ইউজার লগইন

দূরতম গর্জন'এর ব্লগ

ঈশ্বরের চেতনা

আসবাবপত্রহীন ঘর অনেকটা সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর মতই। যখন সে ঘুমিয়ে থাকে তখন যে কারো মনেই বয়ে যায় প্রশান্তির হাওয়া। এক অজানা সুখ মুখে ছোট্ট হাসি এনে দেয়, সারা শরীরে বয়ে চলে এক অদ্ভুত আদুরে অনুভূতি। এই ছোয়াচে আদরের সংক্রমন উপেক্ষা করা কঠিন, তেমনি কঠিন হয়ে যায় ৩ দিন পর নিজ রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়া, শার্সিতে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোটা দেখতে থাকা।

অদ্ভুত আলস্যে দিন গুলো কেটে যায়। ৮ টা ঘন্টা টানা পরিশ্রমের পর বসে থাকি, কথা বলি। খেতে থাকি যতক্ষন না উদর পূর্তি হয় অথবা চেতনা গুলো হারিয়ে যায় রঙ্গিন পানির নেশায়। কখনো সে নেশার আতুরতা সেটে যায় নগ্ন শরীরের অলিগলিতে। হরমোনের প্রবল স্রোতে ককেশীয় চামড়ার সোদা গন্ধে নিজের সচেতনাকে মেরে ফেলার অদম্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়তোবা সার্থকও হয়। চিন্তা করতে চাই না এহেন অনুশোচনার।স্বপ্নে তলিয়ে যাক আমার প্রতিটা সেকেন্ড।

উড়ে যাওয়া হাওয়াগুলো

ঠান্ডা জাকিয়ে বসছে ইদানিং। রাত যত গভীর হয় কন কনে ঠান্ডা হাওয়া গাছের পাতাগুলো ঝরতে থাকে। দিগন্তজোড়া সবুজের উৎসব ফিকে হয়ে হলদেটে রং এ রূপ নিচ্ছে। চোখ ধাধিয়ে থাকা রূপ নির্জীবতায় বিলীন হয়ে যায়।

বিকেল গড়ালে পার্কগুলো জনমানবহীন হয়ে পড়ে। নিয়নের আলোতে নিজেকেই অদ্ভূত গীরগিটি মনে হয়। ক্যাম্পে পড়ে আছে কতদিন হলো এখন আর হিসেব নেই। উকিলের কোনো খোঁজ নেই, ইমিগ্রেশন ব্যাস্ত এখন সিরিয়ানদের নিয়ে। আমার অলস সময়গুলো কেটে যায় মানুষ দেখতে দেখতে। ল্যাপটপটা বিগড়ে গেছে কিছু দিন আগে। আইফোন দিয়ে গান শুনতে ভালো লাগলেও ল্যাপটপের কাজ করা যায় না। হাতে তেমন কিছু নেই যে একটা ল্যাপটপ কেনার বিলাসিতাটা করতে পারি।

শুধু একটা সোয়েটার আর মা এর কিনে দেয়া লেদার জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে গান শুনছিলাম। ঠান্ডা বাড়ছিলো আধার গ্রাস করছিলো পুরোটা আকাশ। হাটতে থাকলে গামলাস্তনের দিকে। ঠান্ডায় পিপাষা বাড়ে, পানশালাতে আড্ডায় ভরপুর হতে থাকে পিপাসার্ত মানুষের। প্রেসবিরন থেকে একটা ক্যান কিনে গলা ভিজাচ্ছিলাম এমন সময় একজন বাংলায় বলে বসলো পেছন থেকে,"ভাই, লাইটার আছে?"

মৃতপ্রায় দিগন্তজোড়া

বলা হতো যখন দিগন্ত ঢেকে যেতো তীব্র শীতের সাদা বরফে, তখন রাতের আধারে নেমে আসতো বর্বরতার দেবতা। লুটে নিতো লুটেরা, হত্যা করতো গ্রামের পর গ্রাম, তরুনী কিশোরী নির্বিশেষে হতো ধর্ষিত নিজের আপনজনের সামনে। এভাবে যখন প্রতিটা শীতে একের পর এক গ্রাম জ্বলে ন গরীর লোকালয়ে পা রাখে তখন ছোট রাজকন্যা বিমর্ষ রাজার কানে একটা বুদ্ধি এটে দেয়। বলে এমন একটা দূর্গ বানাতে যার মধ্যে ঢুকলে শত্রুরা পথ হারিয়ে ফেলবে, হীতাহীত জ্ঞান হারিয়ে যুদ্ধ করার সমর্থ খোয়াবে। পাহাড়ের ওপর বিশাল এক গোলকধাঁধার দূর্গ।

