মীর'এর ব্লগ
সারভাইভিং হলোকাস্ট বাডি
শিরোনামের কথাটা লিখেছিলাম এক পুরোনো বন্ধুকে, যে সম্প্রতি মেসেঞ্জারে জানতে চেয়েছিল, হেই ইউ, হোয়াট আর য়ু ডুয়িং নাউ?
অথচ এই আমি একসময় নিজের শার্টের ভেতর হাত লুকিয়ে রেখে মানুষকে বোঝাতে চাইতাম যে, আমার একটি হাত কাটা পড়েছে। সেটা খুব বেশিদিন আগের কথা না।
সে সময় একটা চাররঙা টিপ-কলম ছিল আমার। প্রায়ই যেটার চারটা বাটন একসঙ্গে টিপতাম। কোন শীষই বের হতো না। ওই সব দিনে বাড়ির মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকতাম। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কেউ আসতো না, একসময় নিজেই আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়তাম। ভগ্ন মনে।
ঈদের সময় বা বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়াটা জীবনের একটা অন্যতম প্রিয় অনুষঙ্গ ছিল। রাতের ট্রেনে বাড়ি ফেরার সময় মনে করতাম, চাঁদটাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি যাচ্ছে।
আর প্রায়ই ঘরের সুইচবোর্ডে অবস্থিত ফ্যান, লাইট ইত্যাদির সুইচকে মাঝামাঝি জায়গায় ব্যালেন্স করার চেষ্টা চালাতাম। এই কাজ করতে গিয়ে প্রচুর বাল্বের ফিলামেন্ট কেটেছে আমার হাতে। এছাড়া ফ্রীজের লাইট কখন বন্ধ হয় তা দেখার জন্য খুব আস্তে আস্তে সেটার দরজা বন্ধ করতাম।
আই উইশ আই ওয়াজ ইনভিজিবল!
১.
একজন বন্ধু লিখেছেন, আই উইশ আই ওয়াজ ইনভিজিবল!
পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সবার মনের আশা একই রকম থাকে কেন? আমার তো সেই কবে থেকে ইচ্ছে করে অদৃশ্য হয়ে যেতে। ইচ্ছেগুলো পূরণ হয় না। শুধু বিভিন্ন রকম ফর্ম পূরণ হয়, বছরজুড়ে।
দেউলিয়াত্ব ক্রমে খুবলে খাচ্ছে শরীর। মনটাকে তো খেয়েছে সে প্রক্রিয়াটির শুরুর দিনে। আর মগজ খেয়েছে অনেক আগে। বালুমানবকেই মনে পড়ে আজকাল শুধু।
২.
চলছে জীবন নিজের গতিতে। আশপাশে কত কিছু ঘটে যায়। একটা আড়াই বছরের বাচ্চা তিনতলা থেকে পড়ে যাবার সময় তাকে ধরে ফেলে কয়েকজন কারখানা শ্রমিক। ইন্দোনেশিয়ায় বন পুড়ানোর কারণে সিঙ্গাপুরের বাতাসে কার্বনের মাত্রা বেড়ে যায়। জীবন বাজি রেখে যে শ্রমিক বড় বড় ইমারত নির্মাণ করে, সে কোনোদিনও পায় না ওই ইমারতে বসবাসের আস্বাদ। অথচ তারপরও প্রতিটি মানুষের কাছে তার জীবনই মুখ্য। নিজের জীবনটাকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে ভালোবাসে এমন মানুষের সংখ্যা কত পৃথিবীতে। হাতে গুণে কি শেষ করা যাবে?
৩.
বেইরুতের গল্পকথা: সাধু জর্জের উপকূলে
১.
আসলে আমাদের জীবনে যা কিছু হয়, ভালোর জন্যই হয়- ঠিক কিনা? আমাদের ইনটুইশন, স্বজ্ঞা বা অন্তর্জ্ঞান যাই বলি না কেন, খুব ভাল করেই জানে আমরা কে কি করার জন্য জন্ম নিয়েছি এবং বেড়ে উঠেছি। তাই আমি জীবনে যখনই কোনো সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য হই, নিজের ইনটুইশনকে প্রশ্ন করি সেটার ব্যাপারে। যেমনটি সেবার চাকুরির ইস্তফাপত্র জমা দেয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, ইস্তফা দেবো কিনা। উত্তর এসেছিল একবাক্যে, হ্যাঁ।
সেই ইস্তফাপত্রটা সেবার জমা না দেয়া হলে, সম্ভবত কখনোই আমার বেইরুতের অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব হতো না। আর সাতপাকে জড়িয়ে জীবনের কি চেহারাটা দাড়াঁতো, তা নাহয় নাই ভাবলাম। চলুন আজ সে অভিজ্ঞতাটার কথাটাই জেনে নেয়া যাক।
দখিনা নিঝুম বন্দরে বিলুপ্ত নীলের পূর্বপুরুষ উতলা নাওয়ের হাল ধরে
১.
