ইউজার লগইন

অপেক্ষা [গল্প] - ২য় কিস্তি।

রাত নেমেছে শহরে। সোডিয়াম বাতি দিয়ে দিবালোক কে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা বাইরে রাজপথে, আর ঘরে ঘরে পর্দার আড়ালে থাকা বাসা বাড়ী গুলোতে টিউব বাতির আলোয় দিনের শেষ সময়ের ব্যস্ততা।

সামনের বিলবোর্ডের নিয়ন আলোর প্রতিচ্ছায়া পড়েছে আনোয়ার সাহেবের বেডরুমের জানালার কাঁচে। প্রতিদিনের মত আজও অফিস শেষ করে বাসায় ফিরে আনোয়ার সাহেব ব্যাস্ত হয়ে যান টিভিতে খেলা দেখা নিয়ে। ইএসপিএন এ কোন প্রিমিয়ার লীগের খেলা দেখছিলেন আর উত্তেজনায় মাঝে মাঝে নিজের ডান পা শক্ত করে ফেলছিলেন তিনি। বুঝি গোল টা তিনিই দিয়ে দিতেন মাঠে থাকলে !!!!

মাথার উপর ফ্যানটা দৃশ্যমান হয়ে ঘুরছে সাথে এ/সি ও চলছে। বেডরুমের এক পাশের দেয়ালে এলসিডি টিভি ঝুলানো আরেক পাশে বিছানা। পুরো রুমের ইন্টেরিয়র যেন সৌন্দর্য থেকে জৌলুস টাই ফুটিয়ে তুলছে বেশী করে। বিদেশী টাইলস ফিটিংস এর মেঝেতে পায়ের শব্দে ঘুরে তাকান আনোয়ার সাহেব। কখন যে তার মিসেস দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছে, খেয়াল করেন নাই। পায়ের শব্দে খেয়াল হয়। তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে খেলাতেই মনোনিবেশ করেন।

- সংসারের খোঁজ খবর কিছু কি রাখো ? মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে, চেহারায়, পোশাকে নব্য ধনীর আভিজাত্য নিয়ে রুমে ঢুকেই প্রশ্ন টা মিসেস আনোয়ারের।
- ঐটা তোমার ডিপার্টমেন্ট , আমারে বলছো কেন ? টিভির দিকে তাকিয়েই উত্তর আনোয়ার সাহেবের।
- হুম ভালই , আমার উপর সব ছেড়ে দিয়ে উনি আনন্দে পা নাচাবেন আর খেলা দেখবেন।

ঝাঁঝের সাথেই কথা গুলো বলা। গলা শুনে আনোয়ার তাকান বউয়ের দিকে।

- কি হয়েছে আবার ?
- কি আর হবে !! জরিনার মা'রে নিয়ে তো আর পারা গেল না। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেছে। একটা কিছু করা দরকার।
- ডাক্তার দেখাও।
- ডাক্তার কি কম দেখাচ্ছি নাকি। আজ কতদিন হল জ্বর । সংসারের কাজ করবে কি, তারেই টানতে হচ্ছে আমার। ডাক্তার একগাদা টেষ্ট দিছে আবার।
- তাহলে বাড়ী দিয়ে আসো। ঝামেলা শেষ হয়ে যায়।
- আর পরে এইসব সামলাবে কে শুনি ?

আনোয়ারের মুডটাই নষ্ট হয়ে যায়। এইসব ঝামেলা নিয়ে কখনই কথা বলতে ভালো লাগে না তার। টিভির দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু দেখার চেষ্টা করে সে।

- আমি কি করতে পারি এখন ? আনোয়ার এবার তার মিসেস এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করে ।
- তোমার কিছু করতে হবে না। মন্টু কে পাঠাবো বাড়িতে , কিছু টাকা লাগবে। ওর আসা যাওয়া সাথে আরেকজন কে নিয়ে আসা । আর জরিনার মা'কে কিছু টেস্ট করাবো , টাকা লাগবে।
- ওকে কর। যা ভালো মনে কর। কালকে টাকা তুলে নিও।

মিসেস আনোয়ার আর কিছু বলেনা। স্বামীর এরকম নিস্পৃহ কন্ঠ শুনে গজ গজ করতে বের হয়ে যায় রুম থেকে।

