ইউজার লগইন

হৈমন্তী... (শেষ পর্ব)

হৈমন্তী

আমার মনে একটা ভাবনা ছিল রাজনীতি করা বড়ো মেয়ে না জানি কি করিয়া বসে। কিন্তু অতি অল্পদিনেই দেখিলাম টেলিভিশনের হিন্দি চ্যানেলের সিরিয়ালের সঙ্গে নারী মনের কোনো জায়গায় কোনো কাটাকাটি নাই। বসিয়া দিনরাত হিন্দি সিরিয়াল দেখিতে লাগিলো। দেখিতে দেখিতে চোখে ঘোর লাগিয়া উঠিলে ঘুমাইয়া বিশ্রাম লয়।

এ তো গেল এক দিকের কথা । আবার অন্য দিকও আছে , সেটা বিস্তারিত বলিবার সময় আসিয়াছে ।

আমাদের ঘরের কাজ কর্ম শিখাইবার জন্য মা ব্যগ্র কিন্তু হৈম কোনভাবেই ঘরের কাজ করিতে আগ্রহী নহে। বরং সে কাজের কথা বলিলেই কোমরে ওড়না পেচাইয়া তারঃস্বরে বিরোধী দলীয় সাংসদ দের ন্যায় মা এর সহিত ঝগড়া করিতে উদ্যত হয়। মা ও কম যান না, তিনিও আঁচল পেচাইয়া তাহাকে প্রধানমন্ত্রীর ন্যায় এক হাত দেখাইতে প্রস্তুত হইয়া থাকেন। ফলশ্রুতিতে গৃহবাস নরকবাসের মতন মনে হইতে লাগিলো।

বাবা মা এর বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেশের কুটুম্বরা আমাদের বাড়িতে আসিয়া জমা হইলেন। কন্যাকে দেখিয়া তাঁহাদের মধ্যে একটা কানাকানি পড়িয়া গেল । কানাকানি ক্রমে অস্ফুট হইতে স্ফুট হইয়া উঠিল। তাঁহার মধ্যেই হৈম আসিয়া উপস্থিত হইলো। কোনো-এক দিদিমা জিজ্ঞাসা করিলেন , “ নাতবউ , তোমার বয়স কত বলো তো। ”

হৈম বলিলো - কুড়ি। বলিয়াই মা'র দিকে তাকাইয়া চোখ টিপিয়া ইশারা করিলো।
ছেলে বউ এর চোখ টিপি দেখিয়া তৎক্ষণাৎ মা মূর্ছা গেলেন। দিদিমারা সকলে মিলিয়া মা'র মুখে চোখে পানি ছিটাইয়া সুস্থ্য করিয়া তুলিলেন। দিদিমা'রা কহিতে লাগিলেন -
"অপু এই বুড়ো ধামরা বয়সে এমন কচি মেয়ে ঘরে আনিলো। ছিঃ ছিঃ ছিঃ"

বধূর নির্বুদ্ধিতায় রাগিয়া উঠিয়া মা বলিলেন, “ তুমি তো সব জান! তোমার বাবা যে বলিলেন , তোমার বয়স ত্রিশ । ”

হৈম কহিল - "বাবা কি আমাত্তে বেশী বুঝে?"

ইহার পরে মা যতই গালি দিতে লাগিলেন কথাটার কালি ততই গড়াইয়া ছড়াইয়া চারি দিকে লেপিয়া গেল।

হৈমর দুর্গতিতে দুঃখ করিব কী, তাহার কাছে আমার মাথা হেঁট হইয়া গেল। সেদিন একখানা শৌখিন-বাঁধাই-করা সিদ্দিকা কবিরের রেসিপির বই তাহার জন্য কিনিয়া আনিয়াছিলাম। বইখানি সে হাতে করিয়া লইল এবং আস্তে আস্তে কোলের উপর রাখিয়া দিল, একবার খুলিয়া দেখিল না।

