পুনর্মুষিকোভব
মহাসড়কটি ধরে কিছু দূর এগুলেই চোখে পড়ে গ্রামটি।
আর পাঁচ-দশটা গ্রাম থেকে আলাদা কিছু না। পাশাপাশি থাকা চৌচালা বাড়ী গুলো , উঠোন, গোয়াল ঘর , মাটির রাস্তা আর গাছ-গাছালি জড়সড় করে চেনা দৃশ্যপট তৈরী করা।
সে গ্রামে বাতাসের তুলিতে রৌদ্রের জলরঙ দিয়ে আঁকা হয় সহজ সরল মানুষগুলোর জীবনের ক্যানভাস । গ্রামের আরেক পাশে বিস্তীর্ন ফসলী মাঠ, সে মাঠে আকাশ আর মাটি কথা বলে ফিসফিসিয়ে।
সেই গ্রামেরই এক বাসিন্দা লালু। জন্ম থেকেই গ্রামের আলো বাতাসে বড় হয়েছে ছাগ শিশু লালু। তার মনিবের পরিবারের সবার আদর-যত্নে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠে লালু। সারাদিন বাইরে বাইরে আপন মনে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়ে সন্ধ্যা হলে বাড়ীর পথ ধরে। কখনও এর জমিতে , কখনও ওর জমিতে মুখ দিয়ে দেয় মন ভুলে। কখনো তাড়া খেয়ে দুপুর না গড়াতেই বাড়ীতে ফিরে যায়। মনিবের বউ তাকে যত্ন করে ভাতের মাড় , সব্জির ফেলে দেয়া অংশ খেতে দেয়, তাড়া খাওয়ার কথা ভুলে আপন মনে চিবোতে থাকে লালু।
লালুর সাথে গ্রামের আর কারো সখ্যতা গড়ে উঠেনি তখনও। একা একা ঘুরতে ঘুরতে ঘরতে একদিন দেখা হয়ে যায় এক সারমেয়র সাথে। সারমেয়টির কঙ্কালসার দেহ দেখে মায়া হয় তার। নিজ থেকে এগিয়ে গিয়েই কথা বলে লালু। সারমেয়টিও সাড়া দেয় লালুর আহ্বানে। প্রথমদিন দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষন আলাপ চলে।
সেদিনই, দিন গড়াতেই দুইজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরী হয়ে যায়, লালু তাকে সাথে করে নিয়ে আসে তার মনিবের ঘর পর্যন্ত। তারপর থেকেই সারমেয়টি সেখানেই থাকে, লালুর মনিবের বাড়ী পাহারা দেয়, আশে পাশে ঘুরাঘুরি করে, কখনও সখনও দূরে কোথাও যায় খাবারের সন্ধানে কখনো বা লালুর মনিবের বা আশেপাশের কারো ফেলে দেয়া খাবার খেয়ে দিন কাটে তার।
দিন দিন বাড়ে লালু আর সারমেয়টির সখ্যতা। সারমেয়টি নানান জায়গায় যায় খাবারের সন্ধানে, সেই সব জায়গার গল্প করে লালুর কাছে। লালু মনযোগ দিয়ে শুনে তার কথা, আর নিজে না যেতে পারার অপারঙ্গমতায় কষ্ট পায় মনে মনে। লালুও প্রতি-উত্তরে জানায় তার প্রতি মনিবের আদর আর যত্নের কথা।
শুনতে শুনতে লালুর এক সময় ইচ্ছা হয় সারমেয়টির সাথে অজানা জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখার, পাশের মহাসড়কটি পার হয়ে ওপাশের গ্রামটিকে দেখার। একদিন লালু বলেই ফেলে তার ইচ্ছার কথা। সাথে সাথেই সারমেয় রাজী হয়ে যায় লালুকে মহাসড়কের ওপারে নিয়ে যেতে। দিন তারিখ ঠিক করে একদিন লালু রওয়ানা দেয় সারমেয়র সাথে। চাঁপা উত্তেজনায় লালু কাঁপতে কাঁপতে ডাকতে ডাকতে পৌছে যায় মহাসড়কের ধারে।
জীবনে সে প্রথম এল এখানে। রাস্তার পাশ থেকে দাঁড়িয়ে খানিক ক্ষন দেখে সে কালো কালো সে পথ, মাঝে সাদা সাদা দাগ। সেখানে কোন ঘাষপালা নাই। শুকনো খরখরে সে জায়গা। তার উপর দিয়ে সো সো করে চলছে নানা রকম গাড়ী। এক সেকেন্ডও বিরাম নাই সে জায়গার। জীবনে প্রথম গাড়ীও দেখে লালু। এরকম অবস্থা দেখে তার ভয়ে চার পা কাঁপতে থাকে। এরই মধ্যে সারমেয়টি কখন রাস্তা পার হয়ে গেছে, খেয়াল করেনি সে। সারমেয়র ডাক শুনে ফিরে তাকায় সে। তাকে ওপারে যাবার জন্য ডাকতে থাকে সারমেয় টি। লালু ভয়ে ভয়ে সামনের দুই পা রাখে রাস্তার উপর ।