রাজধানীর রাস্তাগুলো অসাধারণ। আর সংখ্যাতেও অনেক। একবার কোনো একটা রাস্তায় হারিয়ে যেতে পারলেই কেল্লা ফতে। হাজারো গলি আর লক্ষ অলিতে নিজেকে নিয়ে মিশে যাওয়াটা কঠিন নয় মোটেও। গভীর শীতের রাতে বিজয় সরণী-তেজগাঁও লিংক রোডের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরানো অনেক কঠিন তারচেয়ে।
দুপুরের কড়া রোদে যখন মানুষের সাথে সাথে মহল্লার দোকানী, দোকানের চাএর স্টোভ, উত্তরের বড় মোড়, মোড়ের বিলবোর্ড- সবাই এক তালে ঝিমায়; তখন আমার সাইকেলে চেপে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে ইচ্ছে করে।
এই নষ্ট শহরে নাম না জানা যেকোন মাস্তান
১.
রাজধানীর রাস্তাগুলো অসাধারণ। আর সংখ্যাতেও অনেক। একবার কোনো একটা রাস্তায় হারিয়ে যেতে পারলেই কেল্লা ফতে। হাজারো গলি আর লক্ষ অলিতে নিজেকে নিয়ে মিশে যাওয়াটা কঠিন নয় মোটেও।
দুপুরের কড়া রোদে যখন মানুষের সাথে সাথে মহল্লার দোকানী, দোকানের চাএর স্টোভ, উত্তরের বড় মোড়, মোড়ের বিলবোর্ড- সবাই এক তালে ঝিমায়; তখন আমার ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে ইচ্ছে করে। চারপাশে ঝিমুতে থাকা প্রতিটি অনুষঙ্গকে দেখতে ইচ্ছে করে। হঠাৎ কোনো ব্যস্ততায় একা রাস্তাটায় ঝিমুনির জগৎ থেকে বের হয়ে আসা, অপরিচিত এক চোখ টানা সুন্দরীর প্রতি আকৃষ্ট হতে ইচ্ছে করে। তার ইস্ত্রি করা সোজা চুল, রুজ ঘষে লাল করা গাল, কমলা রঙয়ের লিপস্টিকে আঁকা ঠোঁট, শরীর আঁকড়ে থাকা কামিজ, হাঁটুর পর থেকেই শেষ হয়ে যাবার হুমকি দিতে থাকা সালোয়ার বা গানের চরিত্র থেকে উঠে আসা নূপুর পড়া একটি পা- সবাই আমাকে আকর্ষণ করে। আমার কাছে এদের সবাইকে একেকটা আলাদা চরিত্র মনে হয়। সবার অভিনয়ে একটি সুন্দর সিনেমা দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা জন্মায়। অথচ সেই মেয়েটিই কিনা আমায় একদিন বিশাল মিথ্যে একটি কথা বলেছিলো!
প্রিয় প্লে-লিস্টের গভীর থেকে উঠে আসা একটি উপলব্ধি
আজকাল বা পরশু যদি সে এসে দাঁড়ায়
ছায়ার মতো আমার ছায়ায়
ছায়ারো ছায়াতে সে অন্যজন
ভরদুপুরে একলা রাতে অন্য মন...
গানটা মনে পড়ে গেলো যখন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে দিয়ে পার্কে ঢুকছিলাম তখন। কানে হেডফোন গোঁজার জন্য খানিক যাত্রাবিরতি নিতে হলো। তারপর মনে হলো পার্কে ঢুকে কি লাভ? এমন না যে, নীলা ভেতরে কোথাও আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। ও অনেকদিন আমার জন্য কোথাও গিয়ে বসে অপেক্ষা করে না।
একটা সময় দিনের বেশিরভাগ সময় সে লাইব্রেরীতে বা কমন রুমে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করতো। সে সময়গুলোতে স্মার্টফোনও বাজারে নামে নি। ছিলো না ফ্রুট নিনজার মতো কোনো গেম। সে কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার জন্য বসে থাকতো আমি বুঝতাম না। মাঝে মাঝে ওর কাছে জানতে চাইতাম, কিভাবে পারো তুমি? ও কিছু বলতো না এবং শুধু নিঃশব্দে হাসতো।
আমি এখন বুঝতে পারি, ও সেটা কিভাবে পারতো। কারণ ও ভালোবাসতো। ভালোবেসে ঘন্টার পর ঘন্টা কারো জন্য কোথাও বসে থাকা অসম্ভব না। বিশেষ করে ভালোবাসার প্রথম দিককার দিনগুলোতে তো একেবারেই না। যেকোন ভালবাসারই প্রথম দিককার দিনগুলো একেবারে ইউনিক। আমার অসাধারণ লাগে!