এভাবেই শতকের পর শতক প্রাগের দূর্গ সুরক্ষিত করে আপন লোকালয়, জনমনে এনে দেয় স্বস্তি। প্রবল শীত গুটিগুটি পায়ে এগুচ্ছে আমার জানালার শার্ষিতে আর আমি ঢুলুঢুলু চোখে আকিবুকি করি কুয়াশা ঢাকা কাচে। অবিচ্ছন্ন অবসর আমার, তাই বাসায় ফোন করবার ভুলটি করে বসি।

: সকালে খেয়েছিস?
: হ্যা।
: ঠান্ডা কেমন পড়েছে?
: এখনও তেমন না।
: হাতে টাকা পয়সা আছে? ভালো জ্যাকেট?

বৃষ্টিদিনের প্রেমিক

ট্রেন স্টেশনে বসে আছি, পাশে ইতালী থেকে আগত নাজমুল ভাই। বয়স ৩৮ এর ওপরে, স্টকহোমে এসেছেন তিনদিন। গত পরশু দেখা হয়েছিলো তার সাথে আমার ঠিক এখানেই। থাকার জায়গা পাচ্ছিলেন না, আমাকে দেখে কেতা ঠিক রাখতে ইংলিশ ইতালিয়ান মিশিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন।

একটু আগে আমাকে বললো,"আপনাকে দেখে মনে করেছিলাম আপনার জন্ম সুইডেনে। আপনার বাংলা কথা বলার টোন, চুলের স্টাইল দেখে মনেই হয় না আপনি কেস (এসাইলাম) মারছেন। দেশে কি মডেলিং করতেন?"

আমি এর কোনো উত্তর দেইনি। আমি অপেক্ষা করছিলাম ট্রেনের জন্য। গতকাল রাতে একটা আইফোন উপহার পেয়েছি সোনিয়ার কাছ থেকে। তারপরই ওর সাথে আমার একটা কঠিন ঝগড়া হয়। আমি ওর রুম থেকে বেরিয়ে যাই, বলা যায় এক কথায় আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়। যাই হোক, সেটা অন্য একদিন লিখব ক্ষন।

ট্রেন স্টেশনে বসে বসে আইফোনে সিম গুজেই দেখি সব কিছু সেট করা, নিজের নামে আপেল আইডি, বিভিন্ন ভাষার গান আর ওয়াল পেপারে সোনিয়ার ছবি। যদিও ছবিতে জামা কাপড় একটু কম.....আই ফোন ৪এস।

টাবিথাকে ফোন দিলাম:
: হ্যালো টাবিথা?
: কে?

এক গুচ্ছ ড্রোন!

আজকের আকাশে এক গুচ্ছ রোদ ছিলো। সে রোদে ছোট ছোট শিশুরা লাল ক্যাপ পড়ে ঘুরতে চেয়েছিলো। হাতে পপসিকলস নিয়ে ষোড়শী লাল ফ্রক বাতাসে হেলিয়ে দুলিয়ে স্কুল থেকে ফিরবে। জানালার সাড়শী খুলে পাশের বাড়ির সোনালী চুলো উষ্কখুষ্ক ছেলেটার সাথে কথা বলার বাহানা খুজবে।

অথচ পুরোটা রাস্তা জ্যামে আটকে গেলো। ট্রেন গুলো অথর্বের মতো বসে বসে প্রমাদ গুনছে ট্রাফিক পায়নি বলে। বাসগুলো বেরোয়নি বেশী ডিপো থেকে। অফিস আদালত তবুও থুবড়ে পড়বে না, কেননা সরকার অচল হয়ে পড়বে ওবামার আগমনে।

হ্যা, আজকে স্টক হোমে ওবামা এসেছেন। তার মুখে চকচকে আমেরিকান হাসি। সুইডিশরা এই এক জায়গাতেই দুর্বল যেমনটা দুর্বল মিশরীয় সোনিয়া তার বয়ফ্রেন্ডের প্রতি।

