মোহছেনা ঝর্ণা'এর ব্লগ
বই মেলা ঘিরে কিছু টুকরো স্মৃতি
প্রতিবছরের মতো এবারও এসেছে ফেব্রুয়ারী মাস। ভাষার মাস,ভালোবাসার মাস,বই মেলার মাস।
একুশের বইমেলা ঘিরে আমার খুব সামান্যই স্মৃতি। যখন ভার্সিটিতে পড়তাম একুশের বইমেলা উপলক্ষে বিভিন্ন চ্যানেলে বিকাল ৩টার পর থেকে সরাসরি মেলা প্রাঙ্গন থেকে বইমেলা দেখানো হতো।প্রতিদিন মেলায় আসা নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হতো।আবার কবি সাহিত্যিকদেরকে তাদের অনুভূতি সম্পর্কে উপস্থাপক অনেক কথা জানতে চাইতেন।আমি বুভুক্ষের মতো সেই অনুষ্ঠান গুলো দেখতাম।আর ভাবতাম আহ কবে যে একটু বই মেলায় যেতে পারব।
সেই প্রাণের মেলায় প্রথম গিয়েছি ২০০৮ সালে।সাথে ছিল আমার মেজো ভাই রিমন,ভাতিজা আরাফাত এবং ভাতিজি আরিফা।খুব সম্ভবত সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারী।শুক্রবার।বন্ধের দিন থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই ভিড় ছিল মাত্রাতিরিক্ত বেশি।তার ওপর ছিল ভালবাসা দিবস।
কঠিন সময় আমাদের মা-মেয়ের
আমার মেয়েটা কাঁদছে।আমি পাশের রুমে বসে আছি।হোসনা ওকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে নানান কথা বলে যাচ্ছে।দুধের ফিডারে দুধ বানিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। মেয়ের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।সে অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে।
তার কান্নার শব্দটা আমাকে অস্থির করে তুলছে কিন্তু আমি নিজেকে শক্ত রাখার কঠিন চেষ্টা করে যাচ্ছি।মেয়ের কান্না থামছে না।এবং ওর কান্নার আকুতিতে একটা সময় আমি খেয়াল করি আমার সারা শরীর কেঁপে কান্না চলে এসেছে।আমি অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি।
হোসনা যেন আমার কান্না না দেখে সেজন্য দৌড়ে আমি বাথরুমের ভেতর ঢুকে যাই।পানির ট্যাপ ছেড়ে দিই যেন কোনোভাবেই আমার কান্নার ফোঁসফোঁস শব্দে হোসনা ঘাবড়ে না যায়।
মেয়ের কান্না এতক্ষণেও থামেনি দেখে আমি চোখে মুখে পানি দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে হোসনার কোল থেকে মেয়েকে বুকে টেনে নিই। আমার কোলে আসার সাথে সাথে মেয়ে কান্না থামিয়ে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।কি জানি আমার ৪মাস ১০ দিন বয়সী মেয়েটা বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছে না তার মা তাকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছে।মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।নিজেকে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে আমার জন্য।
আমরা অসুস্থ সরকার চাই না
দু’সপ্তাহ আগে একদিন অবরোধের দিন জরুরি কাজে আগ্রাবাদে যেতে হয়েছিল।অনেকদিন পর একা একা বাসার বাইরে যেতে কেমন যেন লাগছিল।মনে হচ্ছিল সব কেমন অন্যরকম। বাসা থেকে অন্যরা বলে দিয়েছিল,সাবধানে যাস।ভাবখানা এমন যে আমি বোধহয় নতুন পথ চলতে শিখেছি।
বাসা থেকে বের না হলেও টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার কল্যানে দেশের অস্থির পরিস্থিতির খবর ঠিকই জানতাম।কিন্তু সেদিন আগ্রাবাদে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তা অনেক বেশি ফাঁকা।সাধারণত অবরোধ হলে দূর পাল্লার গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে বা চললেও খুব কম চলে।কিন্তু অবস্থা তো দেখি হরতালের চেয়েও খারাপ।
যাক অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা সিএনজি পেলাম।অন্যসময় সিএনজি ড্রাইভাররা যা ভাড়া তার চেয়ে অনেক বেশি চায়।দরদাম করতে হয় ।এদিনের সিএনজি ড্রাইভার দেখলাম যা ভাড়া তাই চাইল। সিএনজিতে বসে জিজ্ঞেস করলাম,আজ সিএনজি এত কম কেন? গন্ডগোল হচ্ছে নাকি।
তিনি বললেন, হ্যাঁ ,হঠাৎ হঠাৎ করে ককটেল মারে।আগুন লাগাইয়া দেয়।তাই ভয়ে কেউ বাইর হইতে চায় না।
তখন বেআক্কেলের মতো প্রশ্ন করে বসলাম, আপনি বের হলেন কেন?
