার্থনা," খালাম্মা/আপু/ভাইয়ারা, দুইটা ভিক্ষা দিয়া যান। ডাক্তার হবো"। "প্রশ্ন কিনতে সাহায্য করুন, দেশের সেবা করতে সুযোগ দিন" মার্কা স্লোগানও দেয়া হলো। রুমালের সামনে দিয়ে পাথর-হৃদয় মানুষগুলো হেঁটে যায়, ফিরেও তাকায় না। সেদিন প্রথম উপলব্ধি করলাম--ভিক্ষা করা আসলে খুব সহজ না।
আমরাও দমবার পাত্র নই। চিন্তা করে বের করলাম ছিড়া-ফাঁড়া দুইটাকা একটাকা কিংবা কয়েন রাখতে হবে রুমালের উপরে। নাহলে কেউতো বুঝতেই পারবে না যে আমরা আসলে ভিক্ষা করতেই বসছি। এই ভিড়ের কলতানে কি আর আমাদের করুণ(!) আর্তি শোনা যায়? অতঃপর ভিক্ষার উদ্যোক্তারা প্রায় ডাকাতি করেই আমাদের বাকি সবার পকেট থেকে দুই-একটাকা খসালো। কে বলে ভিক্ষা করতে পুঁজি লাগে না !?!
প্লান কাজ করলো। আশপাশ দিয়ে যাওয়া মানুষরা এবার ঘুরে ফিরে তাকাতে লাগলো। তবে পাথর হৃদয় খুব একটা গললো না; কিংবা আমাদের বেশ-ভূষায় বিভ্রান্ত হয়েই সে পাথর-হৃদয়গুলো হয়তো বুঝে উঠতে পারলো না আমাদের ভিক্ষার মর্ম। কিছু সময়ের মধ্যেই সামনে পড়লো সহভিক্ষুক এক বন্ধুর পুরোনো প্রেমিকা, আমাদের স্কুলেরই মেয়ে। তাকেও ধরলাম আমরা। ভিক্ষা না দিয়া যাবি কই? সেও আরেক মেডিক্যাল-দুর্ভাগা; কয়েকটা টাকা দিয়ে বেচারি এ যাত্রা ছাড়া পেল। স্কুলের আরো কিছু বন্ধুদের গ্রুপ সামনে পড়লো, সেখান থেকেও ভিক্ষা প্রার্থনা করা হল। এমনি করে কিছুক্ষণ যাবার পর সামনে বসা এক অচেনা যুগল হঠাৎ করে আগ্রহী হল। অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের ভিক্ষাবৃত্তি দেখছিল আর দুজন মিলে হাসাহাসি করছিল। এবার ভদ্রলোক তার বান্ধবীর ঠোঙ্গা থেকে কয়েকখানা বাদামও দান করলো আমাদের ভিক্ষার ঝুলিতে! আমরা সে বাদাম খেয়ে শুকরিয়া আদায় করলাম, আর বুঝাতে লাগলাম এই কয়টা বাদাম দিয়ে তিনি দেশ ও জাতির ভবিষ্যত নির্মাণে কি বিপুল অবদান রাখলেন! তবে এই যুগল বাদে আর কোনো অচেনা বাঙালির বিশ্বাস হলো না যে আমাদের কেউ ডাক্তার হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে!
কিছুক্ষণ পর ক্রমাগত ব্যর্থতায় সকলের তেল ফুরিয়ে এল। আমরা বিনিয়োগকারীরা পুঁজি বাদ দিয়ে লাভ হিসাব করতে গিয়ে দেখলাম সব মিলিয়ে দশ কি বারো টাকা জমেছে। দশ-বারো লাখ টাকার ডাক্তারি বিদ্যা সম্বলিত প্রশ্ন কি আর দশ-বারো টাকায় পাওয়া যাবে?! তার চেয়ে বাদাম খাই; ডাক্তার হওয়া আমাদের কম্মো না। বাদাম কিনলাম, সামনের যুগলকেও দিলাম। আর শুকনো বাদাম চিবুতে চিবুতে আমাদের ভাঙা স্বপ্নগুলো জোড়া লাগলে কেমন হতো ভাবতে লাগলাম।
দুপুরের চড়া রোদে যখন মাথা চিড়বিড় করতে লাগলো, তখন আস্তে আস্তে আসর ভাঙতে লাগলো। ছোট ছোট গ্রুপে ভেঙে আমরাও জনারণ্যে মিশে গেলাম। ইশকুল বেলার বন্ধুদের সাথের শেষ বৈশাখ এমনি করে শেষ হয়ে গেল। বন্ধুদের কেউ এখন খুব কাছে, কেউ বা খুব দূরে... কেউ কেউ কাছেই, তবু দূরের চাইতেও দূরে। "যাক পুরাতন স্মৃতি"- তান তুলে পহেলা বৈশাখ এখনো প্রতি বছরই আসে; শুধু লেখাপড়ার ঝামেলায় কেউ আসতে পারে না, কারো কারো সময় হয় তো তিন-চারশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঢাকা আসার অর্থ-সংকুলান হয় না। নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ততাও আছে। কারো কারো প্রিয়তমার সঙ্গ দেবার ডিউটিও থাকে। কিছুই আর আগের মতো করে হয় না...