ডানে তাকায় , বায়ে তাকায় কিন্তু সে পথটি ফুসরত পায়না, আর লালুও পার হতে পারে না । বেশকিছু ক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর এক সময় হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যায় রাস্তা টা। লালু সাহস করে এক পা দুই পা করে এগুতে থাকে। মাঝ রাস্তায় আসতে না আসতেই দেখে হঠাৎ করে একটি গাড়ী এসে থেমে যায় তার কাছে এসে। লালু ভয়ে চিৎকার করে বাকী রাস্তাটুকু কোন রকমে দৌড়ে পার হয়।
রাস্তা পার হতেই সারমেয় লালুকে খানিক্ষন বকা ঝকা করে তার বোকামীর জন্য। তাকে বুঝিয়ে দেয়, কিভাবে দৌড়ে রাস্তা পার হতে হয়। লালু হাঁপাতে হাঁপাতে শুনে কথা গুলো। তারপর তারা দু'বন্ধুতে মিলে নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যা হতে ফিরে বাড়ীর পথে। আবার সেই সড়ক পার হবার সময় আসে।
সারমেয় যথারীতি দৌড়েই পার হয়ে যায়। লালু কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে এবার আস্তে আস্তে পার হয় রাস্তা, একটা গাড়ী তাকে পাশ কাটিয়ে হুস করে চলে যায়। বাতাসে শব্দ ভেসে আসে - "শালার ছাগলের বাচ্চা"
রাত্রে শুয়ে শুয়ে লালু সারমেয়টির সাহসের কথা ভাবে, তার বুদ্ধির কথা ভাবে, তার নানান রকম খাবারের কথা ভাবে। মনে মনে প্রার্থনা করে - ঈশ্বর তাকে যদি সারমেয় করে দিত !!!
সেরাতেই ঈশ্বর লালুর প্রার্থনায় সাড়া দেন। গভীর রাতে তাকে সারমেয় করে দেন ঈশ্বর, স্বপ্নে দেখা দেন লালুর। স্বপ্নে লালুকে জানিয়ে দেন তার প্রার্থনা মঞ্জুর হবার কথা।
যথারীতি পরদিন সকাল হয়। পাখিরা শব্দে শব্দে জানিয়ে দেয়, পূব আকাশে আলোর রেখা গাঢ় হতে থাকে। কিছুটা আলো এসে পড়ে লম্বা গাছ গুলোর পাতায়। লালুর ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম ভাঙ্গতেই মনে পড়ে তার গতরাতের স্বপ্নের কথা। দৌড়ে যায় কুয়ার কাছে। সারমেয় হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করে খুশীতে ডেকে উঠে লালু।
লালু ডাক দিয়ে উঠতেই দেখে তার মনিব লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে তার দিকে। তার ভাষায় অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে লালু, তার মনিবকে। ততক্ষনে লাঠির দু-এক ঘা পড়ে তার পিঠে। মন খারাপ করে লালু বাড়ী ছাড়ে । মহাসড়কের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আজ সে একা একাই রাস্তা পার হবে, ওপারে যাবে, নতুন খাবারের স্বাদ নিবে, আর কোনদিন মনিবের বাড়ী ফিরবে না সে।
আগের মত করে লালু রাস্তা পার হয়, ধীরে ধীরেই। অভ্যাসবশতঃ ভাবে , তাকে দেখে গাড়ী এসে থেমে যাবে না হলে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে।
সেদিন গাড়ী এসে আর থামে না, পাশ কাটিয়েও যায় না। একটা সারমেয়র রাস্তা পার হতে দেখে গাড়ী চালকের কোন ভাবান্তর হয় না, সে সোজা চালিয়ে নিয়ে যায় গাড়ী, সারমেয়টির শরীর বরাবর, শুধু বলে উঠে - "শালার কুত্তার বাচ্চা সরে না দেখি"।





জোস্ লাগলো বস।
ধইন্যা , মিঃ এ বি
মামা .......