আমার রাজকন্যার গল্প
আজ ১৪ নভেম্বর।আমার রাজকন্যার বয়স তিন মাস পূর্ণ হলো।সময় কত দ্রুত যায়! এই তো সেদিন ১৪ আগষ্ট,২০১৩ বুধবার দুপুর ২টা ৪০মিনিটে গগনবিদারী চিৎকার করে আমার রাজকন্যা এলো এই কঠিন পৃথিবীতে।এরপর থেকে এই তিন মাস সময় যেন চোখের অলক্ষ্যেই কেটে গেছে।রাতের ঠিক নেই,দিনের ঠিক নেই।রাত-দিন যেন মিলেমিশে একাকার।
রাতে ঘুমানোর আয়োজন করছে সবাই,অথচ আমার রাজকন্যা কেঁদে অস্থির।সারাটা রাত থেমে থেমে কান্না দিয়েই শেষ করেছে প্রথম এক মাস।
দ্বিতীয় মাসে রাজকন্যা একটু বড় হলো।তাই দ্বিতীয় মাসের রাতগুলো সে কাটিয়েছে বিরামহীন কান্নায়।তার কান্নায় পাড়া প্রতিবেশীর ঘুমের বারটা বেজে যেত।আর তাই সকালবেলা রাজকন্যার নানুমনিকে মুখোমুখি হতে হতো একগাদা প্রশ্নের,নাতনী এত কাঁদে কেন?ডাক্তার দেখান।হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ আনুন। মনে হয় কারো নজর লেগেছে।এরকম হাবিজাবি আরও অনেক কথা।
তৃতীয় মাসে রাজকন্যা তার দাদাভাইয়ার বাসা থেকে বেড়িয়ে এসে বেশ লক্ষীটি হয়ে গেছে।এখন সে মাঝে মাঝে রাতে জেগে থাকে।তবে আমার রাজকন্যা একা রাত জাগতে পছন্দ করে না বলে ইদানীং তার মার পাশাপাশি তার বাবাকেও রাতটা জেগেই পার করতে হয়।
সালমার হুইল চেয়ার এবং স্বপ্নময়ী সাবরিনা
(১)
সালমা আমার খালাতো বোন।থাকে কাপ্তাই শহরে।ওর জন্য অবশ্য শহর-গ্রাম,দিন-রাত এগুলোর পার্থক্য খুব বেশি নয়।কারণ গত ছয়-সাত বছর ধরে ওর জীবনটা ওদের ঘরের একটা খাটের উপরই কেটে যাচ্ছে খুবই নির্দয় ভাবে।ছোটবেলায় ও খুব দুরন্ত ছিল।শৈশবের সময়টাতে কাপ্তাই শহরের বড়ইছড়ি নামক জায়গায় থাকতো ওরা।ওদের বাসার সামনে খোলা মাঠ ছিল।বাসার পেছনে ছিল একটা চা পাতা বানানোর কারখানা।ও নিজেই এসব ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিল আমাদের।আবার সমবয়সীদের সাথে পুতুল খেলার জন্য দিত ভোঁ-দৌড়।আন্টি ওর দুরন্তপনায় কখনো কখনো অস্থির হয়ে উঠত।কারণ ওকে ঘরেই রাখা যেত না।কে জানে পরে আর ঘরের বাইরে যেতে পারবে না বলেই হয়তো তখন ঘরেই থাকতে চাইতো না।
বিশ্বজিতের মৃত্যুর দায় আমাদের সবার
আমরা ষোল কোটি মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ কত সংখ্যক মানুষ সক্রিয় রাজনীতি করি বা সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত?