: তুমি নাকি রুম ছেড়ে দিয়েছো?
: হ্যা। আমাকে ইমিগ্রেশন থেকে স্টুভসটা পাঠিয়ে দিয়েছে। ওখানে একটা ক্যাম্প আছে।
: ওসব ছাইপাশ খাও কিভাবে?
: ক্ষুধা পেটে সুইডেনের পুরো জঙ্গল আমার কাছে সব্জী বাগান মনে হয়।
: তুমি আমার রুমে উঠে পড়ো তাহলে!
: তোমার বয়ফ্রেন্ড আসলে কোথায় থাকবো?
: জানি না। তবে তুমি উঠে পড়ো। অনেক মজা হবে।

অরক্ষিত বলয়

সেনাবাহিনীর কাজ যুদ্ধ করা। তারা যখন মারা যাবে তখন গুলিটা যাতে বুকে লাগে তার জন্যই তাদের যতো ব্যাকুলতা। মৃত্যুকে আমরা ভয় পাই, বেচে থাকতে চাই অনন্ত কাল।

অনন্তকাল বেচে কি করবো? সাগর পাড়ে মার্টিনি হাতে নিয়ে রঙ্গিন ছাতার নীচে শুয়ে শুয়ে সাগরের গর্জন শুনবো অথবা বিপুল অর্থ বৈভবে ডুবে মৌজ মাস্তি। সম্ভব নয়, মৃত্যু এমন এক সত্য যেটা আমরা সর্বদা ভুলে যাই। কালকে হয়তো নীল আকাশে সূর্য্য উঠতে নাও পারে, তবু মৃত্যু অবধারিত। মহাজাগতিক নিয়মের উর্ধ্বেই।

স্টকহোম সোদ্রার পার্কে বসে ছিলাম। এক সিরিয়ান যুবক দাড়িয়ে খুব পরিস্কার ইংলিশে বলে যাচ্ছে। তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। আমার চোখের কোনে অশ্রু ঝরছে। আকাশে রোদ নেই, তবে অশ্রু ঢাকবার জন্য অনেকেই সান গ্লাস পড়েছে।

আকস্মিক বিস্ময়

বাতাসে শীতের একটা আভাস পাওয়া যায়, বোঝা যায় গ্রীস্মের সময় বিদায় নিচ্ছে। শরতকালের মৃদু টোকা মনের দুয়ারে সেসব স্মৃতিরা উকি দেয় যেখানে লেপ্টে আছে কাশ বনের ঢেউ অথবা ঝকঝকে আকাশের পূ্র্নিমা রোদ।

এখানে পূর্নিমা রাতে জ্যোসনার প্লাবন বোঝা যায় না, জনপদ উদাস হয়ে নদীর পাড়ে বসে ঢেউয়ের গান শোনে না। এখানে চলে সুরার জলে নেশাগ্রস্হ বন্যতা। হতে পারে তা আধুনিক যান্ত্রিকতার সুরে মোড়া ক্ষনিকের উচ্ছ্বাস অথবা অন্ধকার রূমে শুধু দৈহিক চাহিদার আদান প্রদান।

আজ পূর্নিমা কিনা জানা নেই, তবে সকাল থেকে মন চাইছিলো একটা খোলা মাঠে শুয়ে থাকি। মাথায় অনেক কিছু এলোমেলো ঘুরপাক খায়। রাস্তা দিয়ে যখন দেখি ছোট ছোট শিশুরা পপসিকলস হাতে নিয়ে ছুটো ছুটি করে তখন মন চায় এরকম একটাকে যদি কোলে নিয়ে সারা দিন হেসে খেলে বেড়াতাম অথবা ছুটির দিন পিকনিকে গিয়ে সোজা দোলনায় চড়িয়ে দিতাম! একটি জীবনের পূর্নতা হয়তো সংসারেই, এরকম চক্রের পূর্নতা দান করাতেই নিহিত।

বাসে ওঠে এসএল কার্ড মেশিনে চেক করার সময় হঠাৎ বাস ড্রাইভার বাংলায় বলে উঠলো,"আপনার পকেট থেকে বোধ হয় টাকা পড়ে গেছে!"