কথা সতj ...
ধইন্যা ।
মামা .......
কথা সত্য ...
আপনি মামা কন কে ????
অন্যরকম, ভালো লাগলো
ধন্যবাদের সহিত থ্যাঙ্ক্যু
বেচারা লালু....
সাঈদ, হালকা চালে একটা ক্লাসিক রচনা করে ফেললেন ? ঈশপের গল্পের মত একটা 'মোরাল' গল্পের শেষে থাকলে ষোলকলা পূর্ণ হতো । পোস্ট পছন্দ হলো ।
গল্পে মোরাল আছে বৈকি কিন্তু সেটা ইশপের মত করে প্রকাশ করি নাই।
মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
মোরালটা আমার কাছে খুব ক্লীয়ার না হইলেও বরাবরের মত সাবলীল লেখা ভালো লাগল।
মোরাল আছে একাধিক, কিন্তু যার যার মত করে সে বুঝে নিক তাই ক্লীয়ার করি নাই।
খানিকটা ইশপের ভাব আর সাধারন গল্পের মিশেল করেই লিখেছি ।
পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
আমিও রায়হান ভাইয়ের মত মোরাল না বুঝলেও লেখা ভালো লাগছে,
গুড জব।
রায়হান ভাইয়ের মত করে না বুঝে যার যার মত করে বুঝলেই হবে
সাঈদভাইর এমন লেখাগুলো পড়লে ধারাবাহিক উপন্যাসের বকেয়া কিস্তির কথা মনে পড়ে যায়
কেন যে মনে করায়ে দেন পুরনো দিনের কথা
পুরনো গোস্তাকি আরেকবার-
বানানটা হবে পুনর্মুষিকোভব
জ্বী, প্রুফ রিডার আছে বলেই বানান নিয়ে চিন্তা করি না এত।
ভালো লাগলো। আপনার এমন লেখা ভালো লাগে।
আপনার ভালো লাগলো শুনে আমারো ভালো লাগলো ।
আমারো ভালো লাগলো সাঈদ ভাই...
ভালো বলেছে রুমিয়া
কইলজা গেল জমিয়া
মোরাল আমিও বুঝি নাই, কিন্তু গল্পটা পড়তে ভালো লাগলো,
যে যা তাই নিয়াই খুশি হওয়া ঠিক, কিন্তু আমরা তো তারেই ভালো পাই যার আছে বেশি বেশি!!...
পুনর্মুষিকোভব মানে কি?...
পুনর্মুষিকোভব মানে পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া ।
মোরাল টার অনেকটা ধরতে পেরেছেন আপনি
শেষ লাইনটা বুলেটের মত হইছে।
ধইন্যা ।
গল্পের মোরাল হইলো " আমি যা তা"
মানে কইতে চাইছিলাম "আমি যা, আমি তা"। মানে হইলো জেবীন আপু যেইটা কইছে সেইটা
মানে হইলো, থাউক আর মানে বুঝাইয়া কাম নাই। গল্পটা খুউব ভাল লাগছে।
যা আছি , তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা ভালো,
প্রকৃতি সবাইকে সব কিছু দেয়না ।
ছাগলরা সারমেয় হতে চায় কেন?
যখন ছাগলরা নিজেদেরকে আর ছাগলে আটকে রাখতে চায় না।
এই আমার মত আর কি ? বুইড়া কালে ব্লগে প্রবেশ !
ছি ছি ভাই , কি বলেন !!! আপনি আমাদের প্রেরনা ।
বেশ,তবে তাই হোক ।
নিজেরে এমন একা আর দুর্বল ভাবেন কেন? আমিও তো আছি (দাপটের সহিত)
সাহস পাচ্ছি । হঠাত ('খন্ড ত' কেম্নে হয়) আজ চেহারা বদলে ফেললেন যে ?
যেন ঈশপের গল্প পড়লাম। এখন ভাবতে বসলাম উপদেশটা কি হইতারে!
মোরাল কি হইতারে দাদা ?
শুভ জন্মদিন।
ছাগু আর কাগু কারো কপালে ইজ্জত নাই
সাঈদ ভাই, আপ্নের খবর কি? বহুতদিন আপ্নারে দেখি না।
মন্তব্য করুন