ভালো বাসার আকাল পড়েছে
একটা ভালো বাসা খূঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি গত দু’সপ্তাহ ধরে।এদিক হলে ওদিক হয় না।বাসার লোকেশন পছন্দ হলে বাসা পছন্দ হয় না।বাসা পছন্দ হলে গ্যাস সংযোগ থাকে না।গ্যাস সংযোগ থাকলে ভাড়া আকাশ ছোঁয়া।পানির সমস্যার কথা বিবেচনায় আনাই যায় না।কারণ কোনো বাসাতেই ২৪ ঘন্টা পানি দেয়ার ব্যবস্থা নেই।বেশির ভাগ বাসাতেই দু’বেলা পানি।আর যারা আরও আধুনিক তাদের একবেলা পানি।গত দু’সপ্তাহে ১২ টা বাসা দেখলাম।দুইটা মোটামুটি নেয়ার মতো পছন্দ হয়েছে।কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো একটা বাসাও নিতে পারিনি।দখিণের বারান্দা চাইনি।ঘরের দেয়ালে আকাশ রং চাইনি।চাইনি তেমন কোনো চাকচিক্য।তারপরও পাইনি।
দুই বেড রূমের একটা বাসার ভাড়া যখন ১৮ হাজার টাকা বলল,গ্যাস বিল,কারেন্ট বিল ছাড়া-আমার মনে হয়েছে আমার মাথার ভেতরে একটা চক্কর দিয়েছে।কেন যে বাসাটা পছন্দ হলো তা নিয়েই হা হুতাশ করছিলাম কিছুক্ষণ।
আর একটা বাসা-এক বেড,গ্যাস সংযোগ নাই,বারান্দা নাই,পানি একবেলা, ভাড়া ১২হাজার টাকা।এডভ্যান্স ৫০ হাজার টাকা।
লালপদ্ম
প্রখর রোদ। ঘামে ভিজে যাচ্ছে পুরো শরীর।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি সেই প্রিয়মুখ।কত বছর পর দেখা!এভাবে কোনোদিন দেখা হবে ভাবতেও পারিনি।খুব দামী কিছু হারিয়ে ফেললে মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে যেমন হাহাকার জেগে উঠে, মিতালীদি’কে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মাঝে মাঝে ঠিক সে রকম হাহাকারই জেগে উঠত আমার।
মিতালীদি আমার স্কুল টিচার ছিল।তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক ছিল তারা আমাদের প্রতিবেশি ছিল বলে।আমি আর আমার ছোট বোন নকশী দিনের বেশির ভাগ সময়ই মিতালীদি’দের বাসায় থাকতাম।মা কোথাও বেড়াতে গেলে আমাদেরকে মিতালীদি’র মায়ের জিম্মায় রেখে যেত।মিতালীদি’র ছোট বোন চিত্রাদি কি সুন্দর গান করতো!মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।মিতালীদি’র বাবা একটা সরকারী চাকরী করতো।আর মিতালীদি’র ভাই মৃত্যুঞ্জয়দা’তো ছিল আমার স্বপ্নের মানুষ।
বিলাসিতা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান জহুরুল হক। এই প্রথম তিনি চ.বি. ক্যাম্পাসে এসেছেন। চট্টগ্রামে এসেছেন দ্বিতীয়বারের মতো। তিনি থাকেন লক্ষীপুরে। শিক্ষকতা করেন একটি প্রাইমারী স্কুলে। গ্রামে গাছ-পালা, লতা-পাতা, ক্ষেত-খামার, পশু-পাখি দেখে তিনি অভ্যস্ত। তবুও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নম্বর গেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশন পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে সারি সারি বৃক্ষ দেখে তিনি আপন মনে বললেন, বাহ ! কি সুন্দর !
অনাহূত ধর্মঘটের কারণে চবি’র ক্লাস স্থগিত। কিন্তু অনার্স ভর্তি কার্যক্রম চালু রয়েছে।প্রশাসনিক ভবনও সচল।শুধু ট্রেন চলছে না। হয়তো চলবে, তবে কোন শিক্ষার্থী থাকবে না। জহুরুল হক তার কন্যা নিঝুমকে নিয়ে অনেক্ষণ সময় পর্যন্ত বটতলীতে ভার্সিটির ৮টা ২০মিঃ এর ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু ট্রেন চলার কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে তিনি একটা সি.এন.জি ডাকলেন। ট্রেনে করে যাওয়ার পেছনে দুটি কারণ ছিল।প্রথম কারণ,তিনি কখনো ট্রেনে চড়েন নি,তাই ট্রেনে চড়ার একটা শখ পূরণের ইচ্ছা ছিল। আর দ্বিতীয় কারণ ছিল, ট্রেনে করে গেলে বিনা ভাড়ায় যেতে পারতেন। এতগুলো টাকা সি.এন.জি ভাড়া দিতে হতো না।