আমি তাহার হাতখানি তুলিয়া ধরিয়া বলিলাম, “ হৈম , আমার উপর রাগ করিয়ো না। আমি তোমাকে কখনো আঘাত করিব না। আমি যে তোমারে ডরাই ”

শবে বরাত উপলক্ষ্যে বাসায় বিপুল উৎসাহে হালুয়া রুটির যোগাড় যন্ত চলিতে লাগিলো। এ-পর্যন্ত সে-সমস্ত ক্রিয়াকর্মে বাড়ির বধূকে ডাক পড়ে নাই। নূতন বধূর প্রতি সেদিন হালুয়া বানানোর আদেশ হইলে সে বলিল, “ মা , বলিয়া দাও কী করিয়া হালুয়া রাঁধিতে হইবে"

ইহাতে কাহারো মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িবার কথা নয়, কারণ সকলেরই জানা ছিল ভার্সিটি হলে থাকিয়া কন্যা মানুষ ।

হৈম কোনক্রমেই টিভির সামনে হইতে উঠিবে না, তাঁহার পছন্দের সিরিয়াল দেখিবে অপরপক্ষে মা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চ্যানেলের সিরিয়াল দেখিতে চাহিবে। ইহা লইয়া ঘরে বউ শাশুড়ির ঝগড়া আরো বাড়তে লাগিলো। বাবা তাঁহার পছন্দের রেসলিং দেখিতে পারে না বলে মন খারাপ করিয়া হৈম'র বাবাকে শাপ শাপান্ত করিতে লাগিলো।

বাড়িতে দোষ সমস্তই হৈমর। তাহার দোষ যে তাহার বয়স ত্রিশ ; তাহার দোষ যে আমি তাহাকে ভয় পাই ; তাহার দোষ যে বিধাতার এই বিধি , তাই আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্ত আকাশ আজ ভুভুজেলা বাজাইতেছে।

ব্যবসা করিবার উদযোগে কোমর বাঁধিয়া লাগিলাম । তাহার ফাঁকে ফাঁকে গৃহে শান্তি আনিবার জন্য উদযোগ গ্রহন করিতে লাগিলাম। একদিন বৃহস্পতিবার মধ্যাহ্নে নিজের ঘরে বসিয়া "সংসারে শান্তি আনিবার ১০১ টি উপায়" পড়িতেছিলাম এমন সময় হঠাৎ করিয়া ফ্যামিলি লিভিং রুমের দিকে চোখ পড়িলো। দেখি হৈম বসিয়া 'কাভি সাস ভি কাভি বহু থি' অবলোকন করিতেছে। তাঁহার আঁখির কোনায় জল জমিয়াছে , তাহা যেন শরতের শিশির কণার মতন চিক চিক করিতেছে।

আমার বুকে ধক্‌ করিয়া একটা ধাক্কা দিল; মনের মধ্যে একটা অনবধানতার আবরণ ছিঁড়িয়া পড়িয়া গেল। এই নিঃশব্দ গভীর বেদনার রূপটি আমি এতদিন এমন স্পষ্ট করিয়া দেখি নাই। আমার বুকের ভিতরটা হুহু করিয়া উঠিল।

শিশুকাল হইতে বাবার কাছে আমার সংকোচের অন্ত ছিল না— কখনো মুখোমুখি তাঁহার কাছে দরবার করিবার সাহস বা অভ্যাস আমার ছিল না। সেদিন থাকিতে পারিলাম না। লজ্জার মাথা খাইয়া তাঁহাকে বলিয়া বসিলাম, “ বউকে লইয়া হানিমুনে যাইতে চাই"

বাবা তো একেবারে হতবুদ্ধি। মনে লেশমাত্র সন্দেহ রহিল না যে, হৈমই এরূপ অভূতপূর্ব স্পর্ধায় আমাকে প্রবর্তিত করিয়াছে। বাবা কহিলেন - "বটে রে। নিজে কামাই করিয়া সেই টাকায় ঘুরিয়া আসো। আকামের ঢেঁকি।"

