ইউজার লগইন

একটি সকালের গল্প [অনুগল্প]

কাদের ঘুম থেকে জেগে দেখে মাথার কাছের ফ্যানটা নিশ্চুপ হয়ে আছে। সারারাত ঘড় ঘড় শব্দ করে বাতাস দেয়া টেবিল ফ্যান এখন আর নড়াচড়া করছে না। নিচে তোষক , চাদর, বালিশ ঘামে ভিজে জুবুথুবু অবস্থা। অনেক ক্ষন ধরেই ইলেকট্রিসিটি নাই।

প্রচন্ড গরমে ঘুম ভেঙে যায় বেশ ভোরেই । এই চারদিকে টিন এর বেড়া আর টিনের ছাঁদের ঘরের ভিতর শুয়ে কাদের চোখ বুঁজে শুয়ে আস্তে আস্তে করে ডান হাত দিয়ে বাম হাতের উপর তাল দেবার মত করে বাড়ি দেয়, কোন একটা সুর মনে করার চেষ্টা করে , গরমটা ভুলে থাকার জন্য হয়তো।

বাইরে তখন রাত শেষ হবার পর আকাশে ছাই রঙ ধরেছে, সূর্যের সোনালী আলোর চ্ছটা তখনও লাগেনি আকাশের গায়ে। রাত শেষের আর দিনের শুরুর ক্ষনটা পার হয় আস্তে আস্তে । বাইরে রাতভর ঘুমানো মানুষের আনাগোনা বাড়ে ধীরে ধীরে। কেউ কেউ ব্রাশ করতে করতেই বের হয় রাস্তায়, খালি গায়ে , লুঙ্গি পড়ে, কোন কোন ডায়াবেটিস কিংবা হার্টের রোগী জোর কদমে হাঁটতে বের হয় ভোরের চাঁপা আলোয়। কাদের তখনও ঘাম চিটচিটে বিছানায় শুয়ে। চোখ বুজে আরাম করে শুয়ে থাকার শেষ চেষ্টা বিছানায়।

"শালার কারেন !! গ্যালে আর আসার নাম থাকেনা" - বলে উঠে বসে। তখনও তার চোখে ঘুম জড়ানো, শরীরে ঘামের বিন্দু কনা গুলো গড়িয়ে গড়িয়ে নিচের দিকে নামছে, শরীরের চেনা পথ ধরে।

দাত মাজতে হবে, গোছল করতে হবে, নাস্তা করতে হবে - বসে বসেই ঝিমুতে ঝিমুতে কাদের কাজ গুলো আওড়ায় নেয় একা একা। এক সময় নড়ে চড়ে মাথার কাছে থাকা ট্রাংকের উপর থেকে ব্রাশ নেয়, পেস্ট লাগায় ব্রাশে। মাথার কাছে দড়িতে ঝুলতে থাকা গামছা আর লুঙ্গি টা কাঁধে নিয়ে বের হয় ঘর থেকে।

অনেক্ষন ধরেই দাঁড়িয়ে আছে কাদের । একপাশে কোদাল আর ঝুড়ি টা রাখা। লুঙ্গির ট্যাকের ভিতর থেকে সিগারেট বের করে ধরায়ে বিশাল একটা ধোয়ার কুন্ডলী ছেড়ে আশে পাশে তাকায়, এখনও অন্যান্য "লেবার" রা আসেনাই। সিগারেটে টান দিতে দিতেই অপেক্ষা করে একজন মানুষের।

সিনেমা হলটার উলটা পাশেই, মেইন রোডের পাশে একটু খোলা যায়গায় সকাল বেলা বাজার বসে। শ্রমিকের বাজার। শ্রমিকরা এসে জড়ো হয় , নানান কাজের শ্রমিক, নানান বয়সের, নানান জেলার। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারা, তাদের দিকে এগিয়ে আসা মানুষের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে তাকে, কাজ দেবে কি দেবেনা , কেউ কেউ কাজ পায় কোন কোন দিন, কেউ কেউ পায়না , আস্তে আস্তে ফিরে যায় ঘরে কিংবা অন্য কোন কাজে কিংবা কোন আড্ডায়। তাদের কে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ব্যস্ত মানুষেরা।

সে বাজারেই দাঁড়িয়ে আছে কাদের কাজের আশায়, খদ্দের আসবে , তাকে পছন্দ করে নিয়ে যাবে, দিন শেষে কিছু টাকা পাবে । গত ৫/৬ দিন যাবৎ কোন কাজ পাচ্ছে না সে, টুকটাক কিছু কাজের জন্য মহাজনেররা এসেছিল, সে কাছে যাবার আগেই অন্যদের পছন্দ করে নিয়ে গেছে তারা। কাদের গত কয়দিন ধরে প্রতি সকালে যায় আবার বেলা বাড়লে আস্তে আস্তে ফিরে আসে টিনের সেই ঘরটায়। জমানো টাকা কমে আসছে, আর কয়দিন কাজ না পেলে হয়তো না উপোস দিন কাটাতে হবে তার।