জরিনার মা বেশ কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ। মাঝে মাঝে জ্বর আসে, ঠান্ডা , কাশী তো লেগেই আছে। কয়েক বারই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। তার জ্বর আসলে মিসেস আনোয়ারেরই চিন্তা-টেনশন হয় বেশী। তার স্বার্থেই তাকে যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ খাওয়ানো হয়, সুস্থ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়। বোকা জরিনার মা সেটা বুঝে না, সে তার "খালাম্মার" ভালোবাসায় মুগ্ধ হয় আর উপরওয়ালার কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করে তার খালাম্মার শান্তির জন্য।

আনোয়ারের সংসারে নতুন অতিথি আসার কয়েকদিনই পর জরিনার মা'র আগমন। তাদের দ্বীতিয় সন্তানের যখন তিন মাস বয়স তখন থেকেই জরিনার মা এই সংসারের সাথে। সংসারের যাবতীয় কাজের সাথে সাথে সেই বাচ্চার যাবতীয় দেখ ভাল, কাঁথা - কাপড় পরিষ্কার থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত তার আঁচলের ছায়ার নিচেই রেখেছে সে।

তার নিজের সন্তানের হারানো মুখ খুঁজে পায় সে ছোট সন্তানের মুখে কিংবা হয়তো নিছক ভালোবাসার টানেই কিংবা আবহমান বাঙালী মায়ের শাশ্বত রুপ টাই ফুটে উঠে জরিনার মা'র ভালোবাসায়।

সময় সময় গৃহ পরিচারিকার কাজের মাঝেও সে শান্তি খুঁজে পায় সেই মাতৃত্বের মত ভালোবাসার মাঝে। সেই সন্তানের অসুখ বিসুখে তাই পাগলের মত রাত জেগে বসে থেকে সেবা করে যায় জরিনার মা।

সেই সেবার বিনিময় মূল্য নেই সেখানে শুধু মায়ের মত একরাশ ভালোবাসাই, শুধুই হৃদয় নিংড়ানো নিষ্পাপ ভালোবাসা।

[আগামী পর্বে সমাপ্য]

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সোহেল কাজী's picture


একটা দীর্ঘস্বাস বেড়িয়ে গেল
একই ছাদের নিচে জীবন কতো বিচিত্র
শেষ পর্ব ট্রাজিক হবে মনে হচ্ছে
চলুক ........................

সাঈদ's picture


ঠিকই ধরেছ ব্রাদার। ট্র্যাজিক গল্প।

পদ্মলোচন's picture


আহা আহা

সাঈদ's picture


কি হইলো রে ভাই তোর ?

নুশেরা's picture


আমরা ধরেই নিই যে গৃহকর্মী হবে রোবোটের মতো, খাবার আর অর্থের বিনিময়ে অবিশ্রান্ত সার্ভিস দিয়ে যাবে। ব্যতিক্রম হলেই অস্বস্তি...

সাঈদ's picture


কথাটা ১০০ ভাগ সত্য।

হাসান রায়হান's picture


ভালো হচ্ছে।

সাঈদ's picture


ভালো লাগলো শুনে।

টুটুল's picture


ভাল লাগছে...
ট্রাজিক হপে? :( ... ট্রাজিক ভাল্লাগেনা :( ... খালি কষ্ট আর কষ্ট :(

১০

সাঈদ's picture


 হঃ 
১১

জ্যোতি's picture


জীবন এমন কেন?দীরঘশ্বাস

১২

সাঈদ's picture


<দী-র-ঘ-শ্বা-সে-র ইমো হইপে>

১৩

অরিত্র's picture


সুন্দর লেখনি

১৪

সাঈদ's picture


ধইন্যবাদ।

১৫

নক্ষত্র's picture


সামনে চলুক......

মানুষের জীবন আর মানুষ দুই-ই বড় বিচিত্র !

১৬

সাঈদ's picture


ঠিক বলেছ ভাই।

১৭

নজরুল ইসলাম's picture


শেষ পর্বের অপেক্ষায় রইলাম

১৮

সাঈদ's picture


অতি শীঘ্রই আসিপে।

১৯

কাঁকন's picture


ভালো হচ্ছে খুব

২০

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ ।

২১

তানবীরা's picture


পৃথিবী বড়োই একটা স্বার্থপর স্থান

২২

সাঈদ's picture


স্বার্থপর এর ক্ষেত্রে মনে হয় মানষ পশুর থেকেও অধম ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সাঈদ's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো। অবাক লাগে।