ইউজার লগইন

অপেক্ষা [গল্প] - শেষ কিস্তি।

রিমি- এইস এস সি ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়া মেয়ে, আনোয়ার দম্পতির ২য় সন্তান। এই বয়সের মেয়েদের মতই সে বেশী বেশী অভিমানী, বেশী বেশী আবেগী। অল্পতেই যেমন উৎফুল্ল হয় প্রচন্ড তেমনি অল্পতেই মনে হয় তার থেকে কষ্টে আর কেউ নাই। মুখে সদ্য গজানো ব্রন দেখে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয়, তেমনি অল্পতেই খিল খিল করে হাসির ফোয়ারা ছুটে, সেই হাসিতে সিক্ত হয় শরীর, মন এমন কি পাশে বসা বাসের সিটের মানুষটিও কিংবা পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোন অজানা ব্যাক্তি।

কলেজ থেকে আসার পরই রিমি আজ মন খারাপ করে বসে আছে তার ঘরে। ঘরের এক পাশের জানালার সাথে লাগানো বিছানায় বসে চুপ করে তাকিয়ে আছে বাইরে। তার ঘরের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ীর বারান্দা ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখা যায়না। কলেজ থেকে এসে যখন জানতে পারে যে জরিনার মা কে কাল সকালে বাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হবে , তখন থেকেই মন খারাপ করে বসে আছে সে। বয়সের কারনেই হোক আর বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তার কারনেই হোক, রিমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা তাকে বিদায় দেবার সিদ্ধান্ত। কিছুও বলার নাই। মা'র কথাই সব । আর ঢাকা শহরে একজন অসুস্থ্য মানুষকে কে-বা টেনে নিয়ে বেড়াবে !!!! এত সময় কই মানুষের ? এত মানবিকতা বা কই মানুষের !!!!

দুপুর গড়িয়ে বিকাল। সূর্য দেবতা অনেক আগেই ঢাকা শহরের ভবন গুলোতে ঢাকা পড়ে গেছে। বিকেলের লম্বা ছায়ায় সামনে জানিয়ে দিচ্ছে সেদিনের শেষ সময়ের ব্যস্ততা। একটা কাক কা কা শব্দে ডেকে যাচ্ছে কোন বাড়ীর ছাদে কিংবা বিদ্যূতের কোন তারে বসে। রিমিদের পাশের বাড়ীর বারান্দায় তার ক্ষীন আলো এখনো জানিয়ে দিচ্ছে তার ম্রিয়মান উপস্থিতি, সে বারান্দার টবে রাখা গাছের পাতাগুলোর সাথে সে আলো কথা বলছে যেন । অবশ্য রিমির সেদিকে মনযোগ নেই।

জানালা টা খোলা , সে জানালার কাঁচে ধূলা আর বাতাসের মিলিত লুটোপুটির খেলায় আর হেঁটে যাওয়া পোকার পায়ের ছাপে কোন শিল্পির বিমূর্ত চিত্র শিল্প যেন আঁকা হয়েছে সে কাঁচে। সে জানালার কাঁচ ছাপিয়ে রিমির দৃষ্টি বাইরের সেই বারান্দায়। তার অতীতের দৃশ্য গুলো যেন জীবন্ত ছবিতে দেখতে পাচ্ছে সে বারান্দায়। টবের গাছ গুলোর পিছনে যেন সে দেখতে পায় লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে ভালো - বড় ফলটা, খাবার টা , মাছের বড় টুকরা টা কিংবা সবার থেকে একটু বেশী পরিমান তার পাতে দিয়ে পান খাওয়া ঠোটে প্রশাস্তির হাসি। মায়ের আদেশ অমান্য করে চুরি করে তার ছোট ছোট আবদার পূরনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠা মানুষটা। সেই আবদার পূরনের পর সেই স্নেহ মাখা বোকা হাসি , সারা সংসারের হাড়ভাঙ্গা কাজের পরেও ঘুমোতে যাবার আগে মাথায় তেল দিয়ে বিলি করে ২ বেনী করে চুল বেঁধে তারপর রাত জেগে তাকে গ্রামের ''গপ্পো", নিজ চোখে দেখা ভূতের "গপ্পো" শোনানো। জরিনার মা'র মুখখানি খুব স্পষ্ট হয়ে যেন আবার অস্পষ্ট হয়ে যায় আস্তে আস্তে গোধূলীর আলো মিলিয়ে যাবার সাথে সাথে।

রিমি হঠাৎ করেই ডুকরে কেঁদে উঠে।

জরিনার মা বিকাল থেকেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জ্বর নাই এখন শরীরে কিন্তু প্রচন্ড দূর্বল। ডাক্তারের দেয়া হাই এন্টিবায়োটিক খেয়ে জ্বর সেরেছে কিন্তু দূর্বলতা বাসা বেধেছে তার বিনিময়ে। গ্রাম থেকে আরেকজন লোক আসছে কালকেই, তাই আর টেস্ট করানোর খুব গরজ করেনি মিসেস আনোয়ার, বরং তাকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েই ঝামেলা শেষ করতে চান তিনি।
কয়েক হাজার টাকা দুপুরে গিয়ে নিজ হাতে দিইয়ে এসেছেন জরিনার মা'র হাতে, যাতে দেশে গিয়ে কিছু করে বাঁচতে পারে, যদিও সে এই বয়সে, এই শরীরে বাঁচার উপকরন কিভাবে সংগ্রহ করবে , তা অস্পষ্ট। জরিনার মা সেই টাকা নিয়ে অপেক্ষা করে সেই সকালের, যদিও ভাবেনি তাকে এভাবে যেতে হবে এই সংসার থেকে। আপনার লোক মনে করেই কাজ করে এসেছে এতটি বছর ধরে সে।