রোদটা চড়া হয় , পূব দিকে থেকে আসা রোদের ঝাঁঝ বাড়ে, শরীরের ভিতর ঘামের কনাগুলো চলাচল শুরু করে, পিছনের দেয়ালে ঠেস দিয়ে চোখ বুজে বসে কাদের। সিগারেটের শেষ দুই টান দিয়ে ছুড়ে মারে সামনের দিকে। এরই মধ্যে আরো কয়েকজন এসে দাঁড়ায়, কাজের আশায়। ঘুরে ঘুরে দেখে , সেই পরিচিত মুখগুলোই, সেই অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর জটলা ।

শেষ যেদিন কাজ করেছিল মোহাম্মদপুরে, সেদিন কাজ সেরে আসার পথে কাজের এক সঙ্গী তাকে নিয়ে গিয়েছিল কোন এক পার্কে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে তখন রাত নেমেছে। রাস্তার সোডিয়াম বাতির মৃদু আলোয় গাড়ীর চলাচল, রাস্তার পাশের দোকান গুলিতে নিয়ন আলোর বর্নিল সাজ সজ্জা। কাদের আর তার সেই সঙ্গী সেই সময় এক পার্কে ঢুকে। জীবনে প্রথম দেখে রঙচঙ মেখে দাঁড়িয়ে তাকা মেয়েদের। তার সেই সঙ্গী ঘুরে ঘুরে দেখায় আধো আলো , আধো ছায়াতে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধেক মানুষগুলো কে। আর বেশি কিছুর সাহস হয়না , সেদিনের মত ফিরে আসে তারা, আসার পথে মুখোমুখি হয় রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলোর নিচে দেখে করুন চেহারায় রাঙীন মুখ আর ঠোটের সাথে কান্না ভেঁজা চোখে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মেয়ে। তাকে পাশ কাটিয়ে ফিরে আসে তারা সেদিনের মত।

বেলা বাড়ে , সমান্তরাল ভাবে বাড়ে ব্যস্ত মানুষের পদচারনা, গাড়ীদের ছুটোছুটি। আস্তে আস্তে আবার ফিরে যেতে থাকে কাজের আশায় জড়ো হওয়া মানুষ গুলো।

এই সকালেই কাদের নিজেকে হঠাৎ করেই সেই পার্কে আবিষ্কার করে। আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিচ্ছে যেন।

কোথায় যেন সে মেয়েটির সাথে তার মিল খুঁজে পায়।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আশরাফ মাহমুদ's picture


লেখা সুন্দর। নষ্ট বাস্তব।

সাঈদ's picture


সুন্দর কথা বলেছেন তো - নষ্ট বাস্তব।

ধন্যবাদ ।

নুশেরা's picture


আপনার সিরিজটা কি আর আসবে না?

লেখাটা ভালো লেগেছে (বিষয়টা না Sad )

সাঈদ's picture


বিষয় কি দুষ করলো গো ভইন !!!!

নীড় সন্ধানী's picture


কীবোর্ডের জোর বাড়ছে দিন দিন Innocent

সাঈদ's picture


আপনাদের দোয়ায় দাদা।

মুক্ত বয়ান's picture


এইটা বেশি দেখা যায়, মালিবাগ রেলগেটটার পাশে। মানুষগুলো দাঁড়ায়ে থাকে ঠায়। আমরা দেখে যাই, এসি বাসে চড়ে হুশ হুশ করে পার হয়ে যাই এদের।
দু:খজনক।

সাঈদ's picture


আমার বাসার কাছেও এরকম দাঁড়িইয়ে থাকে। আমি নিজে গিয়ে কতদিন ডেকে এনেছি বাসার কাজের জন্য।

ভাস্কর's picture


গল্পের সকল চরিত্রের লগে তো নিজেরো মিল পাইলাম খানিক...Sad

১০

সাঈদ's picture


কন কি !!! ক্যামনে মিল পাইলেন ?

১১

ভাস্কর's picture


আমরাও তো টাকার বিনিময়ে জোগালি খাটি...

১২

সাঈদ's picture


তা ঠিক ভাই, সেই হিসাবে আমার সাথেও মিল সব চরিত্রের।

১৩

জ্যোতি's picture


হুমমমম।

১৪

সাঈদ's picture


ফাঁকিবাজি কমেন্টের তেব্র পরতিবাদ ।

১৫

টুটুল's picture


ভাল্লাগলো

১৬

সাঈদ's picture


শুইন্যা ভাল্লাগলো।

১৭

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


মিল হইলো পেটের দায়

১৮

সাঈদ's picture


ঠিক ঠিক।

১৯

শওকত মাসুম's picture


ভাল লাগছে

২০

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ

২১

নজরুল ইসলাম's picture


ভালো লাগছে

২২

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ।

২৩

নাহীদ Hossain's picture


খুব ভাল...খুব ভাল...তয় লেখাটা আর একটু বড় হইলে ভাল হইতো

২৪

কাঁকন's picture


ভালো লাগলো; ধারাবাহিকটার খবর কি ভাই?

২৫

সাঈদ's picture


ধারাবাহিক টা অচিরেই আসবে । ধন্যবাদ আপু।

২৬

তানবীরা's picture


কোথায় যেন সে মেয়েটির সাথে তার মিল খুঁজে পায়।

২৭

সাঈদ's picture


হুম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সাঈদ's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো। অবাক লাগে।