হয়তো সে জীবনটা আমার ছিলো না
১.
মস্তিষ্ক খুব দ্রুতগতিতে জঞ্জালে রূপান্তরিত হচ্ছে। আজকাল আর খুব বেশি কিছু মনে থাকে না। অথচ আগে শ'খানেক পরিচিতের মোবাইল নাম্বার মুখস্ত ছিলো আমার। অনেক দিন পর্যন্তই ছিলো। ইদানীং খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, মানুষের নামটা পর্যন্ত মনে থাকে না খুব কসরত না করলে। শহরটারও আমার মস্তিষ্কের মতোই অবস্থা। আগে আমার বাসার জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যেতো, আকাশটা কোথায় গিয়ে দিগন্তের কালো রেখার সঙ্গে মিলেছে। এখন জানালা দিয়ে তাকালে নির্মাণাধীণ ভবন দেখতে পাই। কিছুদিন পর হয়তো ভবনটির গায়ে সুন্দর রং করা হবে। কিন্তু সে রং আকাশের মতো হবে না।
২.
দ্রুতগতিতে চলছে জীবন
"ও ছোটপাখি ছোটপাখি সর্বনাশ হয়ে গেছে
পৃথিবীর পরে আর
তোমার-আমার
ভালোবাসার কেউ নেই, কিছু নেই।
ও ছোটপাখি ছোটপাখি
ভাংচুর হয়ে গেছে
শিশুদের খেলনায়, আমাদের দোলনায়, ডাকবাক্সের ঢাকনায়
রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে আলো নেই।
ও প্রেমপাখি প্রেমপাখি
গানটা হেরে গেছে, নদীটা ফিরে গেছে, পাহাড়টা সরে গেছে, সাগরটা মরে গেছে
আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই।
ও নেই নেই কিছু নেই
রাস্তার বাম নেই, শ্রমিকের ঘাম নেই, টাকাদের দাম নেই, চিঠিটার খাম নেই
আমাদের কারো কোনো নাম নেই।
ও ছোটপাখি ছোটপাখি সর্বনাশ হয়ে গেছে
পৃথিবীর পরে আর
তোমার-আমার
ভালোবাসার কেউ নেই, কিছু নেই।"
২০০৪-০৫ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি খুব বেশি দিন হয় নি। প্রাইভেট টিউটর বা পত্রিকার ইউনিভার্সিটি রিপোর্টার জাতের কিছু হয়ে ওঠার তাগিদ তখনো মনের ভেতর ঢোকার পথ খুজেঁ পায় নি। ইন ফ্যাক্ট, স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধবদের তখনো নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে রাখতে ভালো লাগতো। ক্যম্পাসে, ডিপার্টমেন্টের ক্লাসে- কোথাও খুব বেশি মন বসতো না। কিন্তু ক্যম্পাসে গেলে একটা জিনিস ঠিকই টের পেতাম, সেখানে আমার একটা নোঙর পোঁতা আছে। কোথাও না কোথাও।
গল্প: প্রিয় বর্ষাকে নিয়ে দুই ছত্র
বর্ষা একটা দারুণ ঋতু। বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হুডখোলা রিকশায় ঘোরার মজাই আলাদা। এ সংক্রান্ত একটি ছোট্ট সত্যি গল্প মনে পড়ে গেলো লীনা আপুর প্রকৃতি কথা... ব্লগটা পড়ে। ভাবলাম, লিখে ফেলি। উনাকে অনেকদিন কোনো পোস্ট উৎসর্গও করা হয় না। সেটাও করা হলো এই সুবাদে। 
---
সেবার নম পেন যেতে হয়েছিলো একটা আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সম্মেলনের ঢাকনা দিতে। কভার করার বাংলা হিসাবে এই কথাটা ব্যবহার করে আমি খুব মজা পাই। সম্মেলন শুরুর দিন সকালে আকাশে রোদ ঝিকমিক করছিলো। আর ছিলো ঠান্ডা বাতাস।
জলে যায় জলের পোকা, স্কুলে যায় কোলের খোকা