আত্মীয়
মানুষ যে কতটা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে পারে তা এ মুহুর্তে মোসাদ্দেক আলীকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না সেতুর।তিনি এত আগ্রহ নিয়ে কথা বলছেন যে তিনি খেয়ালই করছেন না তিনি যাকে কথা গুলো বলছেন সে আদৌ শুনছে কিনা। সেতু মোসাদ্দেক আলীর কথা শুনছে খুবই দায়সারা ভাবে।ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যদি এখানে মোসাদ্দেক আলী কথা না বলে ,রান্নাঘরে একটা কাপ ভাংগার শব্দ হলে সে শব্দ যেমন সেতুর কর্ণকুহরে প্রবেশ করত,ঠিক তেমনি মোসাদ্দেক আলীর বকর বকরও তার কানে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে।সে মাঝে মাঝে হা হু শব্দ করছে এবং বরাবরের মতো এবারও খুব বিরক্ত হচ্ছে।কিন্তু সে মুখটা খুব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।তারপরও তার মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে তার মুখ ফসকে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।আর সেজন্যই সে তার শ্বশুরের সামনে বসে থাকতে চাচ্ছে না।কিন্তু মানুষটা এমন আগ্রহ করে কথা বলছে যে তার মুখের উপর উঠে যেতে খুব অস্বস্তি হচ্ছে সেতুর।
মানুষ যখন আগ্রহ নিয়ে কিছু করে তখন সে মানুষটার জন্য একধরনের মায়া হয়।কখনো কখনো সে মায়া তীব্র ভালোবাসায় পরিনত হয়।যেমন-কেউ যদি খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলে,আগ্রহ নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে,শুনতে কিংবা দেখতে খুব ভালো লাগে।
আমার দাদী
৯০উর্দ্ধো দাদী আমার তিন দিনের জ্বরে হঠাৎ করে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বসেছেন।
কাউকে চিনতে পারছেন না ,কারো কোনো কথার জবাব দিচ্ছেন না।শুধু ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।দাদীর ছোটো ছেলে আমার বাবা।বাবা ভীষণ মা ন্যাওটা।বাবার বয়সই এখন ৬০ছূঁই ছূঁই।
দাদী ছিলেন লক্ষীপুরে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে আমার জেঠার কাছে।খবর পেয়ে বাবা নিজের অসুস্থতাকে বৃদ্ধাংগুল দেখিয়ে সাত সকালে শাহী গাড়িতে করে দিলেন লক্ষীপুরে ছুট।গিয়ে তো মায়ের অবস্থা দেখে বিমর্ষ।নিজের প্রেশারই হাই হয়ে গেছে।যখনই ফোন দিই কী অবস্থা।বাবার গলাটা জড়িয়ে আসে।আমি বলি বু’র (দা্দীকে আমরা বু ডাকি) তো বয়স কম হয় নাই,সেজন্যই হয়তো শরীরটা বেশি অসুস্থ।দেখবেন ,বু কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে।
বাবা আমাকে বলে আমার মায়ের বয়স হয়েছে আমিও জানি।কিন্তু আমার তো মা।তাই মন বোঝে না।অস্থির লাগে।নিজের চোখের সামনে নিজের মাকে এমন দেখলে কোনো সন্তানই সুস্থ থাকতে পারে না।
বাবার মন খারাপের সিকি ভাগও হয়তো আমি বুঝি না।কিন্তু আমি অনুভব করার চেষ্টা করি।
ভালোবাসা আমাকে বাসেনি ভালো
টিকেট কাটার পর থেকেই আমি আতংকে ছিলাম ট্রেনে না জানি কে বসে আমার পাশের সিটটাতে।মনে মনে চাচ্ছিলাম কোনো না কোনো ভাবে যেন একজন মেয়ে বসে।আজ সকালে,(সকাল না বলে ভোর বলা উচিত)এই কুয়াশার চাদরের ভেতর দিয়ে যখন আমি বটতলী রেল স্টেশনে এসে পৌঁছালাম তখনও মনে মনে একই দোয়া করছিলাম।কিন্তু না,আমার দোয়া যে কোনো কাজের না তা প্রমাণ করার জন্যই দেখি আমার পাশের সিটে বসে আছে উড়নচন্ডী,উসকু-খুসকু টাইপের একটা ছেলে।মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল।কিন্তু মেজাজ দেখানোর তো আর উপায় নেই।তাই বিরক্তি চেপে হতাশ নয়নে জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকি।