স্মৃতিতেই ছিল বৈশাখ, স্মৃতিতেই হারিয়ে গেল।
ছবিসূত্রঃ চারুকলার শিল্পীদের তৈরি করা মুখোশ, ছবি আমারই তোলা; সময়ঃ চৈত্রের শেষ দিন, ১৪১৬।





ঝড় শুরু হইছে বাইরে... কখন ইলেক্ট্রিসিটি ফট্টুস দেয় ঠিক নাই...
ভাঙ্গার লেখা পইড়া আকাশ ভাইঙ্গা ঝড় বৃষ্টি
জোশিলা হইছে... ইশ লেখাটা যদি আর কয়দিন আগে বের হইতো
ধইন্যা
হুমম আকাশ ভাইঙ্গা ঝড় বৃষ্টি হইতে গিয়া আমার ঘর ধুলা-পানিতে একাকার হইছে, ইন্টারনেট লাইন বন হইছে, কারেন্ট জ্বালাতন করছে...আর কি কমু
ভাঙ্গারে মাইনাস... এই লেখা কেন আগে দেয় নাই? ইবুকে থাকলে কী ক্ষতি হইতো?
আসলেই...আমারে মাইনাস! তবে পজিটিভ দিক দেখেন। আমার লেখা না থাক্লে আমরাবন্ধুর প্রথম পাতায় বৈশাখী লেখা থাকতো না
-ভিক্ষা করা আসলে খুব সহজ না
হ , শুভ নববর্ষ
শুভ নববর্ষ
দলছুটের "আল্লার ওয়াস্তে ২টা ভিক্ষা দেনগো ..." ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিলো নাকি?
"আমার জন্য লেখালেখিটা কোনোকালে সহজ ছিল না" এটা কি বললা? কঠিন হবার পরওতো দারুণ লেখো। তোমার নামই কি বিনয় মজুমদার?
ভাঙ্গা বিনয় মজুমদারর আত্মীয় হয়
কি যে কন! আমি কি কইছি নাকি আমি খারাপ লেখি?! আমার লেখা তো বসস
...খালি লেখতে ইকটু কষ্ট হয় 
মজা পাইলাম ভাঙা
আহারে...মজাটাই দেখলেন, দুঃখটা বুঝলেন না!
স্মৃতি-বিস্মৃতির দোহাই দেবার দরকার নাই। ভাঙা পেন্সিলের আরো আরো স্মৃতিকথা চাই।
বাঙালির তিন হাত-ডান হাত, বাম হাত আর অজুহাত
বছরের প্রথম দিনই ভিক্ষা করছেন! তো সারা বছর কেমন গেছিল?
সারা বছর আর ভিক্ষা করতে হয় নাই, মাইনষে তাদের পুলাপান পড়ানোর জন্য এমতেই ট্যাকা দিছে
জোশিলা লেখা । মজা পাইলাম লিখতে পারেন না তাইতেই, পারলে কি হয়তো কি জানি।
পারলে ব্লগটা এম্নে কইরা উল্টায় যাইতো
এইটা কীভাবে হইলো? :০
www.rotateme.org এ যান, তাইলেই বুঝবেন
ওয়াও, দারুণ জিনিস শিখলাম তো একটা!!
মজা পাইলাম আবার সিনিকাল টোনটা উপভোগও করলাম ... অনেক স্মৃতি মনে করাইয়া দিলেন ...
খুইলা বসেন স্মৃতির ঝাঁপি...আমরাও দেখি কি আছে!
হা হা হা হা
ভালো হ্ইছে ইবুকে দেওনাই
ইবুকে দিলে কি আর কমেন্টানো যায়?
.............."স্মৃতি বলতেই সবার মনসচক্ষুতে ভেসে আসে হাসি-কান্না-অভিমান-ভালোবাসার মিশেলে টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা। আমি এইদিক দিয়ে বড়ই অভাগা। আমার স্মৃতির সাথে দল বেঁধে ছুটে আসে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রাট সহ নানা গুন্ডা-পান্ডারা; আমাকে স্মৃতিভ্রষ্ট করে দিয়ে তারপর দাঁত কেলিয়ে হাসে।" ...................."আমার স্মৃতিরা এরকম; খুব আনন্দের কিংবা খুব বেদনার হয়তো, তবে তার সূক্ষ্ণ কিংবা স্থূল ডিটেইলগুলো আমার মনে থাকে না, শুধু অনুভূতিটা টিকে থাকে। আমি তাই সেই স্মৃতির অনুভূতিতে ইচ্ছেমতো রং চড়াই। ভাঙ্গা পেন্সিলের কোনো স্মৃতিই হয়তো আমার স্মৃতি না, তবে অবশ্যই আমার স্মৃতির অনুভূতি।" গল্পের শুরুর এ ভূমিকাটুকু এত ভাল লেগেছে !
পহেলা বৈশাখ আবারো প্রায় এসে গেল । আবারও এমনটি ঘটতে পারে । এমন করে স্মৃতির ভান্ডার ভরে উঠতে পারে । হবু ডাক্তারদের ভিন্ন পেশার প্রশিক্ষণ (?) কোন কাজে লাগবেনা, তবে গল্পটি দারুন, আর লেখার ভঙ্গী অত্যন্ত আকর্ষণীয়, ঈর্ষণীয়ও বলা যেতে পারে ।
াই, ভালা পাইলাম
(
(
বুয়েটে আমার প্রথম পহেলা বৈশাখ নিয়া কিছু মজার স্মৃতি আছে,কিছু দিন পর লেখবো,এখন আমার টার্ম ফাইনাল,
মন্তব্য করুন