সেদিন দু'টি চড়ুই পাখির কলহ দেখছিলাম। আমি আর দুর্জয়। ওরা ঝগড়া করতে করতে নিজেদের আবাসস্থল ছেড়ে মাটিতে নেমে এসেছিলো। ছেলে চড়ুইটা চড়ুই পাখির ভাষায় চিৎকার করে অন্য চড়ুইদের কাছে সঙ্গীনির নামে বিচার দিচ্ছিলো। আর আশপাশটা ঠিক তখনই নিশ্চুপ হয়ে যেতে দেখে বুঝে ফেললো, দু'টি মানবসন্তান ওদের খেয়াল করছে। সঙ্গে সঙ্গে দুই জন ফুড়ুৎ। চড়ুই পাখিরা কখনোই নিজেদের ঝগড়া মানুষকে দেখতে দিতে চায় না।
সেই ঝগড়ার পুরো সময়টিতে মেয়ে চড়ুইটিকে একবারের জন্যও মুখ খুলতে দেখি নি। ভালবাসা মনে হয় এমনি। সঙ্গীর প্রতি যদি অভিযোগই থাকে, তাহলে কি ভালবাসা থাকা সম্ভব?
ছোট পাখি ছোট পাখি ভাঙচুর হয়ে গেছে শিশুদের খেলনায়, আমাদের দোলনায়…
কি কি উপায়ে বাঁশের কেল্লা এবং ওই চক্রটিকে রুখে দেয়া যায়?
বাঁশের কেল্লা নামের ফেসবুক পাতাটি ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে উঠছে। একাধিকবার সরকারীভাবে বন্ধ করে দেয়া পরও কোনো লাভ হয় নি। কারণ বন্ধ করার অল্প সময়ের মধ্যেই শিবিরের লোকজন আবার একই নামে একটি করে নতুন পাতা চালু করে ফেলছে। তারপর বাঁশের কেল্লার টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে নতুন পাতাটির লিংক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ইন্টারনেট চড়ে বেড়ানো ছাগুর দল মুহূর্তে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেখানে। চাঁদে দেইল্ল্যা রাজাকারের মুখ দেখা যাওয়ার গুজব এই বাঁশের কেল্লার মাধ্যমেই সারাদেশে ছড়ানো হয়েছিলো। এই ভয়ংকর গুজবটির কারণে সারাদেশে একশ'র বেশি মানুষকে মরতে হয়েছে। সিএনএন-এর আইরিপোর্ট বিভাগে এ ঘ্টনাটি নিয়ে একটি রিপোর্ট করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে- কিভাবে ইসলামকে অপব্যবহার করে বাংলাদেশে সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে।
রাত যত গভীর হয়, ভোর তত এগিয়ে আসে
১.
দেশে একটা সংকটকাল উপস্থিত হয়েছে। চাপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, রংপুর, ঠাকুরগাও, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ৪ পুলিশসহ ৪২ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে 'দেইল্যা রাজাকার'-এর ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর এসব সংঘর্ষ শুরু হয়।
লক্ষণীয় যে, ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় ঘোষণার পর দেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ৫ তারিখ সন্ধ্যার পরের অংশটুকু বাদ দিলে এ আন্দোলনের বয়স ২৪ দিন। আর ওই আগুন লাগানো সন্ধ্যাটিকে ধরে হিসাব করলে ২৫। এতগুলো দিন আমরা কাদের মোল্লাসহ সব রাজাকারের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি, কিন্তু একজন মানুষকেও কুটোর আঁচ পেতে দিই নি। অথচ ওদের নেতার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর মাত্র ১ দিনে সারাদেশে মরতে হয়েছে ৪২ জন মানুষকে। অনেকে আবার ওদেরই দলের সদস্য। এই জামায়াত-শিবিররকে যে আমরা রক্তচোষা জানোয়ার বলি, সেটা কি ভুল বলি?
এই প্রশ্নটা প্রশ্ন হিসাবে কেমন?
১.