দিনের আলো ফোটার সাথে সাথেই কুয়াশা কেটে যাচ্ছে একটু একটু করে।আমি ভাবছি,কেন যাচ্ছি আমি ঢাকায়?কোনো কিছুতেই মন বসে না।যে ভালোবাসার জন্য আমি সব ছেড়ে দিতে চেয়েছি সে ভালোবাসাই কিনা কত সহজে ছেড়ে দিল আমাকে।মুক্তির স্বাদ যে এত বিস্বাদ হতে পারে এ ঘটনার মুখোমুখি না হলে হয়তো কোনোদিনই জানা হতো না আমার।ভাবনার ছেদ পড়ে পাশে বসা পাবলিকের উপরের লাগেজ স্ট্যান্ড থেকে ব্যাগ নামাতে গিয়ে ফেলে দেয়ার শব্দে।আমার বিরক্তি ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,সরি।
সাজানো ঘর
সতের বছর ধরে তিল তিল করে সাজিয়েছে সে। যেখানে যে জিনিসটি মনে ধরেছে কেনার চেষ্টা করেছে। সেই পছন্দের জিনিসটি এনে তুলেছে নিজের ঘরটিতে। এ ঘরের প্রতিটি ইট, বালু, সিমেন্টে জড়িয়ে আছে সে। তার নকশী করা কাঁথা, বিছানার চাদর, বালিশের কভার সব কিছু যেখানে সে রেখেছে সেখানেই আছে। শোকেজের কাঁচের তৈজসপত্র, আলমারিতে রাখা ভাঁজে ভাঁজে সাজানো শাড়ি, গহনা সব কিছু আছে। দেয়ালে টানানো ছবিতে কী সুন্দর হাসি। তিনপুত্র নিয়ে সাজানো ঘর। ঘরের সামনে ছোট্ট ফুলের বাগান। একটু দূরে পেয়ারা গাছ, জাম্বুরা গাছ, জলপাই গাছ সব আছে। শুধু সে মানুষটি নেই। সতের বছর আগে নতুন বউ হয়ে যে এসেছিল এ বাড়িতে। পুরনো ভাঙা ঘর দেখে সে কী বিস্ময়! বাবা কেমন করে পছন্দ করল এ বাড়ি!
ঢাকা শহর ঢাকা নয়
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে প্রথম পা রেখছিলাম ঢাকা শহরে।ঢাকায় যাওয়া উপলক্ষে সেবার অনেক প্রথমের মুখোমুখিই হয়েছিলাম।সময়টা ছিল ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যনেজম্যান্ট (বিআইবিএম)এ বাবার দু’সপ্তাহের এক ট্রেনিংকে কেন্দ্র করেই আমাদের স্ব-পরিবারে ঢাকায় যাওয়া।আমি তখন সবে মাত্র আগ্রাবাদ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি।যেহেতু বছরের শুরুর দিকে মাত্র তাই পড়ালেখার কোনো চাপ নেই।ঠিক এমন সময়ে ঢাকায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ-খুশি আর কারে কয় টাইপের অবস্থা।আমাদের বেশির ভাগ আত্মীয় স্বজনই ঢাকায় থাকে।আমরাই শুধু চট্টগ্রামে থাকি।আর তাই বাবার দু’সপ্তাহের ট্রেনিংএর সময়টাতে চট্টগ্রামে আমরা একা থাকব কিভাবে এসব ভাবনার কারণেই শেষ সিদ্ধান্ত হয় সবাই মিলে ঢাকায় ঘুরে আসার।
জীর্ণ-মায়া
খুব ছোটখাটো বিষয় নিয়েও ইদানীং সায়ানের সাথে আমার ঝগড়া লেগে যায়।আমার মনে হয় সায়ান বদলে গেছে।সায়ানের মনে হয় আমি বদলে গেছি।আসলে আমরা দুজনেই বদলে গেছি।কেউ কারো কথা শুনতে রাজী নই।দুজনেই বলতে চাই।আর দুজনেই বলতে চাইলে তো সমস্যা হবেই।আমাদের ও হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন ই ঝগড়া হয়।ঝগড়াটা মূলত শুরু হয় রাতে। রাতে শুরু হওয়ার কারণ হচ্ছে সারাদিনে রাতেই আমাদের কিছু সময় থাকে। খুব সকালেই সায়ান চলে যায় অর ব্যবসার কাজে। নতুন একটা ব্যবসা দাঁড় করানো বেশ ঝক্কির ব্যাপার। আর ঘর সংসার সামলে এনজিওতে পার্ট টাইমে একটা চাকরী করি আমি।।বলা যায় দুজনেই ব্যস্ত থাকি দিনভর।তাই হতো দিনের সময়টাতে ঝগড়া হয় না।
সায়ান আমার সাথে এখন আর আগের মতো সব কথা বলে না।লুকোচুরি করার চেষ্টা করে।যেহেতু মানুষটাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি তাই তার লুকোচুরির ব্যপারটা আমি ধরে ফেলতে পারি।