বন্ধুরা কেহ কেহ আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, যাহা বলিলাম তাহা করিলাম না কেন। স্ত্রীকে লইয়া জোর করিয়া বাহির হইয়া গেলেই তো হইত। গেলাম না কেন? কেন! বাপের মানিব্যাগ হইতে টাকা চুরি করিলেই তো হানিমুনে যাইবার টাকা উঠিয়া যাইতো।

তাহারও পরে কী হইল সে কথা আর বলিতে পারিব না।

শুনিতেছি, মা বাবা অন্যত্র ফ্ল্যাট ভাড়া সন্ধান করিতেছেন । হয়তো একদিন মার অনুরোধ অগ্রাহ্য করিতে পারিব না , ইহাও সম্ভব হইতে পারে। কারণ — থাক্‌, আর কাজ কী!

(সমাপ্ত)

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


সাঈদ ভাই রক্স!!!

সাঈদ's picture


আমি পাত্থর হইলাম ক্যাম্নে ??? Stare

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আহারে হৈম'র কত কষ্ট ! চোক্ষে পানি আইসা গেল Sad(

সাঈদ's picture


হ দাদাভাই । Steve

আনন্দবাবু's picture


অসাধারন। চমৎকার বিনুধুনময় সময় কাটাইলাম। এর পরের টার্গেট কে? বিলাসী?? Laughing out loud Laughing out loud

রাসেল আশরাফ's picture


বিলাসীর জন্য এক ভোট Big smile

তানবীরা's picture


বিলাসীর জন্য দশ ভোট

অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম। ১০০ তারা।

ধন্যবাদ Big smile

সাঈদ's picture


বিলাসী রে কিছু কইয়েন না , বেচারী !!!

তানবীরা's picture


হৈমন্তী থেকে সাহসী। আপনি লিখেন Big smile

১০

সাঈদ's picture


আমি ভিতু। এট্টুও সাহস নাই Sad

১১

মীর's picture


সুন্দর সমাপ্তি।

১২

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ ।

১৩

একজন মায়াবতী's picture


সাঈদ ভাই রক্স!!! Star Star Star Star Star

১৪

সাঈদ's picture


আমি পাত্থর হইলাম ক্যাম্নে ??? Stare

১৫

রাসেল's picture


জোশ

১৬

সাঈদ's picture


ধইন্যা ।

১৭

জ্যোতি's picture


জট্টিল হৈছে। সাঈদ ভাই রক্স।

১৮

সাঈদ's picture


ধন্যবাদ। কাছেই থাকুন ।

১৯

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


সাঈদ ভাই রক্স!!

এইবার টার্গেট 'বিলাসী'! Big smile

২০

সাঈদ's picture


আমি পাত্থর হইলাম ক্যাম্নে ??? Stare

বিলাসী রে মাফ কইরা দেওন যায়না ? Steve

২১

নেয়ামত's picture


না বিলাসী রে কোনো ভাবেই মাফ করা যাইবোনা।
বিলাসীকে পথে নামাইতেই হইবো।
নইলে কইলাম হরতাল ডাকুম।

২২

নেয়ামত's picture


না বিলাসী রে কোনো ভাবেই মাফ করা যাইবোনা।
বিলাসীকে পথে নামাইতেই হইবো।
নইলে কইলাম হরতাল ডাকুম।

২৩

সাঈদ's picture


আমিও পুলিশ ডাকুম Crazy

২৪

দূরন্ত পথিক's picture


Wink Wink Tongue Tongue গুরু, জোসসসসসসসসস.............সসসসসসস(ষাটটা দন্ত "স")। Big smile Big smile Big smile আগে লিখলেই পারতেন। কবি গুরু দিল ফাইটা মইরা যাইতো।।।।।।।।।................. আরো চাই...............। Tongue Tongue Tongue

২৫

সাঈদ's picture


Wink Wink

২৬

শওকত মাসুম's picture


জোস

২৭

সাঈদ's picture


ধইন্যা পাতা

২৮

বিহঙ্গ's picture


মজা পুরাই ফাডান্তিস লাগলৌ গুল্লি ................।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সাঈদ's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো। অবাক লাগে।