দেশে একটা সংকটকাল উপস্থিত হয়েছে। চাপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, রংপুর, ঠাকুরগাও, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ৩ পুলিশসহ ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে 'দেইল্যা রাজাকার'কে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর এসব সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ জামায়াত-শিবির-রাজাকার গোষ্ঠীকে ঠেকাবার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা চালাচ্ছে এবং বিজিবি তাদের সহযোগিতায় কাজ করছে।
লক্ষণীয় যে, ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কাদের মোল্রার যাবজ্জীবন রায় ঘোষণার পর দেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ৫ তারিখ সন্ধ্যার পরের অংশটুকু বাদ দিলে এ আন্দোলনের বয়স ২৩ দিন। আর ওই আগুন লাগানো সন্ধ্যাটিকে ধরে হিসাব করলে ২৪। এতগুলো দিন আমরা কাদের মোল্লাসহ সব রাজাকারের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি, কিন্তু একজন মানুষকেও কুটোর আঁচ পেতে দিই নি। আর আজ দুপুরে ওদের নেতার রায় ঘোষণার পর এখনো একবেলা পুরোপুরি পার হতে পারে নি। তার আগেই মারা যেতে হয়েছে ৪৩টি মানুষকে। এদের অনেকেই আবার ওদেরই দলের সদস্য।
ব্লগার মানেই নাস্তিক নন
ব্লগ লিখছি কতদিন হয়? চার বছর চার মাস! এই দীর্ঘ সময়ে পড়া হয়েছে শত সহস্র ব্লগ। সবচাইতে প্রিয় ব্লগ কোনটা আমার, কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। যদি জিজ্ঞেস করতো, তাহলে আমি বলতাম, ব্লগার 'জানালা'র একটি ব্লগের কথা।
ভেলরি টেইলরকে নিয়ে যখন আমরা পুরো ব্লগ দুনিয়ার লোকগুলো হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন জানালা নামে একজন ক্ষণজন্মা ব্লগার একটি ব্লগ লিখেছিলেন। আমি মাঝে মাঝে সেই লেখা পড়ি, চোখ জলে ভরে যায়। 'জানালা' লিখেছিলেন এক অসহায় মেয়ের গল্প। যে নিজের পায়ে হাঁটতে পারে না বলে মেলায় যেতে পারে না। অপেক্ষায় থাকে তার ভাই তাঁকে মেলায় নিয়ে যাবে। জানালা নামের ব্লগার তার মিহিদানা অক্ষরে সেই মেয়েটির গল্প লিখেন আমাদের জন্য।
"হঠাৎ খেয়াল করি, যেখানে যাই সে আসছে সাথে সাথে। এক ফাঁকে বোনকেও ফোন করে একবার; আমি না মেলায় যাচ্ছি। এমনকি অফিস রুমেও। তুমুল বিরক্তি নিয়ে বলি, কিছু চাই তোমার? সে বলে আবারো, তুমি মেলায় যাবে না? আমি একটু চিন্তায় পড়ে যাই। বৃষ্টি কমে যায় যদি! সে আমার সামনে একটা সোফায় বসে থাকে। চোখের আড়াল করে না। যদি তাকে ফেলে মেলায় চলে যাই।"
আন্দোলনের একদিন
শুক্রবার। বাসা থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গেলো। আগের দিন রাত ৪ টা পর্যন্ত মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকার ফল। কাজের কাজ কিছু হয় নাই, এমনটা বলবো না। আন্দোলনের নানান দিক নিয়ে অসংখ্য আলোচনা মস্তিষ্কের নিউরণের ভেতর বানের পানির মতো প্রবেশ করেছে। ভাগ্যিস ইনফরমেশনের কোনো ভর থাকে না। নাহলে আমার মাথাটা এত ভারী হয়ে যেতো যে, নিশ্চিত সেটা আজ আর আমি বালিশ থেকে তুলতে পারতাম না।
পৌনে ১২টার দিকে দৈনিক বাংলা মোড় দিয়ে ঢুকে বায়তুল মোকাররমের সামনে একটা চক্কর দিলাম। শ্রম ভবনের দিকটা একেবারে পল্টন মোড় পর্যন্ত বন্ধ। উল্টা রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছি আর দেখছি হাজারো দাঙ্গা পুলিশ, রাব দাঁড়িয়ে আছে পজিশন নিয়ে। তাদের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি। বায়তুল মোকাররমের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো শ'পাচেক অল্পবয়সী পাঞ্জবি পড়া ছেলে। পুরো সিঁড়িই দখল করে ছিলো ওরা। সংবাদকর্মীদের অনেককেই দেখলাম মাথায় হেলমেট পড়ে ঘোরাঘুরি করছেন। নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টারকে দেখলাম। দেখে মেজাজ খারাপ হলো। কেন, কে জানে?