ঘুম ঘুম

ঘুম ভেঙ্গেছিলো বেলা ১১:৩০টায়। মাথায় বিনি কেটে দিলো ঘুম যে গভীর হয় সেটা জানা ছিলো না। বিনি কাটা বন্ধ হয়েছিলো বলেই ঘুমটা ভেঙ্গেছিলো এটা আমি নিশ্চিত। চোখ মেলে দেখি সোনিয়া পিংক রঙ্গের অন্তর্বাসে আমাকে দেখছে। আমি মুচকী হেসে চোখ বন্ধ করে বললাম,"আমাকে কি হোসনি মোবারকের মতো লাগছে?"
: একটু পর আমার বয়ফ্রেন্ড আসবে। সে এসে তোমাকে যে কি করবে সেটা ভেবে হাসছি।

ঘুম আমার দৌড়ে পালাল। তড়াক করে বিছানা ছেড়ে প্যান্ট খুজতে লাগলাম এমন সময় সোনিয়া বললো,"আন্ডারওয়্যারটা বাথটাবে, প্যান্ট টা সোফার ওপর। আর টি শার্ট জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো। আচ্ছা একটা কথা বলতো, তোমার হ্যাংওভার হলে এত চিৎকার করো কেন?"
: (আমি প্যান্ট খুজতে খুজতে) তোমার বয় ফ্রেন্ড কখন আসবে?
: ও নীচে দাড়িয়ে আছে। তুমি বের হলেই আমি চাবি জানালা দিয়ে ছুড়ে দেবো!
: তুমি আসলেই অদ্ভুত!

"ও আচ্ছা?" বলেই আবার শুরু হলো নখরামো। নিটল শরীরের ঘোর লাগা নখরামো। দুধে আলতা শরীরে যেন মাদকের ছোয়া। চোখ দুটো সামলে প্যান্টটা পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে গেলাম। পকেট হাতড়ে মোবাইলটা বের করে দেখি দুটো মিসড কল অজানা নম্বর থেকে।

অবিশ্বাসের দোলাচল

কোর্টের চিঠিতে আজকের তারিখ ছিলো, বেলা ১১টায়। সোলনা ইমিগ্রেশন অফিসে পৌছাই ১০:৪৫ মিনিটে। রোদের প্রখর তাপে টপ টপ করে কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিলো। রিসেপশনিস্ট আমার চিঠিটা দেখা মাত্রই তলায় পাঠিয়ে দিলো ১০৮ নম্বর কক্ষে: ইন্টারভিউ রুম।

এখানকার বিল্ডিংগুলো বেশীরভাগ পুরোনো আমলের বাগান বাড়ির মতো। বাইরে থেকে দেখলে মনে কাঠের বাড়ি ঘর কিন্তু এই বাড়িঘর গুলো বানানো হয়েছিলো আজ হতে প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে। যাই হোক, ইন্টারভিউ রূমে ঢুকে দেখি একটি স্বর্নকেশী মেয়ে আর একজন বাংলাদেশী মহিলা। এই বাংলাদেশী মহিলাকে আমি চিনি। উনি আমার ইন্টারপ্রেটার। যদিও আমি বলেছিলাম আমি ইংলিশ ভালো পারি তবুও বলা হলো এই ইন্টারপ্রেটার যিনি ইন্টারভিউ নেবেন তার জন্য।

সম্ভাষন শেষে শুরু হলো প্রশ্ন পর্ব:

: মিঃ শফিক, আপনার কেসটা সম্পর্কে বলুন।

দিন দিন প্রতিদিন

ঘুম ভাংলো ফোনের আওয়াজে,"বাবা, তুই ঈদে ফোন করিসনি কেন?"

আওয়াজটা শুনেই বুঝতে পারলাম মার আওয়াজ। এরকম দরদমাখা আওয়াজে দুনিয়ার তাবৎ মা রাই তাদের সন্তানদের ডাকে। বাইরে ঠিকড়ে রোদের খেলা, শরতের মিস্টি ঠান্ডা হাওয়াটা যখন মুখে লাগে তখন মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। ঠিক বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে ঠান্ডাটা নেমে আসতো আমাদের গাঁয়ে। বিকেল বেলা খেলা শেষে নদীর পাড়ে আড্ডা, রাতভর ওয়াজ অথবা একতারার সুরে কীর্তনের অনুষ্ঠান রাতভর।

শৈশবের সময়গুলো খুব দ্রূত চলে যায়।
: বাবা, তুই কি ঠিকমতো খাস?
: খাই মা।
: ঈদের দিন নামাজ পড়ছিস?
: ঘুম থেকে উঠতে দেরী করেছিলাম।
: তুই এখনও বদ। কতবার বললাম নামাজ পড়।
: মা, আমি চলে আসি?
: ভালো না লাগলে এসে পড়। আমার কিছু ভালো লাগে না। সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকি। তোর ছবি দেখি। তোর হাসিমাখা মুখ কতদিন দেখি না।