অপেক্ষা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ে তার তেল চিটচিটে বালিশে মাথা রেখে।

সেই টাকা হাতে নিয়েই ঘুমোচ্ছে জরিনা'র মা। ঘুমের মধ্যেও হাতের মুঠোয় টাকাগুলো শক্ত করে ধরে রাখা, জীবন নামক সময় টুকুর অবশিষ্টাংষ টুকুর জন্য নিরাপত্তা যেন ধরে রেখেছে।
যদিও সে জানেনা গ্রামে কার কাছে যাবে, কোথায় যাবে, একা একা এই বয়সে বেঁচে থাকতে গেলে কেমন করে তা সম্ভব। তার বাবার বাড়ী কত আগেই নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে , দুই ভাই আছে কিন্তু কোথায় চলে গেছে, কি করে তাও জানেনা। গ্রাম বলতে সেই আগের চেহারাই ভাসে তার চোখে , সেই মাটির রাস্তায়, দুপাশে বাঁশের নতজানু হয়ে পরশ সেই পথে। জরিনার মা জানেনা সেই রাস্তা এখন পিচ ঢালা পাঁকা রাস্তা, সেই বাঁশ ঝাড় উজাড় হয়ে এখন সেখানে মানুষের বসতির চিহ্ন।

এক সময় রাত গভীর হয়, জরিনার মা তবুও গভীর ঘুমে অচেতন। ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখে সে, তার গ্রামে সেই মেঠো পথে দাঁড়িয়ে আছে তার মেয়ে জরিনা। আস্তে আস্তে কাছে যায়। এক সময় দেখে জরিনা না, সে রিমি । আবার দেখে সে জরিনা। আর সামনে যেতে পারেনা সে। পা যেন কেমন শক্তিহীন হয়ে পড়ে তার, পুরো শরীরের শক্তি ও যেন লোপ পায় আস্তে আস্তে।

ঘুমের মধ্যেই সে নিথর দেহে প্রতীক্ষা করে সকালের ।

[সমাপ্ত]

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সোহেল কাজী's picture


এতোটা ট্রাজিক হঈবে বুঝতে পারিনাই
সিরিজ ভালা পাইছি।
আঙ্গুল উঁচা করলাম

সাঈদ's picture


আঙ্গুল উচার জন্য ধইন্যা।

সুবর্ণা's picture


মন্টা এমনিতেই খারাপ ছিল, আরো খারাপ করে দিলেন আপনি। ধুর!!

সাঈদ's picture


ওহ!! মন ভালো সংবাদ দেই - এবির পিকনিক ৫ই ফেব্রুয়ারী।

নক্ষত্র's picture


আপনে খারাপ লুক আছেন। কইষ্যা মাইনাচ। ধুরররর মনটাই খারাপ করে দিলেন।

সাঈদ's picture


ওহ!! মন ভালো সংবাদ দেই - এবির পিকনিক ৫ই ফেব্রুয়ারী।

পদ্মলোচন's picture


তোমার লেখার ক্ষমতারে স্যালুট

সাঈদ's picture


<বিগলিত হাসির ইমো হবে>

আমি ধইন্যা।

কাঁকন's picture


ভালো লাগলো

 

১০

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ ।

১১

টুটুল's picture


সমাপনী অন্য রকম হইছে।
সুন্দর

১২

সাঈদ's picture


<কোলাকুলির ইমো হইপে>

১৩

হাসান রায়হান's picture


বাস্তব গল্প।

১৪

সাঈদ's picture


জ্বী ভাই ঠিক বলেছেন।

১৫

নীড় সন্ধানী's picture


সুন্দর সমাপন। সফল সিরিজ!! :)

১৬

সাঈদ's picture


<বিগলিত হাসির ইমো হৈপে>

১৭

তানবীরা's picture


আমার আগেই মনে হয়েছিলো, আপনি মেরে দিবেন ওনাকে। সব সময় কেনো দুর্বলদের ঠকতে হবে, একবার গা ঝাড়া দিয়ে দাড়াক, প্রতিবাদি হোক এবং জয়যুক্ত

১৮

সাঈদ's picture


দুর্বলদের ঠকতেই হয়... এটাই নিয়ম... আমি স্বাপ্নিক নই তাই তাদের কে নিয়ে গা ঝাড়ার স্বপ্ন দেখতে পারিনা।

১৯

নুশেরা's picture


মেরে ফেলে বাঁচায় দিসেন। দিশাহীন অনিশ্চয়তার মতো আতঙ্ক আর কিছুতে নাই।

আরও গল্প চাই।

২০

সাঈদ's picture


দিশাহীন অনিশ্চয়তার মত আসলেই আর কিছু নাই - একমত।

ইনশাল্লাহ আরও গল্প দিব।

২১

মলিকিউল's picture


পৈড়া গেলাম।

২২

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সাঈদ's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো। অবাক লাগে।